গৃহবন্দির জবানবন্দি

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন।অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    জয়দীপ চক্রবর্তী

    বাইরে ভরা দুপুর থমথম করছে। গাছের পাতা উজ্জ্বল সবুজ। আকাশের রং ঝকঝকে নীল। রাস্তাঘাট চকচক করছে। ধুলো উড়ছে না। বাড়ির সামনে দিয়ে হাতে-ঘাড়ে ট্যাটু, মুখে সিগারেট, রংচঙে চুলের সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত ম্যাচো প্রেমিকের বাইক নিয়ে দাপাদাপির শব্দ নেই। দূর রেলস্টেশন থেকে ভোরবেলার ট্রেন চলাচল সংক্রান্ত ঘোষণা কানে আসেনি। উদ্ধত কুউউউ বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ছুটছে না বাড়ির পাশের রেললাইন দিয়ে।

    চোখে দেখা যায় না এমন ছোট্ট একটা জীব পুরো পৃথিবীটাকেই যেন এক আশ্চর্য ম্যাজিকে থমকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার কড়া এবং বিষাক্ত ট্যাকলে অহংকারী মানুষ খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ড্রেসিংরুমের মধ্যে বসে হ্যা-হ্যা করে হাঁপাচ্ছে এখন। বক্সের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে নিরন্তর দৌড়তে দৌড়তে অন্যকে গোল দিয়ে নিজে জিতে যাবার প্রতিযোগিতা থেকে আহত অবসৃত মানুষ চুপটি করে বসে আছে এখন। অন্যকে ল্যাং মেরে, ট্যাকল করে, ঠেলে দিয়ে নিজে কাপ জিতে আনার শিভ্যালরি দেখানোর উপায় নেই বলে তার নিজস্ব নায়িকার কাছেও এখন সে অনেক নিষ্প্রভ।

    কাজ নেই। অলসের মতো বসে আছি। বাড়িতে খবরের কাগজ আসা নিষিদ্ধ হয়েছে। কাজের মাসিও হোম কোয়ারেন্টাইনে। রাস্তা মাড়িয়ে বাইরের খোলা বাতাসকে সঙ্গী করে এ বাড়িতে আসা মানা। প্যাকেটের দুধ দিতে এলে খালিহাতে ধরা যাচ্ছে না। প্লাস্টিকে সংক্রমণের ভয় নাকি বেশি। হাতে দস্তানা পরে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে দূর থেকে হাত বাড়িয়ে খপ করে প্যাকেটটা ধরে নিয়েই জলে ডুবিয়ে ‘স্যানিটাইজ’ করে নিচ্ছি। শত্রু কোথা থেকে যে ঢুকে পড়ে কেউ জানে না। সতর্ক থাকাই বাঞ্ছনীয়। অতএব লখীন্দরের বাসরঘরের মতো নিজের বাড়ির সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্যে অদৃশ্য হেতালের ডাল হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি বাড়ির মধ্যে। খবরের চ্যানেলে চোখ। আজ কতজন সংক্রমিত হলেন? সারা বিশ্বে কতজন এই মারণরোগে মহাকালের গর্ভে খসে পড়লেন। আপডেট থাকা চাই। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। কেন্দ্র, রাজ্য কোনও সরকারকেই ছাড়ছি না সুযোগ পেলে। কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়। বুঝি। সেসব জটিল অঙ্ক স্টেটাস দেবার সময় মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বুদ্ধিজীবীর মতো নিরন্তর মাথা ঘামানোর দিনে ঘন ঘন চা তেষ্টা পাবেই। চা তেষ্টার সময় আমরা কম-বেশি ফিউডাল। গলা তুলে হাঁক ছাড়তেই অভ্যস্থ, ‘কই, এক কাপ চা হবে না কি?’
    মোড়ের দোকান, অফিস, বাড়ি সর্বত্র এ ব্যাপারে এই দস্তুর। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ম মানে না সবসময়। ভুলে গিয়েছিলাম, আমি এখন বন্দি। কয়েদখানার আসামিই একপ্রকার। খেলার মাঠ থেকে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসা ব্যর্থ স্ট্রাইকার। আমার আদেশ এই দুঃসময়ে কে মান্য করবে আর!
    কাজেই চায়ের ফরমাশ নাকচ হতে এক সেকেন্ড লাগল না। রান্নাঘর থেকে ঝাঁঝালো গলা ঠিকরে এল, ‘ইলেকট্রিক কেটলিতে জল গরম করে নিজে বানিয়ে নাও। আর হ্যাঁ আমাকেও এক কাপ দিয়ে যেয়ো…’
    হাল্কা বিরক্তি দেখিয়ে ফেলে বললাম, ‘রান্নাঘরেই তো রয়েছ। আভেনে চাপিয়ে দাও না বাপু…’
    বলেই বুঝলাম, চকলেট বোমার পলতেতে অনবধানে আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছি দেশলাইতে কাঠি ঠুকে।

    প্রতিদিন বাধ্যতামূলক গৃহবন্দিতে আমরা চির উড়ু উড়ু, সংসার উদাসীন আধা সন্ন্যাসীর দল এখন বেজায় গৃহী। বাসন মাজছি। ঘর মুছছি উপুড় হয়ে। ন্যাতা হাতে সংসারের জমে থাকা ধুলো সরাচ্ছি আর নিজেকে বোঝাচ্ছি, এটুকু তো শরীরের স্বার্থেই। কাজ আসলে সবচেয়ে ভাল এক্সারসাইজ। সুগার প্রেসার কমানোর সেরা উপায়। বাধ্যতামূলক ঘরে থাকা আমাদের এতদিনে স্বাস্থ্যসচেতন করে দিল ঘেঁটি ধরে।
    ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে টুয়েন্টি ফোর ইন্টু সেভেন সার্ভিসের ফাঁকেই দিনের বেলা জানলা দিয়ে দেখছি অনেকদিন বাদে বাড়ির উঠোনে ঘুঘু চরছে। চড়ুই, বাবুই, টুনটুনি, মৌটুসির দল ফিরে আসছে বাগানের ফুলগাছগুলোর ডালে ডালে। প্রজাপতি উড়ছে, পাখি ডাকছে…

    আমার বাড়ির গেটের সামনে একপাল কুকুর জটলা করে প্রতিদিন। আমি রোজ দরকারে অদরকারে হাজারবার বাড়ি থেকে বেরনোর সময় ওদের হাঁকডাক করে তাড়িয়ে দিতাম। জানলা দিয়ে বাইরে চোখ পড়লেই সেই কুকুরগুলোকে দেখতে পাচ্ছি। আমার গেটের কাছে দলবেঁধে আড্ডা দিতে দিতে বার বার আমারই দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে তারা। আর নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
    আমি জানি আমাকে নিয়েই কথা বলছে তারা নিশ্চিত।
    মানুষের অনাদরে আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা পশুপাখিরা এখন খাঁচার মধ্যে বন্দি মানুষকে দেখছে আর আহ্লাদে ভেংচি কাটছে প্রতিদিন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More