সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

রোদবাতাসের পথ

অনিতা অগ্নিহোত্রী

প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।  আজ শেষ পর্ব 

পূর্বপ্রকাশিত পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

চলনবিল

তোমার কথা খুব মনে পড়ে ইগনিয়াস।

তোমার কাছেই একদিন শিখেছিলাম, মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছতে হয়, কীভাবে বুঝে নিতে হয় নীরব দ্রোহের ভাষা।

কলকাতার হাজরার মোড়ে ক্ষীরোদ ঘোষের বাজার। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বাংলা স্কুল। তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির দীক্ষা। কত পথই যে পেরোলাম আমি, জন্ম থেকেই চোখে অল্প দেখা, মুখচোরা লাজুক, এক মেয়ে। ছত্রিশ বছর ধরে জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলি দিলাম এমন এক জীবিকায় যাকে মানুষের কাছে পৌঁছবার রোদবাতাসের পথ বলেই জেনেছি। এরই পাশাপাশি, কখনও বা গলাগলি করে চলেছে আমার লেখা, যার মধ্যে ধরে রাখি আমার অল্পচেনা, অ–চেনা ভারতবর্ষের সন্ধান। কিছু কাজ করা হল, অনেক কিছুই হল না।

তত্ত্বের দিক দিয়ে নিজেকে ঠকিয়েছি। বৃহৎ যন্ত্রের আমি একটি ইসকুরুপ তা ভেবে নির্মোহ হতে পারিনি। হৃদয় মেধা শ্রম সব কিছু দিয়ে নিজেকে উজাড় করেছি এক শূন্য ক্যানভাসে। সন্তানেরা কতদিন একা একা খেয়ে ঘুমোতে গেছে ধুলো পায়ে, কতবার তাদের জ্বরে তপ্ত শরীর পায়নি মায়ের কোল, বার বার স্কুল বদল হয়েছে, পরীক্ষার আগে আমার সাহচর্যের প্রত্যাশাও ত্যাগ করতে হয়েছে তাদের। এক পরিবারে বাবা–মা যদি কাজকে সবকিছুর আগে রাখেন, তা হলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

কিন্তু আজ তারা যেভাবে দেশকে বোঝে, জানে, তাতে মনে হয় সন্তানদের ত্যাগটুকু নষ্ট হয়নি।

কাজকে যদি ‘কেরিয়ার’ মনে করে লালন করতাম, অনেক সম্পন্নতা ও মুকুটের পালক জড়ো হতো। ভাগ্যিস তা হয়নি!

বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে লড়াইয়ে শাস্তি পেয়েছি ‘সিস্টেম’–এর কাছেই, কিন্তু আমার মনে কোনও ছায়া ফেলতে পারেনি তা। প্রশাসনকে মানুষের কাছ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি দুর্গম, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের টিম কে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে। দরিদ্রের জন্য ব্যাঙ্কের নীতির সঙ্গে লড়াইয়ের প্রয়োজন সেদিনও ছিল, আমার কাজের জীবন আরম্ভের গোড়ায়, আজও আছে। বৃহৎ পলায়নপর ব্যবসায়ীদের প্রতি স্নেহপরায়ণতা তীব্রতর হয়েছে বিশ্বায়নের পরবর্তীকালে।

বাঁধ বাস্তুচ্যুতদের জন্য পুনর্বাসন নীতি ও তার রূপায়ণের যে কাজ করেছিলাম, আজ তা সারা দেশেই স্বীকৃত মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয় এমন সমস্ত প্রকল্পে। বাংলার জন্য রইল আমার রূপকলা কেন্দ্র। হয়তো আজ তার জীর্ণ পরিকাঠামো, কিন্তু চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে চলেছেন আমাদের এক সময়ের ছাত্রছাত্রী প্রশিক্ষকরা। বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে আন্ধেরির বিশেষ ‘জোন’–এর গরিমা আগের মতন নেই। সোনা ও জহরত শিল্প মন্দার মুখে। কিন্তু শ্রমিকদের ক্লিনিক ও শিশুদের ক্রেশ আজও কাজ করে চলেছে। জাতীয় আবাসন নীতি গৃহনির্মাণে স্বচ্ছতা আনার জন্য সংশোধিত রিয়েল এস্টেট বিল; তফসিলি ও আদিবাসী অত্যাচার নিরোধক আইন, ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারদের পুনর্বাসন, ট্রেনিং ও মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণের জন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে পেরেছিলাম। সেগুলির রূপায়ণ চলবে।

ছত্রিশ বছর একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘ সময়। যদি তাতে ধরা হয় সপ্তাহে ছ’দিন কাজ, আর দিনে বারো ঘণ্টার মনোনিবেশ। প্রথমদিকের চ্যালেঞ্জ ছিল অন্যরকম। মায়েদের ‘বন্ধ্যাকরণ’–এর টার্গেট না নিয়ে শিশুমৃত্যুর হার কমানোর শপথ নিতে আমার জেলার মান খসে তিন থেকে তেরোয় চলে গিয়েছিল। তা হোক, ফুল্ল সেই সব শিশুরা বেঁচে আছে, বড় হয়েছে আশা করি। ‘কোল মাফিয়া’ ফরেন ট্রেড–এর মধ্যবর্তী সম্প্রদায়ের চাপে জনপ্রতিনিধির উষ্মার তল আমি দেখতে পেয়েছি। এরা মানুষকে ভাঙতে, নষ্ট করতে সম্পূর্ণ সক্ষম, কারণ এরা অস্ত্র ব্যবসায়ী।

বিশ্বায়নের পর চ্যালেঞ্জের প্রকৃতি বদলেছে। রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার স্বপ্ন দেখতে দেখতে ‘করপোরেট’ একসময় ‘রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে চায়। আমাদের বৃহৎ, জঙ্গম দেশের বহু স্বর, বহু চেষ্টা এই প্রবণতাকে প্রতিহত করার জন্য লড়ে চলেছে। আমার কাজও নিঃশব্দে এই লড়াইতে মিশে গেছে। নিরস্ত্র জনতার উপর অস্ত্রচালনার অজস্র ঘটনা ঘটেছে একবিংশ শতাব্দীতেই। অধিকাংশের পিছনেই খনি, শিল্পের জমি অথবা বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের চাপ। অথচ বৃহৎ বাঁধ প্রকল্প, বিরাট শিল্প স্থানীয় মানুষের প্রান্তিকতায় বিশেষ বদল ঘটাতে পারে না, তা পরীক্ষিত সত্য।

বহু সংগঠনের ও মানুষের পিছনে দাঁড়িয়ে কাজ করা একজন হিসেবেই নিজেকে দেখেছি। তবু আজও ঘরে বাইরে মেয়েদের উপর আক্রমণ, তাদের দেশান্তরী হয়ে হারিয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় তাদের স্বাধীন চেতনার প্রতি আগ্রাসন আমাকে হতাশায় আচ্ছন্ন করে। দীর্ঘদিন যৌন শোষণের পর বারো বছরের মেয়েটি হোমে যাওয়ার সময় বুঝেছিল, সংসারের জন্য উপার্জন আর সে করতে পারবে না। তাই দরজায় নিজের হাতে লিখে গেছে ‘সরি আম্মা’। কী মর্মান্তিক এই লেখাটুকু!

চুনি কোটাল রোহিত ভেমুলা পায়েল তড়বী– কোনও মৃত্যুই আমরা ঠেকাতে পারিনি, কেবল এগিয়ে দিয়েছি মর্গের শীতলতার মতো আমাদের পরিসংখ্যান–সারণী। হিংসা কি সত্যিই বাড়ছে, না ঈষৎ নিম্নগামী গত কয়েক বছরে!

আজও ঘোড়ায় চড়ে বিয়ে করতে যাওয়া ‘দলিত’ বরকে পুলিশ উপদেশ দেয় ‘হেলমেট’ পরে নিতে। কারণ গ্রামের ‘উচ্চবর্ণ’ পাথর ছুড়লে আইন–শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায় তারা নেবে না।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে বসলে আজও তোমার মুখ ভেসে ওঠে মনের সামনে, ইগনিয়াস!

অরণ্য–পর্বত সংকুল দীর্ঘ পথ ভেঙে আলো অন্ধকারে আমি, আমার মতন অজস্র মানুষ পথ হাঁটছে। আগে আগে চলেছ অদৃশ্য তুমি– দিগন্তের কাছে কোথাও যেন তৃষ্ণার্ত পরিত্যক্ত ইঁদারাগুলি ভরে উঠছে রাতের নিঃশব্দ শিশিরপাতে!

অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

(শেষ)

অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত।  

Comments are closed.