সোমবার, আগস্ট ২৬

বিজনের কলকাতা

একরাম আলি

কথিত আছে— নবির অন্তিমশয্যায় শিষ্যরা সব জড়ো হয়েছেন। শেষ বাণী শোনার জন্যে সবার কান খাড়া। ধীরে উচ্চারিত হল— পরনের এই শেষ খেরকাটি পাবেন ওয়াইস আল-কারনি। সবাই চুপ। চোখে প্রশ্ন— কে তিনি! ফের উচ্চারিত হল– ইয়েমেনি। মা অন্ধ। উট চরানো তার জীবিকা। দূর দেশ থেকে মদিনায় আসতে হলে তার বহু দিনের ইবাদত নষ্ট হত। তাই আমরা কেউ কাউকে কোনওদিন দেখিনি। তাকে চিনবে হাতের কব্জিতে শ্বেতির দাগ দেখে। ওমরকে বললেন, ওই সাধককে যেন পোশাকটি পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি পরার যোগ্য একমাত্র তিনিই। তারপরও বিস্ময়। এবং প্রশ্ন। মদিনায় এত বিখ্যাত সব সাধক থাকতে অচেনা ইয়েমেনবাসী পাবে হজরতের পোশাক! কেন?

অন্তত শ-তিনেক বছর হল কত-কত ভাগ্যসন্ধানী ঢুকেছে এই শহরে। চোর, খুনি, ফেরেব্বাজ, কবি, ছাত্র, দালাল, ব্যবসাদার, সাধু, হাওলাদার, বেশ্যা, ধুরন্ধর ক্ষমতালোভী। কত মেধাবী আর প্রতিভাবানের জমায়েত। কত-না ঘরহারাদের আশ্রয় এই শহর। তবু সর্বস্ব ছেড়ে আসতে পারে যে, যার সমর্পণ নির্লোভ, কলকাতা তাকেই দরজা ঈষৎ ফাঁক করে দেখায় নিজের নিভৃত কক্ষ। যেখানে অন্ধকারে অস্থির শয্যা ডাকে— আয়, আয়! বিজনকে সম্ভবত ডেকেছিল। বিজন রায়।

জলপাইগুড়ি থেকে এসে ঢুকেছিল মেডিকেল কলেজে। হায়ার সেকেন্ডারিতে র‍্যাঙ্ক ছিল বিজনের। তখন সে থার্ড ইয়ার। থাকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে, মহেন্দ্র ম্যানসন নামের কলেজ হোস্টেলে। কিন্তু থাকে কি?

কলেজ যাওয়া সে ছেড়ে দিয়েছিল। ঘুরত পথে পথে। অন্য কোথাও বসত কিনা জানি না, কফি হাউসে তাকে দেখা যেতই। বিনয়ী। আত্মসম্মানজ্ঞান মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত। এমন একাধিক দিন হয়েছে, শেষ বিকেলে গিয়ে দেখি— একা বিজন। দেখা মাত্র তার অপরূপ জলপাই-হাসি।

— কিছু খাবেন?

— না। না। এই তো খেলাম।

— একটা টোস্ট?

গলা থেকে পেট অবধি হাত বুলিয়ে– ‘পারব না, একরাম। ভর্তি।’

— অনেকটা খেয়েছেন? কখন?

— এই তো দুপুরে। টোস্ট।

— তাহলে ইনফিউশন বলি একটা?

— একটাই বলুন। আমি হাফ।

সে হয়তো-বা ছিল কলকাতার সাধক। সাধকদের কি জাগতিক স্নানের দরকার হয়? বিজনের হত না। গায়ে পুরু ময়লা। সেই ময়লার উপর ততোধিক ময়লা শার্ট। তেলচিটে প্যান্ট। পায়ে নোংরা হাওয়াই। ক্রমে ছেঁড়া স্ট্র্যাপে সেফটিপিন। তারপর? তারপর আর কী! একদিন নাঙ্গা পা! কেউ চটি কিনে দিলে কিছুদিন পরই তার পা কীভাবে যেন ফের রাস্তার অ্যাসফল্টে ফিরে যেতে শুরু করল।

কার যেন প্রেমিকা ছিল না? মনীষা নাম। কফি হাউসে বিজনকে দেখে দাঁত কড়মড়িয়ে বলেছিল— ইচ্ছে হয়, বাথরুমে পেড়ে ফেলে কষে স্নান করাই! তার সে-মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়নি। বিজন ছিল পাঁকাল। পিছলে বেরিয়ে যেতে জানত।

দু-এক রাত ঘুরেছি তার সাধনক্ষেত্রের পথে পথে। মধ্যরাতে রাস্তা তখন ফাঁকা। শুয়ে-থাকা ফুটপাথবাসীদের বিরক্ত না-করেই হাঁটা যেত। দু-পাশে সারবন্দি ঘুমোচ্ছে দোতলা তিনতলা চারতলা ইমারত। ঔপনিবেশিক বনিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে। নীচের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ঊর্ধ্বমুখে সিগারেটের (কোত্থেকে যে জুটত!) ধোঁয়া ছেড়ে তার সবিস্ময় উক্তি ছিল— পেল্লায় বাড়িগুলো দেখেছেন! এত টাকা এক জায়গায় জড়ো হল কোত্থেকে?

বিধাতা নামের একটা সিনেমা এসেছিল তখন। বহুদিন পর দুই বাল্যবন্ধুর দেখা। তখনও ড্রাইভার-থেকে-যাওয়া শাম্মি কাপুর ধনী দিলীপকুমারের আলিশান বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে, তারিফ করছে, আর মাঝে মাঝেই বলছে— লেকিন তু আমির ক্যায়সে বনা?

এতটা জানত না বিজন। বা, হয়তো জানত। মেডিকেল কলেজের যাবতীয় জটিলতা ছিঁড়ে মন চলে গিয়েছিল ওই ফুটপাথবাসীদের বিছানা-নামের ভূতলে। কেন সে এমন হল? জিজ্ঞেস করা হয়নি কোনওদিন। বলা ভালো, সাহস হয়নি। নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম কি? হয়তো। অথচ, সে দস্তয়েভস্কির কোনো চরিত্র ছিল না। কাফকার তো নয়ই। কুন্দেরার? তা-ও নয়। বলা ভালো, কোনও নতুন লেখকের অপেক্ষায় সে রাতের পর রাত ঘুরেছে, যে নাকি কলকাতার। বাঙালি কেউ। লোয়ার অ্যাবডোমেনে যার ঘোরাফেরা।

সে কি কবিতা লিখত? সমস্ত সুফি সাধকই কিছু অন্তত লিখে বা বলে গেছেন, যা কবিতা। এমনকী রাবিয়া আল-বসরিও। বিজনও হয়তো লিখত কিছু। কিন্তু কবি হওয়ার বাসনা তার ছিল না। যেমন আমরা সবাই কখনও-না-কখনও কিছু তো চুরি করেইছি—বাবার, মায়ের, ভাইবোনের, বন্ধুর বা অন্য কারওর। নিতান্ত অন্যের বাগানের ফুল বা খুচরো ফল। চোর হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে তো নয়! তেমনই ছিল বিজনের লেখাপত্র।

এক রাতে– বেশ রাত, বাস-ট্রাম বন্ধ হয়ে গেছে– এসপ্লানেড থেকে ফিরছি। পথে, আরে, মহেন্দ্র ম্যানসন না? বিজনের হোস্টেল যে! ঢুকবি? চল। যে-রাস্তা দিয়ে টি-বোর্ড থেকে বাসগুলো এসে আজকাল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ছোঁয়, তার পাশের গলিতে ঢোকার দরজা। এবং খোলা। এত রাতেও! ঢুকে বাঁহাতি ডাইনিং রুম। বিশাল খাঁ-খাঁ টেবিলে একটা মাত্র খাবার। ঢাকা দেওয়া। ঢাকনা খুলতেই রুটি, তরকারির পাশে বাটিতে একখণ্ড মাছ। ছ্যা-ছ্যা, মেডিকেল স্টুডেন্টদের এই খাবার? সাধে কি আর বিজন ক্লাসে যায় না! খাবি? ঘঞ্চুর প্রস্তাব। এবং আশ্বস্ত করার চেষ্টা—খা না, এটা নির্ঘাত বিজনের।

একটা করে রুটি আর তরকারি খেয়ে দোতলায়। বারান্দায় সিগারেট টানছে একজন। বিজনের ঘরটা কোনদিকে? ঘুরে তাকায়। আপাদমস্তক দেখার পর তার আঙুল ওঠে সিলিঙের দিকে এবং আঙুলকে অনুসরণ করে আমাদের চোখও। তিনতলায় উঠে দেখি, ঘর খোলা। বিজন নেই। বিছানা বলতে খাটে মাদুর। প্যান্টের মতো কিছু-একটা ভাঁজ করে বালিশ। আমরা মেঝেয় শুয়ে পড়ি। কখন যেন দরজায় মূর্তিমান বিজন। একমুখ হাসি— আরে, আপনারা! এ কী, মেঝেয় শুয়ে? উঠুন, উঠুন। কোনও আপত্তিই টিকল না। মাদুর পাতা হল মেঝেয়। আমাদের সে-রাতের রাজশয্যা। এ-কথা, সে-কথা। আচ্ছা, আপনার খাওয়া হয়েছে? কম পড়েছে নিশ্চয়। না, না। অনেকটাই তো ছিল।

ঘঞ্চু ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা সরু বারান্দায়। হাতে সিগারেট। সামনে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ। ফাঁকা। নীচে, ডানদিকের ফুটে হাইড্র্যান্টের আশপাশে একটুখানি জমা জল। একটা কুকুর কোত্থেকে এসে খাচ্ছে। মাথা নীচু। বিজন আঙুল বাড়িয়ে দেখায়— দেখেছেন? খাওয়ার সময় সব প্রাণীকেই কেমন মাথা নীচু করতে হয়? যৌথ হাসি। নিঃশব্দ।

উঠে পড়ি। তৃতীয় প্রহর গড়িয়ে রাত ঢলে পড়েছে শেষ পর্বে। একটা পেন হবে? অবশ্যই— বিজন এগিয়ে যায় ঘরের ঈশান কোণে। এতক্ষণ চোখে পড়েনি। সেখানে আবর্জনার ছোটোখাটো একটা স্তূপ। ঝাঁটার কাঠি, ছেঁড়া কাগজ, ন্যাকড়া, ধুলো, শূন্যগর্ভ টুথপেস্টের তোবড়ানো টিউব, প্ল্যাস্টিকের টুকরো। বিজন হাতড়াচ্ছে। একসময় আবিষ্কারের আনন্দ তার ডানহাতের দু-আঙুলে—এই যে! নিন। প্যান্টে ঘষে সে বাড়িয়ে দেয় পরিষ্কৃত একটা রিফিল! সত্যিই তো, লেখার জন্যে আর যা-কিছু, সবই যে বাহুল্য! তবে রিফিলটা সে-রাতে কাজে লাগেনি। সাহস হয়নি। নিঃস্বতার প্রান্তসীমায় পৌঁছনোর সাহস।

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লাভপুর ছাড়তে পরামর্শ দিয়েছিলেন যামিনী রায়— কলকাতায় আসুন। শশ্মানে না-এলে শবসাধনা হয় না।

কিন্তু বিজন? কোথায় সে? জানি না। বিজনই জানতে দেয়নি সম্ভবত। নিঃশব্দে, অতি গোপনে সে হয়তো-বা সেঁধিয়ে গেছিল এই শহরের নিশিগহ্বরে।

১১ মার্চ। ২০১৩। একদল অস্ত্রধারী ঢুকে পড়ে সিরিয়ার রাক্কাহ শহরে। আইএস জঙ্গি। একটি প্রাচীন সমাধি তারা মাটিতে মিশিয়ে দেয়। সমাধিটি ছিল সেই সর্বত্যাগী সাধক ওয়াইস আল-কারনির। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি আইএস। ইরাকের মশুলে আরেকটি সমাধিও গুঁড়িয়ে দেয় তারা ২০১৪ সালে। কথিত ছিল, সেটিও নাকি ওয়াইসের সমাধি!

যত অন্ধকারেই থাকুক, অতিপরাক্রমশালী একটা ছিপ যেন-বা ঘাই মেরে বিজনকে সড়াৎ টেনে নিয়েছিল।

Comments are closed.