আমায় ডাক দিলে কি…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    দুপুরে ভাতঘুমের মধ্যে স্বপ্নটা দেখলাম। দেখলাম একটা ট্রেন থেকে, কী মনে করে কে জানে, হঠাৎ নেমে পড়লাম একটা স্টেশনে। তাও আবার শেষ কম্পার্টমেন্ট থেকে। সেটাও আবার রয়েছে প্ল্যাটফর্মের বাইরে। দেখলাম স্টেশনটির নাম ‘মুরগুমা’। যাব পুরুলিয়া, কিন্তু নেমে পড়েছি এই স্টেশনে! দেখলাম তো এইরকম স্বপ্ন, কিন্তু মুরগুমাতে কি আদৌ আছে কোনও রেলস্টেশন? পুরুলিয়ায় অনেক বছর ছিলাম তাই যতদূর মনে পড়ছে, মুরগুমাতে কোনও রেল স্টেশন নেই। তাহলে কেন দেখলাম এই রকম স্বপ্ন? দেখলাম কেননা এই রকম ভুল স্টেশনে নেমে পড়ার ইচ্ছে, আপনাদের অনেকের মতোই, আমারও অনেকদিনের পুরনো বাসনা। কত কত দিন মেঘলা দুপুরে, জানলা দিয়ে অকারণ মনখারাপ নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমিও তো ভেবেছি একটা নাম-না-জানা অচেনা স্টেশনে একদিন ঠিক নেমে পড়ব। স্টেশনের ঠিক পাশেই থাকবে একটা পুকুর আর তার পাড়ে হয় জারুল নয় একটা হিজল গাছ। তাদের ফুল, ফুলের রেণু ঝরে ঝরে পড়বে পুকুরের জলে। আর আমি সেই পুকুরের পাড় দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে আশ্রয় নেব একটা ছোট্ট কুঁড়েতে। দিনান্তে ফুটিয়ে নেব শাকান্ন। কত কত দিন তো ভেবেছি এই রকম। তাই বোধহয় এমনকি যেখানে রেল স্টেশন নেই কোনও, স্বপ্নে সেই মুরুগুমাতেই নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে!

    মনখারাপে এই রকম ভেবেছি, স্বপ্নেও এই রকম দেখলাম— সত্যি। কিন্তু, বাস্তবে ট্রেনে উঠলেই আমাকে তাড়া করে ভুল স্টেশনে নেমে পড়ার ভয়! মাঝেমাঝেই এমন জায়গায় যেতে হয় যেখানে আগে যাইনি আর তখনই ভয় পেতে থাকি, এই বুঝি নেমে পড়ব ভুল স্টেশনে। আসলে একবার দু’বার এই রকম হয়েছে বইকি! ইলেভেন টুয়েলেভে পড়ার সময়ে মেট্রোতে একা একা চড়তাম যখন, কতবার যে ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কাউকে গন্তব্যটি কোথায় জিজ্ঞেস করতে ভারী লজ্জা লাগত তখন। মেট্রোয় উঠে হয়তো চোখ পড়েছে এমন এক সুন্দরীর দিকে যে পাহাড়ি পাইথন, যার নাকের ওপর জমে রয়েছে এক ফোঁটা ঘাম, দেখে মনে হচ্ছে সম্রাট শাহজাহানের আমলের মুক্তো, আর অমনি কবিতার লাইন আসতে শুরু করেছে মাথায়, হয়ে পড়েছি অন্যমনস্ক আর কখন টুক করে পেরিয়ে গেছে গন্তব্য। অবশ্য মেট্রোয় ভুল স্টেশনে নামলে ঝক্কি কম। ফিরতি ট্রেনে উঠে মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে। কিন্তু পাতালের ওপরে এই মর্ত্যধামে ট্রেনে চাপলে অনেক সময়েই সেই সুবিধে মেলে না। তাই ভুল স্টেশনে নামার ভয়ে আমি এক অদ্ভুত কাণ্ড করতাম এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও। তখনও অনলাইনে যে ট্রেনে বসে রয়েছি সেটি রয়েছে ঠিক কোথায় তা জানার উপায় ছিল না। তখন অচেনা জায়গায় যেতে হলেই আমি তাই আগে জেনে নিতাম কতক্ষণ সময় লাগে সে জায়গায় পৌঁছতে। তারপর ফোনে ঠিক তার দশ মিনিট আগে অ্যালার্ম সেট করে নিতাম। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার ভয় ছাড়াও থাকত ঘুমিয়ে পড়ার ভয়। ট্রেনে বা বাসে উঠলেই, কী জাদুতে কে জানে, প্রায়ই আমার চোখ জড়িয়ে আসে! তো, এই অব্যর্থ দাওয়াইতে কাজ দিত দারুণ। কখনওই ভুল স্টেশনে নেমে পড়িনি আমি। মনে আছে বছর কয়েক আগে যাব বুনিয়াদপুর। মালদা পেরিয়ে গৌড় এক্সপ্রেস সেখানে পৌঁছে দেবে আমাকে। এদিকে ট্রেন লেট করছে মালদার পর থেকেই আর আমি দশ মিনিট দশ মিনিট করে করে অ্যালার্মের সময় পিছিয়ে দিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। শেষমেশ অবশ্য নির্বিঘ্নেই নেমেছিলাম ট্রেন থেকে, ভুল স্টেশনে নয়, ঠিক স্টেশনেই।

    ট্রেনের মতোই বাসে চড়েও আমার ভয় থাকে ভুল স্টপে নেমে পড়ার। নেমে পড়েওছি বেশ কয়েকবার। লেখালেখির একেবারে শুরুর দিকে ঘনঘন যেতাম কালীঘাটে কবি প্রভাত চৌধুরীর বাড়ি। সে বাড়ি ছিল তখন আমার কাছে এক স্বপ্নভিলা। কত কত অগ্রজ কবি আর বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সেই বাড়িতেই। বাড়িটিতে পৌঁছতে কিন্তু হামেশাই বিপদে পড়তাম আমি।  হাজরা মোড় আর রাসবিহারী মোড় আমার গুলিয়ে যেত। কলকাতার নানা মোড় এখনও আমার গুলিয়ে যায় এভাবেই। এই মাত্র কিছুদিন আগেই বাস থেকে গড়িয়াহাটে নামব ভেবে বালিগঞ্জ-টঞ্জ পেরিয়ে কোথায় একটা চলে গেছিলাম। সেখান থেকে আবার অটো ধরে ফিরে এসেছিলাম গড়িয়াহাটে। আর অস্ট্রেলিয়াতে একবার ভুল স্টপে নেমে যে কী বিপত্তি হয়েছিল সেই গল্প তো আগেই শুনিয়েছি। ভুল স্টেশনে বা স্টপে নামার মতোই ভুল বাসে চড়াও আমার আর এক অভ্যেস। তার কারণও ওই অচেনা ব্যক্তিকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার চিরসবুজ কুণ্ঠার পাতাটি থেকে কিছুতেই ছিটকে না-পড়া একফোঁটা লাজ। এখনও তাই অনুমান করে, বাসের গায়ের লেখা পড়ে, কলকাতা শহরে আমি মাঝে মাঝেই উঠে পড়ি বাসে এবং দায়িত্ব নিয়ে ভুল বাসে চড়ি। তারপর অনেক ঘাম ঝরিয়ে পৌঁছতে হয় গন্তব্যে। তবে ভুল বাসে চড়ার ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বপরায়ণ আমার শ্বশুরমশাই। তখন আমার কন্যা তিন্নি এইটুকুনি, মাস ছয়েকের শিশু। আমরা তখন থাকি পুরুলিয়ায়। তিন্নির দাদু এসেছেন তাকে আর তার মাকে বেলিয়াতোড়ে মামাবাড়ি নিয়ে যাবেন বলে।  আমার স্কুল চলছে পুরো দমে। ছুটি নেই। তাই আমি যাব না। আমার শ্বশুরমশাই সোমাকে নিয়ে বেরোলেন দুর্গাপুরের বাস ধরবেন বলে। পুরুলিয়া থেকে বাসে তখন বেলিয়াতোড় যেতে তিন-সাড়ে তিনঘণ্টা লাগত। বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড় হয়ে বাস যেত দুর্গাপুর। মোবাইল ফোনের যুগ নয় সেটা। আমাদের আর সোমাদের বাড়িতে অবশ্য ল্যান্ডলাইনের ফোন ছিল। ঘণ্টা চারেক পরে ফোন করে জানা গেল তখনও সোমারা পৌঁছয়নি। আমার আর মায়ের সে কী টেনশন! ফোন করারও প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে খবর এল তাঁরা পৌঁছেছেন। আমার শ্বশুরমশাই দুর্গাপুরেরই একটি বাস ধরেছেন কিন্তু সেই বাস বাঁকুড়া দিয়ে যায়নি। গেছে রঘুনাথপুর শালতোড়া হয়ে দুর্গাপুর। ওঁরা তাই নেমেছিলেন বড়জোড়ায়। সেখান থেকে আবার বাঁকুড়া আসার বাস ধরে, মানে পিছন পথে হাঁটা দিয়ে আর কি, বেলিয়াতোড়! দেরি হয়েছিল ঠিক, তবে ভুল বাসে চড়েও ঠিক গন্তব্যে ওঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন সেদিন। জীবনেও তো এই রকম হয়েই থাকে, তাই না? বাস মিস হয়; ভুল বাসে চড়া হয়ে যায়। তবে তাও দেখা যায় গন্তব্যে ঠিকই পৌঁছানো গেছে, একটু যা দেরি হয়েছে, এই মাত্র!

    তবে বাস থেকে ভুল স্টপে নামার সেরা ঘটনাটি ঘটিয়েছিলাম আমি একবার কলকাতা থেকে বর্ধমান ফেরার সময়ে। মাত্র বছর কয়েক আগেই। শেষ বাসে ফিরছি বর্ধমান। ধর্মতলা থেকে সেই বাস ছেড়েছে রাত সাড়ে আটটায়। বর্ধমান পৌঁছতে পৌঁছতে তা প্রায় পৌনে এগারোটা/এগারোটা বাজবেই। বাসে উঠে থেকেই সেদিন শুনছি সুমনের গান। মানে সেই কবীর সুমন হওয়ার আগের পর্বে, যখন তিনি সুমন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন, সেই সময়ের গানগুলো। যেসব গান না শুনলে আমাদের অনেকেরই হয়তো কবিতা লেখাই হত না। কানে গোঁজা ইয়ার ফোন, মন চলে গেছে সেই নয়ের দশকের গোড়ার দিকে। চারিপাশ থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত আমি। কখন বাস পৌঁছে গেছে বর্ধমান, খেয়াল করিনি। আমার নামার কথা গোলাপবাগে। কখন পেরিয়ে গেছে সেই স্টপ—খেয়াল করিনি তাও। অপার্থিব সুমন থেকে পার্থিব জগতে যখন ফিরলাম তখন আমি নামতে পারি কেবলমাত্র শেষস্টপ নবাবহাটে। যেখান থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর গোলাপবাগ। সেখান থেকেও বেশ খানিকটা দূরেই আমার বাসা যেখানে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন তারাবাগ। নামলাম নবাবহাটে। অত রাতে রিক্সো বা টোটো পাওয়া অসম্ভব। নেইও। অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম। পিঠে বই বোঝাই ভারী ব্যাগ। কিছুটা হেঁটেই বুঝলাম শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না। দেবদূতের মতোই তখনই দেখা মিলল এক সাইকেল আরোহীর। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে তিনি সাইকেলে টুকটুক করে চলেছেন। আমি হাত দেখাতেই থামলেন। তাঁকে বললাম যে, আমার সাহায্য প্রয়োজন। তিনি আমাকে বসিয়ে নিলেন তাঁর সাইকেলের কেরিয়ারে। তাঁর গুনগুন গান শুনতে শুনতে আমি এক সময় পৌঁছেও গেলাম গোলাপবাগে। বুঝলাম যে, ভুল স্টপে নেমেও অনেক সময় ঠিক মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আমাদের।

    এত কথা বলছি বটে ভুল স্টেশন বা ভুল স্টপে নেমে পড়া নিয়ে। কিন্তু এই আমিই তো স্ব-ইচ্ছায় কোনওদিন অচেনা স্টেশনে বা স্টপে নেমে যাইনি। কেমন একটা ভয়ই তো বরং কাজ করে অচেনা স্টেশনে নেমে পড়তে। ভুল স্টেশনে যাতে নেমে না পড়ি তার জন্য কতই না আঁটঘাট বাঁধি! আমি নিজের ইচ্ছায় কিছুতেই ভুল স্টেশনে নামতে পারি না। আমার মধ্যবিত্ত ঘরসোহাগী মন আমার পায়ে বেড়ি পরায়। তবু স্বপ্নে দেখি যে, ভুল স্টেশনে নেমে গেছি। মনখারাপের দিনে ভাবি, এইবার একদিন ঠিক ট্রেন থেকে নেমে যাব এক অচেনা স্টেশনে। নামি না, আবার এই ইচ্ছেও মরে না। আশ্চর্য না? কেন এমন হয়? কেন? মনে হয়, আমাদের সকলের ভেতরেই একজন করে নিরুদ্দেশের পথিক বাস করে। সেই আমাদের ভুল স্টেশনে নেমে পড়ার, অনির্দিষ্টের পথে হেঁটে যাওয়ার ডাক দিয়ে যায় অনবরত। কিন্তু সবসময় সেই ডাক শোনা যায় না। সে নিশিডাক শোনা যায় শুধু স্বপ্নে আর মনখারাপে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More