দেশ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    মানুষের সেরা আবিষ্কার হয়তো-বা ঈশ্বর। এবং আত্মা। ঈশ্বর এবং আত্মার সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য নয়, মানুষই সেই গূঢ় কথাটি সামনে এনে খুঁটিয়ে দেখতে চেয়েছে। আত্মা ঈশ্বর-নিরপেক্ষ নাকি সংশয়মধুর সম্পর্কে তার ‘চলার বেগে পায়ের তলায় রাস্তা জেগেছে’ — এমনও প্রশ্ন হাজার হাজার বছরের।

    অনেকের মতো আমিও সর্বস্ব ঘেঁটে আমার আত্মাকে খুঁজে পাইনি। কিন্তু আত্মা না-থাকলেও আত্ম যে থেকে যায়! যেমন কারও কারও পকেটে সিগারেট না-থাকলেও বারুদকাঠিতে ভরা ছোট্ট দেশলাইটি থাকে! এই আত্মকে আমি পেয়েছি ব্যক্তি-আমিতে। যেদিন জানলাম– যা-কিছু বিখ্যাত এবং সেসবের খ্যাতির কারণগুলো অতিচিহ্নিত, সেদিনই ওই ঝাড়লণ্ঠনের তলা থেকে নিজেকে সরিয়ে অজানা নিষ্প্রভ এলাকাগুলোয় ঘুরে বেড়িয়েছি। জানা-অজানা বইয়ের খোঁজে থেকেছি যেমন, ঘুরেছি পথে পথে। চোখে পড়েছে মধ্য আর উত্তর কলকাতার একেকটা চা-দোকান। তার গঠনকৌশল। বিন্যাস। সামনের মস্ত ড্রামে জল ফুটছে। ট্যাপ ঘোরালেই ধোঁয়া-ওঠা জল। পাশের স্টোভে দু-এক দশকের স্মৃতিখচিত দশাসই পাত্রে চলে যাচ্ছে সেই উষ্ণতা। তাতে দুধ। চা-পাতা। চিনি। শুষ্ক তৃণ। ঝাউশাখ। এ যেন উৎপলদার (কুমার বসু) ‘আরো প্রকৃতির ছবি’!

    ফুটপাথে ততক্ষণে ‘নগর পিছনে ফেলে চলে আসে সহস্র ভিখারী,/ অন্ধ লোল ভিখারিনী, ভিক্ষাদাতা ইত্যাদির সার’। কিন্তু এখানে কোনও মুক্তার শিকারি করতল স্ফীত করে হাঁক দেয়নি। চায়ের সর্বনাশা টানে সবাই হাজির। যতবার মাথা নীচু করে ভাঁড়ের উষ্ণ তরঙ্গে মুখ দিয়েছি, ততবারই বুঝেছি— চায়ের প্রকৃত কপাট আরও দূরে। ভিখারির দলে মিশে আমি কি শুনিনি, চায়ের গভীরে রুদ্ধ শৃঙ্খলের ধ্বনি?

    এভাবে কত কত চায়ের দোকান। পথে-বিপথে। এভাবেই কত-যে বেড়ে গেছে চা খাওয়া!

    এমনই একদিন হিন্দ সিনেমার পাশে চা খেয়ে হাঁটছি। ট্রামরাস্তায় একটু এগোতেই চোখ আটকে গেল। বহু পুরনো একটা বাড়ি। দরজায় রংচটা সাইনবোর্ড। অনেকটা হেলে পড়েছে। তাতে লেখা– ‘বীরভূম মেস’।

    বীরভূম মেস! এই হিন্দ সিনেমার কাছে? চল তো দেখি।

    দেউড়ি পেরিয়ে খোলা উঠোন। এককোণে চৌবাচ্চা। পড়ন্ত বিকেলে সাজোয়ান এক ছেলে চান করছে। এগিয়ে যাই– ভাই, এটাই তো বীরভূম মেস?

    হাতের মগ থেমে গেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে যে দেখছে আমাকে, তার পরনে সিক্ত গামছা। সারা শরীর বেয়ে জল নেমে আসছে। ডানহাতে চোখদুটোকে জলমুক্ত করে— হ্যাঁ। কেন বলুন তো?

    বেড খালি আছে? শুনে তার মুখে সজল হাসি— আপনি বীরভূমের? উত্তরে আরও চওড়া হাসি— আমার বাড়ি পিংলা।

    এমন সময় দোতলার বারান্দায় এক প্রৌঢ়— শিবু, সে কে?

    স্নানরত ছেলেটি ইশারায় উপরের দিকে দেখিয়ে ফের গায়ে জল ঢালতে লাগল। উপর থেকে ঘোষিত হল– কোনও এককালে এটা বীরভূমেরই মেস ছিল বটে। নামটুকুই আছে। এখন পুরোটা মেদিনীপুরের।

    হায় রে! এমন জেলা, একটা মেসও নিজের দখলে রাখতে পারে না!

    এর কিছুদিন পরই ট্রামে এসপ্ল্যানেড থেকে ফিরছি। সঙ্গে বীরভূমেরই এক বন্ধু। দাঁড়িয়ে। নিজেরা কথা বলছি। সামনের সিট থেকে— আপনারা বীরভূমের? কড়কড়ে ধুতি-পাঞ্জাবির প্রৌঢ়। আচ্ছা? আমিও। কোথায় থাকেন? আসুন না আমাদের আড্ডায়। শ্যামবাজারে আমাদের বীরভূমের একটা আড্ডা আছে। প্রতি রোববার। চলে আসুন সামনের দিন। এই তো পরশু। শ্যামবাজারের কোথায়? ট্রামডিপোয় নেমে উলটো ফুটে। যাকে জিজ্ঞেস করবেন হরিমাধব বাঁড়ুজ্জের বাড়ি, দেখিয়ে দেবে।

    আশ্চর্য! এমনও হয়? হয়তো এঁরাই বা এঁদের আগের জেনারেশন একদিন পত্তন করেছিলেন ওই বীরভূম মেসের। হেরে গিয়েছেন মেদিনীপুরের তরুণদের কাছে। দেখি ভদ্রলোককে। মেদহীন। ভাঙা গালেও চকচকে ভাব। চওড়া কপালের ওপারে কাঁচাপাকা চুল। সঙ্গে দু-একটা কথা। ওইটুকুই। ততক্ষণে কলেজ স্ট্রিট। এবং সেই শেষ দেখা। ট্রাম থেকে নেমে দু-জনের একইরকম হাসি। আহা রে! কী টান, যেন প্রবাসী!

    মানুষ কোনও ভূখণ্ডকে যখন নিজের দেশ হিসেবে ভাবে, কী কী গুণ সেই ভূখণ্ডের উপর আরোপ করে? আমাদের বাড়িতে থাকত উমেদালি। নিরক্ষর। দিনে চাষের কাজ করত। রাতে থাকত পাহারা দিতে। মানে ঘুমোতে। পেত রাতের খাবারটুকু। এটা-ওটা। কোনও কিছু অমিল হলে বীরভূমের উপর জোর দিয়ে টেনে সে বলত—গোটা বী-র-ভূ-মে নাই। মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে তার বলার ভঙ্গিতে বীরভূম হয়ে যেত সসাগরা ধরিত্রী! বাস্তবিক মনেও করত তেমনটাই। এতটা না-হলেও, ‘দেশে’ তো আমিও গিয়েছি কতবার!

    উত্তরে সরু হয়ে অধুনা ঝাড়খণ্ড আর মুর্শিদাবাদকে ছুঁয়েছে যদিও, পাকুড় একদিন ছিল বীরভূমেরই অংশ। এমনকী মুর্শিদাবাদের রাঢ় এলাকাও। দক্ষিণে কোটি বছরের অজয়। স্রোতে এমন এক চলমানতা, যার বাধা টপকাতে পারেনি সে। তবে পশ্চিমে সমবয়স্ক পাহাড়-জঙ্গল অতিক্রম করে সে পৌঁছে গিয়েছিল দেওঘর পর্যন্ত। গোটা সাঁওতাল পরগনা ছিল বীরভূমে, যে-পরগনাটি আজ গুটিসাতেক জেলায় টুকরো। আর পুবে বাদশাহি সড়ক। এত বড় একটা জেলা আজ কাটছাঁট করে দাঁড়িয়েছে এইটুকু!

    তবু রুক্ষ, উচ্চাবচ, গরিব একটা জেলায় শত শত বছর বসবাস করছে যারা, বংশপরম্পরায়–  যত নিকৃষ্ট ভাবেই হোক না কেন– বেঁচে থাকবার জন্যে অনুর্বর সেই ভূখণ্ডের মাটি থেকেই তাদের খুঁজে নিতে হয় গর্ব করার মতো কিছু গুণ। আশ্চর্যের যে, তারা খুঁজে পায়ও! তাই উমেদালি মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে আকাশসীমা দেখাত। দেখাত তার বীরভূম।

    কিন্তু যারা পৃথিবীর মানচিত্র দেখেছে প্রাথমিকে পড়ার সময়, তারা? বড়ো হয়ে জেনেছে সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অগণন নীহারিকামণ্ডলীর অস্তিত্ব, তাদের কাছে তো বিন্দুবৎ হতে হতে হারিয়েই গেছে ওই প্রাণের বীরভূম!

    এই যে আমি কলেজ স্ট্রিট থেকে ফিরছি, আসলে তো ফিরছি না, হাঁটছি মাত্র। আধোজাগ্রত কিছু যাত্রী নিয়ে ট্রাম সরসর করে পেরিয়ে গেল। সামনে ফুটপাথবাসী এক বৃদ্ধা ছেঁড়া চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। হয়তো ঘুমিয়েই গেছে। ঘুমিয়ে গেলে কেউ কি ফুটপাথে থাকে? এই যে হাঁটছি, হ্যারিসন রোডের ফুটপাথে হাঁটছি কি? সর্বস্ব হারিয়ে যে মাথার অন্ধকারে গুটিসুটি বসে আছে বীরভূম!

    রাস্তা শেষ হওয়ার আগেই মেসের দরজা। সিঁড়ি। চেনা-চেনা মুখ। দোতলার সরু বারান্দা। বেড়ালের অনস্তিত্ব। রাতের ঠান্ডা খাবার। আমার সরু একটা বিছানা। আহ্! কত-যে রাত হয়ে যায় ওই বিছানাটুকু পেতে!

    যখন শুই, অন্ধকারে হাতদুটো নিজে-নিজেই ছড়িয়ে যায়। সিঙ্গল খাটের শেষ কিনারা পর্যন্ত। আঙুলগুলো টের পায়– উত্তরে কীরকম সরু। রাজগ্রাম পেরিয়ে দূরে পাকুড়ের আলো মিটমিট করছে। পশ্চিমে অন্ধকার– জঙ্গলে-ঢাকা পাহাড়শ্রেণী। পুবে সুলতানি আমলের– হয়তো-বা তারও আগের সেই সেন অথবা পালরাজাদের তৈরি– চওড়া পথ। পায়ের কাছে বিস্তীর্ণ বালি। তারপর জল।

    সিঙ্গল খাট ছাড়িয়ে হাত, পা বাইরে বেরিয়ে যায়। অন্ধকার। নিরালম্ব। আর কিছু নেই। না স্থল। না জল। এইটুকুই আমার শয্যা। আমার বীরভূম।

    বালিশে মাথা এপাশ-ওপাশ করে। একসময় হয়তো ঘুমিয়ে পড়ি। তখন আমার আত্ম কি করে? ঘুমোয়?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More