বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮

এলিয়েন

একরাম আলি

গাছে-ঢাকা আমহার্স্ট স্ট্রিট। দু-পাশে বুক-চেতানো ফুটপাথ। ফাঁকা-ফাঁকা। গাড়ি-ঘোড়াও কম। বাস মাত্র একটা– থ্রি বি। পাইকপাড়া থেকে আলিপুর। পরে-যে আরও চলবে, তার শুরু থ্রি সি বাই ওয়ান দিয়ে। তারপর যোগ দেয় থ্রি ডি। সবই প্রাইভেট। জাতে সরকারি লাল বাসের কয়েক ধাপ নীচে। একেকটা দু-নম্বর ডবলডেকার বা টু-বি এমন গম্ভীর চালে আসত, যেন মরণোত্তর বিধান রায়কে এসকর্ট করে নিয়ে আসছে!

পাইকপাড়ায় থাকে শৌনক লাহিড়ী। আবাসনের গেটেই স্টপ। পড়ত সেন্ট পলস স্কুলে। পরে কলেজ বলতে গোয়েংকা। ফলে হল কী, বাস বিশেষ পালটাতে হয়নি। থ্রি বি-তেই বহুদিন কাজ চালিয়ে নিয়েছে। মাঝে হ্যারিসনের ক্রসিং। টুক করে নেমে পড়লেই প্যারামাউন্ট মেস।

কিন্তু আমহার্স্ট স্ট্রিট তো অনন্ত নয়। ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পর দরকার মতো নিজেকে সরু করে পাড়ার ভিতরে ঢুকে যেতে চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু একটু এগিয়েই শেষ। তারপর শশীভূষণ দে-র গলি। ক্রিক রো ছাড়িয়ে ছুঁয়েছে ধর্মতলা স্ট্রিটকে। তালতলা অ্যাভিনিউয়ের মুখে ওই যে বাড়িটা, ওটাই অমিতাভদের। অমিতাভ মণ্ডল। হেয়ার স্কুল থেকে স্কটিশ চার্চ। বাড়ির উলটোদিকে দৈনিক বিশ্বামিত্র। হাঁটাপথ। আমার যেমন, অমিতাভরও তেমনই। লম্বা। মেসের একফালি খাটে উঠে বসলে মনে হত, সবুজ লাউশাকের ঝাড় দুমড়ে-মুচড়ে বাজারের থলেতে নিজেকে ঠেসে ঢুকিয়েছে। অসুবিধে নেই। গলাটি তুলে দিব্যি আড্ডাও দিয়ে যাচ্ছে।

একদিন প্রস্তাব এল– মেসের হট্টগোলে লেখাপড়ার, বিশেষ করে লেখার, অসুবিধে হয় তো। ওদের তিনতলার দু-টো ঘর ফাঁকা। দরকারে সেখানে থাকতেই পারি। থাকা অবশ্য হয়েছে কয়েকবার, তবে লেখাপড়া কিছু হয়নি। দেওয়ালে কিছু ছবি, হালকা আসবাব, চারতলায় সুইচ টিপলে নীচে বাজে এমন একটা কলিং বেল। আর, উপচে-পড়া অ্যাশট্রে। মূলত আড্ডা। জুটে যেত বন্ধুরাও। ছোট, বড়। এমনকী উৎপলকুমার বসুও। ফাঁকা থাকলে মাঝে মাঝে মাসিমা। সেই সূত্রে বীরভূম-যোগ— উনি ডাক্তার তো। লাভপুর হাসপাতালে থাকার সময় তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। অমিতাভকে দেখিয়ে—ওর জন্ম তো লাভপুরেই। ওর নাম রেখেছিলেন উনিই। অমিতাভ তখন টানা গদ্যে চাতুর্ভৌতিক বিবর্তনগুলো লিখে যাচ্ছে।

আর প্রেসিডেন্সির দেবাঞ্জন (চক্রবর্তী), অনির্বাণ (তখন লাহিড়ী, এখন ধরিত্রীপুত্র)। বয়সে এরা অল্প ছোট। কী করে যেন ভিড়ে গেল দলে। এবং আরও কেউ কেউ। যেমন স্কটিশের সূর্য (ঘোষ) আর নীলোৎপল (মজুমদার)। শেষ দু-টো নাম পাশাপাশি আসতেই চাইছে না, যদিও দু-জনই বরানগরবাসী।

যেমন সূর্য। নাম যা-ই হোক, চন্দ্রদোষ প্রকট। চরিত্রে উপগ্রহ। ছিল কিন্তু বেপরোয়া। গ্রহণে তলিয়ে যাবে, তবু পিছু হটবে না। একবার নিমন্ত্রণ। তার থাকার কথা গোপাললাল ঠাকুর রোডে, টবিন রোডের মোড়ে। থার্টি ফোর বি থেকে ভরদুপুরে নেমে দেখি– ভোঁ-ভাঁ। খুঁজে খুঁজে বাড়ি। পুরনো, জটিল, তার বিন্যাস। কেউ একজন এসে– সূর্য? উপরে। চলুন। ঢুকে উঠোন। এ-বারান্দা, ও-বারান্দা। সিঁড়ি। ফের বারান্দা। এদিক-সেদিক ঘুরে একটা ঘরের বন্ধ দরজায় পথপ্রদর্শক দাঁড়িয়ে পড়লেন— যান। ঠেলুন?

একা? ততক্ষণে আমার হাত দরজার পাল্লায়। একটু ফাঁক। ছোট্ট ঘর। ফর্শা, মাংসল, প্রকাণ্ড একটা অসুখ খাটের উপর ভাসছে। খালি গায়ে চিৎ-শয়ান আমার আমন্ত্রণকর্তা। পরনে পাজামা। জ্ঞানহীন। শিয়রে মাসিমা– কী যে খেয়েছে বাবা, জানি না। সকাল থেকে পড়েই আছে। বেলা দেড়টা বাজতে চলল, সাড়া নেই।

বসতেই হয়। কেননা পাশে চেয়ার। মাসিমার স্বগতোক্তি—কী যে হল। জানো, এই ছেলেকে একদিন কোলে নিয়ে মিছিলে হেঁটেছি। পারছি না দেখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাঁধে নিয়ে হেঁটেছেন। আর আজ? তিনি থেমে গেলেন। চোখ ছেলের বুকের দিকে। তাঁর নীরবতা আমার পেটে মোচড় দিচ্ছে। মেসে ফিরতে অন্তত আড়াইটে-তিনটে। যদি পাই, খেতে-খেতে চারটে। মাসিমা, আরেকদিন আসব। উঠি।

এটা ব্যতিক্রম নয়। তবে, কবে কখন কোথায় ঘটবে কেউ জানে না। সূর্যও না। যেমন এলাকা ছাড়িয়ে আমার যাওয়াটাও ব্যতিক্রম নয়। এলাকা কোনটা? উত্তরে গ্যালিফ স্ট্রিট। মানে বাগবাজার খাল, যার ব্রিজে সীমানা-নির্দেশক একটা বোর্ডে কবেকার লেখা—‘চব্বিশ পরগনা’। বোর্ডে ছোট্ট একটু সংযোজন— খালের এপারেরই কারও– চোখে পড়তই। সরকারি লেখার উপরে বেসরকারি সংযোজনটি ছিল— ‘সাবধান!’

পুবে সার্কুলার রোড। মানে আরেকটূ ছাড়িয়ে মারহাট্টা ডিচ। টালা, পাইকপাড়া বা বেলগাছিয়া যেতে খাল। তার ঘাটগুলোতে মাটির হাঁড়িকলসি, খড়বোঝাই বড়-বড় নৌকো কোত্থেকে-যে আসত!

দক্ষিণে এসপ্ল্যানেড। সচরাচর সদর স্ট্রিট। যমুনা সিনেমা, তার আশপাশের গলি। গোপন হাসিস বার। ভেতরে ঢুকলে আবছা পরিবেশ। ধোঁয়া-ধোঁয়া। তারই মধ্যে দেওয়াল জুড়ে নীল আকাশ। উজ্জ্বল মেঘের আনাগোনা। নীচে রূপবান বৃক্ষরাজি। সেইসব গাছপালার ফাঁক দিয়ে ঝরনা নেমে আসছে নরম পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে। সফেন আছড়ে পড়ছে ঘরের মেঝেয়। ওই আকাশ, মেঘ, অরণ্যানী, ঝরনা, পাথর— সবেরই উদ্ভব কারও মনে। সে অনুপস্থিত। আরেক মনে গেঁথে দেওয়ার জন্যে তার কাজ সে করে গেছে।

ঘরের মাঝখানটা ফাঁকা, চারপাশে বসার আসন। লো টেবিলে নানা আকারের ছিলিম, ব্রাশ। পছন্দেরটি বেছে নেওয়ার অপেক্ষা। এসবের মাঝে কানে দুল, হাতে তিব্বতি বালা, এক যুবক খুবই তৎপর। বিনয়ী ষাঁড় যেন-বা, ছোট ছোট গুঁতো মেরে ওই ছবির স্নিগ্ধতায় সে ঢুকিয়ে দিতে চায়।

পশ্চিমে গঙ্গা। মূলত শোভাবাজার ঘাট থেকে নিমতলা। ঘোলা জল, তার প্রাচীন তরঙ্গ, কাদা, স্নানার্থী আর শবদেহ, বাসি ফুল, জেলেনৌকা, লঞ্চযাত্রীর নিরুপায় তাড়া, ভরসন্ধেয় গলা-জলে ডুবে তরুণ-তরুণীর শরীর চেনার জোয়ারভাটা। কিন্তু সবসময়ই দেখা যেত বালক-বালিকার দল। সাঁতার কাটছে বা ঝাঁপ দিচ্ছে জলে। মাতৃপাশ ছেড়ে তারা উঠতেই চায় না। বসে বসে এসবের শোভাদর্শন। কখনো বেঞ্চ। কখনও জলের দিকে নেমে-যাওয়া ঘাটের সিঁড়ি। রকমারি নেশার পর্দা ছিঁড়ে আচমকা মাঝগঙ্গা থেকে স্টিমারের ভোঁ।

ছিলাম মূলত বাসযাত্রী। কখনো-বা ট্রাম। একা বা দলবেঁধে। কিন্তু যেতাম কোথায়? কোথায় নয়? শ্যামবাজার থেকে এসপ্ল্যানেড– সর্বত্র। মানে, বাছাই করা কয়েকটি জায়গায়।

দলবেঁধে গেলে একটা খেলা কালক্রমে বেশ জনপ্রিয় হয়। উদ্ভাবক কে ছিল? শৌনক লাহিড়ী? বলা শক্ত। পাঁচ-সাতজনের দল। বেকার হলেও পকেট কারও ফাঁকা নয়। কিন্তু টাকাপয়সা যে সবসময়ই লাগে। কত জরুরি খরচ। চা, কফি, সিগারেট। আরও কত কী। পকেটে সেটা থাকা দরকার! তাই, কে কাটবে টিকিট? শুধু নিজেরটা কাটলে দল আর কিসের? তাই হয়তো-বা একদিন শোনা গেল— আমি। ব্যারিটোন ভয়েস। বলে কী! নতুন সদস্য। কনিষ্ঠজন। সে কাটবে টিকিট? কন্ডাকটরের মুখে ‘কলেসটিট’ শোনার আগেই সবার আগে শৌনকের ভারী গলায় ধ্বনিত হল— ‘জয় তব বিচিত্র আনন্দ,’ সঙ্গে সঙ্গে বাকি সবাই— ‘হে কবি, জয় তোমার করুণা।’ সুরে-বেসুরে বাসের গতি ধীর হচ্ছে। এসে গেছে কলেজ স্ট্রিট। মুহূর্তে সবাই বুঝে গেছে, এরপর কী করতে হবে। যাত্রীরা হাঁ। ভিড়-বাসে রবীন্দ্রসঙ্গীত? এতগুলো দামড়া ছেলে? ‘জয় তব ভীষণ’… দল এগোচ্ছে গেটের দিকে… ‘সব-কলুষ-নাশন…’ নেমে গেছে শৌনক … ‘রুদ্রতা।’ একে একে নামছে সবাই… ‘জয় অমৃত তব, জয় মৃত্যু তব,/ জয় শোক তব,’ … বিভ্রান্ত কন্ডাকটরের মুখে অস্পষ্ট উচ্চারণ—‘টিকিট?’… ততক্ষণে শেষজন নেমে গেছে … ‘জয় সান্ত্বনা।।‘

সেই শুরু। কতবার যে এভাবে পয়সা বাঁচিয়ে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের কত কত গান!

তবু, এটা ছিল নিছক খেলা। যেমন যেতে যেতে পথপাশে অন্যের বাগান থেকে ফুল ছিঁড়ে নেয় কিশোরের দল। বা, পথভোলা প্রজাপতি জানালা দিয়ে ঢুকে পড়লে ধরার চেষ্টা করে, ধরা পড়লে অতি-আদরে প্রজাপতি-নামের সেই এলিয়েন প্রাণীটি মরেই যায়, তেমনই।

হয়তো পরে, নিভৃতে, অনুশোচনায় ভোগে কিশোরটি। যেমন বেঁচে-যাওয়া পয়সায় সিগারেট কিনে টানলে দমকা কাশি ওঠে। সেই কাশি পরে একদিন প্রবল হবে। ছোট ছোট কফ উঠবে। তারপর দলা-দলা। কেউ টেরও পাবে না, ছোট্ট প্রাণটি কফের সঙ্গে কখন বেরিয়ে গেছে। সে কি এইসব খুচরো ফক্কিকারির জন্যে?

হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুন

ব্লগ: একরাম আলি

Comments are closed.