সোমবার, নভেম্বর ১৮

হার-জিত

একরাম আলি

সেটা সাতাত্তর। সাতাশ মার্চ জরুরি অবস্থা উঠে গেল। এল নির্বাচন। ফল– রাজ্যে কংগ্রেসের রাজ্যপাট চুরমার করে বামফ্রন্টের মারকাটারি জয়। মাসটা সম্ভবত ছিল জুন। দিনটা ছিল শনিবার। জরুরি অবস্থার দমচাপা মাসগুলো পেরিয়ে এসে মুক্তির আশ্বাস ছিল ব্রিগেডের বিশাল বিজয় উৎসবে। তাই হয়তো-বা শিয়ালদা থেকে মিছিলের পর মিছিল। একটু এগিয়ে কলেজ স্ট্রিট বা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ঘুরে ময়দানমুখো হবে তারা। একসময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ি। মিছিলে সারবন্দি রাতজাগা উড়োখুড়ো মানুষ। বলদৃপ্ত। নতুন আশা। কিন্তু কোত্থেকে যেন তাদের খড়িওঠা হাতে এসে জুটেছিল সিল্কের লাল পতাকা! সেই প্রথম। বিশাল আকারের। পতপত করে না-উড়লেও ওড়ার সম্ভাবনা নিয়ে সেগুলো তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়। বড্ড চোখে লেগেছিল সেইসব পতাকার ঝলমলানি। রবিবার কাগজে দেখা গেল, নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন— কোনও কমিউনিস্ট সরকারকে সহ্য করবে না দিল্লি। ফেলে দেবেই। তাই সতর্ক থাকতে বলা হল সবাইকে। একটু বেলায় শ্যামবাজারে শঙ্খ ঘোষের বাড়ি। আড্ডায় পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল শুনিয়ে দিলেন— জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না, হায় সিপিএম হায় রে…! ঘরময় চাপা হাসির বুজকুড়ি। আর তাতেই হয়তো ইঙ্গিত ছিল চৌত্রিশ বছরের স্থিতাবস্থার! এ তো বোঝাই যাচ্ছে, তেমন ইঙ্গিত পাইনি। আমরা তত ধুরন্ধর ছিলাম না যে!

কয়েকদিন পর এক বিকেলে– কী কারণে মনে নেই— দাঁড়িয়ে আছি শিয়ালদায়। আপার সার্কুলার থেকে একটা দক্ষিণমুখো অ্যামব্যাসাডর পেরিয়ে যেতে গিয়ে থমকে গেল। জানলায় ফর্সা মুখ। পিছন ফিরে। আমার দিকে? না-চিনে উপায় কী! সবার মুখে গোঁফ মানায় না। ফর্সা মুখে কালো গোঁফটি (নাকি জোড়া!) যাকে বলে লাগসই ছিল। চেঁচিয়ে নাম ধরে ডাক। স্মৃতির জোর সাঙ্ঘাতিক যে! কাছে যাই।

সোনাদা।

প্রথম দেখি সিঊড়িতে। বাহাত্তরে। নির্বাচন ঘোষণার পরে।

পুরনো পোস্ট অফিস-লাগোয়া সদ্য কেতাদুরস্ত বাড়ি উঠেছে পোস্ট অফিসেরই। উঠলে হবে কি, একটা সরু আর নোংরা গলি গজিয়েছে দুইয়ের মাঝখানে। পুরোনো আর নতুনের মাঝে যে-ধরনের বিভাজন কিছুতেই এড়ানো যায় না আমাদের দেশে। উলটোদিকে চন্দ্রগতি হাই স্কুল। পাশেই বার লাইব্রেরি থেকে শুরু কোর্ট চত্বর। পোস্ট অফিসের সেই গলিতে ঢুকেছি, আচমকা পাশেই কালো কোটের ফর্সা, দোহারা, বেঁটেখাটো, নির্ঘাত উকিল একই কাজে ছটফটিয়ে ঢুকে পড়েছেন। গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। একটা সেকেন্ড যেন ফুরসত নেই নষ্ট করার। ওই অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে, মিহি করে হেসে— ভাই, আমি সোনাদা। এবারের কংগ্রেস ক্যান্ডিডেট। ভোটটা আমাকে দিয়ো কিন্তু। কোন ইয়ার? সেকেন্ড? ওমপ্রকাশ আছে না? আরে, টিব্রিওয়ালা। ও ঠিক যোগাযোগ করে নেবে।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ১: চুয়াল্লিশের তিন

শেষে চেন টানতে টানতে— দিয়ো ভাইটি!

একই সঙ্গে গলি থেকে বেরোচ্ছি যখন, বাড়তি বলতে কাঁধে অচেনা ভোটপ্রার্থীর হাত। ভাবী এম এল এ-র। মন্ত্রীরও। কী নাম? বাড়ি? যাব কিন্তু তোমার বাড়ি। কাজ তো হয়েই গেল। চা খাব সেদিন। ঠিক আছে? ইত্যাদি। সত্যিই গিয়েছিলেন। চাও খেয়েছিলেন চেয়ে!

এম এল এ, মন্ত্রিত্ব, ওয়াংচু কমিশন, গদি হারানো— সব পর্ব শেষে, এমনকি কংগ্রেসের ভরাডুবির পর ফের দেখা— এসো। আরে, কতদিন পর দেখা। ওঠো! ওঠো!

আমি যে কোথাও যাব না, মেসে ফিরব এবং মেসটা সামনে, তাতেও দমবার পাত্র নন– আগে ওঠো তো গাড়িতে!

তাঁর দল হারলেও তিনি ম্যাজিশিয়ান। ঠিক জিতে গেছেন এবং বড় ব্যবধানে। ঝকঝক করছে গ্রে সাফারি। চকচকে স্যু। হালকা টাকের ইশারা। পাঁচ বছরেই ডাবল চিন। গালে বিকেলের লালচে আভা কাঁপিয়ে বললেন— কাজ নেই তো তেমন? চলো, ঘুরে আসি। না-না, ওসব বললে হবে না। কতদিন পর দেখা!

গুরুস্থানীয় এক নেতা, বেশ ভারী গোছের, তাঁর বাড়ি যাচ্ছেন। কিছু না, এমনিই। তবে, তুমি চুপচাপ থাকবে, কেমন? টুঁ করবে না। বেরিয়ে আমরা কোথাও বসে আড্ডা দেব। ঠিক আছে? ততক্ষণে বছরখানেক আগে দেখা ‘জনঅরণ্য’ ফিল্মের রবি ঘোষকে মনে পড়তে শুরু করেছে। পানের সঙ্গে কাঁচা সুপুরির মতো ক্ষতিকারক একধরনের মজা চিবোচ্ছি আমি।

কোথায় সেটা? কাছেই। চলো না!

যেতে যেতে এদিক-ওদিক একটু ঝালিয়ে নেওয়া– কী করছ। বাহ। মেসটা কোথায়। ও, প্যারামাউন্ট বোর্ডিং হাউস? চেনা-চেনা নামটা। কেন, শান্তিনিকেতন বোর্ডিংয়ে থাকতে পারতে। ওটা কি হোটেল হয়ে গেছে? ইস, কত থেকেছি ওখানে। মন্দ খাওয়াত না। ও, তুমিও থেকেছ? বলো, ভালো খাওয়ায় না ওখানে? জানো তো, একবার পেল্লায় একটা মুড়ো খেয়েছিলাম। কাতলার। কিলোখানেক তো হবেই! কমপক্ষে হাফ কিলো। তার কম নয়। আর ওরকম আলু-পোস্ত শান্তিনিকেতন ছাড়া কোথায় পাবে এই কলকাতায়?

এন্টালি মার্কেট পেরিয়ে গাড়ি ছুটছে। সুর ফ্রিজের কাছে এসে লম্বা সিগারেট ধরিয়ে তাকালেন—খাও নাকি? নাও তাহলে!

ঠোঁটে ঝুলছে। ঘাড় এদিকে। ধোঁয়ায় চোখদুটো আধবোজা। ‘না, থাক’ শুনে– ও, খাও না? খুব ভালো। বাজে নেশা রে ভাই। একবার যদি ছাড়তে পারি, পিতৃপুরুষের দিব্যি, গঙ্গাস্নান করব। ঠোঁট থেকে ফাইভ ফিফটি ফাইভ নামিয়ে এনে হাসি।

পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে আমার উদবেগ— আমরা কি সাউথে যাচ্ছি? না-না। এসে গেছি। এই তো। বলতে বলতে গাড়ি ডানদিকে বাঁক নেয়। থিয়েটার রোড, মানে সেক্সপিয়র সরণি। ঘুরেই বাঁদিকের বন্ধ গেটে গাড়ি থেমে যায়। ছোট্ট হর্ন। ভেতর থেকে একটু ফাঁক। একটা মুখের উঁকি। দারোয়ান। গেট খুলে যায়। এরই মাঝে চোখে পড়ে, গেটের দু-দিকে বাংলায় আর ইংরেজিতে লেখা— গান্ধী ভবন। একটু মলিন, না-হলে পুরনো আভা খোলতাই হবে কী করে! ভেতরে ছোট্ট আমবাগান। গাড়িবারান্দা। জনবিরল। সামনে পেল্লায় দরজা। দারোয়ান একটু ফাঁক করে ভেতরে যায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে খুলে দেয়— আসুন। পিছু-পিছু ঢুকে পড়ি।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ২: ম্যানেজারবাবু

মস্ত হলঘর। ও-প্রান্তে সিঁড়ি। ওপরের বারান্দায় তিনি স্বয়ং দাঁড়িয়ে। রেলিঙে হাত— কে, সোনা? বাঁদিকের পয়লা ঘরটায় বোস। সিনেমার সেটে যেন চুরুটজ্যান্ত কমল মিত্র।

ঘরটা তেমন বড় বলা যাবে না। সোফায় বসে পড়ি। ফের ফিসফিসিয়ে সতর্কতা— মনে আছে তো, যা বলেছি? একটু পর, মানে অনেকটা পরে, নেতার আবির্ভাব। হালকা নীল হাওয়াই শার্ট, সাদা স্ট্রেচলনের প্যান্ট। পাতলা কোঁকড়ানো চুলে ব্যাক ব্রাশ। বড় একটা সোফায়, আসলে একজনই বসতে পারে, তিনি বসলেন। পিছু-পিছু ট্রে-সহ দুটো হাতের প্রবেশ। চা। দুজনের জন্যে। না, গৃহকর্তা খাবেন না।

কথা শুরু হল। চলছেও। সবই মান-অভিমানের কথা। পরাজিত দলের দুই জয়ী চরিত্র। একজন বোড়ে, অন্যজন গজ। এই যে বুক ফুলিয়ে ব্রিগেড হল, বলতে পারিস, ওরা কেউ ছুঁতে পেরেছে আমাকে? আমার মতো মার্জিনে কেউ জিতেছে? কেউ নেই। বেঙ্গলে আমিই সব চেয়ে বেশি ভোট নিয়ে এসেছি রে! আর দেখ, তুই বাগবাজার ঘুরে তারপর আমার কাছে এলি। কেন, আগে আমার কাছে আসার কথা তোর মনে এল না কেন? না-না, তোকে বলেই বলছি। এটাই আমাদের ক্যারেক্টার রে। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তার ফল হ্যান্ড টু হ্যান্ড পেল দল। পেল তো? এবার আঙুল চোষ পাঁচ বছর।

ঠিক এই কথাগুলোই হুবহু নয়, তবে মোদ্দা কথাগুলো ছিল এরকমই।

ডানদিকে খোলা দরজা। এতক্ষণ ধরে সেই দরজার ওপাশটা ছিল নিস্তরঙ্গ। কী-একটা হালকা সবুজ ঢেউ যেন পেরিয়ে যাচ্ছে ওপাশে। ঢেউয়ের শেষ প্রান্তে ফেনার নকশা। কী? ঘাড় তো আর নাটবল্টু দিয়ে আটকানো থাকে না। নিজে-নিজেই ঘুরে যেতে পারে। যায়ও। সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট কিন্তু কড়া সতর্কতা— উঁহুহু, ওদিকে না। ওদিকে কিছু নেই।

সোনাদার হাতে চায়ের কাপ। থমকে গেল। কুঁচকে-যাওয়া চোখ এদিকে। অর্থাৎ, এটা কী করলে! ততক্ষণে তিনি সামলে উঠেছেন– নে, চা-টা শেষ কর। আসিস মাঝে মাঝে। বিপদে পড়লেও আসিস। আমি তো আছি রে! ভয় পাস না।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৩: ইয়ামাশিরো

ঊঠতে হল এরপর। বেরিয়েও যেতে হয়। বাইরে সন্ধ্যের ঝোঁকে মেঘলা হাওয়া। আমগাছে জোনাকি? না, চোখের ভুল। গাড়িতে উঠে ড্রাইভার শোনে— পার্ক স্ট্রিট।

ইচ্ছে করে না। ‘না’ বলে দিই। আর এক দিন। কেন? চলো না, কোথাও বসে একটু কথা বলি। না এবং হ্যাঁ-এর টানাপড়েনে গাড়ি ততক্ষণে গান্ধী ভবন থেকে বেরিয়ে এঁকেবেঁকে থিয়েটার রোডের ব্যস্ততায় ঢুকে পড়েছে।

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

Comments are closed.