রানার ছুটছে-১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    ব্যক্তির সংবাদ ব্যক্তিকে পৌঁছে দিত রানার। কখনও বা সমষ্টির সংবাদ সমষ্টিকে। আমার কেন জানি না মনে হয় খবরের কাগজও এক ধরনের রানার। খবরের কাগজও তো নানা ধরনের সংবাদই পৌঁছে দেয় রাত্রি পেরিয়ে ভোরের দুয়ারে। আমিও, দেখেছি, সারাদিনের হাজারো কাজের মাঝেও কীভাবে কে জানে ঠিকই পড়ে ফেলি বেশ কয়েকটি খবরের কাগজ। এইবার ভেবেছি সেইসব খবরের কাগজ থেকে বেছে নিয়ে একটি দু’টি সংবাদের কথা লিখব এই ব্লগে। ভালো কথা, মন্দ কথা। যখন যেমন মনে হবে লিখব তেমনটিই। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগেই এবারই যেমন পরপর খবরের কাগজে পড়লাম দু’টি ভিন্ন ধরনের খবর। একটি আরেকটির থেকে এতই আলাদা যে আমার তো চক্ষু চড়কগাছ!

    #

    ক’দিন আগেই জয়পুরের রাজকুমারী, যিনি আবার একজন সাংসদও বটেন দাবি করেছিলেন যে তাঁরাই নাকি রামের বংশধর। এবার সপ্তাহ না পেরোতেই সঙ্ঘ পরিবারের এক নেতা দাবি করে বসলেন যে, কেরলের শদয়ামঙ্গলমে নাকি রামায়ণের দৈবপাখি জটায়ুর দেখা মিলেছে। জনশ্রুতি আছে যে, সীতার অপহরণের সময়ে রাবণকে বাধা দিতে গিয়ে আহত জটায়ু ভূপতিত হন কেরলেই। শদয়ামঙ্গলমে জটায়ুর মূর্তিও আছে। তাই জটায়ুর দেখা পাওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। ডানা মেলে ‘জটায়ু’ উড়ে চলেছে এই রকম ভিডিও নেতা মহাশয় সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করেছেন। গোল বেঁধেছে তার পরেই। জানা গেছে যে, ওই ভিডিওটি আদপেই কেরলের নয়। জটায়ুরও নয়। যে পাখিটিকে ভিডিওটিতে উড়তে দেখা গেছে সেটি একটি শকুন।  ভিডিওটি আসলে আর্জেন্টিনার। বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরে ওই শকুনটির চিকিৎসা হয়, তারপর তাকে ছেড়েও দেওয়া হয়, তার উড়ে যাওয়ার ছবি ক্যামেরাবন্দি করা হয়।

    এসব হয়েছে তাও পাক্কা বছর পাঁচেক আগে। পাঁচ বছর পরে আমাদের দেশের এক নেতার কল্যাণে সেই পাখি ফিরে এসেছে ‘জটায়ু’ হয়ে।  অবশ্য এই রকমের ঘটনা এদেশে যে এই প্রথম ঘটল তা তো নয়। আমাদের দেশের (রাজ্যেরও) নেতা-নেত্রীরা হামেশাই এধরনের ভুল করেই থাকেন। তাঁদের কল্পনার অমিত ক্ষমতার তারিফ করতেই হয়। গণেশের হাতির মাথা আসলে প্লাস্টিক সার্জারির ফল, পুষ্পক রথ আর কিছুই নয় আজকের এরোপ্লেন— এই সব মধুময়বাক্য আমরা তো আগেও শ্রবণ করেছি। আগে রাগ হত, এখন মন খারাপ হয়। না, অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত নেতানেত্রীদের তাঁবেতে আজ আমরা, আমাদের দেশ— এই কথা ভেবে নয়। মনখারাপ হয় সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে।

    #

    মনে আছে, ছবিতে ‘রামায়ণে’র পর্ব পেরিয়ে প্রথম কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়ি যখন তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। জেঠু হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেই বই। কোন প্রকাশনীর ছিল সেই বই তা আজ আর মনে নেই। কিন্তু মোটা সেই বইটি নিয়ে দুপুরের পর দুপরের এক অপার্থিব ঘোরের মধ্যে দিনযাপন গেঁথে আছে স্মৃতিতে। কথকতা শোনার সৌভাগ্য হয়নি, শুধু একবার রামলীলা দেখেছিলাম একটু উঁচু ক্লাসে উঠে। তবে কথকতার স্বাদ পেয়ে যেতাম গ্রীষ্মের দুপুরে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়ে পড়ে। কেমন একটা সুর যেন সারাক্ষণ গুণগুণ করে বেজে চলত কানে। আর কোথায়ই না চলে যেত আমার কল্পনা— সেই কোন সুদূরের পারে! আমাদের মহাকাব্যগুলির মধ্যে কল্পনার যে অপূর্ব বিস্তার তা সত্যিই একদিক থেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব কাব্যে কবিরা যে নিজেদের কল্পনাকেই দেন এক অপার্থিব উড়াল কেবল তাই তো নয়, যে পাঠক পড়ছেন তাঁদের রচনা, তাঁদের পিঠেও নিঃশব্দে লাগিয়ে দেন অপূর্ব সোনালী দুই ডানা।

    নেতা-নেত্রীদের কথা শুনতে শুনতে আজকাল আর তাই রাগ হয় না। কেন এই নিয়মিত অনৃতভাষণ তা নিয়ে তো সমাজতাত্ত্বিক আর রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দিয়েই থাকেন, কোন ভাঙনের পারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেশকে— দেন সে ইঙ্গিতও। কিন্তু আমাদের মতো যাঁরা দু’কলম লিখি আর দু’পাতা পড়ি, তাঁদের সত্যিই মনখারাপ হয়ে যায় প্রায় প্রতিদিন কল্পনার এই নির্মম হত্যালীলা সঙ্ঘঠিত হতে দেখে। দিনের আলোয় আমাদের ডানা কাটা যায়। রাজকন্যা, রাজপুত্তুরদের জগতে আর আমাদের প্রবেশাধিকার থাকে না। তাতে অবশ্য রাজনীতিকদের ভারী বয়েই গেল! তাঁরা ইভিএমের ঠিক বাটনে চাপ পড়লেই খুশি। গুল দেওয়াও যে একটা উঁচু ধরনের শিল্প তা আজও তাঁরা বুঝে উঠতেই পারলেন না।

    #

    খবরের কাগজের থেকে অবশ্য শুধু যে মনখারাপের খবরই পাই তা তো নয়। মন ভালো করার খবরও তো লুকিয়ে থাকে এদিক ওদিক, কখনও বা পাতার কোণে, ছোট ফন্টের হেডলাইন নিয়ে। তেমনই একটি খবরের দিকে চোখ পড়তেই জমে ওঠা মনখারাপ কেটে গেল। খবরটি মণিপুরের। ক্লাস ফাইভের মেয়ে ইলাংবাম ভ্যালেন্টিনা, তার কান্নার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে ফেসবুকে। কেন কেঁদেছে ক্লাস ফাইভের এই ছোট্ট মেয়েটি? সে যখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ত তখন সে লাগিয়েছিল দু’টো গুলমোহর গাছ। রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে কেটে ফেলা হয়েছিল গাছদু’টি। স্কুল থেকে ফিরে গাছদু’টি না দেখতে পেয়ে তাই কান্নায় ভেঙে পড়ে ভ্যালেন্টিনা। যাঁরা সেই কান্নার ভিডিও দেখেছেন তাঁরা জানেন যে, এ শুধু তথাকথিত উন্নয়নের বিপ্রতীপে নেমে আসা অশ্রু নয় যার প্রতিটি বিন্দুতে আসলে লেখা থাকে প্রতিবাদ। এ তার অতিরিক্ত কিছু। গাছের সঙ্গে মানুষের চিরকালীন সম্পর্কের দলিল এক বালিকার চোখের কোল আলো করে থাকা ওই নীরবিন্দু। গাছদু’টিকে আত্মীয়ই মনে করত ভ্যালেন্টিনা। বিচ্ছেদ তাই সে মেনে নিতে পারেনি।

    ভ্যালেন্টিনার মতোই আরও অনেকে আছেন যাঁরা একটি গাছ সভ্যতার জন্য কতখানি উপকারী সেই হিসেব কষে গাছকে ভালোবাসেন না। তাঁরা গাছকে ভালোবাসেন কারণ গাছের কথা বলার ভাষা তাঁরা বুঝতে পারেন। গাছের মাথা দোলানো, পাতা নাড়ানো বা খসে পড়া, ফুল ফোটা—সবই তাঁরা পড়তে পারেন। তাত্ত্বিকেরা হয়তো একথা মানবেন না। কঠোর বাস্তববাদীরা হয়তো একথা উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু গাছ মানুষকে শুধুই অক্সিজেন দেয়নি, দিয়েছে আদর, বুঝিয়েছে নীরবতার ভাষা। এই ভাষা সাধারণত নেতা-নেত্রীরা বোঝেন না। তবে আশ্চর্যের হল ভ্যালেন্টিনার চোখের জলের মর্ম কিন্তু বুঝেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী। ভ্যালেন্টিনার কান্না থামাতে তাই ভ্যালেন্টিনার বাড়ি অব্দি ছুটে গিয়েছেন এসপি। তাকে শান্ত করতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, শুধু ভ্যালেন্টিনার গ্রাম নয়, গোটা রাজ্যটিকেই গুলমোহরে ভরিয়ে দেওয়া হবে। ছোট্ট মেয়ের তাৎক্ষণিক আবদার রাখতে তার গ্রামের দু’কিলোমিটার রাস্তার দু’ধারে লাগানোও হয়ে গেছে কুড়িটি গাছ। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ‘গ্রিন মণিপুর মিশন’-এর মুখ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ভ্যালেন্টিনারই নাম।

    সমাজ-অর্থনীতি আর রাজনীতির নানা ক্ষেত্রে মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ-র ভূমিকাটি ঠিক জানা নেই। কিন্তু, ছোট্ট ভ্যালেন্টিনার কান্না যে তাঁর হৃদয়কে সত্যিই স্পর্শ করেছে, সে বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহ নেই।

    #

    দেশের দুই প্রান্তে তাই জেগে রয়েছে দুই ভারতবর্ষ। দেখে, মাঝেমাঝে নিজেরই ধাঁধা লেগে যায়। বর্ষার দিনে এক ভারতবর্ষের মুখোমুখি হলে মন হয়ে পড়ে গম্ভীর মেঘলা আকাশের মতো তো আর এক ভারতবর্ষের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় নেচে ওঠে ময়ূরের মতো। বুঝতে পারি না এই দুইয়ের মধ্যে কোন ভারতবর্ষ সত্যি! শুধু ভাবতে ভালো লাগে যে, কান্না থামিয়ে আবার নতুন একটি গুলমোহর গাছের সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করছে ছোট্ট ভ্যালেন্টিনা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More