লেটার প্রেস

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    এককালে ছিল গৃহস্থবাড়ি। তারই এক বা একাধিক ঘরের দেওয়াল কালিতে ভর্তি। স্যাঁতসেঁতে তার মেঝে। কালি-ভর্তি। যাঁরা সেখানে ব্যস্ত, তাঁদের দু-হাত কালিতে রঙিন। এমনকী বিকেলের মুড়ির ঠোঙাও। সেখানে ঢুকলে, কালির জগতেই ঢুকতে হয়। তবু, কালিমালিপ্ত ছিল না সে-জগৎ। বরং সেইসব কালি থেকেই কখনও ঠিকরে বেরিয়ে আসত চিন্তার নতুন নতুন উল্কাখণ্ড। লেটার প্রেস।

    লেটার প্রেসের জগৎটি ছিল মোটের উপর চৌকো মাপের। দক্ষিণে ধর্মতলা স্ট্রিট, উত্তরে গ্রে স্ট্রিট, পশ্চিমে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, পুবে সার্কুলার রোড। এই এলাকার শিরদাঁড়াটি কলেজ স্ট্রিট থেকে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট বা বিধান সরণি। লম্বালম্বি ট্রামরাস্তা। উনিশ শতকের বাঙালির পাগড়ি অথবা শ্মশ্রুশোভিত জ্ঞানচর্চার আস্তানা। সেই সূত্রে বড়ো রাস্তায়, অলিগলিতে প্রেসের আধিক্য।

    কত-যে এইসব প্রেসে যাওয়া-আসা! তবে হুটহাট নয়, দেখেশুনে। অর্থাভাবে যাদের দিন কাটে, তবু তাগাদা দিয়ে ভদ্দরলোকের পাগলাটে-গোছের ছেলেপিলেকে লজ্জায় ফেলতে মন সায় দেয় না, সেইসব প্রেসমালিকের আশ্রিত ছিল লিটল ম্যাগাজিনগুলো। এরকম দু-একজনের নাম আজও ঘিলুর প্রিন্টার্স লাইনে খুঁজলে পাওয়া যাবে। রতিকান্ত নস্কর। জগন্নাথ পান।

    জগন্নাথ পানের রামকৃষ্ণ প্রেস ছিল রূপবাণী সিনেমার উলটোদিকে। পেট্রল পাম্পের পাশে ওই যে সরু গলিটা। দু-টো বাঁক খেয়ে একাধিক গৃহস্থবাড়ি পেরিয়ে ওটাই গিয়ে ঠেকেছে এক উত্তরমুখো দরজায়। ঢুকলেই হাসি-হাসি মুখ। কালো। একহারা। মলিন প্যান্ট। গায়ে গেঞ্জি। সদা ব্যস্ত। এই মেঝেয় বসে গ্যালি প্রুফ তুলছেন, এই কোনও কেসে কম পড়ায় একমুঠো দন্ত স ঢেলে দিচ্ছেন তো এই বসছেন কম্পোজ করতে। বলতে গেলে জোগাড়ে।

    জগন্নাথবাবু মেদিনীপুরের মানুষ। অতি ভদ্র। বাংলা বানানটি জানা ছিল। শুধু তাঁরই নয়, অন্য কম্পোজিটারদেরও। ক্ষিপ্র হাতে একেকটা অক্ষর তুলতে হত। গালে কালো জড়ুল (কোন গালে যেন?) এক মহিলা— নাকি তরুণী?— কম্পোজ করার ফাঁকে ফাঁকে দিব্যি ঠোঙা থেকে মুখে মুড়ি ঢেলে চিবোতেন। চার দশক আগে নিম্নবিত্ততার রং ছিল ধূসর। প্রেসের কালির সঙ্গে মানানসই। এঁরা কোথা থেকে আসতেন, লেখাপড়া কত দূর, সারা দিন অক্ষর সাজিয়ে রোজগার কত— এইসব জরুরি তথ্য জেনে নেওয়া হয়নি। জেনেছিলাম শব্দের শুরুর মাত্রাছাড়া আর মাঝের বা শেষের মাত্রাযুক্ত এ-কারের পার্থক্য। কী লাভ হল জেনে?

    জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবুর’-এ ষোড়শ শতকের শুরুর ভারতীয় গাছপালা, ফলমূল, এমনকী চাষবাসের খুঁটিনাটি বর্ণনা করেছেন। কী লাভ হল তাতে?

    কাছেই ট্রামরাস্তার উপর জহরের অফিস। জহর সেনগুপ্ত। কাছাকাছি নিশীথ ভড়। বিবেকানন্দ রোডের ওপার থেকে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। অফিস মানে তো সেই কর্পোরেশনের। আড্ডার বেপরোয়া পরিসর। কখনও-বা রূপবাণী সিনেমার সামনে পূর্বাণী রেস্টুরেন্ট। একফালি বোর্ডে ঝুলত ‘মাংসের সিঙ্গাড়া’। হিন্দু বাঙালি মতে বিশুদ্ধ নিরামিষ একটি ভোজ্যকে– যাতে পেঁয়াজ-রসুন দেওয়ারও প্রথা নেই— চরম আমিষ করে তোলাটা হয়তো-বা উত্তর কলকাতার পক্ষেই সম্ভব!

    মাংসের সেই সিঙ্গাড়া কিন্তু আজও জিভে লেগে আছে। আর লেগে আছে সামনের ফুটপাথে-বসা মুড়িওয়ালার চিড়েভাজা-মাখা। পেঁয়াজ, আদা, কাঁচালংকা আর ধনেপাতা কুচি পরিমাণ মতো চিঁড়েয় ফেলে– সঙ্গে একটু সর্ষের তেল– যে-কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে মেখে দিত, সেটি নিশ্চয় ছিল কোনো জাদুদণ্ড! না-হলে ঠোঙাভর্তি খাবারটি অমন দেবভোগ্য হয়ে উঠত কী করে?

    অথচ, আমরা কেউ দেবতা ছিলাম না। তবু তেমনটাই একদিন শুনতে হল।

    হয়েছে কী, মাঝেমধ্যে যেমন আসে, দিনকয়েক আগে মেসে এক সন্ধ্যেয় সাফারি স্যুট, কাঁধে ব্যাগ, হাতে ব্রিফকেস, টাকমাথা এক বেঁটে মতো আগন্তুক হাজির। ঘর চাই। পেয়েও গেল। দু-একদিন বারান্দায় সিঁড়িতে হাসি-বিনিময়। এক বিকেলে বারান্দা থেকে নীচের হরিকে চায়ের জন্যে তাগাদা দিচ্ছি, লোকটাও বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পাট্টার পাজামা, স্যান্ডো গেঞ্জি। ঝোলানো গোঁফ হেসে উঠল— আও না। কেয়া চায়-ফায় পিতে হো?

    আরে, লোকটা অবাঙালি! মুহূর্ত মধ্যে মাথার ভেতর রহস্যের জন্ম। কে লোকটা? তিন-চারদিন ধরে এখানে কী করছে? দেখাই যাক না!

    সিঙ্গল রুম। মাথার কাছে ছোট্ট টেবিল। গায়ে চেয়ার– বৈঠো।

    পর্দা সরিয়ে হরি ঢুকল। হাতে খালি প্লেট। রেখে বেরিয়ে গেল। খাটের তলা থেকে টেবিলে উঠল একটা ক্যারি ব্যাগ। সেখান থেকে ডালমুটের প্যাকেট। বেঁটে বোতল। হানি বি– লো, পিয়ো।

    একসময় ‘বহোত গর্মি’ বলে পাজামা খুলে ফেলেছে। ড্রয়ার আর স্যান্ডো গেঞ্জি এখন আধশোয়া। হ্যাঁ, পাটনায় তার নাকি অফিস। সেই কাজে কলকাতায়। থাকতে হবে কয়েকদিন। আমি কি কাল সন্ধ্যেয় জ্যোতিতে শোলে দেখতে যেতে পারি? টিকিট? চিন্তা মৎ করো জি। ব্ল্যাকমে মিল যায়েগা। না। কাল সন্ধ্যেয় প্রেসে যেতে হবে। প্রেস? কেন? প্রুফ আনতে। প্রুফ? উয়ো কেয়া চিজ হ্যায়?

    সব শুনে কী যে বুঝল, কে জানে! উঠে বসল ধড়মড়িয়ে— আরে, তুম ঔর তুমহারা দোস্ত লোগ তো আজব লেড়কা হো! কিন্তু এইসব খরচ আসে কোত্থেকে? আবার বেশ কিছুক্ষণ বকবক। হাতে গ্লাস, ঝোলানো গোঁফের নীচে সিগারেট, ধোঁয়ায় সরু চোখ। শোনার পর কিছু বলবে, এমন সময় ঘরের পর্দা সরিয়ে লিয়াকত আলি ঢোকে। একদা-নকশাল। দেড় বছর দমদম সেন্ট্রাল জেল। তারপর নানা জায়গায় ঘুরেফিরে কলকাতায়। মেসে আমার গেস্ট। মুখে হাসি— খুঁজে মরছি। আর তুমি এখানে?

    তারপর আর কী। বিহারীবাবুর সঙ্গে দোস্তি মুহূর্তে। ওঠার সময় তার আবদার—আমাদের এইসব কাজের জন্যে কিছু টাকা সে দিতে চায়। হাত বাড়িয়ে টেবিলে রাখা ব্রিফ কেসটা কাছে টানে। আমরা বাধা দিই। ছড়ানো জিনিসপত্র দেখিয়ে বলি— এর চেয়ে বেশি কিছু সত্যিই আমাদের লাগবে না। ততক্ষণে ব্রিফ কেস হাঁ-খোলা। ছোট্ট তোয়ালে। সরিয়ে নিতেই ঝলমলে হিন্দি সিনেমা। একশোর বান্ডিল! ঘরটা ততক্ষণে পালটে গেছে। দু-টো বান্ডিল থেকে একটা করে নোট টেনে এগিয়ে দেয়— লো। পকড়ো। ফের যখন সে বান্ডিলে নোট-দুটো নিরুপায় ঢোকাচ্ছে, তার অস্পষ্ট বিড়বিড়ানি থেকে দু-টো মাত্র শব্দ বোঝা গিয়েছিল— শালে আর দেওতা!

    পরদিন সকালে লোকটা বেপাত্তা। ব্যাগ-ব্রিফকেস নিয়ে। শুধু কয়েকটা হানি বি-র খালি বোতল রেখে গেছে। হরির কাছে জানা গেল– যে ক-দিন ছিল, প্রতিদিনই বেরোত একই সাফারি স্যুট পরে, যেটা পরে সে এসেছিল।

    সবটা শুনে দাড়ি কামাতে কামাতে রায়চৌধুরীবাবুর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য— বেঁচে গেছ!

    জামালপুরে রেলে চাকরি। মাসে দু-বার কলকাতায় আসতে হত। কোনদিন আসবেন, ম্যানেজারবাবুর জানা। একটা বেড তাঁর জন্যে বরাদ্দ থাকত। যশোরে বাড়ি। ছিল। জামালপুরের রেল-কোয়ার্টারে যে-ঠিকানা তাঁর রয়েছে, সেটিও নড়বড়ে। বছর-দুয়েকের মধ্যেই রিটায়ারমেন্ট। তারপর? কলকাতা রায়চৌধুরীবাবুর না-পছন্দ। তাহলে? দুই মেয়ের জনক বেছে নিয়েছেন লক্ষ্ণৌ শহরটাকে। আত্মীয়স্বজন রয়েছে। ওখানেই বাড়িঘর করে চলে যাবেন। কলকাতা কদাপি নয়।

    যখনই আসতেন, খোঁজ পড়ত। সকালের দিকে চা-সহযোগে নানা গল্প হত। সন্ধেয় অফিসের কাজ সেরে যখন আসতেন, বেশ ক্লান্ত লাগত তাঁকে। রাতের খাবার আসা পর্যন্ত চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে পারিবারিক স্মৃতিচারণের সাক্ষীও হয়েছি। ঠাকুর্দা ছিলেন নেপালের রাজ-পরিবারে গৃহশিক্ষক। প্রপিতামহও তাই। বাবা কী করতেন, জানা হয়নি। তবে কিঞ্চিৎ জমিদারি ছিলই। যে-বার এসে জানালেন—চাকরি আরও মাস-ছয়েক থাকলেও কলকাতায় এটাই শেষ আসা, সে-বার মেসের সবাইকে খাইয়েছিলেন। ম্যানেজারবাবুর ঘরে অনেক রাত অবধি হাসি-গল্প। সকালে অফিসে বেরোবার মুখে ডাকলেন। গিয়ে দেখি, হাসি-হাসি মুখ। হাতে একটা কী যেন ধরা— কিছু না। পেন। দামি নয় কিন্তু, সাদামাটা। তবু লিখো।

    অপ্রত্যাশিত উপহার। পুরো নামটাও জানা হয়নি যাঁর, সেই রায়চৌধুরীমশাইয়ের কাছ থেকে!

    কোনও কোনও জিনিস যে ব্যবহার করতে নেই, তুলে রাখতে হয়, তখনও জানা ছিল না। এভাবে নষ্ট করে ফেলেছি কত স্মৃতি—লিখে, প্রুফ দেখে। পরে-পরে ছিঁড়ে ফেলেছি কত জামা-প্যান্ট। নষ্ট করে-করে বুঝেছি– উপহার নেওয়ার চেয়ে দেওয়ায় আনন্দ বেশি। দেখেছি তো রামকৃষ্ণ প্রেসের জগন্নাথবাবুকে। যেদিন প্রুফ দিতে পারতেন, গোল করে পাকানো পাতাগুলো যেন ওল্ড টেস্টামেটের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপি– ডেড সি স্ক্রোল!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More