গৃহবন্দির জবানবন্দি ৪

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

২৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

জয়দীপ চক্রবর্তী

ওপর থেকে আমায় যতই কাঠখোট্টা, দড়কচা মারা, কটু, তিক্ত মনে হোক, আমার ভেতরটা মিষ্টি। বলতে নেই, প্রয়োজনের থেকে খানিক বেশিই মিষ্টি। অর্থাৎ আমি মধুমেহর রুগি। টাইপ টু। ইনসুলিন নিতে হয় না, কিন্তু দু’বেলা মেটফরমিন ট্যাবলেট গিলতে হয় নিয়ম করে। সুগার আর প্রেসার অবশ্য আজকাল একধরনের স্টেটাস সিম্বল। ও দুটোর কোনওটাই না থাকলে সমাজে মুখ দেখানো যায় না। বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিজেকে জাহির করতেও বাধো বাধো ঠেকে। লকডাউনের আগে যখন বাইরে বেরিয়ে চায়ের দোকানে জুত করে আড্ডা মারার দিন ছিল, তখন দেখেছি, ‘ওরে একটা চিনি ছাড়া লিকার দিস’ বলে হাঁক মারলে অনেকেই সম্ভ্রমের চোখে চেয়ে দেখত।

এখন অবশ্য সে রাম নেই, অযোধ্যাও নেই। দিনরাত ঘরে বসে আছি। ফুটবলের মতো বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছি সারাদিন। টিভি চ্যানেল থেকে সারা পৃথিবীর খবর সংগ্রহ করছি আর বিশেষজ্ঞের মতামত দিচ্ছি সোশাল মিডিয়ায়। বাড়িতে বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমার কদর নেই। রুগি হিসেবেও সহানুভূতির ছিটেফোঁটা নেই কোত্থাও। পান থেকে চুন খসলেই গিন্নি বলেন, ‘তোমার মতন তোমার রোগটাও দু’নম্বরি। টাইপ টু ডায়াবেটিস। দু’জনের কারওরই বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এই সেদিন যেমন ফস করে তোমার হাইপো হয়ে গেল। এমনিতে মিষ্টির দিকে চাওয়া বারণ, অথচ তখন দৌড়ে ফ্রিজ থেকে রসগোল্লা বের করে ঠুসে দিতে হল মুখে।’

সকাল-সন্ধ্যা ছুটে হেঁটে ক্যালোরি খরচ করে সুগার লেভেল খানিক বশেই ছিল এতদিন। কিন্তু লকডাউনে সে সুযোগ নেই। অগত্যা ছাদেই পায়চারি করি কিছুক্ষণ। তাতে শরীরের কতটা উপকার হয় বুঝি না। কিন্তু খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালে মনটা একটু ভাল লাগে।
আজও ছাদে এসে হাঁটাহাঁটি করছি। বিকেল পেরিয়ে সন্ধে হচ্ছে নিঃশব্দে। পশ্চিম দিকের আকাশ যেন রঙবেরঙের আবির নিয়ে দোল খেলছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবছিলাম আর একটা দিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে চিরকালের মতো। বেশ একটা উদাস উদাস ভাব খেলা করছে মনের মধ্যে। এমন ভাব এলেই কবিরা বোধহয় পদ্য-টদ্য লেখেন। বা গদ্য লিখিয়েরা গপ্পো। হঠাৎ একটা হাল্কা গলা খাঁকারির শব্দে সম্বিত ফিরল। পিছন ফিরে দেখি পাশের বাড়ির ছাদে পল্টনদা। হাতে একটা লম্বা আম পাড়ার আঁকশি।
পল্টনদা লোকটা ভারী সরল সিধে। হুজুগে আর আড্ডাবাজ। পড়াশোনা বেশি করেনি, কিন্তু ব্যবসাট্যবসা করে দাঁড়িয়ে গেছে মোটামুটি। আমি হেসে বললাম, ‘কী ব্যাপার, এই ভর সন্ধেবেলা কাঁচা আম পাড়তে ছাদে উঠেছ? বউদি কি আমডাল রাঁধার প্ল্যান করছে কাল? নাকি আমের ঝোল? ক’দিন হল গরমটা জমিয়ে পড়েছে। রাঁধলে মন্দ লাগবে না। শরীরও ঠান্ডা হবে। কিন্তু তেমন আম কি হয়েছে এক্ষুনি? সবই তো এখন ছোট ছোট?’
পল্টনদা এ কথার উত্তর না দিয়ে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকল আমায়। আমি ছাদের ওই প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম পল্টনদার মুখ কালো। চোখেমুখে উদ্বেগ।
আমি ভড়কে গিয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে পল্টনদা?’
‘খুব বিপদে পড়ে গেছি ভাই’, গলা কাঁপছে পল্টনদার।
আমিও ঘাবড়ে গেলাম। পল্টনদার বাবার বয়েস হয়েছে। সিওপিডি-তে ভুগছেন দীর্ঘদিন। এই অসময়ে বাড়াবাড়ি টাড়াবাড়ি হলে…।
বললাম, ‘মেসোমশাইয়ের শরীর-টরির…।’
‘না না, বাবা ঠিক আছে।’
‘তাহলে কি বউদি?’
‘উঁহু।’
‘ছেলেমেয়ে কারও?’
‘না না, সেসব ব্যাপার নয়।’ দু’দিকে মাথা নাড়ে পল্টনদা।
‘তাহলে?’
‘আরও বড় বিপদে পড়েছি। কী করব বুঝতে না পেরে শেষপর্যন্ত তোর দ্বারস্থ হয়েছি ভাই। বাঁচালে তুই-ই বাঁচাতে পারিস এখন।’
‘আমি সুগারের রুগি। অল্পে টেনশনে পড়ে যাই। পল্টনদার কথায় আমার হাত ঘামছে বুঝতে পারছি। তবু কাঁপা গলায় বললাম, ‘কিন্তু তোমার বিপদটা না জানলে…।’
‘আমার স্টক শেষ হয়ে গেছে। আর একটাও নেই দেখলাম।’
‘কী?’
‘বিড়ি।’
‘ধ্যাৎ’, হেসে ফেলি আমি এইবার।
‘মাইরি বলছি। তুই বুঝতে পারছিস না। রাতে খাবার পরে একখানা আর সকালে ওইখানে বসার সময়। নইলে কিছুতেই নামবে না। আর তুই তো বুঝিস ভাই, সারাদিনে নামাতে না পারলে…।’
‘এই পরিস্থিতি হল কী করে গো? স্টক দেখে রাখোনি আগে?’
‘সকালে খেয়াল করিনি’, অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে পল্টনদা, ‘বিকেলে নাকে মাস্ক বেঁধে বেরিয়েওছিলাম একবার। হতচ্ছাড়া পুলিশ এসে সব গুলিয়ে দিল। আমার সমস্যাটা তো বুঝলই না, উপরন্তু লাঠির এমন ঘা দিল যে পাছায় একটা ফোঁড়া টাটিয়েছিল, পাকেনি পর্যন্ত, সেইটাই ফেটেফুটে একেবারে একশা–।’
‘তা তো বুঝতে পারছি পল্টনদা, কিন্তু…।’ আমি ইতস্তত করি।
‘আর কিন্তু করিসনি ভাই। দাদা বলে ডাকিস। এইটুকু উপকার অন্তত কর। বেশি লাগবে না। এই লকডাউনের বাজারে তোর ব্যাপারটাও বুঝি। গোটা চারেক দে। তাইতেই ম্যানেজ হয়ে যাবে আপাতত।’ আঁকশিটা আমার ছাদের দিকে বাড়িয়ে দিল পল্টনদা, ‘আলগোছে এর মধ্যে ফেলে দে। আমি নিয়ে নিচ্ছি। আশা করছি কাল একটা কিছু ব্যবস্থা…।’
‘কিন্তু আমি যে ওসব ছেড়ে দিয়েছি পল্টনদা’, পল্টনদার কথার মাঝখানেই বলে উঠি আমি, ‘প্রায় বছরখানেক হয়ে গেল…।’
‘সর্বনাশ, করেছিস কী!’ বলে আঁকশি ছুড়ে ফেলে দু’হাত মাথায় দিয়ে ছাদের উপরেই বসে পড়ল পল্টনদা, ‘এখন কী উপায় হবে তাহলে?’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, ‘একটা কথা বলব পল্টনদা?’
‘বল না’, ক্লান্ত গলায় বলল পল্টনদা।
‘তোমার ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে যেন?’
‘এইট।’
‘গুড।’
‘এতে গুডের কী দেখলি’, অসহায়ের মতো বলে পল্টনদা, ‘সরকারি স্কুল। পাশ-ফেল নেই। ও তো প্রকৃতির নিয়মে এমনিতেই ক্লাসে উঠছে। আমাদের যুগ কি আছে রে? এই এইটেই তিনবার খাবি খেয়ে পড়াশুনো ছেড়েছিলাম আমি…।’
‘একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে। এক্সপেরিমেন্টটা সফল হলে কাল সকালের ব্যাপারটা হয়তো ম্যানেজ হয়ে যেতে পারে…।’
‘কী রে?’ উৎসাহ নিয়ে বলে পল্টনদা।
‘কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে তুমি বরং ছেলের অংক বইটা নিয়ে অংক কষতে বসে পড়ো। আমার বাড়িতে দেখেছি, ছেলেকে অংক কষাতে বসালেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে চাপ এসে যায় ওর। কিছুতেই আর বসিয়ে রাখা যায় না খাতা-বইয়ের সামনে…।’
আরও বারোয়ারি নকশা…
গৃহবন্দির জবানবন্দি

গৃহবন্দির জবানবন্দি ২

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More