অযোধ্যা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    তেতাল্লিশ বছর আগের ছবি। বুনো চড়াই পেরিয়ে পাঁচ আগন্তুক দাঁড়িয়ে আছি। বনদপ্তরের চেষ্টাকৃত পাইনবনে। পিছনে বনবাংলো, যেখানে আমাদের ঢোকার অনুমতিপত্র নেই। তারও পিছনে পাহাড়ের ওদিকে সূর্য তলিয়ে যাচ্ছে। সামনে উঁচুনীচু প্রান্তর, যেটি আসলে অযোধ্যার উচ্চতম স্থান। চারপাশে ছোট-বড় পাহাড়। ঝাঁক ঝাঁক টিয়াপাখির সবুজ উত্তরীয় আকাশে এঁকেবেকে টাল খেয়ে উড়ে জানান দিচ্ছে, আমরা এখানে ভিন্ন প্রজাতি।

    বেলা ফুরিয়ে আসার আগেই আস্তানা চাই। আমাদের গন্তব্য কৃত্তিবাস মাহাতো নামের স্থানীয় প্রভাবশালীর বাড়ি। সম্ভবত অঞ্চল প্রধান। সেখানে পৌঁছে গেলেই রাতে জুটবে টাটকা ঘিয়ের গরম গরম পরোটা। বনমুরগি না জুটলেও আলুর দম কি আর মিলবে না? নির্মলের আশ্বাস।

    শুরু হল হাঁটা। চোখে আদিবাসীর হাসির মতো দৃশ্যাবলি। কিছুদূর হাঁটার পর— আরে, আমরা চারজন যে! কে নেই? অশোক দত্ত। বাঁদিকে এক পলাশ গাছ। ফুলভারে নুয়ে পড়েছে। তারই এক ডালে শুয়ে আছে সে। যেন হ্যামকে! অজস্র পলাশের কুসুমিত তলায় গুঁজে দিয়েছে নিজেকে। শুধু বসন্তক্ষত হাসি-হাসি মুখটি তখনও জেগে। তখন কি সে লিখে ফেলেছিল ‘অষ্টবসুর বিভা’?

    একসময় প্রান্তর শেষ হল। গাছপালা ঘন হয়ে জঙ্গলের আকার নিল। গ্রামের মতো একটা কিছুর আভাস। খোঁজ করতে করতে সন্ধের মুখে জানা গেল সেই ভয়ংকর দুঃসংবাদটি— কৃত্তিবাস মাহাতো নেই। আজ ফিরবেন না। তা হলে?

    তাহলে আর কী! যার কিছুই নেই, তার চা–ওয়ালা আছে। আরে, জঙ্গলের ফাঁকে—কতটা দূরে বোঝা মুশকিল– একটা আলো জ্বলছে না? ও কীসের আলো? ততক্ষণে রাতের জংলি পোকারা গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা ডাকাডাকি করছে। খবর নিচ্ছে পরস্পরের– কারা যেন ঢুকে পড়েছে না? সেইসব সন্ত্রস্ত শব্দের ভিতর দিয়ে হেঁটে মুখোমুখি এক চা-দোকান।

    নুয়ে-পড়া চালাঘর। টিমটিমে এক লন্ঠন। টিনে মুড়ি। বয়ামে চানাচুর। আরও দু-একটা বয়ামে কিছু যেন। কাঠের ছোট্ট পাটাতনে কয়েকটা গ্লাস। পাশে কাঠের উনুন। ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে বসানো কালচে কেটলি। সবই দেখা যাচ্ছে আবছা। এমনকী দোকানিকেও।

    বাইরে চাঁদের আলো। বাইরে বেঞ্চির মতো কিছু পাতা। তাতে দু-জন বসে। পাঁচ আগন্তুককে পাশে বসতে দেখে তারা নড়েচড়ে বসল। মশা গিজগিজ করছে। কোথা থেকে? কী ব্যাপার? আমরা কে? মনে হল, সন্তোষজনক উত্তর তারা পায়নি। শহরের কাছ থেকে জঙ্গলের এই জীবগুলি তেমন উত্তর কবেই-বা আর পেয়েছে!

    মুড়ি-চানাচুর দিয়ে চা খেতে খেতে ব্যবস্থা এই হল যে, আমাদের সঙ্গের চাল, ডাল, অবশিষ্ট আলু-টম্যাটো-ডিম তারা রেঁধে দেবে। কিন্তু, এ তো অনেকটা। আমরা খেতে পারব তো? সঙ্গে সঙ্গে নিমন্ত্রণ করা হল সেই দু-জনকে। দোকানি-সমেত খাব আমরা আটজন। হবে না? খুব হবে! ব্যস, শুরু হল রান্না।

    কিন্তু থাকা? কেন, এই বেঞ্চে আর দোকানের উপর? থাকা যাবে না? খানিক পরেই তো ঠান্ডা পড়বে। জাড়ে কষ্ট হবে যে! ঠান্ডা? কতটা? সে না হয় দেখা যাবে।

    চা-শেষে সবে তামাকে টান পড়েছে, পোকাদের কলরব ছাপিয়ে কোত্থেকে যন্ত্রচালিত গান ভেসে এল। রাতে মাইকে গান? এখানে? জানা গেল—খাবার দিতে ডাকছে। কাদের? আশপাশের আদিবাসীদের। কারা? মিশন। কোন মিশন? লুথেরান। সেটা কোনদিকে? এই জঙ্গলটা পেরিয়ে। অনেক দূর? না, না। কাছেই।

    চল তো দেখি।

    টর্চের আলোয় পরপর গাছের গুঁড়ি দেখা যায়, কিন্তু পথ দেখা যায় না। যত এগোচ্ছি, মাইকের আওয়াজ বাড়ছে। কীভাবে যে জঙ্গলটা পেরোনো গেল, আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু পেরিয়েই প্রশস্ত চাতাল। জেনারেটরের আলোয় ঝলমলে। তিনদিকে ঝকঝকে একতলা বাড়ি। মাঝের বাড়ির বারান্দায় পেল্লায় হাঁড়িতে খাবার। সেই খাবারের দিকে মুখ করে থালা হাতে অভুক্ত মানুষজনের লম্বা লাইন। মাইকের আওয়াজে দূরের অন্ধকার কেঁপে কেঁপে উঠছে— আশমান সে আয়া ফরিস্তা…। স্বর্গপ্রেরিত সেই খাবারের গায়ে দুই তরুণ। পায়ে স্যু, সটান জিনস, চেন-খোলা লেদারের জ্যাকেট। সদা ব্যস্ত। একজন দিচ্ছে রুটি, অন্যজন হাতায় করে বাঁধাকপির তরকারি। ধীর পদক্ষেপে খিদে এগিয়ে চলেছে।

    ব্যস্ত হাত থমকে গেল। দুই তরুণের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি আগুয়ান আমাদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে মিছিলের মুখগুলোও গেল ঘুরে। কারা? রাতের বেলা কোত্থেকে? উদ্দেশ্য কী? এই জঙ্গলে নিরাশ্রয় পাঁচজনকে পেয়ে তরুণ-দুটির সেবাধর্ম চাগাড় দিয়ে উঠেছে। আসুন। একজনের পিছু পিছু গেলাম একটা ঘরে। কালো, গাঁট্টাগোট্টা এক ভদ্রলোক। সাদা প্যান্ট-শার্ট। ভারী টেবিলে ঝুঁকে। মুখ তুললেন। মালয়ালি। রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন। ও বাবা! খাস মিলিটারি! অতএব দু-একটা কথা— আমরা কি খেতে চাই? না। ওধারে আমাদের রান্না হচ্ছে। তাহলে? একটা রুম কি পাওয়া যায়? কিন্তু পাঁচজন যে! দু’টো ঘর তো লাগবেই। চিন্তা নেই, গেস্টরুম তাঁদের দু’টো। আমরা থাকতে পারি। টাকা? হাসি ভেসে উঠল। যেন ধূধূ খরায় নীল আকাশে একখণ্ড সমর্পিতপ্রাণ মেঘ— ‘এসো মেঘ, তোমাকেই খাই।’

    তারপর আর কী! সেই চা-দোকানে নিশ্চিন্তে খেতে যাওয়া। জঙ্গলের দুই অতিথির সঙ্গে অপূর্ব ভোজন। ডাং-পরিমাণ ভাতের সঙ্গে আলু সেদ্ধ, ডাল, ডিম সেদ্ধ আর টম্যাটোর চাটনি। শেষে গোল হয়ে তামাকসেবন।

    ফেরার পথ নিবিড় জঙ্গলে ঢাকা। ভুল পথ, ঠিক পথ, ফের ভুল, ভুলভুলাইয়া!

    তাই বলে ফিরিনি কি?

    আহ! মনোরম দুইটি প্রশস্ত কক্ষ। দ্বিশয্যাবিশিষ্ট। ভূতল কার্পেটাচ্ছাদিত এবং অকুঞ্চিত। পার্শ্বে কাষ্ঠনির্মিত সুদৃশ্য লো-টেবিল। তাহার উপর বিলায়তি ভস্মদানি। দুগ্ধফেননিভ শয্যার পাদদেশে ডয়েসল্যান্ডীয় ব্ল্যাংকেট। সংলগ্ন স্নানকক্ষে সর্বাধুনিক আয়োজন।

    বলতেই হবে, এত মূল্যবান দু’টি কক্ষ ঘুমিয়ে আমরা নষ্ট করিনি। অনুমান করতে পারি, এইসব দানের দ্রব্য সুদূর ইয়োরোপ থেকে এসেছে এ-দেশের হতভাগ্যদের জন্যে। যাঁরা দান করেছেন, তাঁরা জানেন না– তারা কত তলদেশের গরিব। আমরা জেগে ছিলাম কবিতায়, গদ্যে আর আশ্রয়দাতাদের আড়ম্বরপূর্ণ সেবাধর্ম বিষয়ে হাস্যপরিহাসে।

    সকালে বেড টি। এবং ক্ষণেক পরে রুটি-তরকারি সহযোগে ফের চা। বারান্দায় ততক্ষণে যুদ্ধসাজ। তিন-চারটে মোটরবাইক। প্রতি বাইকে দু-জন করে আরোহী। প্রত্যেক আরোহী জ্যাকেটে-জিনসে-জুতোয়-হেলমেটে সুসজ্জিত। পিঠে ব্যাগ। কোথায় যাবে এরা? পাহাড়ি গ্রামগুলোতে ওষুধ, শুকনো খাবার, বইপত্র দিতে।

    আমরা বেরিয়ে পড়ি।

    পাহাড়ে। বনপথে। খাদের ধারে-ধারে। ঘন আমলকিবনে থোকা-থোকা আমলকি ভার হয়ে নেমে আছে। কত-না বেলগাছে সবুজ আর মসৃণ বেল। বনবালকের মতো আমলকি পেড়ে-পেড়ে পকেট ঝুলে পড়ছে। জানতেও চাই না, এত কিছু বয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তবু পাড়ি।

    সরু বনপথে নেমে এসেছে দু-পাশের ডালপালা। কেউ পরিচর্যা করেনি। গোড়ায় সার দেয়নি। জল ঢালেনি একফোঁটাও। তবু যে হাউসিংয়ের পর হাউসিংয়ের মতো এত-এত জঙ্গল সিন্ডিকেট ছাড়াই কী করে বেড়ে উঠল, এত অরণ্যানী টিকে রইল এত কাল!

    গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাখিদের জটলা। ওরা ডাকাডাকি করছে। হয়তো কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। তবু আমরা বলতে ভালোবাসি— ডাকছে! যেন আমাদেরই। সহসা সবাইকে চমকে দিয়ে কাছের এক মহুয়া গাছ থেকে নয় যেন, বিলুপ্ত জগৎ থেকে, ময়ূর উড়ে গেল নীচের কোনও জঙ্গলের দিকে। একটু এগিয়ে আরও একটা। ময়ূর? হ্যাঁ, ময়ূরই তো!

    মানুষ বিহ্বল হলে কী করে? আমরা জঙ্গলকে নষ্ট করেছিলাম। অথবা নিজেদের। গড়গড়িয়ে নেমে গিয়েছিলাম খাদে। ফের উঠেছিলাম। তামাক খেয়েছিলাম বুক ভরে। নির্মলের মাথায় রাখাল যুবকের ঢঙে রুমালের পাগড়ির আভাস। অশোকের মাথায়ও। কিন্তু সে তো নকলই! জঙ্গলের এই নিজস্বতার কাছে আর সব নিজস্বতা তুচ্ছ। তাই কেউ কাউকে দেখছিলাম না। পরস্পরের কবিতার টুকরো আওড়ানোর চেষ্টা করছিল কেউ কেউ। উড্ডীয়মান ময়ূরের ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে কে যেন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মতো বলে উঠল সৈকতের কবিতার লাইন— ডিম দিব! ডিম দিব!

    অফুরন্ত অযোধ্যা। কিন্তু সময় অফুরন্ত নয়। কথা ছিল, দুপুরে একটা জিপ যাবে শহরে। আমরা সেটাতে ফিরে যেতে পারি। তার আগে খেয়ে নিতে হবে। চলো ডেরায়।

    ফেরা সিরকাবাদ হয়ে। নড়বড়ে রাস্তা। নেমে যাচ্ছি, নেমে যাচ্ছি। পাহাড়ের গা বেয়ে, বুনো কোনও গাছের গা-ঘেঁষে, ঝরনা মাড়িয়ে। পিছনের দৃশ্যাবলি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। চিরতরে?

    কোথাও একটা পাকা মাথা খাঁচার ভিতর থেকে বলে যাচ্ছিল— হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিরতরে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More