পুরুল্যা পুরুলিয়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    বন্ধুরা জানে— আমি পুরুলিয়ায়। অথচ সিঁড়ি ভাঙছি। রবিবারের কফি হাউস। ফাঁকা যতটা, চোখে লাগে তারও বেশি। ইনফিউশন আসে অবশ্য। কিন্তু কালো কফিকে ঘিরে অস্থির চারপাশ। পালাই-পালাই ভাব। যখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল অস্থিরতা, কাউন্টারের পিছনে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটা পেরিয়ে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে না যদিও, ভিতরে একটানা টিক টিক টিক। পায়ের পেশিতে তার প্রতিধ্বনি। চক্রধরপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ক-টায় যেন? দশটায় না? হ্যাঁ, নির্মল হালদার তো তেমনই লিখেছিল চিঠিতে। তাহলে বসে আছি কেন?

    ঠিক তারপরই দ্রুত সবকিছু ঘটতে থাকে। কীভাবে যেন মেসে পৌঁছে যাই। দু-হাতে জামাকাপড় ঠেসে ভরতে থাকি ব্যাগে। নীচে ট্রাম যাচ্ছে একটার পর একটা। যেন তাড়া দিচ্ছে।

    এই রাতে ব্যাগ? যাবেন কোথাও? কই, বলেননি তো?— তপনের বিস্ময়। পুরুলিয়া। সে কি! ফিরবেন কবে? জানি না— বেরিয়ে যেতে যেতে আমার উত্তর। পিছনে হাসি-সহ তপনের মন্তব্য—বলা নেই কওয়া নেই, দুম করে পুরুলিয়া? আজব কাণ্ড যা-হোক! ততক্ষণে বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি। শেষে রাস্তা। এবং আচমকা একটা দশ নম্বর বাস। লাল। উঠে পড়ি।

    জীবনে যে ক-টা সালতারিখ মনে আছে, এটা একটা। ছিয়াত্তর সাল। মার্চের ন-তারিখ। যাওয়ার কথা পুরুলিয়া। সে-শহরে আছে নির্মল হালদার, সৈকত রক্ষিত। আর আছে অশোক দত্ত। সেখান থেকে দল বেঁধে কোথায় যেন অযোধ্যা পাহাড়। কলকাতা থেকে যাওয়ার কথা পার্থপ্রতিম, গৌতম চৌধুরী আর আমার। এবং শনিবার। পার্থ যায়নি। আমিও না। একা গৌতম সেখানে হাজির সম্ভবত। আর আমি?

    হাওড়া স্টেশনে ঢুকব, ঘড়ির কাঁটা দশটা ঘেঁষে। ছুট ছুট। চক্রধরপুর কোন প্ল্যাটফর্মে? ওই যে! ওই যে! কোথায় টিকিট কোথায় কী, সবে ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অতিকায় ইস্পাতের একটা অজগর। অতি ধীরে। তবু তার লেজটা ক্রমশ পিছলে দূরে সরে যাচ্ছে। পিছু পিছু আমি। শেষে দমকা ছুট দিয়ে শেষ দরজার কাছাকাছি যখন, অবিশ্বাস্য যে, কারও হ্যাঁচকা টানে আমি তখন ট্রেনের পাদানিতে। পা রাখার জায়গা কাকে বলে, সেদিন বুঝেছিলাম শেষ পাদানিতে পা রাখতে পেরে।

    বুক ঘেঁষে খাকি উর্দি। নির্ঘাত রেলপুলিশ! আমার পরিত্রাতা। তাঁর ফাঁকফোকর দিয়ে দেখি, ছোট্ট কামরা। গার্ডের। ট্রের মতো টেবিলে ঝুঁকে সাদা পোশাকের তিনি কী-একটু লিখে ঘুরে তাকালেন। হাতে সিগারেট। দেখেই মনে পড়ল— আরে, সঙ্গে একটাও সিগারেট নেই তো! সারাটা রাত কাটবে কী টেনে? যার পকেটে টিকিটই নেই, তার আবার সিগারেট! ভেবে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করছি, দম নিতে একটা কাঠের বাক্স দেখিয়ে বসতে বলা হল। তবে কি ল্যাজে খেলিয়ে কাটতে চাইছে এরা?

    ততক্ষণে ট্রেন গতি পেয়ে গেছে। আর ট্রেন একবার গতি পেয়ে গেলে ভিতরের সব কিছুই যেমন দুলতে থাকে, তেমনই মেজাজও। দেরি না-করে সহৃদয় রেলপুলিশকে বলি— একটা সিগারেট হবে? কিচ্ছু নেওয়ার সময় পাইনি। খাবার, সিগারেট, এমনকী টিকিটও। কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে, পকেট থেকে বের করে আস্ত একটা সিগারেট তিনি এগিয়ে দেন। কোথায় যাব, কী বৃত্তান্ত, জেনেও নিতে চান। অযোধ্যা? বেড়াতে? কী আছে ওখানে? খুঁটিনাটি জানার ফাঁকে জানিয়ে দেন,  খড়্গপুরে খাবার পাওয়া যাবে। কিন্তু টিকিট নেই যে! ইশারায় গার্ড মানে সাদা পোশাকের লোকটিকে দেখিয়ে তিনি বলেন— কোন কলেজ? ইউনিভার্সিটি। ও!

    ব্যবস্থা এই হল যে, কষ্ট করে কাঠের বাক্সটাতে বসেই রাতটা কাটাতে হবে। ভোরে পুরুলিয়া। নামার আগে উনি কাউকে বলে দেবেন, যাতে সমস্যা না-হয়। তবে, কোনও কাজ হুটহাট না-করাই উচিত। সমস্ত কাজের পিছনে প্রস্তুতি না-থাকলে এমনটাই হয়।

    ঠিকানা বলতে– চকবাজার, এস সি সিনহা রোড। কালীমন্দির। সাতসকালে রিকশ থেকে নেমে খোঁজ করতেই গেঞ্জির উপর গামছা জড়িয়ে অশ্বত্থ গাছের তলায় নির্মল হালদার। গায়েই পারিবারিক দোকান, বাড়ি। বাড়ি বলতে নির্মলের দিদি। তার অনেক লেখায় এই দিদির শ্রম লেগে আছে। চা খেতে, নির্মলের তৈরি হতে, যতটুকু দেরি। আমরা পৌঁছে যাই নডিহায়, অশোক দত্তের বাড়ি। শহরের ঘিঞ্জি এলাকা থেকে ফাঁকা-ফাঁকা। প্রশস্ত উঠোন। বারান্দা। সারবন্দি ঘর। একটা ঘরে লোহার সিন্দুককে পাশে রেখে অশোক আর গৌতম চৌধুরী ঘুমোচ্ছিল।

    তারপর কীভাবে সৈকত রক্ষিত এল, কোত্থেকে অযোধ্যার জন্যে তৈজসপত্র জোগাড় হল, আমরা একটা লজঝড় বাসে উঠে পৌঁছলাম বাঘমুণ্ডিতে, সেসব তেতাল্লিশ বছর ধরে চোখে আঁকা আছে। বিশেষ করে পুরুলিয়া শহর থেকে বাঘমুণ্ডির রাস্তা। শত সংরক্ষণের পরও কত ছবি নষ্ট হয়ে যায়। সারা দুনিয়াজুড়ে ছবি সংরক্ষণের বিশেষজ্ঞ দলই এ জন্যে তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি?

    শুধু জানা ছিল, বাঘমুণ্ডিতে কোনও-এক প্রাইমারি টিচার দেবব্রত মাহাতোর কাছে যাওয়া মানেই ধরে নিতে হবে, আমরা অযোধ্যা পৌঁছে গেছি।

    বেলা আন্দাজ দশটা। অপরূপ এক গাছপালা-ঘেরা জায়গায় নেমে বিশ্বাস করতে হল— এটাই বাঘমুণ্ডি। আরে, ছোট্ট চালাঘরে চা-দোকান! খানিকটা হেঁটে খড়ে-টালিতে ছাওয়া গ্রামের ভেতর আমরা। দেবব্রত মাহাতো? খোঁজ করছি যখন, কোত্থেকে একজন হাজির। গায়ে মলিন গেঞ্জি। একটু-বা ছেঁড়াও। পরনে লুঙ্গি। পা বেচাল। শরীরে মহুয়ার আরক্ষণ। বুকে বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে ঘোষণা— আই অ্যাম ডি মাহাতো!

    দূরে বিস্তীর্ণ পাহাড়শ্রেণীর দিকে প্রসারিত তাঁর হাত— অযোধ্যা। যেন নিজের বাড়ি!

    সোজা মেঠো পথে গেলেই রাস্তা। কাঁচা। পাহাড় কেটে। তবে কালেভদ্রে লরি-টরি যায়। কাঠ আনতে। ওদের জন্যেই বানানো। অ্যাঁ? তেরো কিলোমিটার। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। বাইশশো ফুট উঠতে হবে। পিষ্ঠপ্রদর্শনের আগে তাঁর শেষ বাক্য ছিল— গুড লাক!

    নির্মল আর সৈকত তখন একটা কাগজ করত— ‘আমরা সত্তরের যীশু’। পাঁচ যিশুর হাঁটা শুরু হল। আজকাল বাংলায় যার পোশাকি নাম হয়েছে— ট্রেকিং! লক্ষ্য পাহাড়শ্রেণী, যার নীচের থাকে লাল পলাশ আর উপরের থাকে হলুদ। মাইলটাক হেঁটে পাহাড়ের কোমরে উঠে পাওয়া গেল সেই রাস্তা। শাল মহুয়া পিয়াল আর আমলকির জঙ্গলে মাঝে মাঝে উইঢিবি। পাখির কলকাকলি। ঝরা পাতায় মাটি দেখা যায় না। দূরে ঠক ঠক শব্দ কখনো। কাঠ কাটার। পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে সরু সুতোর মতো লম্বা লম্বা লতা। শুকনো। ছাড়িয়ে ফের চলা। নির্মল জানায়— এখানকার বিশ্বাস, এগুলো সীতার চুল।

    অনেকটা হেঁটে, বেলা তখন দুটো-টুটো, পেট নামতে নামতে পিঠে ঠেকেছে। মানুষ খেতে পেলে শুতে চায়। খেতে না-পেলে? যা পায় তাই খায়। বোঁচকায় ছিল চালের সঙ্গে কিছু আলু, ডিম আর টম্যাটো। আর নুন। জল আগেই শেষ। শুরু হল শুকনো পাতা জড়ো করা। সেই পাতায় আলু টম্যাটো আর ডিম ফেলে দিয়ে জ্বালানো হল আগুন। সবার হাতে একটা করে গাছের শুকনো ডাল। লাখদেড়েক বছর পিছিয়ে আগুন উসকে দিচ্ছি পাঁচ ক্ষুধার্ত। নুন দিয়ে আলু আর টম্যাটো পোড়া খেয়ে শেষে একটা করে ডিম পোড়া! খাওয়ার পর জলের বিকল্প সিগারেট। সিগারেটই তো? আঃ, তেমন লাঞ্চ এ জীবনে আর হল না!

    ফের শুরু হল হাঁটা। এ কী! রাস্তা যে দু-দিকে গেছে! কোনটা আমাদের? ঘোর জঙ্গলের মাঝে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে। এমন সময় জঙ্গলের গহীন থেকে এক প্রেরিত পুরুষ। কাঁধে কুড়ুল। কাঠুরে। শীর্ণ হাত তুলে সে অভয় দেয়— ডানদিকে। তবে ঝরনা দেখতে গেলে বাঁ-দিকে যেতে হবে। কাছেই। যে-রাস্তায় যাবি, সেই রাস্তা ধরেই ফিরবি— তার হুঁশিয়ারি। ভুল করলেই ঘুরে মরতে হবে।

    বাঁ-দিকে যেতে যেতে একসময় কেমন একটা শব্দ। জঙ্গল ঘন হয়ে এসেছে। ছায়া বেশি। তারপর শুধুই ছায়া। সেই ছায়ার মাঝে পাথরের পর পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমেই চলেছেন অপরূপা ঝরনা দেবী। পাথরের শেষ দেখতে চান তিনি। পৃথিবীকে গোপন করবার জন্যেই যেন-বা চারদিকে ঘন জঙ্গল। দীর্ঘ বৃক্ষরাজি। কিন্তু মানুষ তো! খিদেতেষ্টা আছে। সেই জল আকণ্ঠ পান করা হল।

    সেই ঝরনার কি কোনও নাম ছিল? সেটাই কি টুরগা ফলস? নাকি বামনি? কে যে বলে দেবে! আর কেই-বা তাকে রক্ষা করবে!

    ফিরতি পথে ফের হাঁটা।

    একসময় জঙ্গল ফুরিয়ে এল। বিকেলও। আমাদের চড়াই ভাঙাও শেষ। সামনে মালভূমির মতো উঁচুনীচু প্রান্তর। সেই প্রান্তরে ভাস্কর্যের মতো একেকটা গাছ। শাল, মহুয়া, পলাশ। সূর্যাস্তের আগে হাজার হাজার টিয়ার চঞ্চলতা। শুরু হল পাইনের বন। আর তার ফাঁকে বনদপ্তরের নতুন বাংলো।

    আমরা এসে গেছি। অযোধ্যা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More