আমাদের গ্রাম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অনিতা অগ্নিহোত্রী

    প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।

    এই নামে একটা গল্প লিখেছিলাম। যে স্থান–কাল নিয়ে লেখা তার থেকে অনেকটা দূরে সরে এসে। ২০১০–এ সম্ভবত, মুম্বাইয়ের অঘোর বর্ষণের মধ্যে। মৃত্তিকা, মাটি যাকে বলি সোজা কথায়, তাই নিয়ে শিল্প। মাটি তৈরি করে, ছাঁচে ফেলে, আগুনে ফেলে নানা শিল্পবস্তু নির্মাণ– ‘টেরাকোটা’ বলে একে। গল্পে ছিল এমন এক শিল্পীর কথা যাঁর জীর্ণ ঘরে জাতীয় পুরস্কারের মানপত্র অর্থহীন শোভা পায়। অভাব, চেনা মানুষের হারিয়ে যাওয়া, নিজেদের গ্রাম থেকে চলে আসা। তারপর একদিন একেবারে একা, পরিত্যক্ত অন্য কোনও আঙিনায় জ্যোৎস্নায় সে সাজিয়ে রাখে তাঁর ফেলে আসা গ্রাম। মৃত্তিকার অবয়ব, মানুষ, গাছ, বাড়ি–ঘর। অবিকল যেমনটি ছিল তাঁর গ্রামে।

    এমন অনেক শিল্পীকে আমি দেখেছি, তাঁদের ঘরবাড়ি, হাতের কাজ, তাঁদের জীবনব্যাপী দারিদ্র্য এবং শিল্পে নিবেদিত নিষ্পাপ চিত্ত। টেরাকোটার যে কোনও শিল্পবস্তুর দামই নগন্য। ধনী, মধ্যবিত্ত তাও দরাদরি করবেই। এবং, ‘এ আবার কী, মাটিই তো’ বলে জলের দরে কেনার চেষ্টা করবে মৃত্তিকাকে। টেরাকোটার শিল্পবস্তুর যে এত রকম আছে এবং শৈলীর নানা অঙ্গিক, বৈচিত্র্য সেসব ওড়িশার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ না করলে বুঝতে পারতাম না। শৈশবে কৈশোরে বাংলায় দেখেছি বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া। ঘরেও শোভা পায় আবার সিঁদুর–হলুদ মাখা রাঙা সুতোয় বাঁধা গাছের নীচেও মানসিক ইচ্ছা পূরণের আশায়।

    পড়ুন চলনবিল ১

    পড়ুন চলনবিল ২

    এখন বাংলার টেরাকোটাতেও নিশ্চয়ই অনেক বৈচিত্র্য এসেছে, যদিও গ্রামগঞ্জে ঘুরে আমার এখনও দেখা হয়নি তা। উত্তর ওড়িশার খরাগ্রস্থ বলাংগী–তে দেখেছি নানা লৌকিক দেবীমূর্তি, তুলসীমঞ্চ, মৃৎপাত্র এবং চালের খাপরার ওপর বসা বানরী মা ও তার শিশু। দেখে মায়া হয়। পোড়ামাটির খাপরা এখনও গ্রামে ব্যবহার হচ্ছে। ওই বানর মা–শিশু নাকি শুভ, চালের উপর রাখার রীতি আছে। দক্ষিণে উপকূল অঞ্চলে বিশেষত পুরনো ভুবনেশ্বরে খণ্ডগিরি অঞ্চলে টেরাকোটা শিল্পীদের আস্তানা। ছাত্র ও কারিগরদের দিয়ে তাঁরা তৈরি করেন নানা সামগ্রী –– চিত্রবিচিত্র রিলিফের কাজ করা বড় বড় মৃৎপাত্রগুলি তো অসাধারণ সুন্দর। হস্তশিল্প তালিম কেন্দ্রের দৌলতে নতুন ও আধুনিক নানা ডিজাইন এসে জুড়ে যাচ্ছে তাতে। এখানেও আছে মাটির তৈরি নানা আকারের দীপ, দীপস্তম্ভ, পাখি, অন্য পশু, বানর, বাঘ, সিংহ।

    আমাদের বাগানে অনেকদিন ছিল এক পুরুষ ও রমণী মূর্তি। রোদে জলে তাদের কোনও পরিবর্তন নেই। পোড়ামাটি যে! স্থানীয় কোনও মেলায় কিনেছিলাম। আমরা ভুবনেশ্বর ও অন্যান্য শহরে হস্তশিল্প মেলা করতাম। টেরাকোটার অপরিসীম বৈচিত্র্য দেখে একবার কেবল টেরাকোটা শিল্পের প্রদর্শনী হল। এক একটি মাটি ও খড় ছাওয়া কুটীরে এক এক জেলার শিল্প নিদর্শন। প্রাঙ্গণের ধারে জ্বলছে মাটির প্রদীপ, গাছের ডালে টেরাকোটা লণ্ঠন। শহরের আবেগ এমন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল সেই প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে যে, এক সপ্তাহের জায়গায় দু’দিনে সব বিক্রিবাটা শেষ! আমাদের কথা দিতে হয়েছিল প্রতি বছর এই প্রদর্শনী  ‘মৃত্তিকা’ অনুষ্ঠিত হবে ।

    পড়ুন চলনবিল ৩

    পড়ুন চলনবিল ৪

    শিল্পের আড়ালে মানুষজনকে খুঁজে বেড়ায় আমার চোখ। আমি দেখতাম নানা জেলার নিজস্ব ভাষা, খাবার, পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে শিল্পীর পরিবার কেমন রাজধানীতে এসে বসেছে শহরের মানুষের মাঝখানে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায় নেই, এঁদের মধ্যে কেউ হয়তো ভারতের রাজধানী দিল্লির মঞ্চে জাতীয় পুরস্কার নিতে উঠেছিলেন। এমনই কোনও শিল্পীর সন্তানকে নিয়ে লেখা ‘আমাদের গ্রাম’ গল্পটি। বলা বাহুল্য, ওপার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা বাবা–মা’র কন্যা আমার মনের মধ্যেও লুকিয়ে বসে থাকত এক অলীক ‘নিজের গ্রাম’–এ। সাহিত্যের যা স্বভাব, নিজের বা অন্য কারও সন্তানকে অনায়াসে মিলিয়ে নিতে পারে সন্তানের রূপান্তর ঘটিয়ে।

    ভুবনেশ্বর থেকে পুরী যাওয়ার পথে এবং পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পুরনো পাড়ায় দেখা পাওয়া যায় পাথর শিল্পীদের। যে রাঙা বেলে পাথর খোদাই করে এঁরা তৈরি করেন বৃহৎ থেকে অতি ক্ষুদ্র আকারের কারুকার্যমণ্ডিত মূর্তি, সে সব পাথর আশেপাশেই ছড়ানো। বাড়ির প্রাকার, মূল দেওয়ালও ওড়িশার গ্রামাঞ্চলে অনেক সময়েই রাঙা পাথর গেঁথে বানানো হয়। কোনারক মন্দিরের রথের চাকা, ঘোড়া, হাতি, দেওয়ালে খোদাই অপ্সরা মূর্তি এইসব বড় ভাস্কর্য ছাড়াও আজকাল গৃহপ্রাঙ্গণে, লন–এ, বাড়ির বাগানে পাথরের ভাস্কর্য রাখার চল হয়েছে। সেই একই কারণে টেরাকোটায় এসেছে অন্য রাজ্যের ডিজাইনের বান। টেরাকোটা পাথরের চেয়ে কম দামি অথচ দেখতে রহস্যময়, সুন্দর। মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে।

    লিখতে গিয়ে মনে পড়ল, মুম্বাই শহরের মধ্যে আন্ধেরি–তে যে বিশাল স্পেশাল ইকনমিক জোন বা এসইজেড আছে ভারত সরকারের তার দায়িত্বে আমি কিছুদিন ছিলাম। একশো একর জমি শহরের একধারে, সেখানে কয়েকশো বছরের পুরনো বাওবাব গাছ, এবং অসামান্য ফুল–পাতা, কীট–পতঙ্গ, পাখিদের সমাবেশ ছিল। একটি গ্রামীণ হ্রদ ডেভলপারদের ফেলা ইট–সিমেন্ট–বালি ফেলে প্রায় বুজিয়ে ফেলা হয়েছিল যা আমরা পুনরুদ্ধার করেছিলাম। ওই হ্রদের চারপাশে শিল্পপতিদের আগ্রহে গড়ে উঠেছিল এক বাগান ও পায়ে চলা পথ। একবার ‘টেরাকোটা ওয়ার্কশপ’ আয়োজন করে ভুবনেশ্বর থেকে মৃৎশিল্পীদের নিয়ে গিয়েছিলাম। তাঁরা ওখানেই মাটি তৈরি করে, ছাঁচ বানিয়ে, চুল্লিতে পুড়িয়ে তৈরি করেছিলেন অসম্ভব সুন্দর সব ভাস্কর্য। মুম্বাইয়ের হিরে–জহরৎ, সফটওয়্যার–হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীরা এমন জিনিস আগে দেখেননি। বড় শিল্প কাজগুলি বসল হ্রদের ধারে বাগানে, গাছতলায়, পথের পাশে। ছোট কাজগুলি সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিনে নিয়ে চলে গেলেন– হাউ চিপ, হাউ ওয়ান্ডারফুলি ইনএক্সপেন্সিভ বলতে বলতে।

    পড়ুন চলনবিল ৫

    পড়ুন চলনবিল ৬

    যাই হোক, এবার আবার পাথরের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পাথরের ছোট মূর্তিগুলি অধিকাংশই সাদাটে খড়ি পাথরের অথবা কালো মুগলি পাথরের। কেওনঝর অঞ্চলে একরকম নরম সবজেটে পাথর পাওয়া যায়, তার তৈরি মূর্তিও অতি সুন্দর।

    ওড়িশার বস্ত্রবয়নে এবং মূর্তি নির্মাণে দেখেছি সূক্ষ অলংকরণের প্রাধান্য। দিগন্তবিস্তৃত দীর্ঘ দীর্ঘ পর্বতশ্রেণী দেখলে মনে হয় না ওই পাথরেরই মূর্তির এমন রূপ। পাথরের সঙ্গে মন্দির নির্মাণশৈলী যে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এই অলংকরণ হয়তো তার বহিঃপ্রকাশ। চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত জগন্নাথ দেবের যে মন্দির পুরীর চিরন্তন আকর্ষণ, সেই মন্দিরের সংবৎসরের পূজাবিধি ও সামনের রাজপথে যাত্রীদের সমাগমের সঙ্গে বহু শিল্প ও শিল্পীর জীবন জড়িয়ে আছে– সময়ের সঙ্গে তার রূপ ও বৈচিত্র্য বদলেছে। আষাঢ়ের স্নানযাত্রা ছাড়াও সারা বছর নানাবিধ যাত্রা চলে জগন্নাথ দেবের। রথের শিল্পীরা হলেন মহারাণা। দারুব্রহ্মকে যাঁরা স্বপ্নে পান ও রথের রূপ দেন। দারুশিল্পীরা এসেছিলেন উত্তর ও মধ্য ওড়িশা থেকে। জগন্নাথের মূর্তি, রথ ছাড়াও নানা কাঠের শিল্পকাজ করে এখন তাঁদের বংশধররা লিপ্ত আছেন পটচিত্র ও দশাবতার তাসের নির্মাণেও।

    পুরীর কাছে ভার্গবী নদীর তীরে রঘুরাজপুর গ্রাম বহুশতক ধরে গুরুকূল প্রথায় ও সম্প্রতি শিল্পী সমবায় গড়ে পটচিত্রের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজকের পটের সঙ্গে সাবেক কালে মন্দিরের কাছে বিক্রি হওয়া পটচিত্রের মিল নেই। তসর বা কাগজের ওপর নানা পুরাণ ও রামায়ণ মহাভারতের কাহিনীর খণ্ডচিত্র নিয়ে আঁকা পটগুলি শিল্পী প্রতিভার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। পট আঁকতে যেমন প্রয়োজন সূক্ষ অঙ্কনের প্রতিভা, তেমন ধৈর্য আর অধ্যাবসায়।

    রঘুরাজপুর গ্রামটি শিল্প গ্রাম ঘোষিত হয়েছে বেশ কয়েক বছর হল। এই গ্রামের চলার পথের দুধারের বাড়িগুলির দেওয়াল রঙিন ছবিতে চিত্রিত। ভিতরে কাজ করেন শিল্পী তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। প্রায় প্রতি ঘরেই ওড়িশি গীতিবাদ্য এবং নাচের (যাতে কিশোর বালকের দল দলনৃত্য প্রদর্শন করে) ঝংকার শোনা যায় পথে যেতে। এই রঘুরাজপুর নিয়েই বহুবছর আগে লিখেছিলাম ‘সুন্দর পটুয়া’ গল্পটি। সংসার প্রত্যাখ্যাত এক শিল্পীর জীবন, এক বিদেশিনীর সঙ্গে তাঁর প্রেম। যাঁকে নিয়ে গল্পটি ভেবেছিলাম, তাঁর দাওয়াতে বসেই দেখতাম কত যত্নে পটের কাগজ বা কাপড়টি তৈরি হয়।

    পড়ুন চলনবিল ৭

    পড়ুন চলনবিল ৮

    তেঁতুল বিচির মধ্যের নির্যাস দিয়ে ভিজিয়ে তাকে কিছুটা পুরু ও দানাদার করে তোলা। পেন্সিলে ছবি এঁকে নেওয়া অন্য কাগজে। তারপর সূক্ষ তুলির টানে পটের কাগজে ছবি আঁকা। ছবির রঙ দু’দশক আগেও দেখেছি ভেষজ রঙ হত। দীপের কালি দিয়ে কালো, আমপল্লবের সবুজ, পলাশের লাল, চকখড়ির সাদা, তুঁত দিয়ে নীল বা বেগুনি– তারপর দুই রঙের মিশ্রণে তৈরি হত আরও নানা রঙ। এখন হয়তো সর্বত্র আর ভেষজ রঙ ব্যবহার হয় না। এর প্রয়োগ, প্রস্তুতি যেমন পরিশ্রমসাধ্য, তেমনই দুর্লভ হয়ে উঠেছে ভেষজ রঙের মূল উৎসগুলি।

    তালপাতার উপর সূক্ষ কলমের আঁচড়ে ছবি ফুটিয়ে তোলাও এক ধরনের শিল্প। তারও চাহিদা আছে বাজারে, হয়তো তুলনামূলক ভাবে সাধ্যের ভিতর সেইজন্য। এ লেখা যখন লিখছি, তার একমাস আগে তীব্র গতিমান ঘূর্ণিঝড় ফণী বয়ে গেছে উপকূল সন্নিহিত কটক, ভুবনেশ্বর ও পুরী শহরের উপর দিয়ে। শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ নষ্ট হয়ে থাকার ফলে ছেদ পড়েছে জলের সরবরাহ, খাদ্যের যোগান এবং অন্য নানা পরিষেবায়। গত দু’দশকে যেসব গাছ লাগানো হয়েছিল ২০১৯–এর ‘মহাবাত্যা’র পর সেগুলি ভূপতিত। রঘুরাজপুরের শিল্পীরা বিপন্ন। কেবল বিক্রির বাজার নয়, ঘরে রাখা তাঁদের কাঁচামাল, রঙ, কাগজ ও তৈরি অসংখ্য ছবি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। আর্থিক সাহায্য অপ্রতুল কিন্তু ঐতিহ্যের এই প্রাকৃতিক বিনাশের ক্ষতিপূরণ কোনওভাবেই সম্ভব নয়। ভাবলেই বিষণ্ণ হয়ে ওঠে মন।

    অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

    (ক্রমশ)

    অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

    চলনবিল ৯

    মহানদীর কূল ধরে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More