শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

অর্থনীতির নোবেল : গরীবগঞ্জের টাকা ও গুলি খেলার হারজিত

প্রসেনজিৎ সরখেল

২০১৯ এ অর্থনীতিতে  নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত  হয়েছেন তিনজন অর্থনীতিবিদ – অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জী , এস্থার ডাফলো  এবং মাইকেল ক্রেমার।  অভিজিৎ,  অমর্ত্য  সেনের  পর  দ্বিতীয়  বাঙালি  যিনি এই সন্মান পেলেন। এরা তিনজনই উন্নয়নশীল দেশগুলির দারিদ্র্য সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন, অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা আদৌ গিয়ে পৌঁছচ্ছে কিনা তার ইপ্সিত লক্ষ্যে।  এবছরের নোবেল কমিটি তাদের সেই গবেষণা কে স্বীকৃতি দিয়ে জানিয়েছে  ” এই ত্রয়ীর  গবেষণা,  আবিশ্ব  দারিদ্র্য  দূরীকরণের  লড়াইয়ের হাত  শক্ত  করেছে।”

অভিজিৎ, এস্থার এবং ক্রেমারের গবেষণার অবদান প্রধানত দুটি: প্রথমত, দারিদ্র্য নিয়ে অর্থনীতিতে প্রচলিত যা ভাবনা রয়েছে তা অনেকটা  তারাপদ  রায়ের  গরিবগঞ্জের  রূপকথা  কবিতার  মতো  “গরিবগঞ্জে  টাকা নেই তাই কলের চাকা নেই / আবার কলের চাকা নেই তাই টাকা নেই। / টাকা নেই বলে চাকা নেই বলে টাকা নেই। অর্থাৎ এখানে দারিদ্র্য চক্রাকারে আবদ্ধ আর তার শৃঙ্খল ভাঙার  জন্যে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। বিনিয়োগ আসার ফলে অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লাগবে তাতে কলের চাকা ঘুরবে, গরিবগঞ্জের মানুষ কাজ পাবে – তাদের হাতে আসবে টাকা। কিন্তু বিচ্ছিন্ন দু–একটা দেশের ক্ষেত্রে এটা সত্যি হলেও (যেমন রাওয়ান্দা ), তাদের ২০১১ সালের সাড়া জাগানো বই “পুওর ইকনমিক্স-এ” অভিজিৎ এবং এস্থার দেখান যে বিদেশি বিনিয়োগ বা সাহায্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা দারিদ্র্য দূরীকরণের স্বপক্ষে কোন প্রামাণিক তথ্য নেই। একভাবে এটা ট্রিকল  ডাউন তত্ত্বের ব্যর্থতা প্রমাণ করে। এছাড়া ভারতের মতো দেশে যেখানে দারিদ্র্যের সমস্যা প্রকট, সেখানে দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্পের মূল অর্থের জোগান আসে করসঞ্জাত অর্থ থেকে। অভিজিৎরা তাই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেই সম্ভাবনার দিকে যেখানে সরকারি প্রকল্পের ভর্তুকি দরিদ্র মানুষের কাজে লাগে না, কখনও তা গরিব মানুষদের নিজস্ব চাহিদা-জোগানের বৈশিষ্টের জন্যে, কখনও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে। এবং এই কারণেই তার দারিদ্র্য প্রলম্বিত হয়, দুষ্টচক্রে সে আটকে পড়ে নিজের কারণেই। উদাহারণ হিসেবে আভিজিৎরা দেখিয়েছেন দরিদ্র মানুষ অনেক সময়েই সঞ্চয় করতে পারে না তার কারণ, যদি সমাজে অসাম্য খুব বেশি থাকে, সে মনে মনে বুঝতে পারে এই সামান্য সঞ্চয় অবলম্বন করে অভীষ্ট সামাজিক অবস্থানে পৌঁছতে পৌঁছতে সে বুড়ো হয়ে যাবে। এই  কারণেই স্বল্প সঞ্চয়  প্রকল্পগুলিকে দারিদ্র দূরীকরণের হাতিয়ার করা সমস্যাসঙ্কুল কারণ হত-দরিদ্রদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎবিমুখতা বা মন্দগ্রাহিতাকেই অভিজিতরা দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে নির্দেশ করেছেন। একইরকম উদাহারণ দেওয়া যায় টিকাকরণ কর্মসূচীর ক্ষেত্রে যেখানে মানুষ শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে সন্তানকে টিকা দিতে নিয়ে যান না (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটা শুধু মাত্র উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়, খোদ আমেরিকাতেও টিকা নেওয়ার হার, ধরা যাক ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা, ১০০ শতাংশ নয়)। অনেক ক্ষেত্রেই সচেতনতার অভাবে মা-বাবা রা মনে করেন টিকা প্রসূত কোনও অসুখে তার শিশু আক্রান্ত হতে পারে। এইসব ক্ষেত্রেই অভিজিৎরা দেখেছেন সঠিক প্রণোদনা দিতে পারলে এই ধরনের দারিদ্র্য স্থায়ী করা উপাদানগুলির প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া যায়। যেমন, এখন অনেক মাইক্রো ক্রেডিট প্রকল্পগুলিই গ্রাহকদের ভোগ্যদ্রব্য কেনার জন্য ঋণ নিতে নিরুৎসাহ করে। অনেক ক্ষেত্রেই আবার তথ্যের অভাবে এবং অনিশ্চয়তার প্রভাবে গরিব মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে দোনামনা করেন। টিকাকরণের কর্মসূচী এড়িয়ে যাওয়া যদি এই কারণে হয় তাহলে তাকে সেই কাজে এগিয়ে আসার জন্য কিছু তাৎক্ষণিক উৎসাহ দেওয়া যায়। উদয়পুরের এমনই এক টিকাকরণ প্রকল্পে দেখা গিয়েছিল শিশুদের বাবা-মা দের এক বাটি ডাল দেবার ব্যবস্থা করতেই এক লাফে বেড়ে গিয়েছিল টিকা প্রদানের হার।

এই পুরস্কার এক অর্থে দারিদ্র্যের এই অন্যতর পরিপ্রেক্ষিতের গুরুত্ব স্বীকার করে নিল।

দ্বিতীয়ত, অভিজিৎরা দারিদ্র্যের এই ধারণা বিশ্লেষণ করতে বিশদ ব্যাবহার করেছেন  ব়্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল বা এক্সপেরিমেন্টাল অর্থনীতির। এখানে নমুনা সমীক্ষার বদলে মানুষ কে সরাসরি বিভিন্ন প্রকল্পের আদলে কিছু সুবিধে দিয়ে তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয় আরেকটি দলের যারা অন্যান্য দিক থেকে আগের দলটির সদস্যদের মতোই – শুধুমাত্র ফারাক এই যে তারা প্রকল্পের সুবিধাটি পায়নি। ২০০৩ সালে অভিজিৎরা গড়ে তোলেন আব্দুল লাতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশান ল্যাব বা সংক্ষেপে জাপ। গত এক দশক ধরে জাপ-এর সদস্যরা প্রায় ৪০ টি দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়ঃপ্রণালী, পানীয় জলে ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে তথ্য সংগ্রহ করে চলেছেন-  এম্পিরিক্যাল  অর্থনীতি  এবং  পলিসি রিসার্চের  ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

এস্থার  ডাফলো  মাত্র ৬ বছর বয়েসে কমিকস পড়তে গিয়ে জেনেছিলেন মাদার  টেরিজা এবং কলকাতার কথা – গাদাগাদি ভিড় আর দারিদ্র্য তার কল্পনায়  ধরা দিয়েছিলো দাবার বোর্ডে  দাঁড়িয়ে থাকা ঘুঁটির  মতন।  অভিজিৎ বিনায়ক  কে  কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়নি , তার  বাড়ির পাশেই ছিল অনেক ছেলে মেয়েদের ভিড় –তারা ছিল তার খেলার সঙ্গী। আর্থিক অসাম্য তারা মিটিয়ে নিত মার্বেল খেলায় জিতে নিয়ে, অভিজিৎ হিংসেই করতেন তাদের।  নোবেল প্রাইজের  সূত্রে এই কল্পনা আর বাস্তব  মিলে  গেল এটাও কম কথা নয়।

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর

Comments are closed.