গৃহবন্দির জবানবন্দি ২

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    জয়দীপ চক্রবর্তী

    সারা পৃথিবীর বিপদের চিন্তা মাথায় নিয়ে শুয়ে আছি সকালের আলস্য মেখে। চিরকালই অনুভব করেছি সকালবেলা বিছানা থেকে নামার মতো কঠিন কাজ আর করতে হয় না সারাদিন। ঘুম ভেঙে গেছে অনেকক্ষণ। মটকা মেরে পড়ে আছি চোখ বুজে। ঠিক যেন সেই শৈশবদিনের শীতকালের সকালে ঠান্ডা কনকনে কালা পুকুরে চান করতে নামার মতো অবস্থা। জলে নামতেই হবে জানি। তবু একবার করে জলে পা ছোঁয়াচ্ছি, আবার সরে সরে আসছি পুকুরের জলের কাছ থেকে।

    মাঝেমাঝেই গিন্নির গলা পাচ্ছি, ‘সাতটা বেজে গেল তো, এরপর আর পাবে কিছু? আনাজ-কোনাজ বাড়ন্ত। কিছু না আনলে রান্না করতে পারছি না…।’
    আমি কান দিচ্ছি না। মহাপুরুষেরা বলে গেছেন, ‘এই জগৎ-এর সব কিছুই মায়া। ভার্চুয়াল। সোসাল মিডিয়ার বন্ধুত্বের মতো। আছে আবার নেই।’
    আমার এক বন্ধু বলেছে, সে ভার্চুয়াল প্রেম করে। ভার্চুয়াল গল্প আড্ডা, ভার্চুয়াল চুমু…।
    চটকা ভেঙে গেল তীক্ষ্ণ চিৎকারে, ‘কুমড়োর মতন সারাদিনই তো গড়াচ্ছ। জগদ্দল পাথরের মতন গ্যাঁট হয়ে বসে টিভিতে মুখ ডুবিয়ে খবর শোনা, চা খাওয়া আর ঘুম, সারাদিনে এর বেশি তো কিছুই করতে হয় না। চব্বিশ ঘণ্টার বিনেপয়সার ঝি আছে যখন তোমার আর চিন্তা কী। তা বাজারটাও কি আমাকেই করে আনতে হবে? ভাতে ভাত তো মুখে রোচে না। বাপ-মা তো লবাব-পুত্তুর করে গড়ে তুলেছেন তোমায়। অকর্মণ্য, কামচোর কোথাকার…।’
    আমার গিন্নি জন্মেছিলেন কসৌলিতে। রেগে গেলেই মুখ থেকে ফটাফট হিন্দি শব্দ বেরিয়ে আসে বুলেটের মতো।
    আর শুয়ে থাকবে সাধ্য কার। নিজের চোদ্দোপুরুষের নিরাপত্তার কারণেই উঠে পড়তে হল। মুখ ধুয়ে চা খেয়ে হাতে থলি নিয়ে বাজারে যাওয়া। আটটা বাজল প্রায়। ন’টা বাজলেই বাজার বন্ধ হয়ে যাবে এখানে।
    বাজার যাওয়া মানেই তো যাওয়া নয়। হাতে গ্লাভস, নাকে মাস্ক, পারলে গিন্নি আমাকে একটা পলিথিনের রেইন কোটও পরিয়ে ছাড়েন।
    মিনমিন করে বললাম, ‘এই রেনকোট পরে বাইরে গেলে কুকুরে তাড়া করবে যে…।’
    ‘চোপ। একদম বাজে কথা বলবে না’, গিন্নি গর্জে উঠলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর। আমি টিভিতে দেখেছি, ডাক্তাররা পর্যন্ত পলিথিনের ছেঁড়া রেইন কোট পরেই রীতিমতন সংক্রামিত রোগীর চিকিৎসা করছেন…।’
    ‘কিন্তু এই পরে গলদঘর্ম হয়ে সর্দিগর্মি হয়ে যেতে পারে। ঘাম বসে দু’বার সাধারণ কাশিও যদি কেশে উঠি প্রতিবেশীরা রাজারহাটের কোয়ারেন্টাইনে নির্বাসন দেবে। তখন সত্যি বলতে কী তোমারই তো অসুবিধে বলো। সারাদিন কার ওপরে মেজাজ দেখাবে। আমি তো জানি, রাগ করে আমার ওপরে চিৎকার করলে খানিক ক্যাথারসিস হয় তোমার… নইলে অযথা পেট ফাঁপবে, বদহজম, চোঁয়া ঢেকুর ভাঙাও অসম্ভব নয়…।’ বলতে বলতেই বেরিয়ে পড়ি আমি।

    ফাঁকা রাস্তায় প্রায় মহাকাশচারীর পোশাক পরে হাঁটছি। পাশের পাড়ার মিত্তিরদার সঙ্গে দেখা। তার অবস্থাও তথৈবচ। বললাম, ‘কেমন আছেন?’
    হাত-দুই দূরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘দেখতেই তো পাচ্ছ। সং সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাড়ি ফিরে চোরের মতন পিছনের দরজা গলে কলতলায় গিয়ে সব ছেড়ে কেচে, স্নান করে তবে ঘরে ঢোকার অনুমতি। যতবার বেরনো ততবার স্নান। করোনায় নাও যদি মরি, সান্নিপাতিকে মরব হয়তো… তোমার বউদি এমনিতেই বাতিকগ্রস্ত, এখন তা আরও বিশগুণ বেড়ে গেছে…।’
    ‘বার বার বেরোচ্ছেনই বা কেন?’ আমি বলি, ‘একবারেই তো সেরে ফেলতে পারেন…।’
    মিত্তিরদা হাসলেন, ‘সকালে বাজার। বেলা বাড়লে মিষ্টির দোকানে গিয়ে ঠাকুরের নিত্যপুজোর জন্যে দুটো করে সন্দেশ। মিষ্টির দোকানটা খুলে দিয়ে কী যে উপকার হয়েছে ভাই…।’
    ‘রোজ না বেরিয়ে একসঙ্গে দু’তিন দিনের জন্যে কিনে ফ্রিজে রেখে দিতেও তো পারেন…।’
    ‘পাগল নাকি?’ মিত্তিরদা চোখ কপালে তোলেন, ‘আরে মিষ্টির দোকান বন্ধ থাকায় কী মুশকিলেই যে পড়েছিলাম’, বলেই গলা নিচু করেন মিত্তিরদা, ‘সুগারের রুগি তো, বাড়িতে মিষ্টি চেখে দেখতেও দেয় না। এখন গিন্নি বাইরে বেরোন না বলে রোজ নিজে দোকানে যাচ্ছি। ঠাকুরের সন্দেশ কেনার আগে নিজে খেয়ে দেখে নিই কোন সন্দেশটা ভাল…।’
    ‘বলেন কী?’ চোখ কপালে তুলে বলি, ‘এমন করলে মরবেন যে। এই সংক্রমণে ডায়াবেটিকদের রিস্ক বেশি সবসময় বলছেন ডাক্তারবাবুরা। সাবধানে থাকবেন তো…।’
    ‘তিনি রাখলে থাকব, মারলে মরব। অত ভাবি না ভাই। ভেবে দেখেছি চাই বা না চাই একদিন তো যেতেই হবে। কাজেই না খেয়ে মরার চেয়ে খেয়ে মরাই ভাল।’
    মিত্তিরদা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘আসার পথে দেখলাম জগন্নাথের চায়ের দোকান খোলাই রয়েছে। চলো ধরাচুড়ো খুলে ওর দোকানে বসে খানিক গপ্পো করি। দুধ চিনি দিয়ে জম্পেশ করে জমিয়ে চা খাই দু’জনে। তুমিই বলো, ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে কি বাঁচা যায়? ভয় নেই, বাঙালি বিবাহিত পুরুষেরা করোনার থেকেও বিষাক্ত ভাইরাস হ্যান্ডেল করে প্রতিদিন। ওইটুকু ভাইরাস আমাদের কাবু করতে পারবে না হে…।’
    বললাম, ‘মিত্তিরদা আপনি ঠিকই বলছেন হয়তো। তবু বলব, বাড়ি ফিরে যান। কোথাও দাঁড়াবেন না। কারও সঙ্গে গল্প করারও প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন, চায়ের দোকানে জমিয়ে চা খাচ্ছেন এই দৃশ্য তুলে রাখার মতো অতি উৎসাহী মানুষজন হাতে মোবাইল উঁচিয়ে নিরন্তর ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছেন আশপাশে। এখন বাড়ির বাইরে অহেতুক বেশি সময় কাটালে ভাইরাসে নাও যদি মরেন, ভাইরাল হয়ে যে মরবেনই এ বিষয়ে সন্দেহ নেই একটুও…।’

    আরও বারোয়ারি নকশা: গৃহবন্দির জবানবন্দি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More