বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

প্রস্থানপর্ব

একরাম আলি

হ্যারিসন রোড ধরে হাঁটছি। হাতে সস্তার সিগারেট। সস্তা ধোঁয়া। ফুটপাথের এখানে-ওখানে ঘুমন্ত মানুষজন। যে-ঘুম সস্তা-দরে কেনা, সে-ঘুম তো হুটহাট ভাঙবেই। ফিরছি এমন একটা মেসে, যেখানে মেদিনীপুর শ্রীরামপুর নদীয়া পুরুলিয়া বীরভূম থেকে গত কয়েক বছর কত-যে সমবয়স্করা এসেছে। রাত কাটিয়েছে কেউ। গ্রীষ্মের ছাদ থেকে আড্ডা গড়িয়ে নেমে গেছে ট্রামলাইন পেরিয়ে ওপাশের নীচু আর গভীর রাতের ছাদে। সাত না-হলেও আটসকালে হাজির কেউ-বা। কোনওদিন মাঝরাতে বেসামাল সাত-আটজনের দল নেতিয়ে পড়েছে মেসের চৌকাঠে। তাদের দলনেতা হয়তো-বা প্রিন্স মিসকিন। তারা অনেকেই আজ বিখ্যাত। আজকের অনেক তরুণ কবির পরম শ্রদ্ধেয় তারা। তাই গেঁয়ো শরীরে তাদের নামাবলির ঝলমলে ফ্লেক্স জড়িয়ে সে-রাতে মেসে ফেরার নীচু পদক্ষেপগুলোয় তাপস সেনের আলো ফেলতে চাই না।

শুধু বলব—

‘ইয়েস, আই হ্যাভ ফলোড দেম, টাইম অ্যান্ড এগেইন!
ওয়ান, আই রিকল, হোয়েন সানসেট, লাইক আ হার্ট,
ব্লেড থ্রো দ্য স্কাই ফ্রম উন্ডস অফ রাডি স্টেইন,
পেনসিভলি স্যাট আপন আ সিট অ্যাপার্ট, …’

আমহার্স্ট স্ট্রিট সেদিন একটু বেশিই যেন চওড়া। পেরিয়ে আসতে আসতে চোখে পড়ল অনেক কিছু। বন্ধ পুঁটিরামের সামনে শালপাতার ঠোঙার দখল নিতে চাইছে দুটো কুকুর। রাস্তার উলটোদিকে বন্ধ বাটা। পাশের গলি সেঁধিয়ে গেছে সরু অন্ধকারে। সেই অন্ধকার গায়ে লাগিয়ে ওপারে গেলে পটলডাঙা স্ট্রিট। আঁকাবাঁকা। তারই গায়ে দশাসই চৌকো বাড়ি। পুরনো। চওড়া তার দরজা-জানালা। রেলিঙে শত বছরের পাক-খাওয়া নকসা। তারই ভিতর অতিকায় শিশুর মতো হেমন্ত আঢ্য।

প্রথম যেদিন যাই– আগে আগে হেমন্ত, পিছনে আমি। সিঁড়ি চওড়া। পায়ের শব্দে উপর থেকে উঁকি। বাবা। উঠে বারান্দা। ডানদিকে মা কিছুতে ব্যস্ত। আলাপপর্ব। মস্ত খাঁচায় প্রাচীন চন্দনা। পালকগুলো আজও রঙিন, কিন্তু বুড়োটে আর শক্ত। মেঝেয় প্রবৃদ্ধ এক ইয়োরোপীয় শুয়ে। চতুষ্পদ। তবে কোন গোত্র, আজ আর মনে নেই। চেয়ারে এক প্রাচীনা। ঠাকুমা। সবকিছুই ছায়া-ছায়া। এমন বয়োভারাক্রান্ত দোতলা ছাড়িয়ে আমরা উঠি তিনতলার আকাশে। হেমন্তর ঘর। ঢুকেই সামনে চেয়ার-টেবিল। পাশে খাট। মেঝেয়, এককোণে, ছেড়ে-রাখা জামাকাপড়। টেবিলে অ্যাশট্রের ভূমিকায় মস্ত এক কৌটো। খোলা খাতা। পেন। এমনই এক খাতায়— হেমন্তর মুখে শোনা— কিছু-একটা লিখছিল সে। কোনো-এক তরুণের কথা, যে ভাবিল– আত্মহত্যা করিবে।

তারপর আড্ডা, পড়াশোনা, কবিতা, পথে পথে ঘোরা। দিনকয়েক পরে হেমন্ত দেখে—খাতায় সিদ্ধান্তবাক্যটির নীচে লেখা— ভাবিয়াই ক্ষান্ত হইল? বোনের হস্তাক্ষর। মনে মনে দমফাটা হেসে সে-যাত্রা সে রেহাই পায়।

মাঝেমাঝে যেতাম। সে-ও আসত। ট্রামলাইন কাঁপিয়ে আমার মেসে। পরনে ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবি। এমন ভঙ্গি, মনে হত– রেগে আছে। হাজার-একটা কারণ অবশ্যই ছিল এবং সেগুলোর সব আমার জানাও ছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই মুচকি হাসি— কী, কফি হাউসে যাবে নাকি? তাকে কোনোদিন যেতে দেখিনি।

একদিন বেশ উত্তেজিত। খুশি-খুশি। কী? সিঁড়িতে পাঁচটাকার একটা সবুজ নোট কুড়িয়ে পেয়েছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? পাঞ্জাবির পকেট থেকে বার করে সে দেখায়। টাকাটা নিয়ে কী করা যায়? মির্জাপুর ধরে সোজা শেয়ালদামুখো। ক্যায়ফি। কাছাকাছি একমাত্র রেস্তোরাঁ, যেখানে ওয়েটারদের গায়ে উর্দি। লোকে আদর করে বলত— ছোটো আমজাদিয়া। পাঁচ টাকা মাত্র সম্বল করে? আরে, ওখানে পাওয়া যেত চমৎকার একটা ডিশ। পাতলা সোনালি ঝোলে মিহি দু-একফালি পেঁপে, মুরগির গলা ইত্যাদির অংশ, পেঁয়াজ একটুকরো। আইরিশ স্টু। প্লেট মাত্র একটাকা। কেন আইরিশ, কেউ জানে না। হয়তো আইরিশদের হ্যাটা করতে ব্রিটিশদের কারসাজি! সে যা-ই হোক, আমরা তো পেতাম ধোঁয়া-ওঠা অপার্থিব স্টু! সঙ্গে গরম তন্দুরি রোটি। শেষে দুধে-চিনিতে জরানো এককাপ করে সর-ওঠা চা।

একদিন পটলডাঙা ধরে ওদের বাড়ির দিকে হাঁটছি, উলটোদিক থেকে খর্বকায় এক বৃদ্ধ। ধুতি-পাঞ্জাবি। ধীরপায়ে এগিয়ে আসা কৃষ্ণবর্ণ মানুষটি কাছে আসা মাত্র হেমন্তর গম্ভীর নির্দেশ— প্রণাম করো। ইনি সত্যপ্রসন্ন দত্ত।

থাক! থাক! বললেই কী আর সোজা থাকা যায়? আভূমি নত তো হতেই হয় সঞ্জয় ভট্টাচার্যর চিরসঙ্গীর সামনে। তাই বলে এমন সজোরে এবং আচমকা নির্দেশ দিয়ে অপ্রস্তুতে ফেলা? কিন্তু হেমন্ত যে এমনই। আপাতশান্ত। ভিতরটা নানান মতলবে ঠাসা।

বন্ধ আর্য ফ্যাক্টরির দু-ধাপ সিঁড়ি। উপরের ধাপে বসে নীচের ধাপে ছড়ানো পা। বাঁ-হাতি মেসের দরজাটি হঠাৎ গুরুত্ব হারিয়েছে। একটা তো মোটে রাত। সকাল হলে এই দরজাটিই হবে বিদায়-দ্বার। সিঁড়িতে শুয়ে পড়লে কেমন হয়? এই তো সেদিনের কথা। বেসামাল কয়েকজন বন্ধুকে এখানেই ফেলে উঠে যেতে হয়েছিল। মহাপ্রস্থানের পথে যেন যুধিষ্ঠিরের ভাইয়েরা।

হয় কী, কফি হাউসে একদিন সমরজিৎ সিংহের আগমন। সে তখন কৃত্তিবাস ছেড়েছে কি ছাড়েনি। ডোভার লেন-বাসী কোনো-এক লোকেন চক্রবর্তী নামের ভদ্রলোক তখন সমরজিতের মেন্টর। তিনি নাকি ডিনারে আমাদের ডেকেছেন। কাস্টমস ক্লাবে। কী-একটা পত্রিকা করতে চান। ডিনারের আসল উদ্দেশ্য নাকি সেটাই।

বড় ব্যাপার। ফলে দলও বড়। সে-দলে কে-কে ছিল? আট-ন-জন তো বটেই। জহর সেনগুপ্ত-সহ আমাদের সময়ের বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে। ময়দানে কাস্টমস ক্লাব খুঁজেও পাওয়া গেল। ছড়ানো লনে ছড়িয়েছিটিয়ে টেবিল। ঘুরে ঘুরে তদারক করছে সমরজিৎ। চালচুলোহীন হলেও সে-ই যেন আমন্ত্রণকর্তা! ফলে পানভোজন অতিরিক্তই হয়েছিল বলা যায়। এদিকে টেবিল থেকে রাত কতটা গড়িয়েছে, কেউ জানে না। চারপাশ ঘাসে-ঢাকা অন্ধকার। এখানে-ওখানে আলো। সব শুনশান। একটা সময় এল, নিজেদের কথা ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। লোকেনবাবু জানতে চাইলেন, কোথায় পৌঁছে দিতে হবে। বেশ খানিকটা তর্কবিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হল—শিয়ালদা। সবাইকে? হ্যাঁ, সবাইকে।

সে-রাতে দুটো অ্যামবাসাডর-বোঝাই পুরো দলটাই শিয়ালদার নামে এসে পড়ি প্যারামাউন্টে। কিন্তু শোবে কে কোথায়? আমার সঙ্গে না-হয় একজন। বাকিরা? দ্রুত সিদ্ধান্ত—কেন, এই সিঁড়িতে? সন্ধ্যে থেকে এতজনের মুখে বিপুল খাবারের সঙ্গে গলা অবধি দামি পানীয়ের জোগান দিয়েছে যে-সমরজিৎ, সে-ও বিশেষ সুবিধা পায়নি বা নেয়নি। শুয়ে পড়েছিল সিঁড়ির ধাপে, যা আসলে রোয়াক।

বড় হতে হবে। নিজের পোশাক নিজে পরতে হবে। নিজে-নিজে খেতে শিখতে হবে। ছিটকিনির নাগাল পাচ্ছো না তো? তাহলে বোঝো, বড় না-হলে দরজা বন্ধ করবে কী করে? নাতনি প্রবল প্রতিবাদ করে— কিছুতেই সে বড় হবে না। কেন হবে? সে তো এরকমই থাকতে চায়! আহা রে, আমরাও যদি আর বড় না-হতাম, দিব্যি রোয়াকে শুয়ে পড়তাম আজও।

সেই রোয়াক। বসে আছি।

বাবু!

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, চাবির গোছা হাতে শংকর– খাবেন না? গেট বন্ধ করব তো! ক-টা বাজে জানেন?

হাতে সিগারেট। মুখে হাসি। তবু সামাল দেওয়া গেল না। সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে ‘হ্যাঁ, যাই’ বলে উঠে পড়ি। কোনোদিকে না-তাকিয়ে ঢুকে যাই মেসে, যে-মেসটা মোটের উপর মন্দ ছিল না।

কয়েক ঘণ্টা পরই সকাল হয়ে যাবে। গুছিয়ে ফেলতে হবে সব। আর এসবের মাঝে নানাজনকে নানা কথার উত্তর দিয়ে যেতে হবে। ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি শেষ। জানালার ওপারে সোফায় গা এলিয়ে ম্যানেজারবাবু। সামনে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে শুয়ে আছে বেড়ালগুলো। বেশিরভাগ ঘর অন্ধকার। সেইসব দরজার কোনো-কোনোটির দিকে তাকিয়ে মনে হল–

‘এইখানে সেইসব (অ)কৃতদার, ম্লান দার্শনিক
ব্রহ্মাণ্ডের গোল কারুকার্যে আজ রূপালি, সোনালি মোজায়িক।‘

হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুন

ব্লগ: একরাম আলি 

Comments are closed.