সোমবার, নভেম্বর ১৮

রাতের শিয়ালদা

একরাম আলি

প্রকৃতিতে যা-কিছু চলে বা সরে-সরে যায়, সেইসব যাওয়া আর যেতে-যেতে অদৃশ্য হওয়ার পিছু-পিছু মানুষের দৃষ্টিও অদৃশ্য জগতে ঢুকে যেতে চায়। তার গতিকে থামাতে পারে না বলেই হয়তো। চায়ও কি? চাঁদের অস্থিরতাকে সম্বোধন করে বড় জোর তার আর্তি— চোখের জলে লাগল জোয়ার…।

কিন্তু, চাকা? সে তো মানুষেরই আবিষ্কার। সেই চাকার সাহায্যে মানুষ ধরিত্রীর বুকে কত কী যে চালিয়েছে! এ-পর্যন্ত যত চলমান যন্ত্র বানিয়েছে, সবই সে নির্দিষ্ট সময়ে আর স্থানে থামাতে চেয়েছে। যদি না-পারত, যন্ত্রের সেই চলমানতাকে ধ্বংস করতেই হত। ট্রেনের ক্ষেত্রে স্টেশন তাই এত জরুরি।

মেসের অদূরে, হ্যারিসন রোডের শেষে, তেমনই একটি স্টেশন— শিয়ালদা। দিনের ব্যস্ততা কমে এলে, সন্ধ্যের ভিড় পাতলা হতে-হতে রাতের আলোয় ট্রামলাইন-সহ ভেসে উঠত গোটা হ্যারিসন রোড। অতিকায় কুমিরের পিঠ। বেরিয়ে তখন পড়তেই হত।

জঙ্গলের যেমন, বা আকাশের, রাতের শহরেরও নিজস্ব রূপ আছে। রাতেই সে-রূপের দেখা মেলে। এমনকী রাতের স্টেশনের রূপটিও, বিশেষত শিয়ালদার, দূরের ঘুমন্ত ছায়াপথের মতো ছড়ানো।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৫: দ্য আউটসাইডার

শেষ ট্রাম চলে গেছে। ক্বচিৎ এক-আধটা গাড়ি। ফুটপাথ জুড়ে মানুষের স্রোত নেই। এমনই সময়ে কানে আসে রাতের নিজস্ব শব্দ। সারিসারি বন্ধ দোকানপাটের ভেতরে ঠাসা মালপত্রের হাঁসফাঁস। মিষ্টির দোকানে রসের মধ্যে অন্ধকারে ডুবে আছে একদল লেডিকেনি। কলেজ স্কোয়ারের জলে দুই সাঁতারের মাঝে যেন কস্টিউম-পরা ক্লান্ত কিশোরীর ঝাঁক। দু-পাশে ক্ষয়িষ্ণু ঘরবাড়ি ম্যানগ্রোভ জঙ্গল হয়ে ঝিমোচ্ছে। দেওয়ালে, জানলা-দরজার কাঠে, ঘুলঘুলিতে, নর্দমায় নানা পোকামাকড়ের ফিসফাস। তারে-তারে বিদ্যুৎ, ভেতরে অবিরাম রিঁ-রিঁ-রিঁ শব্দে চলাচল– যাদের কান আছে, তারা শুনতে পায়। হাঁটতে হাঁটতে কানে আসে উপরের কোনও ঘর থেকে টানা কাশির শব্দ— খক-খক, খক-খক। দোতলার ছাদের কোণে একলা ঘর। তার খোলা জানলায় মেদবহুল স্বামীকে ছিপছিপে স্ত্রীর ছিটকে জড়িয়ে ধরার ছায়াবাজিও চোখে পড়ে। রোয়াকে কেউ পা গুটিয়ে বসে আছে। মাথা নীচু। সব হারিয়ে নিঃস্ব যেন। নাকি দুনিয়াটাকে জিতে নেওয়ার মতলব খেলছে মাথায়? মাথার ভেতরের শব্দ শোনা যায় না যে!

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৬: কমলবাবু

রাস্তায় আলো কম। বিঘ্ন অনেক। আচমকা ঠাহর হল, সামনেটা বিলকুল ফাঁকা। সোডার বোতল হাতে একদল তাড়া করছে আরেক দলকে। সঙ্গে বুনো চিৎকার। কেন, কেউ জানে না। গ্রামে অস্ত্র বলতে মূলত লাঠি। সেই লাঠি হাতে কাউকে বেরোতে খুব কমই দেখা যেত। যত পুরোনোই হোক সে-অস্ত্র, তবু যে মারতে চাইছে, লাঠির একটা প্রান্ত তো ধরা থাকতই তার হাতে! ফলে শেষ পর্যন্ত সে-ই ছিল নিয়ন্তা– মারবে, নাকি রাখবে। মারলে কতটা? শহরে, কলকাতায়, বেমক্কা ছুড়ে দেওয়া। দূরে কারও আর্তনাদ। নিষুতি রাতে ভীরু পথচারী আশপাশের কোণকানাচে নিজেকে লেপটে দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখত রাস্তা জুড়ে পড়ে-থাকা অজস্র কাচের টুকরো, ভাঙা কাচে ঠিকরে-পড়া আলোর হিংস্র রূপ।

এমন রণক্ষেত্রে ফুটপাথবাসীরা কী নিশ্চিন্তে যে শুয়ে আছে! বাচ্চা, বউ, বুড়ো, বুড়ি। কেউ হয়তো কৌতূহল চেপে রাখতে না-পেরে ঊর্ধ্বাঙ্গ তুলে বসল। পা-দুটো বিছানায় তখনও লম্বা। উঠেই পড়েছি যখন, বিড়ি ধরাই একটা!

আরে! সুরেন্দ্রনাথ কলেজের গলিতে চায়ের দোকানটা খোলা যে! একটু আলো। দু-চারটে লোক। উসকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। খাবে নাকি? নাহ, থাক।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৭: বকখালিতে চারজন

ছবিঘর। বাইরের দেওয়ালে সন্ধ্যা রায়ের ব্যথাতুর মুখে হাসি। চোখে খোদাই করা অশ্রু। থাক-থাক চুলের যেদিকটা ছিঁড়ে গেছে, সেদিকে কোনো পুরুষের আভাস। নীচে স্থির নৌকো। অবদমিত সমাজের ছিন্ন ছবি। হয়তো কয়েক সপ্তাহ চলছে। হলের সিঁড়িতে একাকী একটা কুকুর গুটিসুটি শুয়ে। ভেতরের সারি সারি মলিন চেয়ারগুলো অন্ধকারে হয়তো জলের তলায় ডুবে আছে। গভীর রাতে বন্ধ সিনেমা হলের নিস্তব্ধতা বহুকাল আগের ডুবে-যাওয়া জাহাজের মতো।

সামনে একটা দল স্টেশনমুখী। হন্তদন্ত। একটু চঞ্চলতা। এতক্ষণ চোখে পড়েনি তো! ট্রেন ধরার তাড়া হয়তো। কোন ট্রেন?

স্টেশনের বাইরের চাতালে, ট্রামগুমটিতে, গুটিতিনেক ট্রাম। দিনেরবেলার ব্যস্ততা এখন কল্পনা করা যায় না। কেই-বা করতে যাচ্ছে! স্টেশনের দু-মুখো ঘড়ির কাঁটায় যৌথ ঘোষণা— রাত একটা পঁয়তাল্লিশ।

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৮: এইট–বি

এমন স্টেশন দুনিয়ায় ক-টা আছে যার একটা মেইন, অন্যটা সাউথ? তবু শোনা যায়, এটাই নাকি এশিয়ার ব্যস্ততম স্টেশন। কত দুর্নাম এর! নরকের পাশের দেশ যেন। অনবরত গাঁ-গঞ্জ থেকে পিলপিল করে পোকা ঢুকছে তো ঢুকছেই। বেশির ভাগই দেশভাগের পরিণতি। গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, কেরানি, ঝি-চাকর— মোট কথা বাছাই করা গরিবের দল। এদের সেরারা যায় ডালহৌসি পাড়ায়। কেরানিবাবুর দল। আর যায় ট্রাম। রাজাবাজার, গ্যালিফ স্ট্রিট, হাওড়া, ডালহৌসি, এসপ্ল্যানেড, পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ। একেক ট্রামের যাত্রী একেক রকম।

কিন্তু সেই যে দেশভাগের ঢল, প্ল্যাটফর্মে ভিটেছাড়া আর নিরন্ন পরিবারগুলোর দগদগে চিহ্ন, এত-এত বছর পেরিয়েও শিয়ালদা স্টেশন থেকে কিছুতেই যাবার নয়। আর সেই সুযোগে দু-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া ধড়িবাজদের যেন স্থায়ী ঠিকানা এই শিয়ালদা। কারা ধড়িবাজ? চেনা যায় না। বলবার মতো কোনও প্রমাণও নেই। তবু তারই মধ্যে মেইন আর সাউথ—দুইয়ের গলতায় একদিন চোখে পড়ে এমনই দু-তিনজনকে। কয়েকশো মুরগির ডিম লাল চায়ে ডুবিয়ে টপাটপ হাঁসের ডিম বানাতে ব্যস্ত! ভোর-ভোর বাজারে তুলবে। অতি অল্প কয়েকটা বাড়তি পয়সার লোভে কত খাটাখাটনি, জাগরণ, প্রবঞ্চনা!

পড়ুন হ্যারিসন রোড ৯: রবিবার

এবার চা খেতেই হয়। সিগারেটও। স্টেশনে ঢুকতেই ডাইনে-বাঁয়ে লম্বা পরিসর। কড়া আলোর চাপে মালপত্র, মানুষ, কুকুর– সব নীচু হয়ে আছে। যাত্রীরা শুয়ে আছে বা বসে। কোনও কিছুর অপেক্ষায় মানুষ সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু গভীর রাতে এমনকি মুমূর্ষু মায়ের পাশটিতে শুয়েই মৃত্যুর আশঙ্কায় কেঁপে-কেঁপে ওঠে, বা বড় জোর বসে। আর এ তো শিয়ালদা স্টেশন!

স্টেশনটা এমন কল করে তৈরি, সার দিয়ে পরপর প্ল্যাটফর্ম। নীচে লম্বা গর্ত, তাতে লাইন পাতা। সেই লাইন বেয়ে ধাতব পিস্টনের মতো ট্রেন, জুড়ে-জুড়ে লম্বা, এসে ঢুকবে— ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট। প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষারত সবকিছু নেবে— উদ্বেগ, আনন্দ, শোক, স্বপ্ন, এমনকি জমে-থাকা কালিমাও। নিয়ে ফের বেরিয়ে যাবে। ব্যবস্থা এমন, ফের ঢুকবে পিস্টন। এবং একই ভাবে বেরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে চলে যাবে।

চা খেয়ে সাউথ সেকশন। প্রায় ফাঁকা। প্ল্যাটফর্মগুলো লম্বা হয়ে দূরের আবছা আলোয় হারিয়ে গেছে। যেন ভূতের পা। মাঝের একটা প্ল্যাটফর্মে গোটাকয়েক কুকুর দু-দলে ভাগ হয়ে খেলা করছে নাকি ঝগড়া, তাদের ঘেউঘেউ শুনে বোঝা মুশকিল। ডানদিকের কোণে একটা ছোট্ট জটলা। সেই যাদের রক্তের জোর বেশি, কয়েক লক্ষ বছর ধরে যারা বাড়তি উত্তেজনার আশায় একজোট হয়, তারা। তাস খেলছে। মোট ছ-জন। চারজনের হাতে তাস। মুখে-মুখে বিড়ি। একজন বসে। ছ-নম্বরটি শুয়ে। তাস আর খুচরো পয়সার লড়াইয়ের দিকে তার মাথাটি তোলা। কথা সংক্ষিপ্ত। যতটুকু লাগে। কৃপণ কবির মতো শব্দ ব্যবহার। তোর দান। একজনের হাত থেকে তাস পড়ল। ডায়মন্ডের বিবি। তারপর দুই। তার উপর নয়লা। শেষের তাসটি ধীরে এগিয়ে এল মাটি ঘষে। আণবিক শক্তিধর সাবমেরিনের মতো চকচকে স্পেডের গোলাম।

সরে আসতেই হয়। জুয়া থেকে যুদ্ধের দিকে যেতে হয়েছিল স্বয়ং যুধিষ্ঠিরকে। অন্য পরে কা কথা!

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

Comments are closed.