রানার ছুটছে-৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    মাঝে মাঝে একটা-আধটা খবর পড়ে মন আলোয় ভরে ওঠে। দিন পাঁচেক আগে পড়েছিলাম তেমনই একটি খবর। একজন মাস্টারমশাইকে নিয়ে। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের উত্তর রামনগরের এক অশীতিপর শিক্ষক শ্রী সুজিত চট্টোপাধ্যায় উঠে এসেছেন খবরের শিরোনামে। তাঁর বয়স এখন পঁচাত্তর। অবসর নিয়েছেন সেই ২০০৪ সালে। কিন্তু পড়ানোর কাজ থেকে অবসর নেননি এই বৃদ্ধ। প্রকৃত শিক্ষকদের তো সত্যিই কোনও অবসর হয় না। তাই বছরে মাত্র দু’টাকা দক্ষিণা নিয়ে মাধ্যমিক থেকে স্নাতক স্তর পর্যন্ত প্রায় শ’তিনেক ছাত্রছাত্রীকে পড়িয়ে চলেছেন তিনি। এদের বেশির ভাগই জনজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ওই যে সামান্য দক্ষিণা নেন তিনি, সেই অর্থটুকুও খরচ করেন ছাত্রছাত্রীদের জন্যই। বছরে একবার নিজের চেষ্টায় থ্যালাসেমিয়া নির্ণায়ক শিবিরও করে থাকেন। প্রথম দিকে বিনা পারিশ্রমিকেই পড়াতেন। পরের দিকে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়াবেন বলে পারশ্রমিক নিতে শুরু করেন এক টাকা। আর এখন, তাঁর কথা মতো যেহেতু ‘বাজার আগুন’, তাই পারিশ্রমিক বেড়ে হয়েছে দু’টাকা। প্রতিদিন তাঁর পাঠশালায় ‘রোলকল’ হয়, কোনও ছাত্র বা ছাত্রী দু’দিন না এলেই খোঁজ নিজে নিতে বেরোন এই বৃদ্ধ শিক্ষক। পড়ুয়াদের কেউ কেউ নাকি তিন প্রজন্ম ধরে তাঁর পাঠশালায় পড়ছে। কেন এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর পাঠশালা, এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, সুজিতবাবু বলেছেন, “সবাইকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা শিক্ষকের দায়িত্ব। তা পুঁথিগত হোক, বা সামাজিক। দায়িত্ব পালন না করলে নিজেকে শিক্ষক বলব কী ভাবে!”

    #

    ছেলেবেলায় সুনির্মল বসুর একটি কবিতা পড়েছিলাম, “সবার আমি ছাত্র”। পড়ে মনে হয়েছিল প্রকৃতির পাঠশালাই শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। পরে আসতে আসতে বয়স বাড়তে থাকলে বুঝেছি যে, অভিজ্ঞতার থেকে বড় শিক্ষক আর কেউ নেই। একথা ঠিক যে, প্রকৃতি থেকে আমরা কত কিছুই না শিখি, একথাও ঠিক যে, অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে যেভাবে জীবনের পাঠ পড়িয়ে নেয় তার তুলনা মেলা ভার। তবু আজ এই বয়সে পৌঁছে মনে হয় , জীবনে একজন জলজ্যান্ত রক্তমাংসের শিক্ষকের প্রয়োজন আছে। আর সেই শিক্ষক যদি হন সুজিতবাবুর মতো কেউ তাহলে তো আর কথাই নেই। আমি খুব ভাগ্যবান যে, আমার জীবনে সেই স্কুলের দিনগুলি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি পর্যন্ত এমন কিছু শিক্ষককে পেয়েছি যাঁদের না পেলে যেটুকু পাঠ পেয়েছি জীবনের, তা অসম্পূর্ণ থাকত। সকলের নাম করা যাবে না। কোন নাম নিতে গিয়ে কোন নাম যে বাদ যাবে তার ঠিক নেই। এতে হয়তো দুঃখ পেতে পারেন আমার মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। নাম না করেই বরং আজ দু’জন শিক্ষকের কথা বলি, বলি এমন দু’টি ঘটনার কথা যা আমি ভুলিনি।

    #

    তখন পড়ি ক্লাস ইলেভেনে। কিন্তু কলেজেই। কলেজ পত্রিকার জন্য জমা দিয়েছি একটি গল্প। সেই পত্রিকার অনেকখানি দেখাশুনোও করছি আমি। তো কোন কোন লেখা ছাপা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন যে মাস্টারমশাই (পরে এঁর সঙ্গেও আমার মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে), তিনি আমার গল্পটিকে বাতিল করেছিলেন তাতে বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার তাঁর ‘অশ্লীল’ লেগেছিল বলে। বলা বাহুল্য, কাঁচা বয়সে কলেজে উঠে ছাত্রছাত্রীরা যে সমস্ত শব্দ ব্যবহার করে থাকে, সেইসব শব্দের ব্যবহার একটু বেশিই ছিল গল্পটিতে। আমার ধারণা হয়েছিল এতে করে কলেজ জীবনের একটি ‘বাস্তব’ চিত্র আঁকা যাবে। আমার গল্পটি বাতিল হওয়ায় আমি এতই রেগে গিয়েছিলাম যে, লেখা আবার নির্বাচন করাব বলে ওই ফাইল আবার নতুন করে জমা দিলাম এমন একজন শিক্ষকের কাছে যিনি নিজে একজন কবি। তিনিও ফাইল ফেরত দেওয়ার সময় আমার গল্পটি আলাদা করে তুলে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন সেই গল্পটি কে লিখেছে। জানালাম যে, লিখেছি আমিই। তিনি আমাকে বললেন যে, শোনো, “তোমার গল্পটা ভালো, কিন্তু এই অবস্থায় ছাপা যাবে না”। আমি তো যথারীতি ক্রুদ্ধ। তিনি আমাকে তখন বললেন, “পেন্ডুলামের দোলন দেখেছ তো? মাঝের বিন্দুটিকে ছুঁয়ে সে একবার এইদিকে আর একবার ওইদিকে যায়, কিন্তু তারও একটা মাপ আছে। ওই মাঝের অংশটি হল বাস্তব আর দু’পাশের দুটি কল্পনার সীমা। লেখা  বাস্তবকে ছুঁয়ে কল্পনার ডানা মেলে দেবে, তবেই তো সেটি লেখা। আর ওই কল্পনার উড়ালেরও একটি মাপ আছে। বুঝলে তো?” এক মুহূর্তেই বুঝেছিলাম কী গোলমাল হয়েছে গল্পটিতে। অনেকই হয়তো এই মতের সঙ্গে একমত হবেন না। তবে আমার বড় মনে ধরেছিল এই কথাক’টি। ওই লেখাটিই যে কেবল আমি বেশ কিছু পরিবর্তনের পরে জমা দিয়েছিলাম তাই নয়, আজও লিখতে বসে ‘স্যার’-এর বলা কথাক’টি বিস্মৃত হই না। তবে ওই ‘স্যার’-এর ক্লাসরুমে বসার সুযোগ আমার হয়নি। ক্লাসরুমের বাইরেই বেশ কয়েকটি বছর তাঁর পায়ের কাছে বসে চলত আমার পঠনপাঠন।

    #

    এইবার যে মাস্টারমশাইয়ের কথা বলব, তাঁর ক্লাসরুমে আমি অবশ্য বসেছি। তখন ইংরেজি অনার্সের ছাত্র আমি। চুটিয়ে ছাত্ররাজনীতি করি। সেই মাস্টারমশাইয়ের আবার বামরাজনীতিতে এতটুকু আস্থা নেই। মাঝে মাঝে আমাকে রাজনীতি নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর জন্য  মৃদু বকাঝকাও দেন তিনি। একদিন হল কী, ক্লাসের পরে তিনি আমাকে বললেন, “আজ বিকেলে আমার বাড়িতে এসো। জরুরি কথা আছে”। গ্রীষ্মের ছুটি তখন পড়ব পড়ব করছে। আমি সেই মাস্টারমশাইকে বেশ খানিকটা ভয়ই পেতাম তখন। ভাবলাম, না জানি কী ভুল করে বসে আছি! খুবই বকা দেবেন, তাই হয়তো স্যার আলাদা করে বাড়িতে যেতে বলছেন। দুরুদুরু বুকে গেলাম। দেখলাম একটি কার্ড হাতে নিয়ে তিনি বসে রয়েছেন আমার জন্য। বললেন, “এটি ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির কার্ড। তোমার তো মেম্বারশিপ নেই। কার্ড করাতেও বেশ খানিকটা খরচা হয়। এটা আমার কার্ড। এটা নিয়ে এই গরমের ছুটিতে লাইব্রেরিটা ব্যবহার করো”। আমি তো থ। স্যার তারপর ছবির মতো আমাকে বুঝিয়েও দিয়েছিলেন কীভাবে পুরুলিয়া থেকে হাওড়া স্টেশনে নেমে, তারপর আমাকে যেতে হবে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে। শুধু ওই একবারই নয়, পুরো তিনটি বছর ধরেই আমি তাঁর কার্ডটি দেখিয়েই ঢুকতাম সেই পুরোনো  ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির গম্ভীর আর অপূর্ব সুন্দর বাড়িটায়।

    #

    শিক্ষক দিবসের ঠিক আগে এই রকম আমার জীবনের আরও কত কত শিক্ষকের কথাই না মনে পড়ছে। নিজেদের পেশার বাইরে যাঁরা কতই না সময় দিয়েছেন আমায়। তৈরি করে দিয়েছেন, যেমন পড়াশোনায়, তেমনই অন্য বিষয়েও। অথচ, এখন, মাঝেমাঝেই শিক্ষকদের কাজের সময়ের হিসেব নেওয়া হয়। কখনও কখনও দু’একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তির জন্য সারা শিক্ষক সমাজের গায়ে কালি ছিটিয়ে দেওয়া হয় কী অসম্ভব দ্রুততায়! কিন্তু, আমি তো নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানি যে, ঠিক সুজিতবাবুর মতো না হলেও, মাস্টারমশাই-দিদিমণিরা শুধু ক্লাসে নয়, ক্লাসের বাইরেও, শুধু ‘চাকরির’ সময়টুকুতে নয়, সেই সময়ের গণ্ডির বাইরেও কীভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেন লক্ষ-কোটি ছাত্রছাত্রীদের! তাঁরা আঁধার রাতে হেঁটে চলে একলা পাগল। তাঁরা অন্ধকার উপত্যকায় পুষ্পের মতো ফুটে থাকা জোনাকি। তাঁদের ‘কাজ’কে মাপা যাবে— এমন স্কেল আজও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More