শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

চোদ্দো মিলিমিটার

একরাম আলি

এত যে হাঁটাহাঁটি করতে হয় মানুষকে, সইতে হয় পাহাড় আর খানাখন্দ পেরনোর ধকল, কত-কত সিঁড়ি ওঠানামার অপমান– পায়ের চামড়া তো মাত্র শূন্য দশমিক চার মিলিমিটার পুরু! ওই পাতলা আবরণ সম্বল করেই অতীশ দীপংকরের পা পাড়ি দিয়েছিল হিমালয় ডিঙিয়ে তিব্বতের দিকে। আদিম কাল থেকে মানুষ দুনিয়া চষেছে মাত্র ওই শূন্য দশমিক চার মিলিমিটার ত্বকের ভরসায়। পারেনি যখন, জুতোর দরকার পড়েছে। তাহলে শরীরের সবচেয়ে পুরু চামড়া? পিঠের। চোদ্দোমিলিমিটার! আহা রে! কত-কত আঘাত তাকে সহ্য করতে হবে বলেই কি সর্বাঙ্গের সবচেয়ে পুরু? নাকি পিছন থেকে চোরাগোপ্তা আক্রমণের আশঙ্কায় পিঠের ত্বক নিজে-নিজেই হয়েছে মোটা?

স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বিছানায় চিৎ হয়ে শুই যদি, পচে যাওয়ার ভয় তুলনায় তাহলে কমই। অন্তত চোদ্দো মিলিমিটারের জন্মগত রক্ষাকবজ তো পিঠে জড়িয়ে। কিন্তু তারও যে ক্ষয় আছে বা পচন!

সকালে জামাইয়ের দোকানে ভাস্করদা– পিন্টু, একরামের ব্যবস্থা কী করা যায়?

ওটা আমার উপর ছেড়ে দাও—পিন্টুদার ট্যাবলেট-বোজা চোখ সামনের রাস্তায়। আমার দিকে তাকিয়ে— তোমার না আজ মেসে যাওয়ার কথা? যাও, ঘুরে এসো।

সেই থার্টিফোর-বি। সিঁথি মোড়ে গিয়ে মূল স্রোতে, মানে বিটি রোডে। টালা ব্রিজ পেরিয়ে বাটা স্টপ। নেমে ডানদিকে গেলে অমৃত পত্রিকার অফিসই শুধু নয়, তার আগে ডানহাতি পড়বে প্রবুদ্ধদের বাড়ি। একটু এগিয়ে ডানদিকের গলি ধরে এগোলে ঠাকুর রাধাকান্ত লেনে প্রসূন।

বাস সোজা পাঁচমাথায় ঘোড়ার মুখ ঘুরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট মানে বিধান সরণি। সকালের হাতিবাগান গুটিগুটি পেরিয়ে গ্রে স্ট্রিট। ডানদিকে, কাছেই, রণজিতের (দাশ) মেস। স্টার, রূপবাণী। কর্পোরেশন, আসলে জহরের (সেনগুপ্ত) অফিস। ডাইনে পেট্রোল পাম্প। পাশের গলি দিয়ে এগোলে রামকৃষ্ণ প্রেস। দেখা মিলবে কালিমাখা জগন্নাথ পানের, যে-কালি আসলে প্রেসের রক্ত। তারপরই একদিকে নেতাজিখ্যাত তেলেভাজার দোকান, অন্যদিকে রঙমহল পেরিয়ে বলবার মতো সেই স্যাঙ্গুভ্যালি। বিডন স্ট্রিট টপকে হেদো। তার জল সাঁতরে স্কটিশ চার্চ কলেজ। এপারে বেথুন। বিবেকানন্দ রোডের কাছে শিবশক্তি। সরবতের দোকান। সিদ্ধিলাভের টানে সন্ধেয় জমজমাট।

শ্রীমানী মার্কেট থেকে বাস যত এগোচ্ছে, দু-পাশে বইছে কলেজ স্ট্রিটের গন্ধ। বাঁহাতি পেল্লায় একটা বাড়িকে তার বছরখানেক পর চিনেছিলাম। ততদিনে বরানগর ছেড়ে এসেছি আর বামফ্রন্ট সরকারের নির্দেশে হার্ডিঞ্জ হোস্টেল– যেটাকে বলা হত ছাত্রপরিষদের ডেন– ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে এনে গুঁজে দেওয়া হয়েছে ওই বাড়িটাতে। এক সকালে গেছি এক দেশওয়ালি বন্ধুর কাছে। যাওয়া মানে সেদিনটা থেকেই যাওয়া। পুরনো বাড়িতে নতুন হার্ডিঞ্জ হোস্টেল সে ঘুরে ঘুরে দেখাবেই। একতলা, দোতলা, তিনতলা। যেন অউধের নবাব আবুল মনসুর মির্জা মোহাম্মদ ওয়াজিদ আলি শাহকে সদলবলে লখনউ থেকে উপড়ে নিয়ে এসে ফেলে দেওয়া হয়েছে কোথাকার এই মেটিয়াবুরুজে।

পরপর ঘর। একটা ঘরের মুখে এসে বন্ধুটি দাঁড়ায়—ঢুকবে?

কেন? না, ঢুকলে সাবধানে। সাবধানে কেন? ওঘরে অমুক দাদা থাকেন। কে তিনি? বরানগর মাস কিলিঙের মূল দুই পাণ্ডার একজন। শোনা মাত্র জ্যোতি সিনেমার সেভেন্টি এমএম পর্দায় জ্বলে উঠল গব্বর সিংয়ের মুখ। সামনে শোলে। আগুন। তার বহুপল্লব শিখা পোকামাকড়কে তো টানবেই—আয়! আয়! ঢুকে পড়লাম।

ছোট্ট ঘর। লম্বালম্বি খাট। সাদা বেডসিটের উপর কালো, লম্বা, এক সুগঠিত যুবক চিৎশয়ান। যেন তার কাজই শুয়ে থাকা। খালি গা। পরনে সাদা তোয়ালে। পা দরজার দিকে। একাধিক বালিশের জন্যে মাথা উঁচুতে। চোখ খোলা। ফলে গোটা দরজাটি চোখের আয়ত্তে। বন্ধু আলাপ করিয়ে দিতে শরীর খানিকটা পিছনে টেনে তখন সে আধশোয়া। মৃদু হাসি। নম্র কণ্ঠ। দু-একটা সৌজন্যমুলক কথা যখন সে বলছিল, তন্নতন্ন করে আমি তখন খুঁজছিলাম আধশোয়া মানুষটার শরীরে কোথায় লুকিয়ে আছে সেই অপশক্তি, যে-শক্তি তাকে দিয়ে এত-এত মানুষ খুন করিয়েছে?

চা খাওয়াতে চাইলেন। তত দূর গড়ায়নি। যেমন এখন থার্টিফোর-বি ঠনঠনের কাছে এসে আটকে গেছে। কী, না সামনে ঠেলাগাড়ির একটা চাকা কাত হয়ে যাওয়ায় রাস্তার আদ্দেকটা বন্ধ।

কে আর বাসে মুখ গুঁজে বসে থাকে। চলে তো এসেছি হোমল্যান্ডে। নেমে পড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে কেশব সেন স্ট্রিট, রাজা লেন, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের ছায়াগন্ধ গায়ে-নাকে নিতে নিতে খোলামেলা আমহার্স্ট স্ট্রিট। মেসে ঢুকে পড়ব? ঢোকার আগে এভারেস্ট কাফে মন্দ কী। খিদেও পেয়েছে। বাটার-টোস্ট। চেনা সেই স্বাদ, অর্থাৎ একই রকম খারাপ। এক গ্লাস জল। সঙ্গে চা। বসে বসে সিগারেট শেষ করার আগে ভেবে নিতে হচ্ছিল হিসেবপত্রের কথা। আচমকা মেস ছেড়েছি। টাকাপয়সা? উনি করে রাখবেন। ছাড়ার খবর শুনে ম্যানেজারবাবু খুশি-খুশি। বরানগর? অ্যাডভান্স কত? ও, লাগছে না? দেখো, জায়গাটা সুবিধের নয়। কালই যাচ্ছ নাকি? দু-একদিন পরেই না হয় এসো। চিন্তা নেই। হিসেব আমি করে রাখব।

দু-একদিনের বদলে বেশ কয়েকদিন। সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, হরির সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। কারও জন্যে চা আনতে যাচ্ছে। মুখে হাসি। ভিতরের সেই কালো দাঁতটি– ভালো আছেন? ইত্যাদি। জানালা বেয়ে ম্যানেজারবাবুর গলা— এসো।

এই ক-দিনে কিছুই পালটানোর কথা নয়। পালটায়ওনি। দেওয়ালে সেই অ্যাংলো-সুইস ঘড়ি। স্টিলের আলমারি। বহুব্যবহৃত সোফা। সেই সিঙ্গল খাট। ধুতি-পাঞ্জাবি। রাতের অন্ধকারে মুখময় গজিয়ে-ওঠা বিন্দু-বিন্দু দাড়ি। সেই আধখোলা কোলাপুরি। তবু ঘরটাকে অন্যরকম লাগল। ঠিক কীরকম, বোঝা যাচ্ছে না। তাঁর বসতে বলার ভঙ্গিতে?

নয়াপুকুরের পাড়ে ছিল আমবাগান। সবই দেশি, মানে বীরভূমের নিজস্ব। আমের স্বাদ, রং, পাকার সময় আর গাছের গড়নের জন্যে গাছগুলোর নামও ছিল একেকটা। আমের গন্ধ পোস্তর মতো তো সেটা পোস্ত গাছ। টকটকে লাল? সিঁদুরে গাছ। আষাঢ় মাসে পাকলে আষাঢ়ে গাছ। কোনও গাছ হেলে আছে, তাই হেলা গাছ। তবে হেলে-পড়া গাছগুলোর আম পাকতে পেত না বলে বড়দের কদর পেত না যদিও, এইসব গাছ বাচ্চাদের ছিল ঘরবাড়ি। কাঠবিড়ালিকে পাল্লা দেওয়ার বাচ্চাও ছিল দু-একটা। যেমন নজু বা টুনু। এ হেন বাগানেরও নানা রূপ। মুকুল এলে, কুশি ধরলে, আম ডাগর হলে, পাকলে— একেক সময় একেকরকম। পাকলে ঝরিয়ে নেওয়ার পরও ছোটরা খুঁজত। জানত, কোনও না কোনও ডালে, কোথাও না কোথাও, বড় না-হলেও ছোট্ট দু-একটা আম কি পাতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারবে না? এইভাবে শত শত আমও একদিন নিঃশেষ হত। বাগান তখন যেন-বা বন্ধ্যা। তবু তো বাগান! ম্যানেজারবাবুর ঘরটা আজ যেন তেমনই।

হিসেবপত্র চুকে গেল নিমেষে। চা নিয়ে হরি দরজায়। ফলে চা। অতিথির মর্যাদায়। খাচ্ছি, এমন সময় জানালার ওপাশে বারান্দায় যে-দরজা, তার পর্দা সরিয়ে এক প্রৌঢ়া। সবার চেনা। গলা তুলে— শোনো। ফের তিনি পর্দার ভিতরে।

চায়ের কাপ তখন হাতে। ঠোঁটদুটো কুঁচকে গেল। কাপটা যখন তিনি রাখছেন, পর্দার ওপারে দুই মহিলাকণ্ঠ একে অন্যকে টপকাতে চাইছে। ম্যানেজারবাবুর পা-দুটো নড়েচড়ে কোলাপুরি খুঁজছে। আজ উঠি ম্যানেজারবাবু?

ক্লান্ত হাসি— এস। মাঝে মাঝে এসো কিন্তু?

বেরোচ্ছি তাঁর ঘর থেকে, বারান্দায় তপন। মুখার্জি। হাসলে একগালই হাসত। আরে, আসুন! আসুন!

সেই ঘর। সেই রুমমেট– ওঃ, আপনি এলেন আর ওদিকে শুরু হল কেচ্ছা। মা-মেয়ের ঝগড়া। জানেন তো সবই। আজ কলেজ ডুব দিয়েছে। খালি গা। পরনে পাট্টার পাজামা। মনে আছে এইজন্যে যে, গ্রীষ্মকালটা তপন ওভাবেই কাটাত।

আমি তখন দেখছি ঘরটাকে। ছেড়ে-যাওয়া বেডে তখনও কোনো বোর্ডার আসেনি। সম্ভবত আসবেও না। এভাবে এক-এক করে ফাঁকাই তো করতে চান ম্যানেজারবাবু। এই তপনও যদি কলেজ শেষ করে মেস ছেড়ে দেয়, ওর বেডেও আসবে না কেউ। সেই দিনটির জন্যে অপেক্ষা। এক-এক করে যেমন তাল খসে। পাকলে। নরম মাটিতে ধুপ শব্দ হবে না অবশ্য। তবু কান খাড়া করে সারা রাত জেগে কেউ বসে তো থাকে! নানা জায়গায়। নানা ভাবে।

হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুন

ব্লগ: একরাম আলি 

Comments are closed.