শুক্রবার, নভেম্বর ২২
TheWall
TheWall

শেষ অঙ্ক

অনিতা অগ্নিহোত্রী

প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল। 

পূর্বপ্রকাশিত পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

চলনবিল

আমি যতদিনে সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকে সচিব হিসেবে এসেছি, নতুন সরকার তার নিজস্ব কার্যপদ্ধতি নিয়ে গুছিয়ে বসেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি যে ক্রমশঃই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। মন্ত্রীমণ্ডলের সদস্যরা আছেন, কিন্তু তাঁদের স্বাধীনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর দফতর, যাকে ছোট করে বলা হয়, পিএমও, আগের সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এখনও করছে, কিন্তু কাজ করার ধরনে একটা বদল এসেছে। বিভিন্ন মন্ত্রক ও বিভাগ মিলিয়ে সচিবের সংখ্যা আশি। তাঁরাই দায়িত্ব পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার। অথচ পিএমও’র হাতে গোনা কয়েকজন অফিসার, এক একজন দশ বারোটা করে মন্ত্রকের কাজ দেখেন, নতুন যে কোনও প্রস্তাব যায় তাঁদের হাত ঘুরে। ফলে ক্যাবিনেট নোট, যা কোনও নীতি বিষয়ক প্রস্তাব অথবা নতুন আইন প্রণয়নের অনুমোদন হতে সময় লাগে অবিশ্বাস্য বেশি।

মন্ত্রী নিজে মধ্যপ্রদেশের মানুষ, দলিত পরিবারে জন্ম। প্রতিকূল পরিবেশে বড় হয়েও পড়াশুনো করেছেন, কালক্রমে রাজনীতি ও রাজ্যে মন্ত্রী হওয়া। মানুষটি আপাদমস্তক সৎ। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ, এবং পর্যাপ্ত অফিসার কর্মীর অভাবে যতটা কাজ করা যেত, তা করা সম্ভব হচ্ছে না। আমার মতো তিনিও বোঝেন, সিদ্ধান্তের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যেমন অবরূদ্ধ, কেন্দ্রীয় সরকারের মানবসম্পদ তেমনই সংকুচিত হয়ে চলেছে। খালি পদগুলি ভরা হয় না। নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব বিত্ত মন্ত্রক থেকে নানা ধরনের প্রশ্ন চিহ্নে কণ্টকিত হয়ে ফিরে আসে।

এরই মধ্যে আমরা তফসিলি উপজাতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট বৃত্তির আর্থিক বরাদ্দ যতদূর সম্ভব প্রয়োজনভিত্তিক ভাবে রাজ্যে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলাম। সেখানেও অসাম্যের চেহারা প্রকট। বৃত্তির সবচেয়ে বড় অংশ যেখানে কলেজ বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফিজ, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলি অগ্রণী হয়ে রাজ্য সরকারের পিছনে ঠেলা দেয়– কত তাড়াতাড়ি মঞ্জুরি পাওয়া যায়। অথচ বুনিয়াদি ও সেকেন্ডারি স্তরে যেখানে স্কুলের ফিজ নগন্য, টাকা যাবে ছাত্রছাত্রীর ব্যাঙ্কের খাতায়, সেখানেই যত গড়িমসি! কলেজস্তরের বৃত্তিতে বেশ কিছু রাজ্যে দুর্নীতির চক্র কাজ করতে দেখছিলাম। ফিজ–এর হার যত বেশি, চক্র তত শক্তিশালী। তফসিলি জাতির ছাত্রদের ভুয়ো তালিকা ও পরিচয়পত্র তৈরি করে, তার সঙ্গে জাল মার্কশিট ইত্যাদি জুড়ে এক শ্রেণীর দালাল মারফত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাখিল করা তারপর ফিজ বাবদ টাকা প্রতিষ্ঠানের খাতায় জমা হলে তা ভাগাভাগির ব্যবস্থা।

এই দুর্নীতির একটা বড় কারণ বৃত্তি যোজনায় ফিজ–এর কোনও ঊর্ধসীমা না রাখা এবং দেশের সর্বত্র অসাধু উদ্দেশ্যে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অন্য যে কোনও অর্থকরী ব্যবসার মতো চালানো। কঠোর পরিশ্রমে, নানা রাজ্যে বৃত্তি বরাদ্দ পদ্ধতি সমীক্ষা করে আমাদের টিম যে সব প্রস্তাব দিয়েছিল, তা এতদিনে কার্যকর হয়েছে। কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের অডিটও হয়েছে। বৃত্তি যোজনার দুর্বল দিকটির উল্লেখ প্রথমে করলাম। কিন্তু একই সঙ্গে বলা দরকার, প্রাথমিক ও তার পরবর্তী পর্যায়ে অনুসূচিত জাতি, জনজাতির ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে বৃত্তির ব্যবস্থা আছে, তা না থাকলে তাদের কতজন গ্রামাঞ্চলে পড়াশুনো করতে পারত তা বলা যায় না। এটাও সত্যি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি স্কুলের শিশুদের পরিবারে প্রখর দারিদ্র্য রয়েছে। সম্ভব হলে সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব শিশুকেই বৃত্তি দেওয়া উচিত। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন এই বৃত্তির টাকা দুর্বল শ্রেণীগুলির কাছে যতদূর সম্ভব দ্রুত পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

আমাদের মন্ত্রকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যমন্ত্রী ছিলেন আরও তিনজন। সবার মধ্যেই দেখতাম, যারা এগিয়ে আছে, তাদের আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্খা। তাঁদের কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে বোঝাতে হতো, যে একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় মেধাবৃত্তি চালু করার চেয়ে অথবা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের মহার্ঘ বৃত্তি দেওয়ার চেয়ে, যারা স্কুল থেকে অকালে সরে গিয়ে কুয়াশায় মিশে গেল, তাদের জন্য পরবর্তী শিক্ষা ও দক্ষতার ব্যবস্থা করা। দেশব্যাপী সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যে সব ছাত্র–ছাত্রীরা ক্লাস নাইনের আগেই স্কুলের পড়া ছেড়ে দেয়, তাদের ৮৫ শতাংশই তফসিলি জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের। যে মেয়েরা স্কুলছুট হয়ে বাড়িতে রয়ে গেল, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ কম বয়সে বিয়ে অথবা বিয়ের নামে পাচারের শিকার হয়।

‘দ্বিধার সঙ্গে’ বললাম, কারণ জন্মসূত্রে সাবর্ণ হিন্দু সমাজের প্রতিভূ বলে যাঁরা আমাকে চিহ্নিত করেন, তাঁরা দলিত জীবনের বাস্তব নিজেদের রক্তে মজ্জায় অনুভব করেছেন। আমার কোনও দেখা বা জানা–ই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম কেন, স্পর্শও করতে পারে না। তবু বলতাম, গ্রামেগঞ্জে ঘুরে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে, যেটুকু বাস্তব বোধ অর্জন করেছি, তারই বলে।

নতুন সরকারের নীতি: সবকা সাথ, সবকা বিকাশ। অর্থাৎ, সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন। শুনতে কানে মন্দ লাগে না, কিন্তু দেশের বাস্তবের সঙ্গে একে মেলানো যায় না। যে সব সম্প্রদায় বহু প্রজন্ম ধরে বঞ্চনার শিকার, প্রকৃত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ থেকে বঞ্চিত, যাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন এখনও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, আর সবার সঙ্গে মেলালে তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতি, যথেষ্ট বাজেট বরাদ্দ, ভালো জনসংগঠন ও একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে কাজ। কিন্তু যদি সমস্যার অস্তিত্ব নিয়েই কোনও আলোচনা বা বিশ্লেষণ সম্ভব না হয়, তবে কাজ কী ভাবে হবে?

এই আত্মবিশ্বাসী নিস্পৃহতার মধ্যে বসেই আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং নিষিদ্ধ করা আইনটিকে অনুপালন করতে, অনুসূচিত জাতি ও আদিবাসীদের বিরূদ্ধে অত্যাচার আইনের সংশোধনের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু বহুবার চেষ্টা করেও ‘স্বচ্ছতার মিশন’–এর মতো উচ্চাকাঙ্খী জাতীয় প্রকল্পের অগ্রদূতদের দিয়ে বলানো যায়নি, এদেশে পঁচিশ লক্ষেরও বেশি যে মানুষ বংশানুক্রমে অন্যের বর্জ্য পরিষ্কার করে জীবনযাপন করেন, তাঁদের মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্য সুবিধার জন্য বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা হোক। বিপজ্জনক সাফাইয়ের কাজ আইনত নিষিদ্ধ, অথচ প্রতিদিন বড় বড় শহরে, সরকারি সংস্থার কাজে এবং বেসরকারি উদ্যোগে ম্যানহোল বা গালিতে নেমে ইঁদুরের মতো মারা যাচ্ছেন মানুষ। এসব মৃত্যুতে স্থানীয় পুলিশ এবং নেতৃবর্গের বোঝাপড়ার ফলে কোনও সংস্থার প্রতিভূ কখনও গ্রেফতার হয়েছেন বলে শোনা যায় না। পুলিশ এফআইআর নিতেই অস্বীকার করে অধিকাংশ সময়।

একটি আইন খসড়া অবস্থাতেই রয়ে গেল যাতে সংস্থা ও ঠিকাদারদের উপর দায়িত্ব থাকত শ্রমিকদের উপযুক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা, অর্থাৎ গ্লাভস, পোশাক, মাস্ক ইত্যাদির ব্যবস্থা করে তবেই কাজে পাঠানোর। স্বচ্ছ ভারত মিশনের দেশব্যাপী রাজসূয় যজ্ঞে এইসব চিন্তা চাপা পড়ে গেল। আইন করে অস্পৃশ্যতার ব্যবহারিকতা বন্ধ করা হয়েছে। আইন ও সংবিধান দুই–ই এগিয়ে আছে সমাজের চেয়ে। কিন্তু নানা চেহারা ও মানসিকতার মধ্যে বেঁচে আছে। মানুষকে ‘জাতি’র চিহ্ন দিয়ে অবদমিত করে রাখার চেষ্টা, যা অবস্থা বিশেষে অত্যাচার, অসম্মান এমনকি জীবনহানির পর্যায়ে চলে যায়।

সামাজিক ন্যায় বিভাগকে অজস্র কাজ দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই তুলনায় অর্থ এবং কর্মীসংখ্যা কম। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আনা ট্রান্সজেন্ডার’দের কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের জন্য আইনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। তাদের মানবিক অধিকার এবং অবস্থানের সাম্য অন্তর থেকে মেনে নিতে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেই এক বাধা প্রত্যক্ষ করেছি, বাকি সমাজের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করব? তবু আমরা সর্বভারতীয় স্তরে আইনের খসড়ার উপর আলোচনা করেছি, ট্রান্সজেন্ডার সমাজের প্রতিনিধিদের কথা শুনেছি, তাঁদের কঠিন, জীবিকাহীন, দারিদ্র্যের বৃত্তান্ত জেনে বিমর্ষ, ব্যথিত হয়েছি। আইনের খসড়া নানা বিভাগ ঘুরে, শেষে সংসদের কমিটির হাতে সংশোধিত হয়ে যে আকার নিয়েছে, তা আমাদের আশা পূরণ করতে পারেনি। একইভাবে বয়স্কদের অধিকার রক্ষার জাতীয় নীতি, নিঃস্ব মানুষদের জন্য নীতি ও প্রকল্প তৈরির কাজ প্রাণপনে করে গেছি কিন্তু বহু বিলম্ব, আপত্তি ও বাজেট বরাদ্দের অভাবে স্রোতের বিপরীতে নৌকা বওয়ার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়াত।

আমার সঙ্গে যাঁরা কাজ করতেন তাঁরাও যথেষ্ট নিবেদিতপ্রাণ ও পরিশ্রমী ছিলেন। এঁদের মনোবল জাগ্রত রাখাও আমার কাজের মধ্যে ছিল। ছোট ছোট কারণে এত সময় নষ্ট হতো, ভাবলে এখনও মনঃপীড়া হয়। একটি সরকারি গবেষণা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় ড্রাগস্ সার্ভের কাজ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। জাতীয় প্রতিষ্ঠান, তারা এই কাজ আগে ছোট মাপে করেছে। ভারতবর্ষের ড্রাগ ব্যবহারকারীদের সর্বশেষ সার্ভে হয়েছিল চোদ্দ বছর আগে। আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও আমরা একদশকের বেশি পুরনো পরিসংখ্যান ব্যবহার করে থাকি। অথচ কাজটি দেওয়ার পথে মন্ত্রকের শীর্ষ ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন সব বাধা আসতে লাগল যা বিরক্তিকর। তাঁদের মনের মধ্যে ভয়, এই সার্ভের পরিসংখ্যান পঞ্জাবে ড্রাগের কুপ্রভাব তুলে ধরবে। এবং পঞ্জাবে বর্তমান শাসক দলের বন্ধু সরকার। তাঁদের এক পরমাত্মীয় নেশার এক বড় জোগানদার– জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে। সকলেই জানেন, অথচ পঞ্জাব প্রসঙ্গ উঠলে অপরিণতমনস্ক কিশোরের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সেই একই ঔদাসীন্যে মাসের পর মাস অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে রইল একটি জাতীয় নীতির খসড়া– যা আইন নয়, নীতি মাত্র। তবু ইচ্ছুক রাজ্য সরকারের হাতে পড়ে তার উপযুক্ত ব্যবহার হতে পারবে। ড্রাগস–এর প্রভাবে শরীরে যেসব বিরূপ ও কষ্টদায়ক প্রতিক্রিয়া হয়, তার জন্য ডাক্তারি সহায়তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। পঞ্জাবে গিয়ে দেখেছি তরুণী বধুরা স্বামীর জন্য নেশার টাকা জোগান দিতে দেহ ব্যবসায়ে নেমেছেন। ইঞ্জেকশনে ড্রাগস নেওয়া তরুণদের সর্ব অঙ্গে ঘা, হেপাটাইটিস সি, এইডস–এর মতন অসুখ– অথচ চিকিৎসা পরিষেবার টাকায় মরচে ধরছে, পঞ্জাব সরকার চোখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছে। টাকা খরচ করতে অপারগ।

রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে বিপর্যস্ত হয়ে আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম– দেশের পক্ষ থেকে তার পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে। আমার বারবার মনে হচ্ছিল ভারতের সামাজিক ন্যায় সচিব হিসেবে রোহিতের জীবন রক্ষা করতে আমি ব্যর্থ হলাম। আমার বাংলায় লেখা প্রবন্ধ সরকারে কেউ পড়েছিলেন কিনা আমি জানি না। কিন্তু রোহিতের মৃত্যু পরবর্তী দিনগুলিতে যে কাদা ছেটানো, একটি দলিত পরিবারের অতীত নিয়ে কাটাছেঁড়া করার যে দীর্ঘ ও নির্মম প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছিলাম তা ক্ষমার অযোগ্য। মন্ত্রী মহোদয়কে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম, দয়া করে আপনি আত্মপক্ষ সমর্থনের যুদ্ধে যোগ দেবেন না। আপনি তো মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী নন, আপনি সামাজিক ন্যায় মন্ত্রী।

নিজের সঙ্গে, নিজের মন্ত্রকের সঙ্গে, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে অবিরাম বিবেকের লড়াই ও অশান্তি পর্বের পর একদিন বিদায়ের সময় এসে গেল। দীপাবলীর একদিন আগে অবসর নিলাম। অবসরের অপরাহ্নে আমার সহকর্মীদের বলেছিলাম– একটাই সান্ত্বনা, যে মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও স্বপ্ন নিয়ে ভারতীয় প্রশাসনিক সেবায় ৩৬ বছর আগে যোগ দিয়েছিলাম, সেইসব অক্ষত অবস্থায় নিজের মধ্যে নিয়েই আমি অবসর নিলাম। বাহ্যিক আঘাত অনেক এসেছে, আমার কাজ শ্লথ হয়েছে, নষ্ট হয়েছে, খর্বও কিন্তু মানুষ হিসেবে এবং জনস্বার্থে কাজ করা একজন কর্মী হিসেবে আমার চিন্তা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটাতে রাষ্ট্র ও তার শুভচিন্তকরা ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষতবিক্ষত বহিরঙ্গ নিয়ে আমি শেষ পর্যন্ত জয়ী হলাম, যদিও এই জয়ের তাৎপর্য এখনই স্পষ্ট নয়।

অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

(ক্রমশ)

অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত।  

Comments are closed.