শুক্রবার, অক্টোবর ১৮

গান্ধীর মহত্ত্বের সন্ধানে

বেঞ্জামিন জাকারাইয়া

এককালে ইতিহাসবিদদের বৈঠকে শোনা যেত যে গান্ধীবাদী থেকে কাউকে বাঁচাতে হলে তাঁদের গান্ধীর লেখা পড়তে দেওয়া উচিত। ৮০র দশকের পরে এই কথাটা আর শোনা যেত না। ৯০এর দশকে হিন্দুত্ব ভাববাদীদের জ্বালায় সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একজন ধার্মিকের প্রয়োজনবোধ হয় বলে গান্ধীকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা হয়। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটা যে ‘সেকুলার’এর যে ভালো অনুবাদ নয়, তা আমরা ইতিহাসবিদরা অনেকদিন থেকে জানতাম, তবুও নতুন আবহাওয়ার জন্য নতুন পথ আবিষ্কার করা জরুরি বলে মনে করে সেই সময়ে অনেকে অনেক ধরনের গান্ধী আবিষ্কার করেন। এক্ষেত্রে বক্তব্য ছিল যে নেহরুর বা নেহরুর ধরনের বিদেশ-ঘেঁষা পাশ্চাত্য সভ্যতার রাজনীতি জনগণের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গান্ধী নিজেকে হিন্দু বলতেন, সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করতেন, এবং তা সত্বেও মুসলমানদের সম্মান করতেন, ভাই বলে ডাকতেন। দলিতদের না হয় হরিজন বলতেন, অর্থাৎ কিছুটা paternalist ছিলেন, কিন্তু হিন্দুত্ববিরোধী তো ছিলেনই। হিন্দুত্বর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা শুধু হিন্দুদের হাতে না হলেও, ‘গান্ধী বনাম হিন্দুত্ব’ খেলাটা নাকি খেলা উচিত।

এতদিনে অনেকগুলো গান্ধী পাওয়া গেছে। ৮০র দশকে আশিস নন্দী গান্ধীকে ‘ফেমিনিন’ বলেছিলেন; তিনি নাকি অ্যানারকিস্টও ছিলেন; ৯০এর দশকে ‘গান্ধিয়ান ফেমিনিজম’ প্রকাশ করেন মধু কিশ্বর (কিছুদিন পর নতুন শতাব্দীতে তিনি হিন্দুত্বর দিকে এগোলেন); আরও কত যে গান্ধী ছিলেন বা আছেন, আমরা শুধুই আন্দাজ করতে পারি। একদিক থেকে বলা যায় যে ‘আসল’ গান্ধী খুঁজতে গেলে কিছুই পাওয়া যাবে না। গান্ধীর লেখায় অনেক কিছু আছে, যেগুলো ঠিকমতো সাজালে অনেক ধরনের ideology খুঁজে পাওয়া যায়। তবে গান্ধীর লেখা বুঝতে হলে আমার মতে এটা মনে রাখা উচিত – গান্ধী নিজে বিশেষ নতুন কথা বলে যাননি। তিনি অনেক কিছু অর্ধেক-হজম-করা তথ্য বা বক্তব্য অন্যদের লেখার থেকে নিয়ে নিজের লেখার মধ্যে এনেছিলেন। গান্ধী তাঁদের লেখা নিজের লেখায় উল্লেখ করতেন, তবে তাঁদের যদি সেটা পড়ে শোনান হত, তাঁরা কতটা সেগুলিকে তাঁদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা বলে চিনতে পারতেন বলা কঠিন।

ইতিহাসবিদরা যে আবছা জিনিস স্পষ্ট করে ফেলতে চান, সেটা জানা কথা। তবে তাঁদের ‘গান্ধী বনাম হিন্দুত্ব’ খেলাটা খেলতে হলে কয়েকটা নিয়ম উল্লেখ করে খেলা উচিত। গান্ধী এবং হিন্দুত্ব অনেকটা একই পথে হেঁটেছেন। হিন্দুত্ব এবং গান্ধীর ঝগড়াটা ভাইয়েদের মধ্যে ঝগড়া। তা সত্ত্বেও গান্ধী কখনও খাকি হাফ-প্যান্ট পরেননি। নাথুরাম গডসে যে কারণটা উল্লেখ করেন গান্ধীকে হত্যা করার পর, যে গান্ধী হিন্দুদের পৌরুষ নষ্ট করে দিচ্ছিলেন, সেটা একেবারেই এই ভেতরের লড়াই-এর চিহ্ন। গান্ধী কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির জন্যে সৈন্য জোগাড় করতে চেষ্টা করছিলেন, তিনি প্রায় একই বক্তব্য রেখেছিলেন – যে ভারতীয় পুরুষ পৌরুষ  হারিয়ে ফেলেছে এবং তারা যুদ্ধের মাধ্যমেই সেই শক্তি ফেরত পেতে পারে। শুধু হিন্দুদের কথা না বললেও, পৌরুষ  হারানোর আশঙ্কাটা একই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্যারামিলিটারি গড়ে তুলতে শুরু করল; গান্ধীও ডাক দিলেন paramilitary গড়ে তোলার, শুধু বললেন যে সেই paramilitary অহিংসার সৈন্য হবে। হিংসার এবং অহিংসার সম্পর্কের প্রশ্ন নিয়ে বলেছিলেন, হিংসার ক্ষমতা না থাকলে অহিংসার কোনও মানে হয় না; একটি ইঁদুর বেড়ালের প্রতি অহিংসা দেখাতে পারে না, তবে ইঁদুরটাকে বেড়াল অহিংসা দেখাতে পারে।

গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে যখন চেষ্টা করেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজের জায়গা খুঁজতে, তখন তিনি গো-রক্ষা আন্দোলন সমর্থন করেন। তিনি বলেন, অন্যান্য পশুদেরও রক্ষা করা উচিত, এবং মোষেরা গরু নয় বলে তাদেরকে হত্যা করা উচিত নয়। মুসলমান ‘ভাইরা’ নিশ্চয় হিন্দুদের ভাই মনে করলে গরু হত্যা করা এবং গরু খাওয়া ছেড়ে দেবে – গান্ধীর মতে এটাই উচিত। অবশ্যই তিনি খিলাফাত আন্দোলন, যা মুসলমানদের রাজনৈতিক এবং ধার্মিক আন্দোলন, তাকে সমর্থন করেন। তবে গান্ধীর মতে ‘হিন্দু’ এবং ‘মুসলমান’ আলাদা রকমের মানুষ, যাঁদের একসঙ্গে লড়তে হবে, কিন্তু ধর্ম ছাড়া যে রাজনীতি হয় না, সেটা গান্ধীর জন্য প্রধান মত হয়ে রইল। গান্ধী নিজে বোঝালেন যে উনি যদি রাজি হন কোনও আন্দোলন চালাতে, তাহলে তিনি শুধুমাত্র আন্দোলনের ‘dictator’ হয়ে চালাতেই রাজি হবেন।

খিলাফাত-অসহযোগ আন্দোলনের সময় যে কংগ্রেস পার্টি গান্ধীকে এত প্রাধান্য দিয়েছিল, তারপর থেকে গান্ধীকে কংগ্রেসের সেরা নেতা বলে মানা হয়, কংগ্রেসের ভেতরে এবং বাইরে। সারা পৃথিবীর লোকেরা যেন জানতে পারে যে এক ‘মহাত্মা’ আবার জন্মেছেন। মহাত্মা উপাধিটা যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীকে দিয়েছিলেন, নামটার ইতিহাস বেশ বিদেশি – মাদাম ব্লাভাতস্কির Theosophical Society’র এক আবিষ্কার হল যে মানুষ মানুষ হয়ে জন্মালেও নিজের প্রচেষ্টায় মানুষ থেকে ক্রাইস্ট অথবা মহাত্মা হয়ে এগোতে পারেন, অর্থাৎ নিচু থেকে উঁচু জাতে পৌঁছতে পারেন। গান্ধী নিজে এই বক্তব্য রেখেছিলেন – নিজেকে পুরোপুরি মহাত্মা না ভাবলেও, তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাত জিনিসটা মনোভাবের ব্যাপার। শূদ্র হয়ে জন্মালেও কেউ কেউ আসলে ব্রাহ্মণ, এবং ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মালেও কেউ কেউ শূদ্র হতে পারেন। অবশ্য প্রশ্নটি খোলা রইল, কে কোন শূদ্রকে তাঁর মনোভাব বুঝে ব্রাহ্মণ বলে মানবেন – গান্ধীর নিজের মনে এটা কোনও রহস্যের ব্যাপার নয়, কারণ তিনি এই দায়িত্ব নিজেই নিতে রাজি ছিলেন।

গান্ধীর জীবনে উনি অনেকবার আশ্রম বা ‘ফার্ম’ স্থাপন করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকাতে থাকাকালীন হেরমান কালেনবাখের সঙ্গে ‘Phoenix’ এবং ‘Tolstoy’; ভারতবর্ষে ফিরে এসে সবরমতি আশ্রম এবং অন্যান্য জায়গায় আরও কয়েকটা আশ্রম। যতই গান্ধীর লেখায় পাওয়া যায় যে আশ্রমগুলো ‘self-sufficient’ হয়ে থাকবে, সেটা কোনওটাতেই কোনওমতে হয়ে ওঠেনি। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আশ্রম কালেনবাখের টাকায় চলত, এবং ভারতবর্ষে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের টাকায়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আপত্তি করেছিলেন যখন ওদের টাকায় আশ্রমে ‘হরিজন’দের থাকার ব্যবস্থা করলেন গান্ধী। গান্ধী এই সমস্যার থেকে বেরোনোর উপায় হিসেবে জানালেন- ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের নামে টাকা না দিতে চান, তাহলে সেই ব্যবস্থাটিই সবার জন্যে সুবিধার। দক্ষিণ আফ্রিকাতে পরামর্শ হল যে কোনও বিজলির ব্যবহার হবে না প্রিন্টিং প্রেসের জন্য – শ্রম দিলেন জুলু মহিলারা, গায়ের জোরে মেশিন চালিয়ে।

বলা হয় যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধী তিনটে আন্দোলনে সফল হয়ে এক স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ে তুললেন। রাষ্ট্রপিতা কিন্তু শুধু প্রথম আন্দোলনে সেই সফলতা লাভ করলেন, এবং জেতার মুহূর্তে তিনি আন্দোলন থামিয়ে দিলেন। এক গ্রামে পুলিশ জনগণকে আক্রমণ করছিল, তারপর পুলিশই আক্রান্ত হল। গান্ধীর মতে এটা অহিংসার বিরুদ্ধে, এবং যতদিন জনগণ অহিংসা বোঝার যোগ্য না হয়ে ওঠে, ততদিন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আন্দোলনকে পিছিয়ে দিতে হবে। অথচ গান্ধী নিজে চেয়েছিলেন যে একজন শহিদ পাওয়া যাক, যাতে ব্রিটিশদের হিংস্র সভ্যতার ফল সারা পৃথিবী দেখতে পায়। কিছুদিন তিনি স্বপ্ন দেখেন যে সেই শহিদ হবেন তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা।

এগুলো সবই জানা কথা। তবে শুধুমাত্র এইভাবে গান্ধী-জীবনী লিখতে হলে পুরো স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসটা নতুন করে লিখতে হয়। তাই এই গল্পগুলো খুব-একটা পাত্তা পায় না। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বড় গল্প তৈরি করা বোধহয় উচিতও নয়। সমস্যাটা কিন্তু এটাই রইল – গান্ধীকে আমরা যদি দার্শনিক বা বুদ্ধিজীবী তৈরি করতে চাই, ইতিহাস ভুলে গিয়ে গান্ধীর নিজের লেখার জোরে এক মহাত্মা তৈরি করতে হয়। আর এসব জেনেই বা কী লাভ? গান্ধীর লাঠি বা চশমা অহিংসভাবে যদি হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে চিহ্নিতভাবে দাঁড়াতে পারে, তাহলে গান্ধী কে ছিলেন, বা কী করেছিলেন, তা না জানলেই হয়। ‘আসল’ ইতিহাস বলে কিছু নেই, সে তো অনেকদিন হল আমরা সবাই জানি। অথবা এটা বলা যায় – গান্ধী কিছুটা কাছের লোক হলেও, খাকি প্যান্ট কখনও পরেননি। দু-দিন আগে নাকি স্লোগান শোনা গেছে এক ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে – গান্ধী কি জয়, গডসে কি জয়। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।

লেখক বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ 

‘দ্য ওয়াল’–এ প্রকাশিত এই পর্বের সব লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

 সার্ধশত বছরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী 

 

Comments are closed.