দূরবীনে চোখ

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

২৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

যাই বলুন, স্বচ্ছতা নিয়ে এই মুহূর্তে কোনও প্রশ্ন হবে না। ভারত এখন আরও স্বচ্ছ, বাংলা আরও নির্মল।
দূষণ-অসুর আপাতত ঠাঁই পেয়েছেন আইসিইউ-তে। পরিবেশ-দেবতা সদ্য রিহ্যাব ফেরত নায়কের মতো। উজ্জ্বল, চনমনে।
স্বাস্থ্যবিধির ছোঁয়া লেগেছে ঘরেদোরে। আচরণে সবাই এখন শুচিবায়ু পিসিমা-ঠাকুমা। তাছাড়া উপায়টাই বা কী? উচ্ছে-পটল-আলু ঢ্যাঁড়শ— কার হাত ধরে যে সে সব্বোনেশে আসবে তা কে-ই বা জানে? তাই ডোবাও, চোবাও, অবগাহন করাও সমস্ত বহিরাগতকে। আলু-পটলেরও ভাগ্য! সাবান-স্নান সেরে বলি হতে যাচ্ছে রান্নাঘরে।
কানে এল প্রতিবেশীর স্যানিটাইজড ব্রেকফাস্টের খবর। গৃহকর্তার অতিসাবধানতায় ডেটলগন্ধী আধভিজে পাঁউরুটি উঠেছে সকলের মুখে। তা হোক। স্বচ্ছতা, শুদ্ধতা সবসময় সুগন্ধি হয় না। এ খবর জানলে লেডি ম্যাকবেথ দোষ চাপাতেন না আরবের সুগন্ধিকে। মনে করুন সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘all the perfumes of Arabia will not sweeten this little hand’।
আসামী হাত থেকে ফিরে আসি ফরিয়াদি হাতে। নির্দ্ধিধায় বলা যায়, এই মুহূর্তের সবচেয়ে নিষ্পেষিত নির্যাতিত অঙ্গের নাম হাত। সাবান, স্যানিটাইজার আসামীর ভূমিকায়। শালীনতার সীমারেখা অতিক্রান্ত। তবু কেস উঠছে না কোর্টে। ফেনাসাগরে ভেসে গেছে উপকারী ব্যাক্টিরিয়ার দল যারা এতদিন হাতের দোলনায় হেসে-খেলে বেড়াত। চামড়ার বেশ কিছু স্তর বেমালুম চলে গেছে নিরুদ্দেশে। নিয়মিত পুষ্টির জেরে ক্ষীণ হস্তরেখাও এখন আরও বলিষ্ঠ, আরও চকচকে। এই সংকটকালে তাদের কে তুঙ্গী, কে বক্রী আর কে-ই বা সখা, কে জানে? বিধাতা কি টেলিস্কোপে নিয়মিত নজর রাখছেন হস্তরেখায়?
রেখার প্রভাব অস্পষ্ট হলেও ঘরে ঘরে কাজের হাত কিন্তু ঢের বেড়েছে। ঘরের কর্তা লক্ষ্মীছেলে হয়েছেন। দিগ্বিজয়ের সুযোগ নেই। পাড়ার চায়ের দোকান ঝাঁপ ফেলেছে সেই কবে। রান্নাঘরের জগতে স্ত্রী নামক রাজমিস্রীয়ের পাশে তিনি এখন অদক্ষ যোগাড়ে। আলুর ডিসেকশন, ঢ্যাঁড়শের ক্রশ সেকশন— সদ্যলব্ধ জ্ঞানে যোগাড়ে আপ্লুত, রাজমিস্ত্রীর মুখে তো বাক্য সরে না।
প্রতিবেশী মুকুলবাবু ফোনে বললেন, ক্যাটরিনার ঝাঁটা-ভিডিও দেখে ভীষণ প্রাণিত তার কলেজগামী বিদূষী কন্যে। সম্মার্জনী হাতে তুলে নিয়েছে অবলীলায়। চোখে পড়ছে— হ্যান্ড গ্লাভস লাগিয়ে বাসন মার্জনার কাজে লেগেছে সামনের ফ্ল্যাটের ম্যানিকিওর করা বউদিমনি। কাজের দিদির বিহনে সবাই এখন স্বাবলম্বী। তবে কৃতকর্মের ভিডিও রেকর্ড করতে ভুলছেন না কেউই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’ না মিললে এ কাজ তো নেহাতই অকাজের মতো।
লকডাউন অমান্য করে সৃষ্টিকর্ম বের হচ্ছে হুড়মুড়িয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়ছে তার দাপট। কলমে ‘তোমার-আমার কাব্য’, তুলিতে ‘কলঙ্কিনী রাধা’। আর্ট পেপারে হাত মকশো করছেন পিকাসো, অবন ঠাকুরের গুণমুগ্ধরা। কারও গলায় টপ্পা, পুরাতনী। কেউ আবার নামগানে মেতেছেন, সঙ্গে খোল, করতাল, খঞ্জনি।
গৃহে অশান্তি থেমে নেই। অনেক ঘরেই টিভি নিয়ে গুঁতোগুঁতি তুঙ্গে। কর্তার করোনা কৌতূহল— সব্বোনেশেটা আজ ক’টাকে ধরল, ক’টাকে গিলল— পরিসংখ্যান মগজবন্দি করছেন। গিন্নির সিরিয়াল প্রেম। পুরনো ভালবাসার মতো পুরনো সিরিয়াল— মায়াবী আবেশ। টনি-বনির কার্টুন প্লাস পড়াশোনা চলছে টিভিতে। সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি চ্যানেল। সব মিলিয়ে টিভির যেন নিস্তার নেই। মাঝরাতে সবক’টা আপদ ঘুমোলে কয়েক ঘণ্টার বিশ্রাম মেলে তার। ভোররাতেই আবার রামদেবের প্রাণায়াম শো!
লকডাউনে ভাগ্য খুলেছে কচিকাঁচাদের। অধরা স্মার্টফোন এখন হাতের মুঠোয়। কোচিং ক্লাস হোয়াটসঅ্যাপে। রমেন স্যারের ভূগোল, মদন স্যারের অঙ্ক। পাশাপাশি ক্যান্ডিক্র্যাশ গেম। সঙ্গে ছোট্ট একটু প্রেম। জীবন এমন মধুর কী জাদুতে হল, ভেবে পাচ্ছে না অনেকেই।
সত্যিই জাদু দেখাচ্ছে সেই অনামুখো সব্বোনেশে। বিলিয়ন ডলারের গর্ব-গুমোর সব চুরমার তার গুঁতোয়। মিসাইল-অ্যাটম বম্বওয়ালা শত্রু কোথায়? মাইক্রোস্কোপের তলায় বসে হুমকি ছুড়ছে আততায়ী। মৃত্যুমিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রনেতা এতদিনে বুঝছেন বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা আসলে একটা ইউটোপিয়ার নাম।
ইউটোপিয়ার কথা শোনা যাচ্ছে এদেশেও। নিন্দুকে বলছে মৃত্যুর হিসেবে নাকি ইউটোপিয়ার ছায়া। রয়েছে ঢের গরমিল। তাই চলছে পাটকেল ঢিল। রোগীর মৃত্যুতে ক্যান্সারের ছুতো, হার্ট অ্যাটাকের গুঁতো— অথচ সব্বোনেশে করোনার কথা কেউ বলে না।
মৃত্যু নিয়ে মুখ খোলা অবশ্য বারণ। মৃত্যু এখন শতকরা হিসেব। মৃত্যু এখন পরিসংখ্যান। মৃতদেহ চলে যায়, ‘unwept, unhonoured, unsung’।
তবে লড়াই চলছে। সবাই লড়ছে একযোগে। লড়াই চলছে গৃহকোণে, মাঠে ময়দানে। লড়ছেন ডাক্তারবাবু, স্বাস্থ্যকর্মী, সেবিকার দল। লড়ছেন পুলিশ, সান্ত্রী। আর নিশ্বাসের অধিকার নিয়ে আইসিইউ-তে লড়াই চালাচ্ছে আক্রান্ত মানুষ। হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিস্টান নয়— মানুষ লড়ছে। ধর্মের সব ঠিকাদার যখন সুযোগ বুঝে ঝাঁপ বন্ধ করেছেন তখন ‘মানুষ’ জেগে আছে, জেগে আছে মানবিকতা। জয়-পরাজয় পরের কথা, লড়াই চলছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় খবর।

চিত্রকর: রাজ রায়

‘বারোয়ারি নকশা’য় সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

নিখিল ভারত… সমিতি

‘বারোয়ারি নকশা’য় জয়দীপ চক্রবর্তীর ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

গৃহবন্দির জবানবন্দি ১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More