বিজ্ঞাপন লাইভ

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন।অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুন্দর মুখোপাধ্যায়

    প্রায় পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে বাঁকুড়ার এক গঞ্জ-শহরে সেই অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটা দেখেছিলাম। না, কোনও লিফলেট বা পোস্টার নয়। এবং সেই আধাশহরে হোর্ডিংয়ের প্রাদুর্ভাব তখনও ঘটেনি। অথচ একেবারে লাইভ বিজ্ঞাপন!
    সেদিন একহাতে সবজি, অন্যহাতে মাছের থলে নিয়ে বাজার থেকে ফিরছি, তখনই অভিজ্ঞতাটি হল। বাজার, মানে স্টেশন লাগোয়া রাস্তার ধারে ঝাঁকাটাকা নিয়ে বসা জনা দশ-পনেরো সবজি বিক্রেতা। সে আমলে বাজার করাটা বেশ স্বাধীন একটা কাজ ছিল, এখনকার মতো মোবাইল-শাসিত শপিং হয়নি। এই তো কয়েক দিন আগে, বাজারে দেখলাম এক নব্য হাজব্যান্ড, পরপর সাজিয়ে রাখা ফুলকপির ছবি মোবাইলে তুলে পাঠাচ্ছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সুগৃহিণী পছন্দের ফুলকপিটি সিলেক্ট করে সেন্ড করলেন এবং দরদাম শুরু হল। তবে মাছের বাজারে মোবাইলবাবুর কাজটা বেশ কঠিন। নর্মাল এবং কানকো খোলা দু’রকমের ছবিই তাকে পাঠাতে হচ্ছে। না হলে কোনটা তাজা, গিন্নি বুঝবেন কী করে! দূর থেকে দেখছিলাম একটা নধর রুই হাতে নিয়ে মাছওলা তাড়া দিচ্ছেন, ‘বলুন বলুন…’।
    মোবাইলবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘দাঁড়ান, নেট স্লো চলছে।’

    যাকগে, সেই পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার ঘটনায় ফিরি। দু’হাতে থলে নিয়ে সদ্য বাজারের ভিড় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি, দেখি একপ্রান্তে গাছের ছায়ায় এক আধবুড়ো বিক্রেতা গামছা বিছিয়ে বসে আছে। গামছায় দুটো মাত্র কাঁচা আম।
    চৈত্রের এই মাঝামাঝি সময়ে ডালে দুটো আম দিলে মন্দ হয় না। কিন্তু দুটো আমে কী হবে! বললাম, ‘আর নেই?’
    সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘নেই কে বলল! কত লাগবে?’
    ‘পাঁচশো মতো দাও।’
    লোকটা বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দু’মিনিট দাঁড়ান…।’
    তারপর যে গাছের ছায়ায় সে বসেছিল, তরতর করে উঠে পড়ল সেই গাছেই। অসংখ্য ছোট ছোট আম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটা। লোকটা ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘এগুলো নেবেন… না কি ও ডালের গুলো…?’
    জীবনে সেই প্রথম ও শেষবার আমার চোখ ওপরে তুলে মার্কেটিং। এত বিশাল বিজ্ঞাপন!

    আমাদের ছোট রেলশহরে গোরুর লাইভ দুধ দোয়াও দেখেছি। বিহারি গোয়ালা গোরু হাঁটিয়ে নিয়ে আসত বাড়ির দরজায় এবং চোখের সামনেই দুয়ে বের করত দুধ। ভেজালের কোনও কারবার নেই, জল মেশানো তো দূরঅস্ত। পাশের কোয়ার্টারের স্টেশনমাস্টার ভৌমিকবাবুর তাতেও যেন শান্তি নেই। বললেন, ‘প্রথম দুধটা ভাল হয়। ও ব্যাটা নিশ্চয়ই ভাল দুধটা দুয়ে নিয়ে আসে। তোরা একটু লক্ষ রাখবি তো!’
    আমরা খেলা ছেড়ে হাঁ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে বুঝব?’
    ভৌমিকবাবু হেসে বললেন, ‘দুর বোকা, বাঁট যদি ফোলা থাকে তো প্রথম দুধ। আর যদি চোপসানো দেখিস, বুঝবি দু’নম্বরি, আগে দুয়ে নিয়েছে…।’
    এরপর গোয়ালা এলেই আমাদের কাজ ছিল ঝুঁকে পড়ে গোরুর বাঁট দেখা। গ্যারেজে মিস্ত্রি যেমন গাড়ির নীচে শুয়ে পড়ে, কয়েকজন তো অতি উৎসাহে গোরুটার পাশে শুয়েও পড়ত। তবু বাঁট ফোলা নাকি চোপসানো, কোনওদিন সিওর হতে পারিনি।
    তখন কয়লার উনুন। তাই গুডস ক্লার্ক ঘোষবাবু গোয়ালার সঙ্গে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি করে নিয়েছিলেন। গোরু যদি দুধ দিতে এসে তার দরজার সামনে ইয়ে করে ফেলে তবে গোবরটা ঘোষবাবুর। গোয়ালা দিন-দুয়েক সময় নিয়ে, অনেক ভেবেচিন্তে তাতে রাজিও হয়েছিল।
    সেই কোন অতীতে আমরা পেয়েছিলাম ‘দুধের সঙ্গে গোবর ফ্রি।’

    শশধর বাঁড়ুজ্যে ছিলেন সর্বজনমান্য ও গ্রাহ্য দাদু। অকৃতদার শশধরবাবু রিটায়ারের পর প্রায় কুড়ি বছর বেঁচেছিলেন এবং রেল কোয়ার্টার্সেই ভাড়ায় থাকতেন। তিনি মারা যাবার পর তাঁর টিনের তোরঙ্গ থেকে বেরিয়েছিল একটা মাঙ্কিক্যাপ, গলাবন্ধ কোট একখানা, একজোড়া সোয়েটার ও শাল। এবং প্রায় আনইউজড, দশ বছরের পুরনো এক শিশি চ্যবনপ্রাশ। অকৃতদার মানুষ, কোনও দাবিদার নেই। অত মহার্ঘ জিনিসগুলো তাই ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ বেসিসে হাওয়া হয়ে গেল। আমি ও বিল্টু যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে তোরঙ্গ ফাঁকা। কেবল এককোণে পড়ে আছে একটা লাল হয়ে যাওয়া লিফলেট। তাতে লেখা–
    ‘সন ১৩৫৭, বৈশাখ
    বাবা ফকিরের ঝাড়ফুঁকের কামাল–
    বোকা ছেলেও সসম্মানে পাশ দিবে
    সতীন ও শাশুড়ি উভয়েই হার মানিবে
    পরস্ত্রী আপনাকে স্বামীজ্ঞানে দেখিবে
    এবং
    গেঁড়ে বন্ধ্যা মহিলারও সন্তান হইবে (নিজ স্বামী কৃত)’
    শশধর বাঁড়ুজ্যে পরমবিশ্বাসে, লিফলেটখানা সযত্নে রেখে, সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছিলেন।

    চিত্রকর: রাজ রায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More