লকডাউনে কল্লোলিনী

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

    এই শহরের এক নামকরা বাজারের কোণে জ্যান্ত মাছের হাঁড়ি নিয়ে বসেন পাঁচুদা। লকডাউনে তার হাঁড়িতে এখন মরা মাছের ভিড়।
    “জ্যান্তরা কই দাদা?” প্রশ্ন ছুড়লে বলছেন, “এই গরমে মাস্ক-পরা মাছ কতক্ষণ আর টিকে থাকবে বাবু? তবে হ্যাঁ, একটা গ্যারান্টি দিতে পারি, এ মাছ করোনায় মরেনি।”
    এমন গ্যারান্টি অবশ্য এ বাজারে বেশ কঠিন। করোনা-জামানায় বিশ্বাসের ছবি বড়ই আবছা। বেসরকারি টিভিতে সরকারি ডুয়েলের মুখরোচক। চলছে দেদার ভেংচি কাটাকাটি।
    আমজনতার অবশ্য ভেংচি কাটার উপায় নেই। মুখোশে ঢাকা মুখ। মুখ-মুখোশের লড়াই আপাতত শেষ। সবাই এখন মুখোশধারী। ফোনালাপে এক রসিক মেসোমশাই বললেন, “গিন্নি কী বলেছে জানো। বলেছে মুখোশ পরে তোমাকে রামায়ণের জাম্বুবান মনে হচ্ছে।”
    তা হোক। জাম্বুবান স্বাগত, স্বাগত জাম্বুবতী। মুখোশেই যখন রক্ষে, তখন উপায়টাই বা কী।
    বাজারে মুখোশের কিন্তু ঢের রকমফের। ফিরফিরে আটপৌরের পাশে জমকালো কুলীন। পাপ্পুর লাল, তিতলির পিলা— এই বাছাবাছিতেই এবারের চৈত্র মাস কাটিয়ে ফেললেন অনেকে। ড্রাগ স্টোরে খুলেছে আলাদা মাস্ক কাউন্টার। দামি মুখোশ নেড়েচেড়ে দেখে চোখ কপালে তুললেন এক মহিলা। দোকানদারকে প্রশ্ন ছুড়লেন, “দাদা, এই মোটা কাপড়ে দম আটকে যাবে না তো?”
    এদিকে মুখোশ খুলে দম নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে বেদম খেয়েছে পাড়ার বিশ্বনাথ ওরফে বিশে। পাড়ার মোড়ে চলছে তার ঘ্যানঘ্যানানি। বিষ উগরে যাচ্ছে পুলিশের ওপর। পরিচিতজন পেলেই গল্প, “বুঝলেন দাদা, পরেই বেরিয়েছিলাম। মোটে হাফ মিনিটের একটা মিসটেক। বিড়ির ছোট্ট দুটো টান দেব বলে সবেমাত্র খুলেছি। আর সেই সুযোগেই…। শালা গাঁটে গাঁটে মেরেছে। এটা একটা বিচার হল… বলেন?”
    “বেশ করেছে পেঁদিয়েছে! হাফ মিনিটের বিড়ি ব্রেক! মামদোবাজি! এই বেয়াদবদের জন্যই শহরের এই হাল!” একটু দূরে গিয়ে রাগ ঝাড়লেন শুঁটকে এক দাদা। সমর্থনে আরও কিছু মুখ। অবাধ্যদের জন্য অসন্তোষ জমে আছে অনেক মনেই। চোখে সন্দেহের ভাষা। পটলচেরা চোখের মালিক পর্যন্ত তাকাচ্ছেন আড়চোখে।
    “হ্যাঁচ্চো” দিয়ে ভরা বাজারে আওয়াজ খেলেন প্রতিবেশী সুজনদা। ভদ্রলোকের সিস্টেমে ছোট থেকেই গন্ডগোল। একটা দিয়ে কিছুতেই থামেন না। বড়র পরে মেজ, তারপর সেজ…। মাস্ক ভেদ করে দ্বিতীয় হাঁচি ফিচিত করে পড়তেই হুড়মুড়িয়ে এক আওয়াজ। দেখলাম সুজন-সঙ্গ এড়াতে মরি-বাঁচি করে দৌড়োতে গিয়ে পিছলে পড়লেন এক ভদ্রলোক। আর একটু হলে মুণ্ডুটা নেমে যেত আঁশবটিতে। মাছওলা “চ্যাআআপ” করে একটা বকুনি দিতেই ভ্যাবলা হয়ে গেলেন ভদ্রলোক। কোনরকমে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জবাব দিলেন, “কী করব বলুন না, হাঁচি পড়ছে যে।”
    ইতিমধ্যে আরও দুটো হাঁচি বেরিয়েছে। পাশ থেকে আওয়াজ এল, “এই হেঁচোটাকে ধরে সোজা চালান করে দে বেলেঘাটা আইডি-তে।” বেলেঘাটার কথায় হাঁচির বোধহয় বোধোদয় হল। হাঁচি হুট করেই ব্রেক কষল মাঝপথে।

    লকডাউনে হুট করে ব্রেক কষছে অবশ্য অনেক কিছুই। ব্রেক কষেছে চিন্তার চাকা, রোজগারের টাকা। পেশা নিয়ে অনেকেই তাই দিশেহারা। চেনা টোটোচালক ফুল নিয়ে বসছেন ফুটপাতে। বন্ধ চা-দোকানের পাশে টুল পেতে পাঁউরুটির দোকান সাজিয়েছেন পরিচিত চা-দোকানি। স্যানিটাইজেশনও এখন ব্যবসা। সবজিওয়ালার পাশেই সবজি-স্নানের ব্যবস্থা করেছে ছোট্ট দুই খোকাখুকি। সাবানজলে সবজি চুবিয়ে দিব্যি চলছে স্যানিটাইজেশন। ভেসে আসছে কচি গলার ব্যবসায়ী ডাক— “আসুন দাদা, চুবিয়ে দেব, ডুবিয়ে দেব, করোনাকে হারিয়ে দেব।”
    ঘরে গিন্নির গজগজে সবজি-স্নানের চেয়ে এই বরং ভাল। সাতপাঁচ চিন্তা করে বাজারের ব্যাগ হাতে সবজি শুদ্ধির দোকানে লাইন দিচ্ছেন পত্নীনিষ্ঠ দাদাটি।
    লাইন এখন সর্বত্র। রেশন দোকানের লাইন বেঁকেচুরে লম্বা হয়ে এসে মিশেছে বড়রাস্তায়। লাইনে দাঁড়ানো শুকনো মুখে অনেক গল্প। করোনা এড়াতে রুমাল-গামছার মুখোশ। ময়লা আঁচলে নাক ঢেকেছেন আটপৌরে গৃহবধূটি। ওদিকে একপাশে আনমনে চাল চিবোচ্ছে বারো বছরের খুকি। আগুন জ্বলছে পেটে। চাল ফুটে ভাত হওয়া তো ওবেলার গল্প। এ লাইনে চোখ রাখলে ভাবনা কেমন যেন বেলাইনে হাঁটে।
    স্পিরিট-শপের সামনে অবশ্য খুশির লাইন। দাদা-পিসে-কাকুরা সবাই স্পিরিটেড। চকচকে চোখে ফুর্তির ঝিলিক। দীর্ঘ বিরহের পর প্রিয় মিলনের সরকারি আহ্বান। কল্লোলিনীর অলিগলিতে তাই মানুষের ঢল। ভেসে গেছে ‘লক্ষ্মণরেখা’। মিটার-দূরত্ব ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাদারা একত্রে বলছেন, “উই আর অন দি সেম বোট ব্রাদার।”
    দেখেশুনে পাড়ার বিশে এখন আগুনখেকো বক্তা। গাঁটের ব্যথা সেরেছে, সারেনি মনের ক্ষত। গলা চড়িয়ে তার প্রতিবাদ, “শালা দ্যাখো কাণ্ড, বিড়ির নেশায় ছাড় নেই, এদিকে মালখোরের কী আপ্যায়ন!”
    আপ্যায়নই বটে। রাতের রাস্তায় চোখে পড়ছে টলোমলো পায়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙ্গা করে ফিরে আসছে কেলো-ভুলোর দল। সে মিছিলে কে কার গায়ে পড়ছে হুঁশ নেই। আর অন্যদিকে মহাপ্রস্থানের পথে রোজ চলেছে আর এক লম্বা মিছিল। এই দুই মিছিল নিয়ে চুনোপুঁটিদের মুখ খোলা অবশ্য বাতুলতা। কারণ, একদিকে আছে দেশনেতার প্রেরণা, অন্যদিকে জগৎপিতার ডাক।

    চিত্রকর: রাজ রায়

    পড়ুন, আগের পর্বগুলি…

    দূরবীনে চোখ

    আঁতেলনামা

    ‘বারোয়ারি নকশা’য় সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

    নিখিল ভারত… সমিতি

    ‘বারোয়ারি নকশা’য় জয়দীপ চক্রবর্তীর ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

    গৃহবন্দির জবানবন্দি ১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More