বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮

কলকাতা

একরাম আলি

চুয়াত্তর পঁচাত্তর ছিয়াত্তর সাতাত্তর— সে-সময় কত যে অজানা গাঁ-গঞ্জ থেকে লিটল ম্যাগাজিনের উদয়! কত তাদের নাম। বেশির ভাগ পত্রিকার অপমৃত্যু ঘটতেও সময় লাগত না। দেশের শিশুমৃত্যুর হারের সমান বলা যায়। আশ্চর্যের যে, পত্রপত্রিকার সংখ্যায় তবু ঘাটতি পড়ত না! একটা শুশুক ডুবলে অদূরে জল ফুঁড়ে ভুস করে জেগে উঠত আরেকটা শুশুকের জেদি মাথা। মেদিনীপুর পুরুলিয়া বাঁকুড়া বীরভূম বর্ধমান নদীয়া পশ্চিম দিনাজপুর জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ি– কোত্থেকে কখন কার প্রকাশ ঘটবে, কেউ জানে না। বিশেষ হওয়ার তেমন উচ্চাশা কারও ছিল না। প্রতিটি পত্রিকাতেই ছাপা হত নিজেদের নতুন আর টাটকা লেখা। এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছিল বাংলা কবিতা যে, হাওয়ারগাড়ি ঘুঘুমারি কোচবিহার— এটা-যে কোনও কবির ডাক-ঠিকানা হতে পারে, বিশ্বাস না-করে উপায় কী? স্বয়ং অরুণেশ ঘোষ থাকতেন যে!

কফি হাউসের উদ্দাম ভিড়ে এমন একেকটা নাম পঞ্চাশ বছর ধরে আজও দাঁড়িয়ে। সেই শীর্ণ শরীর। একই মলিন ধুতি-পাঞ্জাবি। পায়ে ধুলোয়-আঁকা চটি। একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে। নাকি অবনতমস্তকে? কফি হাউসের সিঁড়িতে তিনি। অপেক্ষায়। ভিতরে তো এইমাত্র কথা হল! হল, কিন্তু হাতে সময় নেই যে। যদি একটু খেয়াল করে আপনার কবিতাটি তাড়াতাড়ি পাঠান।

বিষ্ণু সামন্ত। একেবারে সামনে। মৃদুভাষী, বিনয়ী। মেদিনীপুর জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ। দীঘা? নাকি দীঘার আশপাশের কোনো গ্রাম থেকে আসতেন? কবি, চিত্রশিল্পী। ‘কবিতা বার্ষিকী’ নামে সংকলন করতেন প্রভাত মিশ্রের সঙ্গে যৌথভাবে। সেটি ছিল প্রথম সংকলন। অর্থ নেই, প্রতিপত্তি নেই, তেমন পরিচিতিও নেই যা দাপুটে, এমনকী জেদের বহিঃপ্রকাশ পর্যন্ত নেই। তবু তখনকার ভঙ্গুর রাস্তা উজিয়ে, ট্রেনে-বাসে এত দূর এসে, কথা শেষ হওয়ার পরেও সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে? লজ্জায় ততক্ষণে মাথা এত ভারী যে, তোলার সাধ্য নেই। এমন মানুষের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যায় না। সিঁড়ির ফাঁক গলে তরতরিয়ে নেমে— আহ, মুক্তি!

প্রথম সংকলনটি বেরোয় পয়লা আশ্বিন তেরোশো চুরাশি, জুলিয়েন ক্যালেন্ডারে যে-সালটি উনিশশো সাতাত্তর। প্রিন্টার্স লাইনে দেখছি— ছাপা হয়েছে রামনগর, মেদিনীপুর থেকে। ছাপাখানার নাম? মাতৃ প্রেস! প্রকাশক শিখা সামন্ত। বিষ্ণু সামন্তর অকালপ্রয়াত স্ত্রী। কবি। ব্যবহারে বিনয়, প্রকাশে বিনয়, পুকুরে-কাচা পোশাক নোনা হাওয়ায় এলোমেলো। তবু প্রথম সংখ্যাতেই ঝোড়ো উপকূলবাসী সম্পাদকদ্বয়ের ঘোষণা ছিল— ‘আমরা বিশ্বাস করি, কবিতামাত্রই রোম্যান্টিক বিদ্রোহ, যার ভাষা ঘনিষ্ঠ সময়ের স্পর্শশিকার ছাড়া অন্য কিছু নয়।’ সময়ের নিষ্পেষণে বিস্ময়বোধ আজ না-হয় কিছুটা আহত। তাই বলে আজ থেকে বিয়াল্লিশ বছর আগের সেই মাতৃ প্রেস আর তার মফস্বলি কম্পোজিটারের কালি-মাখা হাতদুটোর কথা কি মনে পড়ে না? তাঁর চোখমুখ?

ছিয়াত্তরে প্রকাশিত একশো একজন কবির তালিকাশীর্ষে ছিলেন অজিত দত্ত, সবার শেষে জয় গোস্বামী। সংকলনের কত-যে কবি আজ প্রয়াত, সময়ের আলপথে এঁকেবেকে কতজন-যে নিরুদ্দিষ্ট—তালিকাটি দেখলে ভয় হয়। একেকটা সংকলনই বলে দেয়— বিবর্ণ প্রচ্ছদ ওলটালে যে- সূচিপত্র, তার পৃষ্ঠাগুলো বাংলা কবিতার একেকটা ইতিহাস যেন-বা। বিষ্ণু সামন্তরা যদি সেই ইতিহাস-সরণিতে স্থান না-পান, বাংলা কবিতারই ব্যর্থতা সেটা।

তখন সাতাত্তর। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বিপজ্জনক নীতিবোধ চাগাড় দিয়ে উঠল। পড়ি না যখন, বাড়ি থেকে টাকা নেওয়াও উচিত নয়। এদিকে ফুল বেকার! অথচ চারমিনার ছেড়ে কখন যেন ঢুকে গেছি ভাজিরে। ফলে হপ্তায় অন্তত তিন দিন অমৃত পত্রিকার অফিস। ঢোকার আগে মোড়ের দোকানে চা। সিগারেট।

দু-তিনটে ছাইপাঁশ লেখা বেরিয়েছে কি বেরোয়নি। কিন্তু ওই ক-দিনেই অন্য একটা জগৎ ডাকতে শুরু করেছে— আয়! আয়! সে-পৃথিবীটা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের। বিচিত্র তার আকর্ষণ। অথচ, ঢুকে পড়লে অজানা অ্যাসিডের তীব্র ঝাঁঝ নাকেচোখে লাগে। একদিন গেছি। শ্যামলদার হাসিমুখ—ও-ঘরে যা। তোর একটা বিল পড়ে আছে। ও-ঘর? এসব সংকটে পরিত্রাতা একজনই। পাশের টেবিলে বসতেন কনুই অবধি হাতা-গোটানো পাঞ্জাবি। চৌকো মুখ। দাঁতে সিগার। চুল? ব্যাক ব্রাশ হতেই হবে। সাদা-কালো বাংলা সিনেমা থেকে কষ্ট করে উঠে এসে জানালেন– গলির ওপারে।

ঘরটা কেমন? এখন বলতে পারি– গরবাচভের আমলে সোবিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির একদা ক্ষমতাশালী কোনো পদাধিকারীর। প্রতিটি কাজকর্মের কোনও-না-কোনও শব্দ থাকে। এ-ঘরটা নিঃস্তব্ধ। বসে আছেন রূপবান এক প্রৌঢ়। মনীন্দ্র রায়। আলাপ হল। কথা এগোচ্ছিল না। বারবার মনে পড়ছিল— ইনি অনন্যর বাবা। খাতাপত্র দেখে পাশের একজন বললেন ও-বাড়িতে যেতে।

ও-বাড়ি মানে যুগান্তর। এই ক-দিনে একবারই গেছি সেখানে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ অমিতাভ চৌধুরীর ডাকে। গর্বিত মুখে শ্যামলদা বলেছিলেন— যা, অমিতদা তোকে দেখতে চেয়েছেন। তারপর আর কী? স্যুইং ডোর। বহু বছরের ধাক্কা সামলানো। তার সামনে বেয়ারা। নাম বলতে ঢোকার অনুমতি। একবার মুখ তুলে ‘বোসো’ বলেই অতি ব্যস্ত তিনি স্লিপের পর স্লিপ কেটে যাচ্ছেন। যাকে বলে, ঘ্যাঁচ-ঘ্যাঁচ করে। এত দ্রুত, পড়ছেন কিনা সন্দেহ। খবরের কাগজের একটা চালু কথার জ্যান্ত রূপ সেদিনই প্রথম দেখি— যে-লেখা কাটা যায় না, সে-লেখা ছাপা যায় না। হাতে সিগারেট। ছাই পড়ো-পড়ো। টেবিলে প্যাকেট। ফিল্টার উইলস। বাঁহাতের আঙুলে আলতো টোকা। প্যাকেটটা এগিয়ে এল— নাও।

কী আর করা। ফস করে ধরিয়ে ফেললাম। তারপরের গল্প আলাদা।

আজ এসেছি দক্ষিণা নিতে। জীবনে প্রথম। ক্যাশের ভদ্রলোক করুণাবশত একবার তাকালেন। নাম? অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে পাতা ওলটানো শুরু হল। কী আশ্চর্য, খুঁজেও পেলেন! টাকার বদলে ড্রয়ারের ভিতর থেকে যে-বস্তুটি এগিয়ে এল, দেখে হতভম্ব। এ তো চেক! ভিক্টোরীয় যুগের হস্তলিপি জ্বলজ্বল করছে– রুপিস ওয়ান হান্ড্রেড টুয়েন্টি ওনলি। কী করি? ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই তো নেই। নীরবে নেমে আসি।

কিন্তু শহরটার নাম-যে কলকাতা। পয়সা ফেললে বাঘের দুধ মেলে—এটা না-হয় কথার কথা। তাই বলে রাস্তাঘাটে চেক ভাঙানো যাবে না? গণেশ অ্যাভিনিউয়ে এলআইসি অফিসে একজনের খোঁজ পাওয়া গেল। চেক নিয়ে হাতে-নগদ টাকা। বেরিয়ে দেখি, কলেজ স্ট্রিট অ-নে-ক-টা রাস্তা। এই বিকেলে কে যায়! বরং কাছেই কেটি। গেটের বাঁদিকে শালপাতার ঠোঙায় পেঁপে, ছোলা, বাদাম, শশা। হাতে নিয়ে টুক করে ঢুকে পড়া। ভিতরে মিশ্র কলরব। খেয়াল করলে, টেবিলে টেবিলে হিন্দির বকবকম। উত্তর কলকাতায় তখনই একটা রসিকতা চালু হয়ে গেছে— কলকাত্তামে বহোত বঙ্গালি হো গয়া।

তারপর ইউবিআইয়ের কলেজ স্ট্রিট শাখায় অ্যাকাউন্ট হল। সেখানে নিশীথ ভড়ের চাকরিও হল। কিন্তু ভোরবেলা কলকাতার রাস্তা ধোয়া বন্ধ হয়ে গেল চিরতরে। বছর কুড়ির মধ্যে চারদিকের জাঁকজমক গেল বেড়ে। যেখানে-সেখানে হাইরাইজ। বহুদিন চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশনাল ছিল সর্বোচ্চ বাড়ি, যদিও টাটা সেন্টারের তীক্ষ্ণতা সে-বাড়িতে ছিল না। কী-একটা বিশেষণ আছে না? স্লিক না কী যেন? ষোলোতলা টাটা সেন্টারেরে ক্ষেত্রে ওটি লাগসই। আর এখন? তিরিশ, পঁয়তিরিশ, চল্লিশ ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে কলকাতার মাথা। গ্রান্ডের কৌলীন্যকে নস্যাৎ করে এক গন্ডারও বেশি পাঁচতারা হোটেল। নিউ টাউন ঘুরে এই সেদিন এক বাংলাদেশি বন্ধুর সিঙ্গাপুর-স্মৃতি চাগাড় দিতে দেখলাম। টাটারা আলিপুরে একটা বাড়ি করছে। বর্ধমান রোডের উলটোদিকে, ডায়মন্ড হারবার রোডে। সবচেয়ে সস্তার অ্যাপার্টমেন্টটি– আঠারোশো বর্গফুট– পাওয়া যাবে মাত্র তিন কোটি তিন লাখে!

তাজ বেঙ্গলের ছ-তলায় নরম সোফা। টিপয়ে দুটো সুদৃশ্য কাচের পাত্র। গম্বুজ-আকারের ঢাকনা তাতে। একটাতে কাজু, অন্যটাতে অ্যামন্ড। দুটো জলের বোতল। সামনের দেওয়ালে বড়ো স্ক্রিনে সাইট ম্যাপ। খাবার বা পানীয়? ব্ল্যাক টি। শুনে ওয়েটারের প্রস্থান। রিমোট হাতে একজন– স্যর, মনে রাখবেন, এই প্রোজেক্টের সঙ্গে টাটার ব্র্যান্ডনেমটা কিন্তু জড়িয়ে। এটা বানাচ্ছে দুবাইয়ের অ্যারাবিয়ান কোম্পানি। প্ল্যান সিঙ্গাপুরের এক কোম্পানির, যারা ওই শহরের বেশিরভাগটার প্ল্যানার। থার্টি সেভেন্থ ফ্লোর থেকে শুরু হচ্ছে স্যর ক্রিস্ট্যাল ভিউ। তিনটে দিকই কাচের। গোটা শহরটা আপনি দেখতে পাবেন বাড়ি বসে। এত রকমের সুবিধে আজ পর্যন্ত কলকাতায় কেউ দিতে পারেনি। যখন উনি বলছিলেন, বাজনার তালে তালে পরিকল্পিত বাড়ির নানা অংশে তখন ক্যামেরা ঘুরছে। নর্তকীর সারা শরীরে যেমন বলিউডি ক্যামেরা।

কারা থাকবে এখানে? থাকবে তো কেউ বটেই। কিন্তু আমাদের কলকাতাটার কী হবে? সেই কলকাতার, ফুটপাথে বেঞ্চে বসে চা খেতে-খেতে যাকে নিজের মনে হয়েছিল? আসলে ভালোবেসেছিলাম নিজেদেরই। গোপনে একটা ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলাম সেই শহরটার। আর, বাইরে ছিলাম বেপরোয়া। যা-খুশি করছিলাম। অস্কার ওয়াইল্ডের ডোরিয়ান গ্রে-র মতো। মাঝে মাঝে শুধু পর্দা সরিয়ে দেখতাম তাকে– ছবির কতটা নষ্ট হল।

কিন্তু সেদিন দূরে নয়, যেদিন পর্দা সরিয়ে দেখতে হবে— কদাকার, হিংস্র এক নষ্ট শহরের ছবি। ধারালো চোখের কোণে রক্তবিন্দু। নিরুপায় তার বুকে সেদিন ছুরি বসিয়ে দিতেই হবে।

একটা আর্তনাদ। আশপাশ থেকে কেউ জানতে চাইবে— কীসের আর্তনাদ? তারা ভিতরে ঢুকবে। দেওয়ালের প্রাচীন ছবিটিকে দেখবে উজ্জ্বল। ছুরিবিদ্ধ হয়ে মেঝেয় পড়ে আছে হালের অতিবৃহৎ, কদাকার এক কলকাতা।

শুধু ভিক্টোরিয়ার পরিটি তখনও ঘুরছিল। না-হলে কেউ চিনতেই পারত না শহরটাকে।

Comments are closed.