সোমবার, ডিসেম্বর ১৬
TheWall
TheWall

বকুলবাগান

একরাম আলি

জানালা সব খোলা। শীতকালের সিউড়ি। কিন্তু প্রতিটি জানালা দিয়ে একেকটা বড় সাইজের রোদ। তার সঙ্গে আশপাশের মাঠঘাট আর আকাশ ঢুকে পড়ছিল একেবারে ঘরের মধ্যে। উত্তরে যতদূর চোখ যায়– ন্যাড়া মাঠ, মাঝে মাঝে গমখেত, শাক-সবজি, ফের ন্যাড়া মাঠ তিলপাড়া ছাড়িয়ে দূরের আকাশ ছুঁয়েছে।

উনিশশো তিয়াত্তর। ঘরে ভারভারিক্কি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত। আর গৃহকর্তা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রণবেন্দুদার সঙ্গে সেবার ছিল সে। আমারই বয়সী ছিপছিপে এক তরুণ। সমরেন্দ্র দাস। তখনই বেশ ডাকাবুকো। কবিতা লেখে। ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে কবিতা-পত্রিকা সম্পাদনা করে। সিগারেট টানে সর্বস্ব দিয়ে। অন্তর থেকে।

এ-হেন সমরেন্দ্রর সঙ্গে কলকাতায় এসে ফের দেখা। ভিড়ে-ভর্তি কফি হাউসে। মেসে। তারপর এক রবিবার সকালে তাদের বাড়ি। অচেনা পাড়ায়, লালবর্ণ ল্যান্সডাউন মার্কেটের পিছনে। ১২৮এ বকুলবাগান রোড। কত যে রবিবার ছিল তখন!

একটা ঘর। বড়ো একটা খাট। তার বাবার কথা মনে পড়লে আজও দেখতে পাই– পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি অথবা ফতুয়া। বসে আছেন ঝুঁকে, কোনো একটা আসনে। সামনে অ্যাশট্রে, হাতে বিড়ি। এইটুকুই। কিন্তু এইটুকুর মধ্যেও ভঙ্গিটি ছিল গোছানো। ছিলেন কাছেই ইন্দিরা সিনেমার চিফ অপারেটর। তাঁর অখণ্ড অবসরের চারপাশে সমরেন্দ্রর মা কিন্তু সদাব্যস্ত। ছ-ভাই। তাদের একটাই পারুল বোন— ইতি। সমরেন্দ্র মেজ। ভেবে পাচ্ছিলাম না, একটা ঘরে এত হইচইয়ের মধ্যে সমরেন্দ্র লেখে কোথায়, বা, বাকি ভাইয়েরা তাদের কাজকর্ম সামলায় কী করে! তখনই পাওয়া গেল পিছনদিকে আরেকটা ঘরের অস্তিত্ব।

তবু বলতেই হবে, কলকাতায় সেই আমার প্রথম দেখা বাড়ি, যেখানে জায়গা বেশ সংকীর্ণ অথচ প্রাণের উচ্ছলতা উপচে পড়ছে। কেউ কবিতা লিখছে, সঙ্গে আত্মপ্রকাশের মতো পত্রিকা সম্পাদনা করছে। কেউ গান শিখছে। কেউ ক্রিকেট খেলছে। কেউ আবার কোনো বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পড়ে আছে তো আছেই। জন্ম মৃত্যু প্রেম বিবাহ বিচ্ছেদ বন্ধুত্ব মনখারাপ আর তুচ্ছ কোনো উপলক্ষ্যে হইহই উচ্ছ্বাস— একটা ঘরের চার দেওয়ালে এত কিছু আঁটিয়ে নিতে এবং ঘর ফাটিয়ে মুক্ত হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে পারা যে সম্ভব, ধারণার বাইরে ছিল। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা হেরে এখানে ভূত। নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার অদম্য এক উৎসাহ। আমাদের বাড়ির ছাদে ছোট্ট হলেও বিপদজনক অশ্বত্থ গাছটার মতো। বারবার কেটে ফেলা হত, বারবার চারা গাছটায় নতুন পাতা গজাত। কী যে প্রাণশক্তি!

একদিন বকুলবাগান থেকে বেরিয়ে হাঁটছি। সন্ধ্যে হবো-হবো। কোথায় যাচ্ছি, জানি না। আশুতোষ মুখার্জি রোডের কাছাকাছি বাঁহাতি গ্যারেজের মতো একটা ঘরে তেলেভাজার দোকান। ভিড়ই বলে দিচ্ছে এর খ্যাতির কথা। ফলে, একে-তাকে টপকে মাটন কাটলেট নামক অমৃতসেবন হল। পাশের দোকান থেকে চা। সিগারেট মুখে রাস্তা পেরিয়ে ফের গলি। গলির শেষে, আরে, হরিশ মুখার্জি রোড! এ তো বিভূতিভূষণের লীলার বাড়ির রাস্তা! পুরোনো বাড়িঘর। কোথাও গাড়িবারান্দা। কোথাও কম্পাউন্ডের ওপাশে গাছপালার আড়ালে বাড়ির আভাস। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, সমরেন্দ্র জানতে চায়— কী হল। শুনে হাসে। না, আমরা যাচ্ছি কবিতা সিংহের বাড়ি। ১৬বি গোবিন্দ ঘোষাল লেন।

সত্যিই গলি। উত্তর কলকাতার ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ। পুরনো বাড়ি। বারান্দায় ঘুচাই। মানে পরমেশ্বরী নামের বালিকাটি, ইতিমধ্যেই যে কবিতা লিখে আলোচিত। তার স্যানদার সঙ্গে দু-একটা কথা পেরিয়ে আমরা ঘরের ভেতর।

মেঝেয় ঢালাও কিছু পাতা। সামনে ডেস্ক। তিনি লিখছিলেন আধোশুয়ে, কুশন আর কনুইয়ে ভর দিয়ে। থেমে গেল। মানুষের ছায়া মানুষের মনের উপরেও পড়ে। লেখার লতাপাতা সরিয়ে ত্রস্ত-তিনি মাথা তুললেন। ‘সহজ সুন্দরী’র কবি। ‘মনে হয় পিঠে তার ডানা আছে, কাচের পতাকা/ অথবা সে হাঁস এক, উড়ে যাওয়া আলোর পালক…’– কবিতাদিই লিখেছিলেন না! কবিতাটির নাম ছিল ‘ব্যালেরিনা’। মা, একরাম– সমরেন্দ্রর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দান। সেটাকে বিস্তারিত করতে আরও কথা। এবং আড্ডা। লেখা শিকেয় উঠল। একসময় এক সুদর্শন পুরুষের প্রবেশ। দীর্ঘকায়, ধুতি-পাঞ্জাবিশোভিত, কিন্তু মৃদু বেচাল। আন্দাজে বুঝি, ‘দৈনিক কবিতা’র বিমল রায়চৌধুরী। কেননা, ওই যে তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে ডটপেন বের করে নীচে উপবিষ্টার পিঠে বৃত্ত আঁকার চেষ্টা করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মৃদু তিরস্কার—আহ, ছেলেমেয়েরা রয়েছে না! নবাগতজনের পরিচয় যখন পেলেন, পাঞ্জাবি খুলতে গিয়ে আটকে গেল হাত। ঘাড় ঘুরিয়ে— এ যে মুসলমান বিবেকানন্দ! একে কোত্থেকে পেলে?

আমরা যে একটা বাড়ি ডিঙিয়ে গেছি গোবিন্দ ঘোষাল লেনে, জানলাম কিছুদিন পর। সেদিনও সঙ্গে সমরেন্দ্র। ট্রামরাস্তার প্রায়-গায়ে একটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দরজা খুললেন লম্বা, সুদর্শন, পাজামা-পাঞ্জাবির মানস রায়চৌধুরী—আরে! এসো, এসো। স্বল্পভাষী অথচ রসিক মানুষটিকে ভালো না-লাগাই অসম্ভব। চা-সহ আড্ডা। পরে একদিন ওই ঘরেই জীবনে প্রথম শেরি খাই। তবে, মেপে!

শেরি কিন্তু বেশ পুরনো ব্যাপার। সভ্যতাকে স্পেনের দেওয়া প্রাচীনতম উপহার এটি। ইলিয়ড, অডিসি, মায় সোফোক্লেস বা সাফোর নাটকে-কাব্যে শেরির গাঢ় উত্তেজনা লেগে থাকার কথা। ওয়াইনটি গ্রিকরা খেয়েছে। রোমকরাও। এখন সবাই। আর আমি? তালগাছে-ঘেরা আমাদের গাঁয়ে তাড়িই ছিল স্বাভাবিক নেশা, আঙুরপ্রধান আন্দালুসিয়ায় যেমন শেরি। তাড়িতে উৎকট গন্ধ? হলে কী হবে, নামমাত্র মূল্যে বা বিনিপয়সায় অঢেল মেলে যে! তখন কলেজে গরমের ছুটি। অনেক রাত অবধি বাঁধাঘাটে আড্ডা। রাত দশটা-সাড়ে দশটার দিকে গোলেমান হাজির। নেমে গেল জলের ধারের চওড়া সিঁড়িতে। বাক্যব্যয় না-করে কোমরে-বাঁধা গামছাটা বেশ যত্ন করে সানের উপর আড়াআড়ি পাতল। ফিরে দেখল, ঠিকঠাক পাতা হয়েছে কিনা। তারপর গামছার ঠিক পাশটিতে সানের উপর আরাম করে শুল। সবাই হাসছে। গোলেমান কিন্তু নিমেষে ঘুমিয়ে পড়েছিল। যেন ওডিসিয়াসের যুদ্ধক্লান্ত সৈনিক!

মানসদার বাড়ি থেকে উঠব, থামতে হল। ভেতরে ঢুকলেন। যখন বেরিয়ে এলেন, হাতে একটা বই—‘আবহ সময় শিখা’। তাঁর দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ। দিতে চান তিনি–— ‘কে কাকে নম্বর দেয়? একজন আঁধার বলে তুমি কি আঁধার/ কথা শুনে হেসে ওঠে আলোকিত দীপ্ত চারিধার।’

এইভাবে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলি। এইভাবে ধূর্জটি চন্দ, রানা দাস। রাসবিহারী মোড়ের অমৃতায়ন। দেশপ্রিয় পার্কের উলটোদিকে সুতৃপ্তি, যেখানে রবিবারের সকালগুলো জমজমাট, যেখানে সিঁড়ির মুখে ছোট্ট বোর্ড বড্ড চোখে লাগত— ‘মহিলাদের উপরে বসিবার সুবন্দোবস্ত আছে।’

এর চেয়ে আমাদের পুরন্দরপুরের লক্ষ্মী সেন শব্দ ব্যবহারে ছিলেন অনেক চৌকশ। তাঁর গ্রাম্য স্টেশনারি দোকানে ‘ধার নেই’ না-লিখে তিনি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন—‘ভোঁতা’!

এসবেরই মাঝে বেরিয়ে আসত ‘আত্মপ্রকাশ’-এর একেকটা সংখ্যা। কিন্তু এসবের থেকে আলাদা। একরোখা। আসলে, পত্রিকাটি ধরতে চাইত গোটা বাংলাকে, বাংলার সত্তর দশককে। একেকটা সংখ্যার জন্যে তখন কত-না পরিকল্পনা। ছোট কিছুতে, অল্প কিছুতে, সায় ছিল না সমরেন্দ্রর। তার একলা জেদ, যেটা সে চারিয়ে দিতে চাইত সব বন্ধুর মাথায়। বন্ধুদেরও নিজস্ব জেদ ছিল। কোথাও মিলত, কোথাও মিলত না। সব মিলিয়ে একটা-কিছু হত নিশ্চয়ই। না-হলে আজও কেন কাগজটার খোঁজ করে কেউ কেউ? যেমন কলকাতার আকাশে সন্ধ্যাতারার দেখা না-পেলেও, পশ্চিম আকাশে কেউ তো আনমনে তাকায়!

Comments are closed.