মহানদীর কূল ধরে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অনিতা অগ্নিহোত্রী

    প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।

    মহানদীর গতিপথ ধরে ওড়িশার বুনাকারদের সন্ধানে যাত্রা – সেও এক আবিষ্কার। ছত্তীসগড়ের ভিতর দিয়ে বয়ে ওড়িশায় প্রবেশ করতেই নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেই স্বাধীনতার সময়েই। কয়েকশো গ্রাম জলের তলায় চলে গেছে। এখন সেখানে সাগর সমান হীরাকুদ জলভাণ্ডার। হীরাকুদের ক্যানাল সিস্টেম সুজলা সুফলা করেছে সম্বলপুর জেলাকে। এখন অবশ্য জেলাও ভাগ হয়ে গেছে। এখন যেখানে বড়গর জেলা, সেখানকার দক্ষ তাঁত শিল্পীরা হলেন ভুলিয়া মেহের সম্প্রদায়ের। এখন মেহের পদবী তাঁত বয়নের সঙ্গে সমার্থক হয়ে গেছে।

    মেহেররা বহিরাগত, রাজস্থান থেকে এখানে এসে বসত করেছিলেন। এছাড়াও মোটা সুতোর কাপড় বোনেন কুলি মেহের ও তফসিলি জাতির তাঁতিরা। জাতিগত পরিচয়ের  সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পর্ক স্পষ্ট। যাঁরা দরিদ্র তাঁতি, তাঁরা সুতোর কাপড় বোনেন, রেশম সুতো কেনার পুঁজি এঁদের পক্ষে জোটানো কষ্ট। তাছাড়া, রেশম সুতো বুনতে হলে ভালো বান্ধের কাজ জানা দরকার, ততটা দক্ষতা অর্জন করা অথবা সময় দিয়ে শিক্ষানবিশির সুযোগ এঁদের অদৃষ্টে হয়ে ওঠে না। ভুলিয়া মেহেররা বান্ধকাম জানেন ভালো । বংশানুক্রমে বা শিষ্য পরম্পরায় সেই শিল্পগুণ পায় পরবর্তী প্রজন্মও। এঁরা বোনেন রেশম বস্ত্র, ইকতের নকশা তোলা। এছাড়া বড় আকারের বিছানার চাদরে ইকতের বড় কাজ, সেও এঁদের হাতের কারিগরি।

    নদীর ধারের গ্রামগুলিতে তাঁত শিল্পী ও হস্তশিল্পীরা বসত করেন। কারণ মহানদীর জল বড় নির্মল। এ জলে রাঙানো সুতোর রঙ টেঁকসই হয়। এ জল মাটিতে প্রাণ আনে। নানা বর্জ্য মিশে জলের সে গুণ এখন আর নেই। তবু নদীর কূল ধরেই আজও গুণী মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়।

    ওড়িশার তাঁত বস্ত্রের বৈশিষ্ট্য তার অনুপম বান্ধ শৈলী। বান্ধকাজের অন্য নাম ইকৎ। গুজরাত ও রাজস্থানেও বান্ধনী শিল্পের বহুল চলন আছে। তবে ওড়িশা ইকতের নৈপুন্য ও বৈচিত্রের শিল্পগুণের কাছে পশ্চিম ভারত কোথাও দাঁড়ায় না। যদি একে কেউ আমার পক্ষপাত মনে করেন, সে আমার দৃষ্টির নয়, রুচির ভিন্নতার দোষ বলা যেতে পারে। ইকতের ছবিগুলি উঠে আসে জীবন ও প্রকৃতি থেকেই। মাছ, হাতি, পদ্ম ও নানা ধরনের বাস্তব ও অলীক ফুল, লতা পাতা, পাখি। শাড়িতে ছাড়াও পোশাকের জন্য বোনা কাপড়ে, উত্তরীয়তে ইকতের ব্যবহার বুননকে দেয় বিশেষ মাত্রা। ইকতের নকশা রচনার নানা ধাপ থাকে। প্রথমে কাগজের উপর পেন্সিলে আঁকা হল ছবিটি এবং পুরো কাপড়ে তার বিন্যাসও রচনা করে নেওয়া হল। তারপর ফ্রেমে সুতো বেঁধে তার উপর নকশা আঁকা হল। এবার টানির সুতোর গুছিতে সুতো বেঁধে নকশা রঙানোর পরিকল্পনা করা। পাশাপাশি উনুনের আগুনে ফুটিয়ে তৈরি করা হয়েছে নানা রঙ। সবুজ, হলুদ, নীল, লাল খয়েরি– সাবেক বান্ধকাজে গাঢ় রঙের কদরই বেশি।

    মুশকিল হচ্ছে মধ্যবিত্ত ক্রেতা বান্ধ কাজ আর ছাপা নকশার তফাৎ বোঝেন না। ছাপা ডিজাইন ব্লক বা মেসিন প্রিন্টে তাড়াতাড়ি তোলা যায়। বান্ধ কাজে কেবল দক্ষতা নয় , শ্রম সময় সবই বেশি লাগে। তাই দাম কিছু বেশি। ক্রেতা বোঝেন না, অর্থের বিনিময়ে তিনি যা পাচ্ছেন তা এক অমূল্য শিল্প কাজ। কোনও প্রদর্শনীর সময় এই সব কথা বোঝাবার জন্য আমাদের যথেষ্ট বাগজাল বিস্তার করতে হত। বড়গড় ছাড়িয়ে আরও দক্ষিণে গেলে সোনপুর বা সুবর্ণপুর। একসময় সোনপুর ছিল বলাংগীর জেলার মহকুমা, এখন আলাদা জেলা হয়েছে।

    বলাংগীর যেমন খরাগ্রস্ত, বৃষ্টি বিরল জেলা, সোনপুর মহানদী ক্যানালের দাক্ষিণ্যে সজল সুফল। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার বিজেতা চতুর্ভুজ মেহের গ্রামের অন্য তাঁতিদের সঙ্গে নিয়ে নিজের স্টুডিও বা কারখানা আরম্ভ করেছিলেন। এখন তাঁর খ্যাতি দেশ ও বিদেশে। সোনপুরের বহু তাঁত শিল্পী জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। গুণী ও কাজে নিবেদিত প্রাণ মানুষগুলির কোনও তুলনা নেই। মৃৎশিল্পীদের মতন বয়ন শিল্পীরাও ঠান্ডা শান্ত নীরব প্রকৃতির। নিজেদের কাজের কথা নিজের মুখে মোটে বলেন না। অথচ নতুন রূপকল্পনা এঁদের মাথায় সবসময় খেলা করছে।
    শিল্প ও শিল্পীর সন্ধানে বেরিয়ে কত যে নতুন আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে দেখা হতে থাকে। ঘোর বর্ষায় বড়গড়ের এক শিল্পীর ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, দরজা দিয়ে চোখে পড়ে মেঝে জোড়া তাঁত, তাতে বোনা হচ্ছে মাছ পাখি ফুলের বান্ধকাজের বিশাল এক চাদর। তাঁতের উপরের ছাদটুকু ত্রিপলে ঢাকা, ততটুকুই জুটেছে হয়তো। দেওয়াল বরাবর ডাঁই করে রাখা গৃহস্থালী সরঞ্জাম, রান্নার বাসনপত্র অঝোরে ভিজছে। দাদনের সুতো রঙ বাঁচানোর চেষ্টার চেয়ে অনেক বড় শিল্পীর এই নিমগ্নতা। আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন না, কথা বললেন না, নমস্কারও নয়। মনে মনে আমিই তাঁকে নমস্কার করে চলে এলাম।

    ব্রাহ্মণী নদীর কূলে গোপালপুর নামে গ্রাম। গোপালপুরের নাম ডাক তার তসর বস্ত্রের জন্য। তসরের অন্য নাম অম্লান যেহেতু জগন্নাথ দেবের অঙ্গে ওঠে এই রেশম। তসরের গুটি থেকে সুতো কাটা হয় চরকায়, অথবা মোটা সুতো হাতে। তাঁতে ফেলে তসরের সুতো বুনে তৈরি হয় অম্লান বস্ত্র। কখনও তাতে ব্লক ছাপা হয়, কখনও রেশমের পাড় জুড়ে আড়ি সুতোর কাজ। রেশম কীটের জন্য তুঁত গাছের পাতার জোগান দিয়ে তসরের গুটি কী ভাবে তৈরি হয় সেই  জটিল কাহিনী তে যেতে চাই না, তবে এটা বলা দরকার যে তসরের গুটি গোপালপুর গ্রামে আসে কটক জেলার উত্তরে সুকিন্দার জঙ্গল থেকে। আদিবাসী চাষিরা তুঁত গাছ ও রেশমগুটির চাষ করে। গোপালপুরে তিনটি তসর সমবায় সমিতি। তাদের তিন জন সভাপতির মধ্যে বনিবনা নেই। কিন্তু একসঙ্গে তিনজনকে দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। সাদা ধুতি চাদর, নকশি উত্তরীয়তে সেজে, মুখে মৃদু হাসি, তারা বৈষ্ণবী বিনয়ের প্রতিমূর্তি।

    তিনজনের মধ্যে হরিবাবু মানুষটি সবচেয়ে রহস্যময়। এঁদের পূর্বপুরুষ শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে এদেশে আসেন। আচার আচরণে, পুজো অর্চনায় এঁরা বাঙালি। কিন্তু এঁদের ঘরে বা মহল্লায় যে বাংলা চলে তা এতটাই বিবর্তিত, যে আমাদের ভাষা বলে তাকে চেনা যায় না। মাঝে মাঝে পাড়ায় কীর্তন গান হয়, তার ধ্বনি ও সুরে বাংলাদেশ আবছা ভেসে ওঠে। হরিবাবু অভিমানী মানুষ। সমিতির জন্য কোনও দাবিদাওয়া থাকলে হেঁয়ালি করে তা বলবেন। দাবিতে কাজ না হলে আমার অফিসের দরজার সামনে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, বসতে বললেও বসবেন না। একদিন এসে জেদ করতে লাগলেন, সাতদিনের মধ্যে আসতেই হবে গোপালপুর, নইলে চলবে না। কী কাজ কী ব্যাপার কিছু বলেন না। এভাবে হুট্ করে যাওয়া যায়? সারা রাজ্যের কাজ আমার। গেলাম মাসখানেক পর। কোনও দূর জেলা থেকে ফিরছিলাম ওই পথ দিয়ে। হরিবাবু ম্লান হেসে সমিতির সামনের বাগানটিতে নিয়ে গেলেন। বড় দেরি করলেন। সব শুকিয়ে গেল। গাঁদাফুলের চারা সাজিয়ে বাংলা হরফে আমার নাম লিখেছিলেন বাগানে। বাংলা লিখিয়ে নিয়েছিলেন কাউকে দিয়ে। অক্ষর ধরে ধরে চারা বসানো, তাদের বড় করা। আমাকে অবাক করে দেবেন। ফুলে ফুলে লেখা নাম কি সুন্দর দেখাচ্ছিল!  দেরি করেছি তাই শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।
    বেশি বয়স হয়নি কিন্তু লিভারের জটিল অসুখ হয়েছিল। চলে গেলেন হরিবাবু। আমি তখন অনেক দূরে, বম্বেতে। বিভাগের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন অনেকগুলি স্কিম বানিয়েছিলাম। তার মধ্যে একটি ছিল চিকিৎসা সহায়তার। নানা কারণে প্ল্যানিং বিভাগ তার অনুমোদন দেয়নি আমি চলে আসার সময় পর্যন্ত। সরকারের তরফ থেকে কোনও সাহায্য পৌঁছনো যায়নি। চিকিৎসা বিমার টাকা আসে অনেক পরে। খুব যন্ত্রণার মধ্যে হরিবাবু একবারই বলেছিলেন, অগ্নিহোত্রী ম্যাডাম জেনেছেন তো, আমার অসুখের কথা? তাহলেই হবে। আর চিন্তা নেই। আমি জেনেছিলাম অনেক পরে। স্পেশাল ইকনমিক জোনের ডেভেলপারদের দাপাদাপির মধ্যে হরিবাবুর ক্ষীণ স্বর হারিয়ে গিয়েছিল। পরে কলেজ পড়ুয়া ওঁর ছেলেটিকে একটা কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলাম, হরিবাবুর স্ত্রী তাই চেয়েছিলেন। ফুলের অক্ষরে যিনি আমার নাম লিখেছিলেন, তাঁর বিশ্বাসের মর্যাদা আমি রাখতে পারিনি।

    কিছু চরিত্র নাম ও রূপ ঈষৎ পাল্টে মহানদী উপন্যাসে এসেছে। ব্যর্থ তাঁত শিল্পী থেকে ব্যবসায়ী বনে যাওয়া রমেশ এদের একজন। মজুরির জন্য তাঁতিদের ধর্মঘট ভেঙে দিতে যার বিবেকে বাধবে না। বিপরীত মেরুতে আছেন উপমন্যু, জীবনের অমূল্য ছ’টি বছর সংসার ধর্ম ফেলে যিনি রেশমে বান্ধকাজ করে লিখেছিলেন সম্পূর্ণ গীতগোবিন্দ। উপমন্যু সরাক বৌদ্ধ।  মহানদীর অনতিদূরে নুয়া পাটনা গ্রামে এঁর কাছে আমি মাঝে মাঝে যেতাম। ওই গ্রামে বৌদ্ধ পরিবার অনেকে আছেন, হিন্দুদের লক্ষ্মী পূজাও এঁদের ঘরে হয়।  দ্বন্দ্ব দ্বেষ ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতার উত্তাপের মধ্যে ইনি যেন এক স্থির নক্ষত্র। মঞ্চে না উঠেও যে শিল্পে অন্তর নিবেদন করা যায়, উপমন্যুর কাছেই আমার শেখা।

    (মুম্বাই শহরকে লেখিকা সাবেক ‘বম্বে’ নামে অভিহিত করেছেন)

    অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

    (ক্রমশ)

    অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

    চলনবিল ৮

    টানা-পোড়েন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More