টবিন রোড

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    কোথাও তেমন করে যেতে চাইলে নদী পেরোতেই হয়। না-পেরোলে পৌছনো যায় না। আমি পেরোলাম বাগবাজার খাল। ঢিমে স্রোত। জল নোংরা। ঘ্যাচাং নয়, কুচ করে কেটে গেল খালের গলাটি। আর সেই ফাঁক গলে নিমেষে ট্যাক্সি ওপারে।

    হ্যারিসন রোড থেকে টবিন রোড। তাও আবার গোপাললাল ঠাকুর রোডের দিকে। সরু-সরু গলি। খোলা নর্দমা। সারবন্দি কুচো দোকানপাট। উত্তর শহরতলির দু-পাশে যত মলিনতা, সব পেরিয়ে যেতে যেতে ভাবছি দক্ষিণ শহরতলির সেই পংক্তি দু-টি— ‘কিছুই না থাকুক, শুধু দুঃখ দিয়ে/ চেনা যেতে পারে।’ প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত। কিন্তু এখানে, এমন স্যাঁতস্যাঁতে জগতে, ভরসা একমাত্র ভাস্করদা। তখনও জানি না পাশের পিন্টুদাকে, ভাস্কর চক্রবর্তীর মুখের কথা একবার খসলে যিনি অঞ্জলি পেতে লুফে নেন। কী তাঁর রিফ্লেক্স!

    সঙ্গে ছোট একটা দল। নির্দেশ পেয়ে ট্যাক্সিকে ছুটি দেওয়া হল। মালপত্র হাতে হাতে। বাড়ি পরে, আগে চলো জামাইয়ের দোকানে। কী পাওয়া যায় সেখানে? চা-বিস্কুট-ওমলেট-পাউরুটির সঙ্গে চাল ফোটালে দিব্যি ভাতও হয়। ভাতের গন্ধে আসে মাছ বা ডিম বা প্রাণান্ত মাংস। বরানগরে পদার্পণের দিনটিকে সেলিব্রেট করতেই হবে। ঢালাও চায়ের হুকুম হল। তার আগে হাতে হাতে বিস্কুট। সুতৃপ্তি বা অমৃতায়ন না-হোক, রবিবারের আড্ডা তো। হোক না চালাঘর। কম কীসে?

    ঘণ্টাদুয়েকেই স্পষ্ট হল— বরানগর একটা পৃথক জনপদ। এখানকার লোকে কলকাতা যায়।

    প্রতিটি জনপদের নিজস্ব কিছু কষ্ট যেমন থাকে, তেমনই থাকে গর্ব। যাঁর বাড়িতে ভাড়াটে হতে চলেছি, সেই উৎসাহী তরুণ নাগাড়ে আশ্বস্ত করতে চাইছেন— কোনও ধ্যাদ্ধেড়ে বামনগাছিতে আমি এসে পড়িনি। এখানে সন্দীপনদা থাকেন। থাকতেন তুষার রায়। তাঁর ভাই ফাল্গুনি রায় রয়েছেন। শূন্যে ঠেস দিয়ে শেষ তাস ইস্কাপনের টেক্কাটি ফেললেন– এখানেই থাকতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

    বাড়িটি অগোছালো। দক্ষিণে বহু পুরনো একতলা বাড়ি। উত্তরদুয়োরি। তাতে একসার ঘরের একটা আমার। বাথরুম উঠোন পেরিয়ে। উঠোনে মস্ত পেয়ারা গাছ। আরও দু-একটা খুচরো গাছপালা। কাঠবিড়ালিরা ঘুরত উঠোনে। বেড়াল আর কুকুরের অবাধ যাতায়াত। কেননা, উঠোন ছিল উন্মুক্ত। গাঁয়ের কোনও গরিব উঠোন যেন। পেয়ারা গাছকে সামনে রেখে পুবদুয়োরি একটা বাড়ি, যার বারান্দা টালির। উঁচু দাওয়া। সেটাতেই মা-সহ দুই ভাই। ছোট নান্টু। বলতেই হবে যে, নান্টুই বরানগরের ভিতরটা দেখিয়েছিল। তার অলিগলি। নানা রকমের পরিবার। মানুষজন। সেসব বরানগর গণহত্যার আট বছর পরের কথা।

    দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া একটা জনপদ। চারদিকে নিম্নমধ্যবিত্তের আধিক্য। কোনও বাড়িতে ছোট্ট বসার ঘর। চা-বিস্কুট। ওদিকে রেকর্ডপ্লেয়ারে বেজেই চলেছে— মানুষ মানুষের জন্যে। ভুপেন হাজারিকার প্রবন্ধসঙ্গীত। আড্ডায় আটষট্টি উনসত্তর সত্তর একাত্তর সালের দিনগুলো, যে-দিনগুলো গৌরবের অবক্ষয়ের আর মানুষের রক্তের পচা গন্ধে ভরা।

    কোনও বাড়িতে ‘বউদি’ হাঁক দিয়ে সরাসরি ভিতরে যাওয়া যায়। ছত্রিওয়ালা সস্তার খাট। ছত্রিতে ঝুলন্ত রকমারি জামাকাপড়। খাটে, তারই ফাঁকে, তাস খেলা চলছে তো চলছেই। বোর্ডে টাকা, খুচরো পয়সা। চা আসছে। তেলেভাজা। সবকিছুর তদারকিতে ছিপছিপে সেই দশভূজা বউদি।

    সেদিন পনেরোই অগাস্ট। সকালবেলা ঘটল একটা দুর্ঘটনা। সর্বজনীন ছুটির দিনে ফাঁকা গোপাললাল ঠাকুর রোড। ভাস্করদার অলিখিত নেতৃত্বে বড় একটা দল আড্ডা দিতে দিতে হাঁটছি। উত্তর থেকে দক্ষিণে। পিন্টুদাদের ছোট্ট আবাসন পেরিয়ে সরু একটা গলি। মুখে শিশু–কিশোরদের জটলা। হাতে খুচরো সব বাজি-পটকা। ফাটাচ্ছে। ছুঁচোবাজির একটা ফিতেই হবে সম্ভবত। দেশলাই জ্বেলে সামনের রাস্তায়। আমাদের গমনপথে। কারও কারও পায়ের ফাঁকে। ঠুই, ঠাই। হঠাৎ দায়িত্ব নিয়ে ফেলল নান্টু। সম্ভবত স্মৃতি থেকে। তার চিৎকার– বাজি কেন? পনেরোই অগাস্ট। কেন? আজ কি তোর বাবার বিয়ে? যা, ঢোক ভেতরে। সঙ্গে আরও দু-চার কথা।

    হাঁটতে হাঁটতে আমরা অনেকটা দক্ষিণে চলে গেছি। রাস্তার চা-দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা। ভাস্করদার ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়ে ফিল্টার উইলস। ফিরছি। জায়গাটা বরানগর তো। এখানকার মানুষজন বিপদের আগাম গন্ধ পেয়ে যায়। কে যে প্রথম পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, আজ মনে নেই। মনে আছে দু-দিকে দু-হাত ছড়িয়ে পিন্টুদার দাঁড়ানো— কেউ এক পা এগোবে না।

    টবিন রোডের মুখটা কীরকম থমথমে না? পিন্টুদা, সরুন– নান্টুর গলা। এবং ছিটকে বেরিয়ে যায়। পিছু-পিছু আমরাও। তবে ধীরপায়ে। একটু এগোতেই চোখে পড়ে টবিন রোডের মোড়। সেখানে রাস্তার মাঝে একটা সাইকেল রিকশা। রিকশার উপর পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে কালো, রোগা একটা লোক। নান্টুর দাদা না? হাতে জটিল কোনও আগ্নেয়াস্ত্র। সেটা চারদিকে ঘোরাচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে— হিম্মত থাকে তো বেরিয়ে আয়। ভাইয়ের নাম তুলে কে কী বলেছিস, আরেকবার বল।

    হ্যাঁ। নান্টুর দাদা। বাচ্চাদের ছুঁচোবাজি আর তার পরের কথা-কাটাকাটি থেকে এত বড় একটা কাণ্ড ঘটতে পারে, হাতে উঠে আসতে পারে স্টেনগান যার নাম— ধারণার বাইরে ছিল। আরে! যে-বাড়িতে আমি থাকি, সেই বাড়িরই একটা অংশে ভয়ঙ্কর ওই যন্ত্রটা থাকে, ঘুমোয়, খিদে পেলে খেতেও তো চায়! সরতে সরতে কখন যেন নিজেকে আবিষ্কার করি ভাস্করদার একেবারে পাশটিতে। তাঁর ভিতরে যেন বিড়বিড় করে কেউ আওড়াচ্ছে— ‘এক মুহূর্তের রক্ত/ অন্য মুহূর্তের গায়ে ঝরে পড়ে।’ পিন্টুদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সিগারেট এগিয়ে দেন। ‘বিছানার ওপর/ রক্ত ঝরে পড়ে সমস্ত জীবন বেয়ে।’

    ওদিকে দাদাকে রিকশা থেকে নামিয়ে নান্টু নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। ততক্ষণে গোপাললাল ঠাকুর রোডের লম্বাটে আকাশে উঁকি মারছে সেই পঙক্তিগুলো— ‘…আমি/ মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই/ তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি এখন— যেদিক দিয়ে আসি, সেদিকেই দৌড় দি’। দেখতে পাই— যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও মাঠে-ময়দানে যেমন থেকে যায় লুকোনো মাইন, নান্টুর দাদার হাতের যন্ত্রটিও তেমনই।

    তারপরই বাড়িটাকে ভয় পেতে শুরু করি। ঘরের মেঝে স্যাঁতসেঁতে। গুমোট গন্ধ। চামড়ার সুটকেস ছিল একটা। কোনও দরকারে সুটকেসটা সরাতেই দেখি— তলাটা যেন ভিজে-ভিজে। ট্যানড চামড়া যদি পচে যায়, কাঁচা আর জ্যান্ত চামড়া? এখানে শুয়ে থাকলে আমিও তো পচে যাব একদিন!

    ঘরটা চোখ ঘুরিয়ে দেখি। বহু পুরনো একটা দরজা। জানালাও তেমনই। মাত্র একটা। দুটোই একই দিকে। দু-জন মানুষ মুখোমুখি হলে কথার জন্ম হতে পারে। সেসব কথায় হাসি খেলে যায়। না-গেলেও মনের গলিঘুঁজিতে হাওয়া ঢুকতে পারে। ঘরের দরজা-জানালা তেমনই—মুখোমুখি থাকলে হাওয়া। কিন্তু এ-ঘরে ঢুকবে বা বেরোবে, তেমন উপায় নেই। আমারও ঢোকার বা ইচ্ছে মতো বেরোবার উপায় নেই। হয় ঢুকতে হবে, নয়তো বেরিয়ে যেতে হবে। প্রথম কাজটি করে ফেলেছি। পরেরটা? ছ্যাতলাপড়া, ম্যাপ-আঁকা দেওয়ালে এই প্রশ্নের কোনও নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই যে!

    হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুন

    ব্লগ: একরাম আলি 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More