সুখের দিন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অনিতা অগ্নিহোত্রী

প্রেসিডেন্সী কলেজে অর্থনীতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অর্থনীতির পাঠ শেষ করে চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ের কোলে জাতীয় অ্যাকাডেমিতে। দু’বছরের জন্য আইএএস অফিসারের ট্রেনিং নিতে। প্রিয় শহরের প্রতি একরাশ অভিমান ছিল মনে।
তারপর ঝাড়খণ্ডের কয়লা খনি অঞ্চল, মধ্য ও উত্তর ওড়িশার অরণ্য পর্বত স্কুল মালভূমিতে প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ। প্রশাসনের বুকের পাঁজর হয়ে বসে মানুষের প্রতি উত্তরদায়িত্বের ভাবনায় প্রতি নিয়ত দ্বন্দ্ব ও সংশয়ে দীর্ণ হওয়া। কবিতার পাশাপাশি গল্প লেখা চলেছে বাংলার বাইরের জনজীবন নিয়ে।
বড় বাঁধ প্রকল্পের পুনর্বাসন নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষদের গ্রামে পৌঁছোন। সেই সময়েই শুরু হল রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের সংঘর্ষের নতুনতর পাঠ। এর পর বিদেশে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স পড়তে পড়তে লিখে ফেলা প্রথম উপন্যাস, ভুলতে না পারা মহুয়ার দেশ নিয়ে।
১৯৯৬ সাল। অর্থনৈতিক উদার নীতি তখন টলমল পায়ে হাঁটতে শেখা এক শিশু। পনের বছর বাংলার মাটি থেকে নির্বাসনের পর ফিরে এলেন বাঙালী সাহিত্যিক। সদ্য রূপ বদলানো বৈদেশিক বাণিজ্য অফিসের শীর্ষে। কিন্তু এই কি তাঁর ফেলে যাওয়া শহর?
প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।

পড়ে মনে হতে পারে, রূপকলা কেন্দ্রর কথা ভেবে এখনও বিষাদের শিশিরে ভিজে আছে মন। কিন্তু এটাই সত্যি যে দেড় দশকেরও বেশি আগেকার ওই দিনগুলিতে আমি কিন্তু সত্যিই খুব আনন্দে ছিলাম। বন্ধু ও সহকর্মীদের অনেককে বলেওছি, রূপকলা কেন্দ্র আমার কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠতম পর্ব। আনন্দের স্মৃতিগুলি যেন জোনাকি দলের মত কাল ব্যবধানের অন্ধকারে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই তো হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়ে দেখছি, আমার মুঠো ভর্তি আলো।

সমাজ সংযোগ চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযোগী কোনও ট্রেনিং কারিকুলাম বা পাঠক্রম ছিল না। প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের আসার যথেষ্ট আগে আমরা বসলাম, নতুন ধরনের সিলেবাস বানাতে। সংখ্যায় আমরা অল্প ক’জন, তাই ডাক পাঠালাম চেনা অচেনা তাত্ত্বিক বিশারদ চলচ্চিত্রকার শিল্পী গুণী মানুষদের। কে আসেননি আমাদের ডাকে? গৌতম ঘোষ, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমেন্দু রায়, শুদ্ধস্বত্ব বসু, ফাদার রোবেজ। এছাড়াও ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিট্যুট , পুণে ও কলকাতার সত্যজিৎ রায় ইনস্টিট্যুটের শিক্ষকরা। তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, সম্পাদক, সিনেমাটেগ্রাফাররা  আসতেন। আসতেন কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ বিভাগের অধ্যাপকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা, কাজ চালানো খাওয়াদাওয়া, সামান্য সাম্মানিক ও ট্যাক্সিভাড়ার ব্যবস্থা ছিল। আমাদের কখনও কেউ বলেননি, ব্যস্ত আছি বা আসতে পারছি না। কেউ বলেননি, কত সাম্মানিক? বাংলার বিদ্বজ্জনেরা নবীন এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য তাঁদের জ্ঞান, চিন্তা উজাড় করে দিয়েছিলেন। এ কেবল বাংলা এবং কলকাতাতেই সম্ভব। দিল্লি বা বম্বে হলে খাতিরদারি ও ইগো সামলাতেই সব শক্তি ব্যয় হয়ে যেত।

যথা সময়ে কোর্সে প্রথমবার ভর্তির বিজ্ঞাপন বেরোল সংবাদপত্রে। এটা অবশ্য তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের আধিকারিকরা বদান্যতার সঙ্গেই করে দিতেন। আমাদের দুশ্চিন্তা হতে লাগল, আচ্ছা, ছাত্রছাত্রীরা আসবে তো? যদি না আসে? এখন ভাবলে খুবই হাস্যকর মনে হয় এই দ্বিধা–দ্বন্দ্ব। নতুন বলে আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কম ছিল, তাতে ভালোই হয়েছিল, আমরা খুঁটিনাটি নিয়ে অনেক যত্নবান হয়ে পড়েছিলাম। যথাসময়ে লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ হল। এক ঝাঁক তরুণ ছাত্রছাত্রী এল। তাদের নিয়ে সর্বার্থে মেতে উঠলাম আমরা। পুণে ফিল্ম ইনস্টিট্যুটের ছাত্রছাত্রীদের ধর্মঘটে বসার ঘটনা সংবাদপত্রে পড়তাম। পরে পুণে গিয়ে মোহন আগাসের মুখে বিশৃঙ্খলার রোমহর্ষক কাহিনীও শুনে এসেছিলাম। তবে নির্দেশকের ভাষ্যে ছাত্র অসন্তোষের মূল কারণগুলি উল্লিখিত হয়নি, বলাই বাহুল্য। আমি স্থির করে রেখেছিলাম, যত্ন ও নিয়মানুবর্তিতায় পড়াশুনা চালাব এবং দরজা খোলা রেখে দেব, যে কোনও অভিযোগ শোনার জন্য। তাতে ফল হয়েছিল।

প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা প্রায় সকলেই ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের। কোর্স ফি বেশি ছিল না, তবু তাই নিয়ে তাদের চিন্তা লেগে থাকত। আমাদের অ্যাকাউন্টস অফিসার স্টাডি লোনের জন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ আমার কর্মজীবনে এই প্রথম। কাজেই অবস্থানগত দূরত্ব সত্বেও ওদের প্রতি ভালোবাসা লুকোতে পারতাম না। ওদের প্রশ্নে, ডিপ্লোমা ফিল্ম তৈরির টিমওয়ার্কে খুঁজে পেতাম এক মুক্ত চিন্তার স্বাদ, যা আমার ছাত্রজীবনে কখনও উপভোগ করিনি। নীল, চন্দন, ফলক, মৌসুমী, ইন্দ্রজিৎ, প্রশান্ত, অনির্বাণ, কৌশিক, দেবস্মিতা— এদের কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। এরা কেউ কেউ আমাকে প্রিন্সিপাল ম্যাম বলে ডাকত। তাও খুব মজার। ভেবে ভালো লাগে যে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা কেউ হারিয়ে যায়নি। জীবিকা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সঙ্গেও অন্বিত হয়ে আছে তারা। কারও সঙ্গে নতুন করে সংযোগ হচ্ছে আবার। কলকাতায় আমার নতুন আস্তানার সূত্রে।

ইন্দ্রজিৎ যে আমাকে জোর করে দেখিয়েছিল জীবন বদলে দেওয়ার মতো ছবি ‘এল পোস্তিনো’, যার পুলিশে জয়েন করায় খুব দুঃখ পেয়েছিলাম, সে আবার ফিরে এসেছে মিডিয়াতে, কবিতা লিখছে নিয়মিত।
মৌসুমী বিলকিস তো এখন রীতিমত লেখিকা, পাশাপাশি চলচ্চিত্র তৈরির কাজও করে। ডিপ্লোমা ফিল্মে এক মহিলা কবিয়ালের জীবন নিয়ে ছবি করে সে আমাদের মুগ্ধ করেছিল। তারা সদলবলে ফিল্ডে গেছে শ্যুট করতে, এমন একদিন ভোরে বাড়িতে,  মৌসুমীর কান্না ভরা গলা- ম্যাম, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। সারা রাত ধরে কবিয়ালের বাড়ীতে শ্যুট করা ওর ক্যাসেট ওই গ্রামেরই কেউ ইচ্ছে করে নিয়ে চলে যায়। অতএব ওই অংশ তোলার সময় ও খরচ দুটোই আবার লাগবে। শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ও নিজে ভালো আছে, খরচ যা লাগে লাগুক।

প্রশান্ত ছিল একটু একরোখা আর জেদি। দুটো বৈশিষ্ট্যই ওকে পেশাতে দখল পেতে সাহায্য করেছে নিশ্চয়ই। দিল্লিতে থাকতে পার্লামেন্টে মাঝেমাঝেই ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। ও তখন রাজ্যসভা টেলিভিশনে। অনির্বাণ এডিটিঙে সাফল্য পেয়েছে, না হলে বম্বেতে থেকে যেতে পারত না। বম্বে অতি প্রতিযোগিতানির্ভর মহানগর। আই আই টি বম্বের ক্যান্টিনে হঠাৎ একদিন দেখা। ওখানকার ডিজাইন সেন্টারের জন্য ছবির কাজ করছে। দেড় দশক পরে লিখতে বসে অনেকের নাম মনে পড়ছে না। কিন্তু দেখা হলে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আমাকে চিনে নেবে, আমিও তাদের চিনতে পারব, এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

আমাদের প্রশিক্ষকরা পাঠক্রম দেখে প্রতিটি ডিপ্লোমা কোর্সের সাপ্তাহিক রুটিন তৈরি করতেন। আমরা দলে কম ছিলাম বলে বাইরে থেকে প্রতি শাখার বিশেষজ্ঞরা পড়াতে আসতেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, আসা যাওয়ার ব্যবস্থা সব করতেন রূপকলা কেন্দ্রর কর্মী ও শিক্ষকরা। আমাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না কিন্তু উৎসাহ ও জীবনীশক্তি ছিল অফুরন্ত। প্রচুর স্বাধীনতা ও বিশ্বাস রাখা হত বলে সবাই মন দিয়ে কাজ করতে পারত। পাঠক্রম শুরু হলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমরা আমণ্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসতাম বিশিষ্ট অতিথি শিক্ষকদের। গৌতম ঘোষ নিয়মিত ক্লাস নিতেন, এসেছিলেন সন্দীপ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ। সম্পাদনার ক্লাস ও ওয়ার্কশপ নিতে আসতেন অর্ঘকমল মিত্র ও রবিরঞ্জন মৈত্র’র মত বিশিষ্ট সম্পাদকরা। সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে অভীক তখনই বেশ নামী। তিনিও এসেছেন ছাত্রছাত্রীদের টানে। সৌরভ ষড়ংগী নির্দেশনা শেখাতে এসে আমাদের সঙ্গে খুব জড়িয়ে পড়েছিলেন। ভাঙন নিয়ে তাঁর তথ্যচিত্র থেকে ছাত্ররাও শিখতে পেরেছিল হাতেকলমে। দ্বিতীয় বছরে আমার ব্যক্তিগত অনুরোধে এসেছিলেন তরুণ মজুমদার, তাঁর ছবি সবে মাত্র মুক্তি পেয়েছে। হৈমন্তী ও শিবাজীও এসেছিলেন গানের প্রয়োগ নিয়ে বলতে। পরে নিজের মূল্যবান সময় দিয়ে একটি ওয়র্কশপও করেছিলেন ছাত্রদের নিয়ে। সংযোগ চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য অতিথি হয়ে এসে আদুর গোপালকৃষ্ণন ছাত্রদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন।

নতুন স্টুডিওটি ছিল আমাদের বিশেষ গর্বের। আমরা নতুন বাড়িতে এসে ক্লাস ও প্রোডাকসনের কাজ আরম্ভ করে দিয়েছিলাম সময়মত। স্টুডিও নির্মাণের কাজ চলছিল পাশাপাশি । এতে অনেক সময় বেঁচেছিল। রিমোট কন্ট্রোলে চালিত লাইটিং গ্রিড এবং সম্পূর্ণ সাউন্ড প্রুফ, মাল্টি ক্যামেরা সেট আপ সহ এর নির্মাণের জন্য দিল্লি থেকে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কারিগরি সংস্থা বেসিল কে। নেমসেক ছবির ট্রেন দুর্ঘটনার দৃশ্য এতে তোলা হয়েছিল। এছাড়া নানা ছবি সিরিয়ালের কাজেও স্টুডিও ব্যবহার হত। অবশ্য অগ্রাধিকার ছিল আমাদের ছাত্রছাত্রীদের। একবার ইতালীয় দূতাবাসের অনুরোধে এখানে বসেছিল বিদ্বজ্জনসভা। বিখ্যাত লেখক শিল্পী নাট্যকাররা এসেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, বিষয় ছিল সমাজ সংযোগে শিল্প সাহিত্যের ভূমিকা। মহাশ্বেতা দেবী এসেছিলেন, তাঁর উপর তৈরি তথ্যচিত্রের প্রদর্শনের সময়। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু রাজলক্ষ্মী দেবী। কবিতা পড়েছিলেন তিনি। আমি চেষ্টা করতাম সাহিত্যের সঙ্গে চলচ্চিত্র ভাবনাকে যুক্ত করতে। তরুণ ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই সাহিত্য বেশি পড়েনি বলে লাইব্রেরিতে রাখা হয়েছিল ক্লাসিক্যাল ও সাম্প্রতিক সাহিত্যের সম্ভার।

পঞ্চায়েত বিভাগের দায়িত্বে তখন বন্ধু ও দক্ষ অফিসার মানবেন্দ্রনাথ রায়। তাঁর আগ্রহে পঞ্চায়েত বিভাগের সিনিয়র অফিসাররা রূপকলা কেন্দ্রের কাছে এলেন নানা নতুন ভাবনা চিন্তা নিয়ে। সর্ব শিক্ষা অভিযানের অসংখ্য শিক্ষকের জন্য ট্রেনিং প্রোগ্রাম হত সাউন্ড স্টুডিও থেকে। মাঝে তার পরিচালনাতে আমি নিজেই যেতাম। পঞ্চায়েত স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ট্রেনিঙের জন্য নানা বিষয়ে বই লেখা হয়েছিল। কিন্তু বই পড়তে অনেকেই আগ্রহ বোধ করতেন না। এঁদের জন্য আমরা তৈরি করেছিলাম অডিও ভিস্যুয়াল মডিউল। ট্রেনিঙের সময়, বই এর পাশাপাশি ফিল্ম দেখতেন প্রতিনিধিরা। এতে শিক্ষণের মান অনেক ভালো হয়েছিল। রূপকলা কেন্দ্রর সমাজ সংযোগ গণমাধ্যমে যে পেশাদারী দক্ষতা ছিল, ধীরে ধীরে তার টানে সংযুক্ত হচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যান্য দফতরগুলিও। স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু কল্যাণ, তথ্য সংস্কৃতি। আমরা যে কোনও কাজ করার সময় খেয়াল রাখতাম, আমাদের নির্মাণের বিষয়টির মধ্যে যেন সরকারি প্রোপাগান্ডা চলে না আসে বরং বক্তব্যের আদর্শগত দিকটিই স্পষ্ট হয়। কিছুদিন পর, অর্থ বিভাগের সচিব সমর ঘোষ আর মানবেন্দ্র নাথ রায়ের উদ্যোগে ইসরোর স্যাটেলাইট সম্প্রচার স্টেশন বসল রূপকলা কেন্দ্রে। আমাদের স্টুডিওর মাধ্যমে সমস্ত পঞ্চায়েতের মতামত, তথ্য বিনিময়ের বৃহত্তম প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠল কেন্দ্র। মুহূর্তের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কারিগরি ব্যবস্থার ফলে রূপকলা কেন্দ্র যুক্ত হল সারা বাংলার সঙ্গে।

আজ থেকে পনের বছর আগে , সরকারের কাজকর্মের রিপোর্ট তৈরির এত জাঁকজমক ছিল না, নেতা নেত্রীদের মুখ বা কাট আউটের প্লাবন বাজারে আসেনি। সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করতেন, হয়তো কাঠামোগত পরিবর্তনে অনেক শিথিলতা এসেছিল, কিন্তু উন্নয়নের ছবি রঙ ও পালিশ করে পেশ করার জন্য কোন চাপ ছিল না। বরং যখন আমাদের প্রোডাকশন দল পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার সীমান্ত অঞ্চলের গ্রামগুলিতে ঘুরে সেখানকার দারিদ্র, অপুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিকাঠামোর ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার ছবি তুলে এনেছিল, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আগ্রহী হয়ে সে ছবি নন্দনে বরিষ্ঠ প্রশাসকদের দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
এর কিছুদিন আগেই আমলাশোলে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেছে। আমি জানতাম, কেবল আমলাশোলে নয়, দারিদ্র ও অপুষ্টির ছবিটা সীমান্ত জেলাগুলির সীমান্ত গ্রামাঞ্চলেও বিশেষ আলাদা নয়। গৌতম ঘোষের কারিগরি পরিকল্পনা এবং আমার বিষয়বস্তু গবেষণায় এই তথ্যচিত্রর পরিকল্পনা হয়েছিল।
এমন ধরনের কাজ একটি সরকারি সংস্থায়, বাংলা বা ভারতে কোথাও এখন আর তৈরি করা সম্ভব বলে মনে হয় না। অনুন্নয়নের সত্যকে স্বীকার করার সেই প্রয়োজনই কোথাও নেই। রয়ে গেছে কেবল নির্বাচনে জয়াভিলাষ। মানুষের উপর যে কোনও ভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার স্ট্যাটেজি।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাটোগ্রাফার সৌমেন্দু রায় আমার ব্যক্তিগত অনুরোধে রূপকলা কেন্দ্রের ক্যামেরা বিভাগের দায়িত্বে এসেছিলেন। কথা ছিল, ভালো না লাগলে ছ’মাস পর ফিরে যাবেন। আমাদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল এই প্রতিভাবান মানুষটির প্রতি। তিনিও দায়িত্বের ভার নামাতে না পেরে সানন্দে রয়ে গিয়েছিলেন আরও বেশ কয়েক বছর। তাতে রূপকলা কেন্দ্রের অনেক উপকার হয়েছিল। সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি তাঁকে ঋদ্ধ করে রাখত বলেই ছোটখাটো তাঁর অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতাম। যেমন, টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে পথের পাঁচালীর ক্যামেরাটি রূপকলা কেন্দ্রে এনে রাখা। সৌমেন্দু বাবুই বলেছিলেন, কলকাতার কোথাও সত্যজিৎ রায়ের পূর্ণাবয়ব মূর্তি নেই। কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো নেই–ই। মূর্তি বসানোয় আমার বা গৌতম ঘোষের ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল না। কেমন যেন ব্যক্তিপূজনের সমার্থক মনে হত। কিন্তু আলোচনার পর প্রস্তাবটি সকলেরই ভালো লাগল। বিশিষ্ট ভাস্কর নিরঞ্জন প্রধানের তৈরি সেই পূর্ণাবয়ব ব্রোঞ্জ মূর্তি এখনও আছে। দীর্ঘদেহী সত্যজিৎ হাতে ফিল্ম স্ট্রিপ ধরে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন ।

জীর্ণ রিক্ত রূপকলা কেন্দ্রর মূল্যবান জমি ও পরিকাঠামো যদি ভবিষ্যতে কোনওদিন বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবা হয়, মূল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যজিতের মূর্তিটি হয়তো অতীতের কথা মনে করাবে। যেন লুপ্ত সংস্কৃতির বিবেকের প্রহরা। বাংলা ছেড়ে যিনি কোখাও যাননি, তাঁর বাস ভবনের জন্য রাখা ছিল এই পাঁচ একর জমি। বিশপ লেফ্রয় রোড ছেড়ে এখানেও আসতে রাজি হননি সত্যজিৎ, মূলত তাঁর সহকারীদের যাতায়াতের অসুবিধের কথা ভেবেই। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে যাঁর হাত ধরে আমার প্রবেশ, রূপকলা কেন্দ্রর নির্মাণ ও পরিচালনা তাঁকেই দেওয়া আমার গুরুদক্ষিণা। এবার তাঁর হাতেই রইল এই প্রাঙ্গণের ভবিষ্যৎ। সৌমেন্দু রায় যথার্থ প্রস্তাবই দিয়েছিলেন।

(মুম্বাই শহরকে লেখিকা সাবেক ‘বম্বে’ নামে অভিহিত করেছেন)

অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

(ক্রমশ)

অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

চলনবিল ৬

সব হতে আপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More