শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

“সরি বোলা না?”

অনিতা অগ্নিহোত্রী

প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল। 

পূর্বপ্রকাশিত পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

চলনবিল

আন্ধেরির স্পেশাল ইকনমিক জোনের ভিতর শ’তিনেক কোম্পানি ছিল । এই জোনের সোনা ও হিরে জহরতের কোম্পানিগুলি আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করত। এদের নামডাকও ছিল যথেষ্ট। এছাড়া ছিল ইলেট্রনিক্স হার্ডওয়ার ও কম্পিউটার সফ্টওয়্যারের রফতানি কারকরা। ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোশিয়েশন ছিল বেশ কয়েকটি। দিল্লির বাণিজ্যমন্ত্রকের কর্তাদের সঙ্গে ট্রেড পলিসি নিয়ে মিটিঙের আগে এবং বছরের অন্যান্য সময়েও এঁরা নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে আসতেন। কলকাতার চেয়ে মুম্বাইয়ের অর্থ অনেক বেশি, কিন্তু কলকাতায় কাজ করতে গিয়ে যে পরিবেশের সঙ্কীর্ণতা ও ষড়যন্ত্রের ছায়া সর্বদা অনুভব করতাম, এখানে তা ছিল না। কলকাতার মতো এখানে ইউনিয়নের বাধা ছিল না। কাজেই কাজের গতি অনেকটা বাড়িয়ে ছিলাম একটি আধুনিক ফাইল মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করে। এতে আমি দেখতে পেতাম কোন ফাইল কার টেবিলে আটকে আছে। এছাড়া কাস্টমস–এর কাজের মানদণ্ড বেঁধে দেওয়ার ফলে ব্যক্তিগত মর্জি ব্যবহার কমানো গিয়েছিল। এক্সপোর্টের ব্যবসায় সময় অতি মূল্যবান জিনিস। কয়কঘণ্টার দেরিতে পণ্যবাহী প্লেন বা জাহাজ ছেড়ে যেতে পারে। কাজেই অফিসের তৎপরতা বৃদ্ধিতে শিল্প বাণিজ্য মহল খুব খুশি । বাণিজ্য বিভাগের কাছে যথেষ্ট টাকা । তিন বছরে জোন এর পরিকাঠামোয় অনেক পরিবর্তন ও বিস্তার আনতে পেরেছিলাম। অর্থনীতির পূর্ব অধ্যাপক বিদগ্ধ ডক্টর রাহুল খুল্লার তখন বাণিজ্য সচিব। তাঁর স্নেহ যেমন পেয়েছিলাম, কাজও শিখেছিলাম প্রাণ ভরে।

সরকারের দেওয়া সীমিত মাইনের বাইরে লক্ষ্মীর প্রসাদ লাভে যাঁরা আগ্রহী, তাঁদের জন্য মুম্বাই অতি উত্তম জায়গা। রাজস্ব বিভাগের আধিকারিকদের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি। জোনের ভিতরে এবং বাইরের এসইজেড গুলিতে বাণিজ্যমন্ত্রকের অফিসারদেরও রমরমা। বেআইনি রোজগারের দু’রকম হয়— প্রথমটা হল, স্পিড মানি বা কাজ দ্রুত করিয়ে দেওয়ার জন্য ফিজ। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের বাজারে সবচেয়ে বড় রোজগারের উৎস হচ্ছে চাপ দিয়ে আদায়। এটাই সরকারি যন্ত্রের নঙর্থক মহিমা বা ন্যুইস্যান্স ভ্যালু। পুলিশ, রাজস্ব, লাইসেন্স দাতা, শুল্ক বিভাগ এদের মতন রেগুলেটরদের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মীরা এই ভাবেই সাধারণত উপার্জন করে। সুবিধেমত একটা পোস্টিং পেয়ে গেলে মাসে দু’তিন কোটি রোজগার এখানে কোনও ব্যাপার নয়। মুম্বাইয়ের বাতাসে টাকা ওড়ে। কিছু সিনিয়র অফিসারের কথা শুনতাম, যাঁদের আঙুলও তুলতে হয়না, কেবল বিশেষ বিশেষ দিকে না তাকানোর জন্য তাদের বাড়িতে মোটা টাকার মাসোহারা পৌঁছে দেওয়া হয়।
এতদসত্ত্বেও, মানতেই হবে, মুম্বাইয়ের বণিককুল যথেষ্ট সুভদ্র এবং কলকাতার মতো আমার পিছনে দালাল গোষ্ঠীকে লাগিয়ে উত্যক্ত করার কোনও চেষ্টাই এঁরা করেননি।

দীপাবলি এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব। কলকাতায় যেমন দুর্গাপুজো। দীপাবলির সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই উপঢৌকন পৌঁছনোর তোড়জোড় পড়ে যেত। দুপদাপ্ সিঁড়ি ভেঙে বাক্স প্যাকেট নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা এ ঘরে ও ঘরে ঢুকে পড়ছেন, এ দৃশ্য আমার চোখে অশ্লীল মনে হল। অ্যাসোসিয়েশনগুলিকে ডেকে বললাম, আমার অফিসের জন্য কোনও কোম্পানি আলাদা করে উপহার পাঠাবে না। সবার তরফ থেকে এক বাক্স মিষ্টি বা ফল। আর কিছু নয়। তাঁরা ঈষৎ মর্মাহত। বললেন, কিন্তু আমরা তো মন থেকেই দিই! বোঝাতে হল, যে সরকারি অফিসে এভাবে উপহার বিতরণ করাটা কেবল

অশোভন নয়, বেআইনিও বটে। আমরা সকলে সারভিস কনডাক্ট রুলের অধীন। বুঝলেন, মনঃক্ষুণ্ণ হলেও কথা রাখলেন। আমি নিজে সীমা বেঁধে দেওয়ায় অন্য অফিসারদেরও মেনে নিতে হল। সাময়িক স্বস্তি। তবে মাঝে মধ্যে হাস্যকর পরিস্থিতি হত। একদিন এক জহরত শিল্পের মালিক দেখা করতে এলেন। অনেকটা সময় বিদেশে কাটান , ফলে আমাকে চেনার সুযোগ আগে হয়নি। প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পরে বললেন, শুনেছি আপনি একজন লেখক। আপনার জন্য একটি কলম এনেছি। বলে সুদৃশ্য বাক্সে শয়ান যে কলমটি দেখালেন, তা ২৪ ক্যারাট সোনায় তৈরি, ক্যাপের মাথায় বসানো একটি হিরে। ড্রয়ার থেকে বার করে আমার পঞ্চাশ টাকা দামের দুটি কলম তাঁকে দেখালাম। বললাম, কিছু মনে করবেন না। আমার নিজের কলমে যাঁদের  কথা লিখি , আপনার দেওয়া কলমে তাঁদের  কথা লিখতে পারব না। তাছাড়া সারভিস রুল অনুযায়ী এটি সরকারি তোষাখানায় জমা পড়ে যাবে, কেউই ব্যবহার করতে পারবে না। বরং নিজের কাছেই রাখুন। ভদ্রলোক যারপরনাই বিমর্ষ হলেন। এমন কোনও সরকারি নিয়ম আছে, কেউ তাঁকে বলেনি।

একদিন এলেন একগুঁয়ে এক বৃদ্ধ। তাঁর বহু পুরনো এক সমস্যার সমাধান হয়েছে, তিনি খুব খুশি। ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে যাবার কালে বললেন, আজ আমি আপনাকে যা দিতে এসেছি, তা আপনার ফেরানোর সাধ্য নেই। তাই নাকি? কেন? টেবিলে রাখলেন সোনার তৈরি এক লক্ষ্মী ঠাকুরুন। গর্বভরে বললেন, এটি ফেরালে আপনার ধনবৃদ্ধি হবে না। কাজেই এঁকে ফেরাতে পারবেন না আপনি। আমি বললাম, আমার ধন না বাড়ে, না কমে। কারণ সরকারের দেওয়া ধন তো আমার বাঁধা । বরং আপনি দু’বেলা জাঁকজমক করে দেবীকে খুশি করুন। আপনার সমৃদ্ধি বাড়বে। হাতে আসা লক্ষ্মী কেউ ফেরায়! বিরক্ত হয়ে বলতে বলতে ফিরলেন প্রবীণ শিল্পপতি।

এই হল মুম্বাই। টাকা চেনে, আবার কাজের মর্ম বোঝে। পিছনে তাকিয়ে অশ্রুপাত করে না, কেবলই সামনে এগিয়ে চলে। তিন বছর মুম্বাইয়ে কাজ করেছি, মনে পড়ে না কাজ ফেলে রাখার জন্য কখনও কারও উপর রাগ করতে হয়েছে। জুনিয়র কর্মীদের কোনও কাজ অবেলায় দিলে তারা তা শেষ না করে বাড়ি যাবে না। একবার সন্ধেবেলা দিল্লি গিয়ে শুনি পরের দিন সকাল আটটায় মিটিং নেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অথচ যে তথ্য দরকার তা আমার কাছে নেই। ফোন করলাম করণিকের বাড়িতে। তিনি বললেন, চিন্তা করবেন না। সকাল ছটায় অফিসে গিয়ে সব রেডি করে আপনাকে ফ্যাক্স করে দেব। আপনি ফিরে অনুমোদন নিলেই হবে। সকাল সাড়ে সাতটায় দিল্লির শীতল সকালে নির্দিষ্ট ফ্যাক্স মেশিনটির কাছে গিয়ে দেখি, আউট ট্রের উপর শুয়ে আমার দরকারি কাগজগুলি।

এখানে সকলেই নিজের কাজের বাইরে কিছু না কিছু করে, তবে মূল জীবিকায় আঁচ লাগতে দেয় না। মহার্ঘ শহর । এখানে জীবন যাপনের খরচ অনেক বেশি। দেশাই বলে এক মহাপ্রাজ্ঞ মারাঠি আমার সরকারি গাড়ি চালাত। লতায় পাতায় কোথায় যে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছে তার ঠিকানা নেই। কাজে ঢিল দিলে বকতাম। মাথা নীচু করে বলত, সরি। তারপর আরও কিছু বললে, প্রত্যুত্তর— একবার সরি বোলা না? দেখো আগে নহীঁ হোগা। এরপর আর কিছু বলা যায় না। গাড়ি চালানো বাদ দিয়েও অন্য জরুরি দরকারে দেশাই হামেশা হাজির। পুরো মুম্বাই তার  চেনা।

মুম্বাইয়ের মানুষ অসম্ভব বাস্তববাদী এবং স্বয়ংনির্ভর। আবার দিল্লির এলিট পাব্লিকের মতন মতলবি নয়। আমেরিকার কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে মুম্বাইয়ের বেশ মিল। ব্যক্তিগত কৌতূহল প্রকাশ, পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে উৎপাত — নৈব নৈব চ। এসবের মধ্যে অন্য ভাবে বাঁচতে চেষ্টা করত রবি। আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ডি.সি’র  কাছের মানুষ, তাই তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলত তা বুঝতে পারতাম। রবি প্রাণপণে জলের উপর মাথাটি তুলে সাঁতার কাটার চেষ্টা করত। রাঁচি শহরে তার বাবা মা ভাইবোনেরা, তাদের কাছে কবে ফিরে যাবে তাই ভাবত। এও জানত, যে মুম্বাই অনেকটা আমেরিকারই মতন। এখানে ঢোকা কঠিন, বেরোনো আরও কঠিন। মহারাষ্ট্রের নানা শহর ও শহরতলি থেকে এবং দেশের সব প্রান্ত থেকে মানুষ এসে উঠছে মুম্বাইয়ের ফুটপাথে, সেখান থেকে চলে যাচ্ছে ঝুপড়ি বা চাল–এ। পড়াশুনো, কাজকর্ম, বিনোদন সবকিছুর পসরা মেলে ধরে এ শহর বহিরাগতদের ডাকে। এখানকার দ্রুত, মুক্ত জীবন অন্য কোথাও পাওয়া অসম্ভব। এত উঁচু আর বড় সব বাড়ি ,অথচ সেখানে ঢোকা যাবে না, সব নাগালের বাইরে! এ শহর না দেবে মরতে, না দেবে বাঁচতে, রবি দার্শনিক ভাবে বলত।

আন্ধেরির বাড়িতে দু’বছরের মতন কাটিয়ে আমরা দক্ষিণ মুম্বাইয়ে সরকারি বাসা নিয়েছিলাম। সে ফ্ল্যাটটি ছ’তলায়, তার প্রতিটি জানলা থেকে সমুদ্র দেখা যায়। ছুটির দিনের কত দুপুর বিকেল সন্ধে যে আমি সমুদ্রের রঙের বদল দেখে কাটিয়েছি। আলোর খেলায়, বাতাসের দোলে সমুদ্র ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়। রবি আমাদের বাড়িতে এলে অনেকক্ষণ ধরে সাগর জলে আলোর খেলা দেখত। আমি মুম্বাই ছেড়ে যাবার বেলায় বলেছিল, আমাদের সংসর্গে যে কয়েকটি ঘন্টা ও কাটিয়েছে, সেটাই ওর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়। রবির অনুরোধে ওর সবচেয়ে ছোট কন্যাটির নাম আমি রেখেছিলাম। মুম্বাই অফিসের আর সবাই দূরে গেলেও রবি এখনও আমাদের কাছে আসে। চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে পুরনো দিনের গল্প করে।

অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

(ক্রমশ)

অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

Comments are closed.