মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

গোলদিঘি

একরাম আলি

রাত অনেক। বারান্দায় দাঁড়ালে ড্রিল ক্লাসের মতো সারবন্দি রাস্তার আলো। মাঝেমধ্যে গাড়ির হেডলাইট। মিত্র স্কুলের গলতায় শান্তিপুর-নামাঙ্কিত বন্ধ শালঘরের আলো নিভে গেলেও, দরজার মাথায় সাইনবোর্ড পড়া যায়। আশপাশের স্বল্প আলোয় একটু যা ঝাপসা। এত-যে আলো, এসবের প্রতিটির পিছনে আছে আগুন। এমনকী যে-আলো নরম, এত রাতেও সাহেবপাড়ার রেস্তোরাঁয়– টেবিলে টেবিলে— গুনগুনিয়ে আশ্বাসের গান শোনাচ্ছে মৃদু যে-আলো, বলছে—দ্য নাইট ইজ ইয়াং, সে-আলোর উৎসেও পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মতো আগুন।

মানুষ ছাড়া আর কোনও প্রাণী তাই আলোকে বিশ্বাস করেনি।

প্রকৃতি মূলত অন্ধকার। তার বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষ অগণন নক্ষত্রের উসকানিতে আলোকে মহীয়ান করেছে। বলেছে— শিক্ষার আলো, প্রতিভার আলো, জ্ঞানের আলো, সম্পর্কের আলো।

এই-যে সম্পর্ক, যা গড়ে উঠতে অন্তত দু-জন দরকার— পরস্পরের আলোয় তারা জ্বলে। সেখানে যুগ্ম-তারকার মতো পুড়ে খাক হয়ে যাওয়াও আনন্দের। কিন্তু সংশয়ের আগুন এসে গ্রাস করলে? যেদিন কেউ দাবি করে— আলো তারই, স্বত্বাধিকারী সে একা, ডানার নরম-রঙিন পালক সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

রাতে দেখা যাচ্ছে না। তাই বলে কি বারান্দার রেলিঙে ধুলো নেই? ধোয়ামোছার কোনও ব্যবস্থা নেই যে! এসব মেসের রেলিং ধোয়-মোছে প্রকৃতি। বর্ষা, বা কালেভদ্রে নেমে-আসা বৃষ্টি। আর হাওয়া। আকাশ থেকে বৃষ্টির জল যেদিন রেলিং বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা চুঁইয়ে নামে, তার রং পোড়া তেলের মতো। বহু বছরের জমে-থাকা মেসবাসীর অন্তরের কালো ঘাম যেন।

মেস তাই আজীবন বসবাসের স্বাভাবিক আস্তানা নয়। সেই ভয়ে সময়ে-অসময়ে ছিটকে বেরিয়ে পড়া। একেকদিন কোথাও যেতে পা-যে এগোয় না। যাইও না কোথাও। মন চায়, জলের ধারে গিয়ে বসি। কোথায় জল?

কলেজ স্কোয়ার। গোলদিঘি। রিকশাওলাদের মুখে– মাধববাবু কি তালাও। বাড়িয়ে বললে মাঝারি মাপের একটা পুকুরই। আজকাল হয়তো কেউ কেউ বলে ফেলছে– ওয়াটার বেড। ইস! এরকমই মাপের পুকুর আমাদের গাঁয়ের ব্রাহ্মণী। একসময় ছিল প্রাচীন গাছপালায় ঘেরা তার পাড়। বটের লম্বা লম্বা ঝুরিতে যারা দোল খেত, শূন্যের এপাশ থেকে ওপাশে গিয়ে ছুঁতে চাইত আকাশ, তারা কি বনবালক ছিল না?

জলে প্রস্ফুটিত অসংখ্য পদ্ম। পাতায় টলটলে জল হাওয়ার খুনসুটিতে চঞ্চল। পাতালে বুজকুড়ি কাটছে মাছেদের কোনও অলস প্রপিতামহ। ছায়ায়, কাজল-কালো জলে, সে-ছিল এক সত্যিকারের পুষ্করিণী। আর এখানে?

চার-পাঁচটা স্যুইমিং ক্লাব। তাদের দাপুটে ছেলেমেয়ে। তোলপাড় হচ্ছে জল। তবু তো তখন ভালো। বছরের অন্য সময় পড়ে থেকে থেকে নোংরা, ঘোলাটে। যেন জল শুধু সাঁতার কাটার জন্যই। চৌকো। খোপকাটা। তবু শেষ পর্যন্ত জল তো! তাই তাকানো যায়। আর তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই নোংরা জলই দেখায় তার ভিতরের আহ্বান আর অস্থিরতা। হাওয়ায় কাঁপে। ঢেউ তোলে। আশপাশের দৃশ্যাবলির প্রতিচ্ছবিরাও কাঁপে। ঢেউয়ে ভেঙে ভেঙে যায়। একটা ছবি ছিল, কোথায় যেন দেখেছি। গোল থাম। স্তম্ভশ্রেণী। গোলদিঘির জলে ছায়া-সমেত উনিশ শতকের সেনেট হল। সে-ছবি ষাট সালের আগের। এখন সেন্টেনারি বিল্ডিং। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘সেনেট ১৯৬০’ কবিতায় যা ‘স্ট্রিমলাইনড বাড়ি’। তবু জলে পড়লে কাঁপে তো!

হিন্দু স্কুল পেরিয়ে বাঁ-হাতি সরু গেট। ঢুকেই ঘুগনি আর পাউরুটি। খাওয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তবে ঘুগনিটা চমৎকার। আঁটোসাটো। এখানেই কি পাওয়া যেত মাটন ঘুগনি? মনে নেই। পেরিয়ে বাঁ-হাতি ছোটো ছোটো ক্লাবঘর। কী-যে সব হয় ওখানে! সামনে সার দিয়ে বেঞ্চি।

এরই একটাতে একদিন ইউনিভার্সিটির দুই সহপাঠীকে নিয়ে ঘণ্টাখানেকের জটিল নীরবতা। সামনে ডাইভিং স্ট্যান্ড। দুটো ফ্লোর। নীচের ফ্লোরে এক কিশোরী কাঠের পাটাতনের শেষ প্রান্তে। দোল খাছে। পিছিয়ে আসছে। ফের এগিয়ে দোল খাচ্ছে। কিন্তু ঝাঁপ দিচ্ছে না। এদিকে ততক্ষণে একপাশে ফুঁপিয়ে কান্না। অন্যপাশে বিরক্তি। সিগারেটে মুহূর্মুহূ টান। বেঞ্চের মাঝের জনকে দোষারোপ। টপ ফ্লোরে, অনেক উঁচুতে, তোয়ালে-জড়ানো শরীর। স্থির দাঁড়িয়ে। পিছিয়ে এল। সঙ্গের ছেলেটিকে খুলে দিল তোয়ালে। সুগঠিত পুরুষ-দেহ। এগিয়ে গেল। শেষ কিনারায় স্থির। চারপাশের সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার একাগ্রতা। মৃদু তর্ক। ছেলে-বন্ধুটির কোপ আমার প্রতি, যাকে সে মধ্যস্থতাকারী ভেবেছিল। মেয়ে-বন্ধুটির অসহায় দৃষ্টি। আচমকা টপ ফ্লোর থেকে শূন্যে দুটো পাক খেয়ে জলে মসৃণ লাফ। যেন মৎস্যকুমার। সেদিনের অবাঞ্ছিত ওই দৃশ্যে ছিল শুধু দু-জনের ভুলবোঝাবুঝি।

কোথাও ধর্মালোচনা হচ্ছে। কোথাও আড্ডা। মূলত চলছে প্রেম। বিশেষ করে জলের ধারের সিঁড়ির ধাপে। ছেলে, মেয়ে। মেয়ে, ছেলে। এভাবে পরপর। কত-যে গলা নামিয়ে কথা বলতে হয়। একটু নিভৃতির কতটা কাঙাল এইসব যুগল—ভাবলে মন বেদনায় ভরে যায়। এরা কোত্থেকে আসে? কত দূর থেকে? বিরাটি? বরানগর? কফি হাউস থেকে-যে আসে না, নিশ্চিত। এমনকী আড্ডা দিতেও। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বহু কিছু জানতেন। এটা জানতেন না। তাই তাঁর ‘গোলোকধাম’ উপন্যাসে দুই তরুণ কবির কলেজ স্কোয়ারে আড্ডা দেওয়ার কথা লিখেছিলেন।

একা বসলে, আর দেখতে চাইলে, পুরোটা দেখা যায়। এই যে সামনে ইউনিভার্সিটি, ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ছাড়িয়ে কোথায় শ্রীলঙ্কা আর মায়ানমার পর্যন্ত কত-যে ব্যাপ্তি ছিল এর! পাশে হেয়ার স্কুল। প্রেসিডেন্সি কলেজ। এদিকে হিন্দু স্কুল। সংস্কৃত কলেজ। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল। এমনকী মহাবোধি সোসাইটি হল যেতে পানের দোকান কল্পতরু। থিয়োসফিক্যাল সোসাইটি। স্টুডেন্টস হল। কোণের ওই যে সরবতের দোকান প্যারামাউন্ট, ওটাই-বা কি কম? একটা মাত্র পুকুরের পাড়ে ইতিহাসের এত এত ইটের বিন্যাস! এ কি আর কোনও পুকুরের জলে প্রতিবিম্বিত হয়?

আরে, দক্ষিণে ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভা যে! কী হয় সেখানে? একটা ছোট্ট হল আছে ওদের। সেটাই-যে সব নয়, জেনেছিলাম এক সকালে। জগৎ সিনেমা পেরিয়ে দেবুর অর্থাৎ দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মেস। সিউড়িতুতো সম্পর্ক। যখন-তখন যাওয়া-আসা হত। রুমমেট প্রামাণিকবাবু। প্রামাণিক তো? হ্যাঁ, প্রামাণিক। অফিসফেরত টিফিন খেতেন গুছিয়ে। সন্ধেয় গেলে চোখে পড়তই প্রামাণিকবাবুর বেডে স্টেটসম্যানটি শয়ান। তার উপর প্লেট। প্লেটে দু-খণ্ড টোস্ট। বাটার। পাশে বড় কাচের গ্লাসে ভর্তি একগ্লাস চা। টোস্ট শেষ হলে খেতেন খেলিয়ে খেলিয়ে। পাইপে জল টানার মতো। আড্ডা থেকে দেবুর ঘাড় ঘুরে যেত। মুখে বিরক্তি-মেশানো হাসি— আহ, আস্তে! যেন কাজের সময় বাচ্চাদের অনর্থক চেঁচামেচি। একদিন দেবু— এত কি খাচ্ছেন, প্রামাণিকবাবু? প্রামাণিকের উত্তর— এত কোথায়, এ তো পাখির আহার। দেবু হেসে– পাখির, তবে বাজপাখির।

সেদিন জল-ভর্তি একটা থালার উপর দেবু দাঁড়িয়ে। সরু গোঁফের নীচে লাজুক হাসি। কী ব্যাপার? দেবুর ঠোঁটে আঙুল। অর্থাৎ, কথা নয়। জলটা যে হলদেটে! কাউকে বোলো না। পেচ্ছাব। সকালের প্রথম। পা ফাটছে, জানো তো। কিছুতেই সারছিল না। এখন অনেক ভালো।

এই নিদান তাঁকে দিয়েছে ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভা। এদের মতে– মানুষের যা-কিছু বর্জ্য, সমস্ত কিছুই কাজে লাগে চিকিৎসায়। এমনকী কেটে-ফেলা নখ বা চুলও।

দেবুর অসুখ সেরে গিয়েছিল। তবু, ত্রিপুরার হিতসাধনে আমাদের আস্থা জন্মায়নি।

লক্ষ্য করার যে, কলেজ স্কোয়ারের চারিদিকে জমকালো ব্রিটিশ-চিহ্ন। তারই ফাঁকে কীভাবে যেন টিকে আছে মহাবোধি সোসাইটি আর নিভু-নিভু ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভা। মহাবোধি সোসাইটি হয়তো টিকে যাবে। বাকিটা? যেমন আমাদের গাঁয়ে পঞ্চায়েত, পাকা রাস্তা, একশো দিনের কাজ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, রাস্তার ঝলমলে আলো— সমস্ত আঁটঘাটের ওপারে এককোণে, একা, অনাহারে, অলৌকিক উপায়ে এতদিন বেঁচে ছিল বায়েনপাড়ার কোকিলা-নামের বৃদ্ধা। কোন ফাঁকে টুপ করে খসে গেল তার প্রাণ। এই সেদিনই তো!

হ্যারিসন রোড সবকটি পর্ব পড়ার জন্য নীচের লাইনে ক্লিক করুন

ব্লগ একরাম আলি

Comments are closed.