মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯
TheWall
TheWall

কলকাতার কিহোতে

একরাম আলি

যে-ভূখণ্ডে আমি থাকতে চাইতাম, সেটি কেমন? তার পায়ের কাছে থাকবে সমুদ্র। উচ্ছল তীরভূমি। শিয়রে পাহাড়, পর্বত। চারপাশে বনাঞ্চল ঝরনা নদী। দেখবার মতো দু-একটা পুরাকীর্তি-অঞ্চল, যাতে অতীত গৌরবের অন্তত ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। মাঝে মাঝে বসবাসযোগ্য জনপদ। আর, অন্তত এক-আধজন মহামানব। তবে সবার আগে চাইব– সেখানকার মানুষ যেন সহমর্মী হয়। যেন একসঙ্গে বাঁচতে শেখে। মহাকাব্য? থাকতেই হবে একটা কি দুটো। মানুষ যা হতে চেয়েছিল, যে-সব ঘটনার কল্পনায় সে পা ফেলতে চায়, বড় বড় দুর্বিপাকে নিজেকে বারবার ফেলে পরখ করতে চায়, অনাস্বাদিত জয়োল্লাসের মদিরা ঠোঁটে ছোঁয়াতে উন্মুখ— মহাকাব্য তাকে দিতে পারে সেইসব।

কিন্তু এ তো নির্ধারিত যে, মহাকাব্য লেখা আর হবে না। সেই বিশাল আর জঙ্গম যৌথ জীবন আমরা হারিয়ে এসেছি।

তাহলে? কবিতা? মানুষের জীবনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তার যেমন যোগ, তেমনই কবিতার একটি ডানা অতীতে আর অন্যটি ভবিষ্যতে সঞ্চালিত হয়। তাই কবিতা যুগে যুগে শুধু নয়, ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে পালটাতে সক্ষম।

আজকের কবিতা তাই নির্মমভাবে একা। এই এককত্ব আমাদের কবিতাকে কোথাও কোথাও মহৎ করেছে অবশ্যই; কিন্তু বসবাসযোগ্য যে-ভূখণ্ডের ছবি ভেসে ওঠে, যাকে আমরা দেশ বলি, আপাতভাবে মনে হয় যে, তার দায়দায়িত্ব আর নিতে চায় না কবিতা। তবু কি খুঁজে পাই না দেশের বহমান ধারাটিকে, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তার প্রকাশের উন্মুখতাকে?

আর, উপন্যাস।

তখন সাতাত্তর সাল। জানুয়ারির এক রবিবার। আচমকা দেখা জ্যান্ত এক উপন্যাসের সঙ্গে।

সাতসকালে কলকাতা ঠেঙিয়ে নাকতলা। প্রতিভা বসুর বাড়ির একটা অংশে থাকতেন দেবাশিসদা (বন্দ্যোপাধ্যায়)। তখন, যাকে বলে, কনফার্মড বেকার। বাজারে বেরোচ্ছেন। যাবে নাকি? বৌদির হুমকি— সবে এল। বাজারে যাবে মানে? চা দিচ্ছি।

অগত্যা বসে চায়ের অপেক্ষা। কথায় আছে না— এমন সময়? ঠিক তেমনই— এমন সময় খোলা দরজার বাইরে ‘দেবাশিস! দেবাশিস!’ হাঁক। হলুদ পাঞ্জাবি। লুটিয়ে-পড়া ধুতি। পায়ে পাম্প স্যু। সর্বোপরি থাক-থাক চুলে পটের বাবুটি। সপ্রশ্ন দৃষ্টি, আমার উপর। বাজারে গেছেন। ও! গলা নামিয়ে– ভাই, দেবাশিসের স্ত্রীর নাম যেন কী? মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে সঙ্গে গলা তুলে—মনীষা! মনীষা!

বৌদি বেরিয়ে এসেই—ও মা! শ্যামলদা! এ কী, বাইরে কেন? ভিতরে আসুন। ইত্যাদি। ধীর পদক্ষেপে বৌদি-সম্বোধিত ‘শ্যামলদা’র প্রবেশ, সোফায় উপবেশন এবং দেবাশিসদার কাজকর্ম-বিষয়ে দু-জনের কথা। ততক্ষণে মনে মনে খোঁজ চলছে— কে এই শ্যামলদা? বেশিক্ষণ ধন্দে থাকতে হল না অবশ্য। বৌদি চায়ের জন্যে ভিতরে যেতেই প্রশ্ন— ভাই, আপনার নাম? শুনে পাঞ্জাবির পকেটে হাত। ফর্দের মতো একটা কাগজ বেরিয়ে এল। হ্যাঁ, এই তো। কাগজ ফের পকেটে। মুখে ফোলা-ফোলা হাসি। মারাত্মক ভাসা দু-টো চোখ। নমস্কারের ভঙ্গিতে দু-হাত। বিনয়ের সুসজ্জিত অবতার— আমার নাম শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। দয়া করে কাল একবার বাগবাজারে আসবেন? অমৃত পত্রিকার অফিসে?

কথামতো বেলা তিনটেয় হাজির। তার আগে আজকাল যাকে বলে রিসার্চ ওয়ার্ক, সারা। বাজারে খবর– কী-একটা গণ্ডগোলে পড়ে ইনি মেরে সন্তোষকুমার ঘোষমশাইয়ের হাত বা অন্য কিছু ভেঙে চাকরিতে ইস্তফাপত্র দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। এখন সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকার দায়িত্বে।

আনন্দ চ্যাটার্জি লেনে বাঁহাতি একটাই ঘর। বড় টেবিলের ওদিকে তিনি। পিছনে জানালা। পাশে জনাদুই কাজে ব্যস্ত। কোণে কুঁজোয় জল। দেখেই নরম বালক-বালক হাসি— আয়। আপনি থেকে ধড়াস করে তুই! অভিনব ইন্টারভিউ-পর্ব শেষে নির্দেশ— ওই চেয়ারটায় বসে বীরভূমের সাহিত্যচর্চা বিষয়ে এখনই একটা সন্দর্ভ লিখতে হবে। শব্দসংখ্যা তিনশো। মানে লাগল। লেখা কি এত সহজ? তাও শব্দ গুনে? কিন্তু নিরুপায়। গোটা কয়েক সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন লেখাটি কোনও মতে জমা দেওয়া মাত্র না-পড়েই তাঁর চিৎকার— ভাস্কর, ভাস্কর! এটা প্রেসে দিয়ে এস।

সর্বনাশ। এমনও হয়!

সেই শুরু। দিনকয়েক পর টাটকা পত্রিকা হাতে সিঁটিয়ে আছি। তার ভিতরে কোথাও থাকার কথা আমার সেই লেখা-নামের হিজিবিজি। টেবিলের ওপারে তিনি নির্বিকার। ব্যস্ত। শোন, কবিতা লেখা ছাড়। কব্জির জোর থাকলে উপন্যাস লেখ। এক-দেড়শো শব্দের কবিতা? ওটা কোনো পুরুষের কাজ নয়। পারলে পঞ্চাশ হাজার শব্দের উপন্যাস নামা একটা। তিন মাসের মধ্যে দে। ধারাবাহিক করব। পারবি?

এভাবে সাহিত্য! বিস্ময়ে অপমানে অবিশ্বাসে আমি চুপ।

— কী, পারবি না?

— ছেড়ে দিন শ্যামলদা। হবে না আমার।

— আচ্ছা চল। সন্ধেয় বেরোতে পারবি তো আমার সঙ্গে?

তখনও তাঁর মরিস মাইনর হয়নি। বা, পেল্লায় ফোকসওয়াগেন। সবেধন অ্যামবাসাডরই সম্বল। তাতে উঠেই শুরু হল যাত্রা। তখন কি আর জানি, ডন কিহোতের সঙ্গী আমরা, যাদের বলে সাঙ্কো পাঞ্জা! তার বছর দুয়েকের মধ্যেই অ্যামবাসাডরের বড়ভাই-ছোটভাই চলে এসেছে। এবং বিশ্বাস করতেই হবে যে, এসেছে একটা টু-সিটার প্লেন! কোনও উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালি একজোড়া চতুষ্পদ– মানে জার্মান শেফার্ড– কিনে একটার হেমা, আরেকটার নাম মালিনী রাখার পরও ডানাওলা পুষ্পক কিনে ফেললে তাঁকে সারভেনতেসের হিরো ছাড়া আর কী বলা যায়?

কত-যে বিকেল, সন্ধে, রাত গড়িয়ে ভোর। সেসব বড্ড বেশি বড়দের গল্প। লক্ষ্মী নামের এক চরিত্র ছিল তাঁর ‘কুবেরের বিষয়-আশয়’ উপন্যাসে। মেদনমল্লের দুর্গ, তার নির্জন ধ্বংসাবশেষে লক্ষ্মীকে গলা টিপে মেরে ফেলার পর কুবেরের হাতের গাঁটগুলোতে কালো ছোপ পড়তে শুরু করে। একদিন অনেক রাতে প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়িতে হঠাৎ চোখে পড়ে শ্যামলদার হাতের আঙুল। সামনের লোকটা সত্যিই শ্যামলদা তো, নাকি কুবের? চেপে ধরি। কালো ছোপের দিকে হুইস্কি-ভেজা চোখ। মৃদু হেসে উড়িয়ে দেন— ছাড় না!

একদিন কিছু খাবারের বরাত দিয়ে মিত্র কাফের সামনে দাঁড়িয়ে। যাব দক্ষিণে। শ্যামলদা ধুতির বদলে আলিগড়ি। হঠাৎ সরে যেতে বলে উলটো ফুটে একটা জানালা টিপ করে দাঁড়ালেন। ভঙ্গিটি মজাদার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পাশে এক ভদ্রমহিলা, মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছেন– কী ব্যাপার? এখানে?

শ্যামলদার ঠোঁটে আঙুল। অর্থাৎ, চুপ! ইশারায় দেখালেন উলটোদিকের একটা জানালা। যেন ওখানেই আছে সেই রাজকন্যে। ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন। তারপর দু-কথা। মেয়েকে আদর। তাঁরা চলে যেতে আমাদের কৌতূহল– কে? শ্যালিকা। বড়। মতি নন্দীর স্ত্রী। জানিস তো, বিয়ে করে শুধু একটা কলম পেয়েছিলাম? সেটা মতিই দিয়েছিল।

উপন্যাস অনেক রকমের হয়। আমরা পড়িও। কিন্তু একেকটা জীবন মুদ্রিত উপন্যাসকে ছাপিয়ে আকাশে উড়তে চায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পেরেছিলেন কিনা জানি না। তবে তাঁর কুবের পেরেছিল। মই বেয়ে উঠে চাঁদের চ্যাটচেটে রঙে নশ্বর হাত রেখেছিল।

একেকটা ভূখণ্ডে উপন্যাস একেক রকমের। কোনও কোনও উপন্যাস নিজের ভূখণ্ডের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। যেমন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’। যেমন বলা হয়– ডাবলিন যদি ধ্বংসও হয়ে যায় কোনওদিন, ‘ইউলিসিস’ থেকে ফের একটা ডাবলিন গড়ে তোলা সম্ভব। তারাশংকরের সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। বীরভূম চুরমার হয়ে গেলেও ‘কবি’, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ বা ‘গণদেবতা’-র পৃষ্ঠাগুলো থেকে আবার একটা বীরভূম নির্মিত হতে পারে।

তাই, এমন একটা ভূখণ্ডে থাকতে চেয়েছিলাম, যত গরিব আর অবহেলিতই হোক সে-ভূখণ্ড, যেখানে কবিতার ধারাবাহিকতা থাকবে। থাকবে দু-চারটে উপন্যাস।

Comments are closed.