গোধূলিসন্ধির নৃত্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    সত্তরের দশকেও মেস ছিল জবরদস্ত এক প্রতিষ্ঠান। অন্তত কলকাতায়। যেমন স্কুল, জেলখানা, হাসপাতাল বা ধর্মশালা। যে-মেস ছেড়ে যেতে হল আমাকে, সেটার বয়স মাত্র বছরচল্লিশেক। কিন্তু মেস-নামের প্রতিষ্ঠানটি কলকাতায় আরও পুরনো। ইংরেজি এই শব্দটির সমান বয়সের পাথর থাকলেও দুনিয়ার কোথাও গাছ থাকার সম্ভাবনা বেশ কম! কিন্তু ইংরেজি ভাষা তো বলতে গেলে বহু ভাষার ল্যাজাসমষ্টি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এর নানা রকমের মুড়ো আজও নড়ছে নানা ভাষার জলাশয়ে। যেমন mess—  ইংরেজি এই পাঁকাল শব্দটি কয়েক শতাব্দী ফরাসি গর্তে মাথা ঢুকিয়ে দিব্যি রয়ে গেছে। প্রাচীন ফরাসিতে সে mes। মানে দাঁড়াচ্ছে— এ পোর্শন অফ ফুড। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এত দূর যখন এসেছে, আরেকটু পিছিয়ে কেন সে নিজের কৌলীন্য বাড়িয়ে নেবে না! শব্দটা তাই ঢুঁ মেরেছে অবশেষে লাতিনে। সেখানে সে মিতের‍্যা (mittere)।

    এই সেদিন, তেরো শতকে, ভায়া ফরাসি, ইংরেজিতে তার অনুপ্রবেশ। প্রায়ই ব্যবহার হত স্যুপ বা পরিজের ডিশ অর্থে। তারপর সেনাবাহিনীর আবাসস্থল, সেইসঙ্গে আরও সব অর্থগত দুর্নাম পেরিয়ে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে, কলকাতায় এসে মফসসলের ছেলেদের কাছে মেস হয়ে উঠল পরম নির্ভরস্থল।

    এখানে বলতেই হয়— পরিজ কিন্তু খেতে বেশ খারাপ। তার চেয়ে ফ্যান-ভাত অনেক স্বাদু, বিশেষ গোবিন্দভোগ চালের হলে। অথচ গল্পে উপন্যাসে– বিশেষত রুশ লেখকদের– গরম-গরম পরিজ খাওয়ার বর্ণনা পড়ে অজানা খাদ্যবস্তুটির প্রতি কী দুর্বলতাই-না একসময় ছিল!

    মেসের কলকাতা-সংস্করণ সাগরপারের বদনামগুলো যে একেবারে মুছে ফেলতে পেরেছে, বলা যাবে না। নোংরা, অগোছালো— মেসের গায়ে এসব লেগে আছেই। এমনকী ঝগড়া থেকে হাতাহাতি পর্যন্তও গড়িয়ে যেতে পারে।

    এখানে নানা জায়গার নানা জনের সহাবস্থান। যেমন স্বপন। শহর বর্ধমানের স্বপন দে। দে-ই তো? নাকি সেন? না, দে। ন্যাশনাল মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ার। বাবাও চিকিৎসক। কালো। ছিপছিপে। কয়েকদিনের মধ্যেই সে বেছে নেয় আমাকে বা আমি তাকে। গ্লোব, লাইটহাউস, নিউ থিয়েটার্স, এলিট, মিনার্ভা, মেট্রো, কাফে ডি মনিকোর দোতলা, নিজাম, তেমন হলে টাইগার বা রিগাল। বহুবার একসঙ্গে। তার মধ্যে ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কুক্কুস নেস্ট’ তিন-তিনবার। অদ্বিতীয় জ্যাক নিকলসন। অ্যাসাইলামের কাচ ভেঙে চিরবাধ্য-সে যেদিন মুক্তির দিকে ছুটে যায়, ক্যামেরা এপাশে। কাচের অদৃশ্য রোম তার ছুটন্ত শরীরকে গোরিলার আবছা রূপ দিচ্ছে। সামনে জঙ্গলের আভাস। আমরা বেরিয়ে আসি। নির্বাক। চা খাই। চা শেষে সিগারেট চেয়ে অনভ্যস্ত শ্বাসে ঘন ঘন টান দেয় সে। যেন জ্যাক নিকলসনকে টানছে গভীর জঙ্গলের দিকে। বা, হয়তো-বা নিজেকেই।

    আনন্দবাজার পত্রিকার বার্ষিক সংখ্যায় ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আস্ত উপন্যাস। কাউকে কিচ্ছু না-বলে পাতিরাম থেকে কিনে সোজা মেসে। অনেক রাতে ফিরেছি। সক্কালবেলা স্বপন হাজির। ঠোঁটে দুর্গম দাক্ষিণাত্য জয়ের হাসি, মিটিমিটি। বুলন্দ দরওয়াজা দিয়ে ফতেপুর সিক্রিতে তার প্রবেশ– কী করছেন? ও, লেখাপড়া? আপনার দেখছি পণ্ডশ্রমচেতনা এখনো জাগেনি!

    সেই শুরু। ম্যানেজারবাবুর বিরুদ্ধে কোনো কথা উঠলে স্বপনের উক্তি ছিল—ক্যাঁৎ করে একটা লাথি মারা উচিত। একটাই পর্যাপ্ত।

    কপাল ঠুকে তাকে দিই ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দী ও অন্যান্য গল্প’। দিন দুয়েক বাদে হইহই করে সে ঘোষণা করে— আরে, এ তো হাতবোমা! সেইসঙ্গে জানায়– তার পড়া ওটিই সেরা গদ্যের বই। বাঙালি লেখকরা ঘোঁত ঘোঁত করে ভাত গেলে আর ওয়াক ওয়াক করে খাতায় ওগরায়। স্বপনের হাহুতাশ— কী-যে সব ক্যাঁৎক্যাঁতে লেখা এতদিন পড়েছে!

    এ হেন স্বপন সেকেন্ড ইয়ারে হোস্টেল পেতেই চলে গেল তাদের ব্রাইট স্ট্রিটের আস্তানায়। ক্রমে বেপাত্তা। এভাবে কত কত জন!

    ফলে কোথায় কার-যে কী লুকিয়ে আছে, কেউ জানে না। সেসব বেরিয়ে পড়ে আচমকা। বলতেই হবে– মেসগুলি ছিল স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকানপাট, ঘিঞ্জি বাজার আর পরিবার-আবদ্ধ কলকাতার মাঝখানে শেষ পর্যন্ত আশ্রয়হীনদের কয়েকটি মুক্ত দ্বীপ যেন।

    উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে অবশেষে একটি সবুজ দ্বীপের প্রান্তে যারা পা রেখেছে, প্রায় প্রত্যেকেই ছিল ডাকাবুকো। ঘরবাড়িহীন সেই দ্বীপে তারা যা-খুশি করেছে। ঘরবাড়ি থাকলে দখল করার চেষ্টা করেনি কি? লুঠ করেছে। নির্বিচারে খুন করেছে। এমনকী বুনো কাঠের একফালি ডাল হাতে নিয়ে হতবাক জমায়েতের সামনে হুঙ্কার-সহ ঘোষণা করেছে— এই হল রাজদণ্ড!

    আর কলকাতার মেস-নামের দ্বীপগুলো?

    মাথায় কোনও ইংরেজি লিপিকুশলীর লেখা— প্যারামাউন্ট বোর্ডিং হাউস। কালের মালিন্যে সেটি অস্পষ্ট। নীচে দরজা। প্রবেশপথ। দুই পাশের ঘনিষ্ঠ দোকানপসারে সংকীর্ণ। সেই পথে ছোপ-ধরা সুড়ঙ্গপথ। ঢুকলে দেখা যাবে– প্রাসাদে দুর্গে একতলার ব্যবহার যেমন, এই মধ্যবিত্ত বাড়িতেও অনেকটা তেমনই। ঠাকুর, চাকর, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর। সদস্যদের বসবাস দোতলায়, তিনতলায়। ডানদিকে সংকীর্ণ সিঁড়ি। উঠলে সেই কক্ষ– যেটিতে প্রৌঢ় ক্রিস্টোফার কলম্বাস। চামড়া কুঁচকে গেছে। চোখে চশমা। এই সন্ধ্যেয় বাসি খবরের কাগজটিকে পাঁঠার কাঁঠালপাতা ভেবে চিবিয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে রেডিয়ো চলছে। সাগরপারের খবর নয়, নিতান্তই স্থানীয় কবি-রচিত সঙ্গীতধ্বনি রেডিয়ো থেকে নিঃসৃত হচ্ছে।

    সংকীর্ণ বারান্দা। মার্জার-মার্জারী অধ্যুষিত। তিনতলার বারান্দায় শীর্ণকায় যে-মানুষটি সন্ধের কাপপ্লেট ধুচ্ছেন, তিনি চরমতম বাঙালি হলেও মার্কস-এঙ্গেলস-ইয়ুং-প্রেরিত। সামনে বারান্দার শেষে যে-দরজা, মুখোমুখি চণ্ডী। জেলা মেদিনীপুর। এসেছে টরে টক্কা শিখতে। ভর সন্ধেয় ঘষছেও। টেলিগ্রাফ অফিসে– সে-অফিস আন্দামান বা অরুণাচল প্রদেশ বা যেখানেই হোক— ছুটে গিয়ে একটা চাকরি খপ করে লুফে নেওয়ার ওয়াস্তা। পাশের বেডে রঞ্জিত। হোমিয়োপ্যাথি তার পরমপিতা। নাক্স থার্টি বা ওই জাতীয় ওষুধে আপামর দেশবাসীকে সুস্থ রাখার একাগ্রতা সঞ্চয়ে সে ক্লাস করে যাচ্ছে। পাশের ঘরে উল্লাস। চ্যাটার্জি। বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির ছাত্র। বিসিএস দেওয়ার তালে আছে।

    ওই যে আলো নিভিয়ে একলা ঘরের কোণে টেবল ল্যাম্প জ্বেলে বসে, কোনও-এক কাল্পনিক রাঘববোয়াল ধরবার আশায় ঝিমোচ্ছে, ফাতনা নড়ছে কিন্তু হাওয়ায় কিনা বোঝা যাচ্ছে না, ওর মাথায় বিলি কাটছে বেশ কয়েকজন। সবাইকে দূরছাই করে একা ধ্যানস্থ হতে চাইছে। চাইছে নিজের কথা ভাবতে। কিন্তু তার কথায় ঢুকে-ঢুকে যাচ্ছে ইয়োরোপ, আমেরিকা, স্বদেশ।

    এইভাবে তেরো-চোদ্দোটা ঘরের সমস্ত বাসিন্দা আসলে প্রৌঢ় ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অনুচর না-হলেও কোনও-না-কোনওভাবে সঙ্গী। কেউ স্পেন বা পর্তুগাল বা ইতালি থেকে আসেনি। আসেনি ইয়োরোপের অন্য কোনও দেশ থেকে। কোম্পানির আমল পেরিয়ে ব্রিটিশরাজ। সেখান থেকে দেশভাগ, স্বাধীনতা। তবু মেসের এত-এত সদস্যের শিক্ষা বা জীবিকা ব্রিটিশ-পুর্ব যুগের নয়। উপনিবেশের সন্তান এরা।

    এই গ্লোবালাইজেশনের শুরু সেইসব লুম্পেন অভিযাত্রীদের সময় থেকেই, যারা দেশ ‘আবিষ্কার’ করতে বেরিয়ে পড়েছিল, যেটাকে বলা হয় ‘ইয়োরোপিয়ান এজ অফ ডিসকভারি’। থিয়োডোর লেভিটকে যতই কৃতিত্ব দেওয়া হোক, গ্লোবালাইজেশনের সময়টা ১৯৮০ সাল তো আর নয়। সেই পনেরো শতক, যখন সমুদ্রগুলো এক-এক করে চলে যাচ্ছিল ইয়োরোপীয়দের হাতে।

    আজ মেসের ঘরে কেউ ঘাড় নীচু করে টরে টক্কা করেই যাচ্ছে একমনে। ম্যাকবেথ–কে ফ্রয়েডের ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখতে চাইছে কেউ। চোখ আর চুলে মেধাবিনী যারা, গোধূলিসন্ধির নৃত্যে তাদের পায়ের নীচে হংকঙের তৃণ দেখছে কেউ-বা। চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে কৃষি— সব শিক্ষাই সাগরপারের।

    এদেরই কেউ একদিন গটগট করে হাঁটবে টানা করিডরে। পিছনে রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন। চারদিকে কটু গন্ধ।

    –স্যর, কেমন দেখলেন?

    –ভালো না।

    ব্যস্ত এবং সংক্ষিপ্ত উত্তর। এর বেশি বললে-যে গরিমা নষ্ট হবে হাতে-ধরা স্টেথো নামের রাজদণ্ডটির!

    (ছবি: ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কুক্কুস নেস্ট’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য)

     

    হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুন

    ব্লগ: একরাম আলি 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More