বুধবার, জুন ১৯

টানা-পোড়েন

অনিতা অগ্নিহোত্রী

প্রেসিডেন্সী কলেজে অর্থনীতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অর্থনীতির পাঠ শেষ করে চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ের কোলে জাতীয় অ্যাকাডেমিতে। দু’বছরের জন্য আইএএস অফিসারের ট্রেনিং নিতে। প্রিয় শহরের প্রতি একরাশ অভিমান ছিল মনে।
তারপর ঝাড়খণ্ডের কয়লা খনি অঞ্চল, মধ্য ও উত্তর ওড়িশার অরণ্য পর্বত স্কুল মালভূমিতে প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ। প্রশাসনের বুকের পাঁজর হয়ে বসে মানুষের প্রতি উত্তরদায়িত্বের ভাবনায় প্রতি নিয়ত দ্বন্দ্ব ও সংশয়ে দীর্ণ হওয়া। কবিতার পাশাপাশি গল্প লেখা চলেছে বাংলার বাইরের জনজীবন নিয়ে।
বড় বাঁধ প্রকল্পের পুনর্বাসন নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষদের গ্রামে পৌঁছোন। সেই সময়েই শুরু হল রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের সংঘর্ষের নতুনতর পাঠ। এর পর বিদেশে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স পড়তে পড়তে লিখে ফেলা প্রথম উপন্যাস, ভুলতে না পারা মহুয়ার দেশ নিয়ে।
১৯৯৬ সাল। অর্থনৈতিক উদার নীতি তখন টলমল পায়ে হাঁটতে শেখা এক শিশু। পনের বছর বাংলার মাটি থেকে নির্বাসনের পর ফিরে এলেন বাঙালী সাহিত্যিক। সদ্য রূপ বদলানো বৈদেশিক বাণিজ্য অফিসের শীর্ষে। কিন্তু এই কি তাঁর ফেলে যাওয়া শহর?
প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।

প্রায় দশ বছর কলকাতায় কাটানোর পর নিজের মূল কাজের জায়গায় ফিরে আসছি। ওড়িশা আমার ক্যাডার স্টেট, কর্মজীবন আবার আরম্ভ হবে ভুবনেশ্বরের সচিবালয়ে। আমার নিজের চেয়ে বেশি ভালো আর কে জানে, যে গিয়েছিল আর যে ফিরে আসছে তারা দুজন আলাদা মানুষ। একে তো কলকাতার নিজস্ব এক উত্তাল নেশা আছে, কাজ, লেখালেখি নিজের পরিবারের সান্নিধ্য সব মিলিয়ে। রূপকলা কেন্দ্র — সে তো নিজেই এক গভীর আর গহন শিকড়। কাজের ভূমি ফুঁড়ে নেমে গেছে একেবারে অস্তিত্বের ভূ–কেন্দ্রে। সে কেবল সুখ বা বেদনার স্মৃতি নয়, তার ধারাবাহিকতা নিয়েও মনের মধ্যে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। পাঁচ বছরের মধ্যেও কেন্দ্র’র কর্মী দল, যাঁদের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বসে এত কাজ করেছি, তাঁদের স্থায়িত্বের উপর প্রশ্নচিহ্ন রেখেই চলে যেতে হচ্ছে।

অ্যাড-হক অবস্থা নিয়ে তাদের মনের মধ্যে নানা আশঙ্কা, সংশয়। আমার পরে যিনি এসেছেন , তাঁর প্রত্যাশা পূরণ এঁরা করতে পারবেন কিনা তাই নিয়ে চিন্তা। কেনই বা দ্বিধা–দ্বন্দ্ব মনে? এখানকার চেয়ে পরিশ্রমী, সৎ কর্মীদল আর কোথায় আছে? সকলেই মনে মনে একই কথা ভাবছেন।
যাঁরা প্রথম দিন থেকে ছিলেন, ধূ ধূ মাঠে ইটের পর ইট সাজিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সাউন্ড রেকর্ডিং সিস্টেম থেকে অ্যানিমেশন ড্রয়িঙের উড পেন্সিল যাঁরা কিনে এনে সাজিয়েছেন, কেবল অস্থায়ী বলে তাঁদের পেশাগত দক্ষতার অবমূল্যায়ন হবে না তো? তার উপর, রূপকলা কেন্দ্র’র উন্মেষ ও শৈশব আমার হাতে যদিও গড়ে উঠেছে, আমি যে চলচ্চিত্র বিশারদ নই, তার খোঁটা শুনতে হতে পারে, পিছনে যাঁরা রইলেন তাঁদেরই। গড়ে তুলতে প্রশাসনিক দক্ষতা দরকার, তৈরি প্রতিষ্ঠানকে চালাতে বিশেষজ্ঞ হলেই চলবে এমন একটা মতও জায়গা করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। আমাকে ফিরতে হবেই, কারণ অন্য রাজ্য সরকারের কাজে এতদিন আমাকে থাকতে দিয়ে ভুবনেশ্বরে আমার ক্যাডার নিয়ন্ত্রকেরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। দুই রাজ্যের মুখ্যসচিব কটক শহরে রাভেনশ’ কলেজে পড়াশুনো করেছেন। আমার প্রত্যর্পণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে তাঁরা যে পত্রালাপ করছেন তাও বিশেষ আনন্দদায়ক নয়। এখানে থাকতে আমি নিজেই আগ্রহী নই। কিন্তু আর্থিক বছরের গোড়াতেও প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজেট বরাদ্দ কিছুই হয়নি, নানা সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে মধ্যপথে । মনে হচ্ছে এখনও যেন বিভাগীয় ঔদাসীন্যে সবই এলোমেলো হয়ে আছে।

পারিবারিক জীবনেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। আমার কাজের সময় ফুরিয়ে আসার মুখে বাবা চলে গেছেন। দীর্ঘদিন তাঁর বিছানায় থাকা সত্ত্বেও মা এবং আমরা ভাইবোনেরা তাঁর নৈকট্যের উত্তাপ সর্বদা অনুভব করেছি। বরং আত্মীয়স্বজন বাবাকে দেখতে এসে যখন আক্ষেপ করতেন, এঁর চেয়ে তো চলে যাওয়া ভালো, তখন আমরা খুব বিরক্তি অনুভব করতাম। বাবার দায়িত্বের অনেকটা আমার উপরে বলেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। শেষের কদিন নির্বাক বাবা খুব বড় কোনও শারীরিক কষ্টের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিলেন। বাইরে একটানা বৃষ্টি, ঘরের ভিতর বাবার খুব জ্বর যা কোনও ওষুধে নামছে না, নিশ্বাসের কষ্ট। তারপর এক শরতের ভোরে বারান্দার নিচে শিউলিগাছতলায় বাবার নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা। এমন শান্ত, সুন্দর মুখ, দীর্ঘ সাত বছর রোদে জলে না বেরিয়ে সোনার মতো গায়ের রঙ, দেখতে দেখতে বুকের মধ্যে কি যেন ছিঁড়ে গেল হঠাৎ। কলকাতার প্রতি গভীর টান যেন আচমকা শিথিল হয়ে গেল। তখনই ফিরে এলেই হয়তো ভালো হত। কিন্তু আকৈশোর সাথি বাবাকে হারিয়ে মা তখন শোকের গভীরে। যাব ভাবলেই যাওয়া যায় না।

এদিকে ভাস্কর নিরঞ্জন প্রধানের স্টুডিওতে আরম্ভ হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের পূর্ণ দৈর্ঘ্যের মূর্তি নির্মাণের কাজ। সে এক অন্য অনুভব। মানুষটির অবয়বের খণ্ড খণ্ড ছাঁচ বানিয়ে রাখা হয়েছে। চুল্লির দাউদাউ আগুনে পাত্রে ফুটছে গলন্ত ধাতু। বিহার থেকে আসা একদল কারিগর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সে গলন্ত ধাতু ছুটে গিয়ে ঢেলে দিচ্ছে ছাঁচে। একচুল দেরি হলে ধাতু জমে যাবে, নষ্ট হবে মূলধন। একতিল ভুল হলে গলন্ত ধাতু ওদের হাত পা জ্বালিয়ে জখম করে দেবে। মানুষগুলির সারা দেহে চুল্লির উড়ন্ত ছাই, তাপে তাদের নগ্ন শরীর তামাটে কালো, ধাতুর পাত্র ছাঁচে ঢেলে ‘জল জল ‘ বলে আর্তনাদ করতে করতে বাইরের বাতাসে ছুটছে। দেখতে দেখতে মনের মধ্যটা অসাড় হয়ে যেত। এই কি শিল্প? এর মধ্যে মানুষ কোথায়? যাঁর মূর্তি তিনি নিজেই তো খণ্ড বিখণ্ড। ”আগুনের ভিতর” বলে একটি গল্পে এই অনুভূতির বেদনা ধরা আছে। বাবার মৃত্যুর পর লিখেছিলাম “আত্মজন” নামের আর একটি গল্প– স্মৃতি থেকে শোক কে মুছতে না পারার অসহায়তা নিয়ে। । এই দুটি গল্প আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখা। পরে, ইংরাজিতে অনূদিত হয়ে সর্বভারতীয় পাঠকের কাছে পৌঁছেছিল। গভীর বেদনার মধ্যেই শিল্পের পরিপূর্ণ অভিব্যক্তি, আমি তার সাক্ষী হয়ে রইলাম– ব্যক্তিগত জীবনে এবং নৈর্ব্যক্তিক অস্তিত্বের মধ্যেও।

আমাদের প্রথম সন্তান পড়তে পুণে চলে গিয়েছিল চার বছর আগে। তার কলকাতা ছেড়ে যাওয়া আমার জীবনকে এমন ফাঁকা করে দিয়েছিল, যে আমি কনিষ্ঠ সন্তানটির প্রতিও যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। অবস্থাটা খুবই দুঃখের হয়ে উঠেছিল আমার নিজের কাছেই। এই সময় শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ কাহিনীর মত অদৃশ্য অন্নপূর্ণা রূপকলা কেন্দ্রকে আমার কোলে নিক্ষেপ করলেন। ফলে আমার ফিটের ব্যামো ছেড়ে গেল। নতুন সন্তানকে গড়েপিটে তুলতে তুলতে আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। কলকাতা ছেড়ে যখন ভুবনেশ্বরে পা রাখছি, তখন সেই বড় খোকা চলে গেছে বিদেশে পড়তে। ট্রেনে করে মেয়েকে নিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবছি, আমার ঘরের একটা কোণ এখনও ফাঁকা রয়ে যাবে। রেলপথের ধারে জ্যোৎস্না ধোওয়া গ্রামগঞ্জ মাঠ ঘাট। চেনা পথ। বহুবার এ পথে এসেছি গেছি। চোখের জলে সব ঝাপসা। জীবনপাত্র কখনও পূর্ণ হয়না, যে মাধুরী উছলে পড়ে যায়, তারই অপর নাম অশ্রু।

ভুবনেশ্বরে আমাদের নতুন বাড়িটি ( সরকারের দেওয়া, কাজেই আইনত বাসা বলাই সংগত। ) রাস্তার ওপরে। পাঁচিল ঘেরা বিরাট জমির ওপর সাদা এক বাড়ি। অনেক গাছপালা। ডান দিকের কোণায় বড় চাঁপা গাছের ডালে দোলনা বাঁধা হল। মাঝখানে গোল গোলাপ বাগান। এছাড়া নানা এলোমেলো অগোছালো ঝুপসি মত জঙ্গল। চারিভিতে দেওয়ালের পাড় ঘিরে আর্ট কলেজের ছাত্ররা আদিবাসী আলপনা , যাকে বলে চিতা ও ঝোটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই দেখে বাড়িটিকে শিল্প সংগ্রহালয় মনে করে কখনও কখনও বিদেশী পর্যটকেরা দেখতে আসতেন। বাড়ির ভিতরটা কেমন যেন অদ্ভুত দেখতে। এখানে ওখানে ছোট বড় দেওয়াল তোলা। বাইরে খুব বড় পাকা গোয়াল ছিল, আগে যিনি দীর্ঘদিন ছিলেন, তাঁর ছিল অনেকগুলি গরু। কানাঘুষোয় শুনতাম, তাঁর স্ত্রী ছিলেন একজন পুরো নিরামিষাশী। যে ছোট শোওয়ার ঘরটিতে শুয়ে রাতে আমি কন্যাকে গল্প বলতাম, সেটা নাকি আসলে আমিষ রান্নাঘর। দেওয়াল জোড়া অতগুলো তাক সেইজন্য। তাতে আমি মনের আনন্দে ছবি সাজাচ্ছিলাম।

শহর ছাড়িয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন আবার নিজেকে ফিরে পেলাম সেই প্রকৃতির কাছে, যার সান্নিধ্য চিরকাল আমার বেদনায় অমৃত সিঞ্চন করে এসেছে। জ্যোৎস্না রাতে ,মহানদী ও কাঠজোরীর বিপুল বিস্তার যেখানে দিগন্ত বিস্তারী জলের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে, কটক শহর ছাড়িয়ে নরাজের পুরনো বাংলোয় বসে সেই দিকে তাকিয়ে সব মনে পড়ে গেল। শৈশবের শহর থেকে চলে এসেছি কিন্তু ফিরে এলাম মানুষের খুব কাছে। দায়িত্ব পেয়েছি বয়ন ও হস্তশিল্প বিভাগের। এ এমন এক রাজ্য যেখানে কাজের সুযোগের হিসেবে কৃষির পরই বয়ন শিল্প। ১৯৯৯ এর সাইক্লোনের পর সুতাকলগুলি নষ্ট হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, রয়ে গেছে তাঁতশিল্প। সারা রাজ্য ঘুরে বৈচিত্র্য ও শিল্পের সমস্যাগুলি নিয়ে একটা স্পষ্ট ছবি পেলাম। এবার প্রয়োজন অর্থের। মুখ্যমন্ত্রী কার্পণ্য করেননি, যতখানি চেয়েছিলাম, ততখানিই মঞ্জুর হয়েছিল। সম্ভবত এই সব কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে তাঁর কাছে দীর্ঘদিন কেউ প্রস্তাব আনেনি। মুখ্যসচিব আমার দীর্ঘ কলকাতা বাস নিয়ে খুব বিরক্ত হয়ে বসেছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, অর্থ সংকোচন ঘটলে আমার কাজ করার ক্ষমতা অনেকটা হ্রাস পাবে। প্রশাসনে একটা ছলাকলা সারা জীবন দেখেছি— কাজের মানুষকে শাস্তি দেওয়ার সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে তাকে বিনা কাজে বসিয়ে রাখা। কিন্তু আমি যে নিজেই হিসেব নিকেশ করে টাকার দরকার নিয়ে মগডালে পৌঁছে যাবো, এতখানি আশাবাদ তিনিও প্রত্যাশা করেননি। বাংলা কবিতা দিয়ে যার জীবন শুরু , তাকে নৈরাশ্যে নিমজ্জিত করে এমন সাধ্য কার?

খুব অস্পষ্ট ভাবে হলেও, মহানদী উপন্যাসের বীজ এই সময় থেকেই আমার মনে বোনা হয়ে গিয়েছিল। যদিও লেখার প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছিল আরও বেশ কয়েক বছর পর। মানুষ কেন নদীর কূলে এসে বসবাস করে, কেনই বা দূরে চলে যায় নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে, নদীজলের সঙ্গে জীবনযাপনের কী গভীর সম্পর্ক — নদীর স্রোতপথ অনুসরণ করে নানা গ্রামে গঞ্জে যেতে জানার চেষ্টা করেছি।
শান্ত গ্রামে মূল মাটির পথটি ধরে যেতে দু’পাশের ঘর থেকে কানে আসে তাঁত চলার শব্দ, বেলাভূমিতে ঢেউ এসে পড়ার ছন্দকে যদি শব্দে ধরা যেত তবে এমন কোনও সঙ্গীত রচনা হত। আমরা বাংলায় বলি টানা ও পোড়েন, ওড়িয়া ভাষায় বলে টানি ও ভরণি। টানির সুতোর গায়ে ভরণি এসে লাগলে, ‘হাথা’ র গায়ে ‘কামদা’  এসে লাগলে এই শব্দ তৈরি হয়। ’হাথা’  ও ‘কামদা’ হল তাঁতের দুই কাঠের ফ্রেম। আর দেখতাম জীর্ণ বাড়ির দাওয়ায় বসে নিমগ্ন শিল্পীকে – কী যত্নে ভেষজ রং তুলিতে নিয়ে রাঙাচ্ছেন দশাবতার তাস অথবা কাঠের পুতুল। হয়তো রাষ্ট্রপতির হাতে পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান, কিন্তু চালের খড় বদলানো হয়নি বহুদিন, অথচ সঙ্গেই থাকে শিক্ষার্থী চারজন ছাত্র। গুরুশিষ্য সব রামনাথের কালের মতন তেঁতুল ভাত খেয়ে আনন্দে কাজ করছেন। এঁদের কাছে জীবনের পাঠ নিতে নিতে কলকাতাকে মন থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

সহজ নয়। এক পুরনো সহকর্মী সপরিবার এসেছিলেন কলকাতা থেকে। স্বাভাবিক হাসিখুশি ভাব নেই। মলিন চেহারা। চলে যাওয়ার পর এক বিশিষ্ট মানুষের ফোনে জানলাম, প্রতিদিন কি পরিমাণ অপমান ও কটু ভাষণ শুনতে হচ্ছে তাঁকে। আমাকে মুখ ফুটে বলতে চাননি। ওরা চলে যাওয়ার ভোরে বৃষ্টি পড়েছিল। স্টেশনে যাবার সময় গাড়ি চাকা কাদার উপর দাগ রেখে গিয়েছিল বাগানের পথে। আবহাওয়ার মধ্যে যেন জড়ানো বিষাদ। ওই চাকার দাগটা কেন জানি না আজও খুব স্পস্ট হয়ে আছে মনের কাছে।

অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

(ক্রমশ)

অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

চলনবিল ৭

সুখের দিন

Comments are closed.