দেশের মানুষ চেয়েছে তাই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

    কলকাতার এক নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক শিক্ষক একদিন নিজের স্কুলের উল্টোদিকে রাস্তায় বসে থাকা এক কমলালেবু বিক্রেতার সঙ্গে দরাদরি শুরু করেছেন। সেই লোকটি এক ডজন কমলালেবু আশি টাকার কমে দেবে না আর আমাদের শিক্ষকও ষাট টাকায় এক ডজন কিনবেনই। অনেক কথার পরও লোকটাকে রাজি করাতে না পেরে আমাদের শিক্ষকমশাই বলে উঠলেন, “ওই যে বিরাট স্কুলটা দেখছ, আমি ওখানে পড়াই। তুমি পঁয়ষট্টি টাকায় দিয়ে দাও বুঝলে!” আমাদের কমলালেবু বিক্রেতা সেই স্কুলের দিকে পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে, “ওই স্কুলে আমার বাবা পড়ত না আর আমার ছেলেও পড়ে না। লেবু নিতে হলে আপনাকে আশি টাকাতেই এক ডজন নিতে হবে।”

    ভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ বিগত দু’মাস ধরে লুটিয়েন্স-লন্ডন-হংকং হনলুলুকে ওই একটি কথাই বলেছেন,

    “আপনার স্কুলে আমার বাবাও পড়ত না আর ছেলেও পড়ে না।”

    এই সাধারণ মানুষরা সবাই যে একই জায়গায় ভোট দিয়েছেন তা মোটেই নয়। কিন্তু তাঁরা গলা না তুলে আওয়াজটুকু পৌঁছে দিয়েছেন। যেখানে দেওয়ার।

    “আমার চেয়ে ভাল আর কেউ বোঝে না” এই বিশ্বাস যদি মাথার গভীরে ঢুকে যায় তাহলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মতপ্রকাশ আমার ভেবে নেওয়া রাস্তায় না হাঁটলেই দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে মনে হয়। একবারও প্রশ্ন জাগে না, প্রতিটা মুহূর্তে ‘গণতন্ত্র’–এর কথা বলব আর রায় দেখে, ‘অশিক্ষিত মূর্খ’ বলে গাল দেব ভোটদাতাদেরই, এই দ্বিচারিতা কতদিন চলতে পারে? সংসদীয় গণতন্ত্র মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে যিনি বা যে দল জিতবে তার/তাদের শাসন। এবার আমার পছন্দের লোক জিতলেই মানুষের চেতনা বাড়ল আর হারলেই চেতনা কমল, এটা গা–জোয়ারি, গণতন্ত্র নয়।

    গণতন্ত্রে ‘রামা কৈবর্ত’ কিংবা ‘হাসিম শেখ’এর মতো গোয়ালিয়র বা দ্বারভাঙার মহারাজারও একটি করেই ভোট। তাই কৃষকের ভোটে মহারাজা হেরে যেতেও পারেন। আচ্ছা, এই মহারাজাদের লক্ষ-লক্ষ বর্গফুটের প্রাসাদ অধিগ্রহণ করে গৃহহীনদের মধ্যে বিলি-বন্দোবস্তের জন্য কোনও গণ-আন্দোলন হয়নি কেন? পাঁচ বিঘে জমির মালিককে খুন করে যাঁরা বিপ্লব করতেন, মহারাজাদের ক্ষেত্রে তাঁরা নিরুৎসুক ছিলেন কেন? প্রশ্ন করার অধিকার যদি স্বীকৃত হয়, তাহলে এই প্রশ্নও করতে পারে কেউ। যেমন কেউ জানতে চাইতেই পারে, যাঁরা সন্তানকে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের কোচিঙ-সেন্টারে ভর্তি করানোর সময় জেনে নেন, কোন কোন স্যার বা ম্যাডাম ক্লাস নেবেন, তাঁরা কীভাবে সেই রিকশাচালককে দোষ দিতে পারেন যে জানতে চেয়েছিল, বিকল্প প্রধানমন্ত্রীর নাম? “নেতা নয়, নীতিই আসল” যদি সত্য হয় তাহলে ‘স্যার-ম্যাডামের নাম নয়, পড়ানোটাই আসল’ও তো সত্যি!

    আসলে বাইরের সত্যকে অস্বীকার করলে যে ভিতরের মিথ্যাকেই প্রশ্রয় দিতে হয়, সেই বোধটা আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। গতবার যারা ৩১% শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবার যদি তারা ৪৬% পায় আর আমার পছন্দের দল ৩% শতাংশ থেকে ১% হয়ে যায় তাহলে মেনে নিতে হবে যে কোথাও একটা ভুল আছে, আমাকে নতুন করে রাস্তা বানাতে হবে জনগণের কাছে যাওয়ার।

    কিন্তু আমি মানব কেন? তার চাইতে যাকেই আমার অপছন্দ তাকেই ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে দাগিয়ে দিই। লাখে-লাখে মানুষ খুন করেছে হিটলার-স্তালিন-পলপট-সুহার্তো ইত্যাদি সব স্বৈরাচারী। কিন্তু আমি স্তালিন বা পলপট কিংবা সুহার্তো নিয়ে কিছু বলব না বলে যদি পণ করে বসি, তাহলে ‘হিটলার’এর বিরুদ্ধে বলা আমার কথাগুলো কোথাও একটু কম হয়ে যায় ওজনে, এটা বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হবার দরকার নেই। ‘সহিষ্ণুতা’ চাইব কিন্তু একটুও ‘সহিষ্ণুতা’ দেখাব না, ভিন্ন মতের জন্য গলা ফাটাব কিন্তু নিজের পাড়ায় ‘ভিন্নমত’ বরদাস্ত করব না, জিতলে আবির খেলব কিন্তু হারলেই বলব, ‘মার্কেটিং’ এমনটা হলে লুডোর ঘুঁটি উপর থেকে নিচে নেমে আসবেই কারণ গণতন্ত্রে আজ যে প্যাসেঞ্জার কাল তারই হাতে স্টিয়ারিং।

    এবারের নির্বাচনেই তেলেঙ্গানার ‘নিজামাবাদ’ আসনে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের বিরুদ্ধে প্রায় একশোআশি জন কৃষক একযোগে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন, সরকারের কৃষক নীতির প্রতিবাদে। আসনটিতে মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ে হেরে গেছেন। এটাই ভারতের গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রে, এত সাফল্যের ভিতরেও, তিরুপতি’তে জামানত জব্দ হয়ে যায় বিজেপি’র। আজমের শরিফ থেকে আবার তারাই বিপুল ভোটে জেতে। অমেঠীতে গড় চূর্ণ হবার দিনেও, চুরাশির ‘ক্ষত’ পিছনে ফেলে স্বর্ণমন্দিরের শহর অমৃতসরে বিজয়পতাকা ওড়ে কংগ্রেসের। আসলে ভারতের জনমানুষের স্পন্দন ইংল্যান্ড-আমেরিকা কিংবা এসি ঘরের আরামে অনুভব করা যায় না। রাস্তার ধুলো গায়ে না লাগলে বোঝা সম্ভব হয় না যে লোকাল ট্রেনে এক কামরায় গাদাগাদি করে থাকা জরিনা আর মালতীর মধ্যে বন্ধুত্ব অটুট থাকবে, মসনদে যেই বসুক না কেন। আলুর পাইকার, বস্তা সাইকেলে তোলার সময় খেয়ালও করবে না চাষির ধর্ম কী!

    যারা এক ধরনের হত্যার ক্ষেত্রে চিৎকার করে অন্য ধরনের হত্যার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চুপ করে থাকবেন, একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে অন্য অন্যায়টা দেখতেই পাবেন না চোখে, ওইটে নিয়ে তাদেরই বেশি মাথাব্যথা যেন!

    সাধারণ লোকের মাথাব্যথার জায়গাগুলো অন্য। বেকারি থেকে যুবক-যুবতীদের মুক্তির রাস্তা দিক সরকার, জিএসটি’র জটিলতা কমুক, কৃষকের আত্মহত্যা ১৯৯১ থেকেই জ্বলন্ত সমস্যা কিন্তু এবার যেন তা বন্ধ হয়, এইসবগুলো তারও দাবি। তবু সে যে পাঁচবছরের প্রধানমন্ত্রীকে আরও পাঁচবছর সময় দিয়েছে তার কারণ এই প্রথম ভারতের কোনও সাধারণ নির্বাচনে ‘মূল্যবৃদ্ধি’ ইস্যু হয়নি সেভাবে আর দ্বিতীয়ত সে মনে মনে বিশ্বাস করছে যে আজকের ভারত অন্য কোনও দেশের অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াবে না আর; এখানে আর কখনও ২৬শে নভেম্বর ২০০৮ এর পুনরাবৃত্তি ঘটাবার সাহস করবে না কেউ।

    মতামত লেখকের সম্পূর্ণত নিজস্ব।

    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময়ের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কবি এবং কথাসাহিত্যিক।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More