হে পূর্ণ তব চরণের কাছে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    পূর্ণের চরণপ্রান্তে আশ্রয় কে না চায়? বাইরে থেকে সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনুষ্য হৃদয়ের এই যাচ্ঞা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হতেই থাকে। তাই তো মানুষ নিখুঁত হতে চায়। রূপে, কাজে। খুঁতখুঁতে মানুষেরা নাকি দ্রুত উন্নতি করেন জীবনে, এমনটা অনেকেরই মত। পূর্ণ হতে চাওয়ার ইচ্ছেই তাঁদের চালনা করতে থাকে সামনের দিকে, তাঁরা ভাঙতে থাকেন একের পর এক সিঁড়ি। তবে এই পূর্ন হতে চাওয়ার ইচ্ছে, নিখুঁত হতে চাওয়ার বাসনা সবসময় কিন্তু সুধা রসের সন্ধান দেয় না। যেমন ছোটবেলায় আমি বারবার বিরক্ত হতাম জেঠুর খুঁতখুঁতে স্বভাবের কারণে। ইতিহাসের উত্তর থেকে হাতের কাজ কোথাও কোনও অস্পষ্টতা থাকলেই, ঠিক যেমনটি উনি চাইছেন, তেমনটি ন-হলেই, রেগে যেতেন জেঠু। সরস্বতী পুজো হবে। সে পুজোর জন্য ঠাকুরের সাজ জেঠু নিজের হাতেই করতেন। কখনও কখনও আমাদের ওপর ভার পড়ত কোথাও একটু রঙ করার বা সাদা পাতা কেটে কেটে নানা রকমের ফুল, পাখি বানাবার। তখন আমরা পড়তাম বিপদে। জেঠু চাইতেন কাঁচি যেন চলে নিখুঁতভাবে। মাপে একটু এদিক ওদিক হলে আবার নতুন করে কাটতে হত ফুল, পাখি। এ কাজে আমার দুই ভাইই আমার চেয়ে ছিল অনেক দড়। তাই কপাল বারবার পুড়ত আমার আর আমি জেঠুর ওই খুঁতখুঁতে স্বভাবের ওপর রেগে উঠতাম। মনে হত, যদি কাগজের ফুলের একটি পাপড়ি আধ-সেমি বেশিই হয়, তো ক্ষতি কী?

    কীভাবে কে জানে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই খুঁতখুঁতানি প্রবেশ করল আমার ভেতরে। এ এক অনিবার্য উত্তরাধিকার। আমার খুঁতখুঁতানির জ্বালায় এখন আমার পরিবারের মানুষদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। হাতের লেখা সোজা না হওয়ার জন্য আমার কন্যা আমার কাছে প্রায় রোজই বকা খায়। ব্যাঙ্কে ঠিকানা লিখতে গিয়ে আমার স্ত্রী সামান্য একটু ভুল করলে আমার মনে হয় যে,  এটিএম কার্ড বুঝি আর এসে পৌঁছবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ওই সামান্য ঠিকানার ভুল অগ্রাহ্য করে কার্ড এসে ঠিক পৌঁছয়। বুঝি যে, জগত আসলে ছোটখাটো ভুল ত্রুটির কেয়ারই করে না! কিন্তু তবু আমার মন খুঁতখুঁত করতেই থাকে। জামা-প্যান্টের ক্রিজ এক্কেবারে সমান না হলে, আমার মুখ ভারী হয়। নতুন কেনা স্কুটারে ছোট্ট একটি স্ক্র্যাচ হলে আমার মন খারাপ হয়। কেউ হয়তো দেখতেই পায় না সেই স্ক্র্যাচ—তবু আমার খুঁতখুঁতানি যায় না। আমি আবার স্কুটার রঙ করাই। মনে আছে নতুন গাড়ি কিনে প্রথমবার কলকাতা সেই গাড়ি নিয়ে গিয়েই একটি ছোট্ট স্ক্র্যাচ নিয়ে বাড়ি ফিরে সেই দাগ তোলার জন্য বেশ কিছু টাকা খরচ করেছিলাম। আমার স্ত্রী অবশ্য এইসব ব্যাপার তেমন একটা পাত্তা দেন না। ছোট ছোট ভুল সম্পর্কে তাঁর রয়েছে এক নির্বিকল্প উদাসীনতা। সাহসও তাঁর আমার থেকে বেশি। কিন্তু ছোটোখাটো জিনিসকেও আমি একেবারেই অবজ্ঞা করতে পারি না। মনে আছে এই খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্যই একবার আমার নাম হয়ে গিয়েছিল একে ৪৭। তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হোস্টেলগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হত নিয়মিত। আমার কাঁধে পড়ত জজিয়তির দায়িত্ব। খুঁতখুঁতে আমার চোখ চলে যেত অনুষ্ঠানগুলির মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা থেকে পারফরমেন্সের নানা ছোটখাটো ভুল আর অসঙ্গতির দিকে। শেষদিন পুরস্কার বিতরণের আগে নির্দিষ্ট করে বলেও দিতাম সেইসব ভুলত্রুটি। ছাড় পেত না কেউই। আমার ওই ভয়ংকর খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্যই আমি, অংশুমান কর, এ.কে., ছাত্রছাত্রীদের মুখে মুখে হয়ে গিয়েছিলাম একে ৪৭! একবার, সত্যি বলতে কি, এই খুঁতখুঁতানির জন্য বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম ইউকে ভিসার অফিসে। সেবার হাতে পূরণ করা ভিসার ফর্মে একটি অক্ষর জড়িয়ে গিয়েছিল লেখার সময়। ডাবল রাইট করব না বলে আর কেটেকুটে তাকে ঠিক করার চেষ্টা করিনি। আর হোয়াইটনার নাকি অফিসিয়াল কাগজপত্রে ব্যবহার করা যায় না, তাই কালো লেখাকে নকল সাদা কালিতে ঢেকে তাকে আবার কালো করার চেষ্টাও করিনি। দ্বিধা নিয়েই কাগজপত্র জমা দিয়েছিলাম ভিসা পেতে। ভিসা অফিসে লেডি ভিসা অফিসার আমার জমা-দেওয়া কাগজপত্র পরীক্ষা করে সেসব একটি ফাইলের মধ্যে পুরে দিয়ে আমাকে বললেন একটু অপেক্ষা করতে। কিছু সময় পরে আবার ডাক আসবে আমার। ওই সময়টুকুতে যেন আমি হাতে ধরে থাকা ওই বন্ধ করে-দেওয়া ফাইলটি আর না খুলি। কিন্তু হল কি, যেই একলা হলুম ওই অফিসে, অমনি ওই জড়িয়ে থাকা অক্ষরটি তাড়া করতে থাকল আমাকে। মনে হল একবার ফাইল খুলে দেখি ওটি ঠিকঠাক পড়া যাচ্ছে কিনা। যেই ফাইল খুলেছি অমনি ধরা পড়লাম গোপন ক্যামেরায়। ব্যাস, ওই মহিলা অফিসারের নির্দেশে অন্য একজন এসে ফাইলটি কেড়ে নিলেন আমার থেকে। আমি বসে রইলুম চোরের মতো। অবশেষে শাস্তি হিসেবে সব শেষে ডাক এল আমার। যে-কাজ হত মাত্র আধঘন্টায় তা হতে লেগেছিল ঘন্টা দেড়েক, মনে আছে। তারপরেও বাড়ি ফিরেছিলাম দুশ্চিন্তা নিয়ে। ভিসা পাব কিনা—তা নিয়ে সে কী তীব্র দুশ্চিন্তা! তবে, মিলেছিল ভিসা। এডিনবরা যাওয়া সে যাত্রায় আটকায়নি।

    আসলে মানুষ যতই পূর্ন হতে চাক না কেন, পূর্ণতা মানুষের অধরাই থাকে। মানুষ কেবল পূর্ণতার চরণের কাছেই দু’দণ্ড বসতে পারে। তার বেশি কিছু করার সাধ্য তার নেই। জীবনের অক্ষর বেঁকে গেলে, তা কি  সহজে হোয়াইটনার দিয়ে মুছে ফেলে আবার নতুন করে লেখা যায়? বুঝি এসব কথা, কিন্তু মানতে পারি না। নানা রকমের সব ভোগান্তির পরেও তাই আমার খুঁতখুঁতে স্বভাব যায় না। ভাবছেন হয়তো আমার মতো খুঁতখুঁতে মানুষ তাহলে নিশ্চয়ই বিস্তর কাটাকাটি করে লেখার খাতায়, আমার লেখার খাতা বুঝি ভরা থাকে শুধুই কাটাকুটির দাগে। তা কিন্তু নয়। গদ্য লেখার সময় আমি বিস্তর কাটাকুটি করি একথা ঠিক। একই জিনিস বারবার পড়ে পড়ে, একে-ওকে-তাকে শুনিয়ে শব্দ বদলাই, বাক্যের গঠন পাল্টাই। সেসব কাটাকুটির অবশ্য কোনও চিহ্ন থাকে না। কেননা আমি কাগজে কলমে গদ্য লেখা ছেড়ে দিয়েছি বহুকাল। নেহাত বিপদে না পড়লে গদ্য লেখার জন্য কলম ধরি না। আর ল্যাপটপ কীভাবে ধরে রাখবে কাটাকুটির চিহ্ন? সে তো বড় বয়সে ফিরে আসা ছোটবেলার স্লেট। শুধু মুছে ফেলতে জানে।

    কবিতা অবশ্য আমি লিখি ঠিক এর উল্টো প্রক্রিয়ায়। ল্যাপটপে সরাসরি খুব সামান্য কবিতাই আমি লিখেছি এতাবৎকাল। কাগজ আর কলমের সংস্পর্শ ছাড়া আমি কবিতা লিখতে পারি না। আমার পছন্দ রুলটানা খাতা বা ডায়েরি। ওই দুই রুলটানা দাগের মধ্যে অক্ষরগুলি কেমন একটা সমতায় সেজে উঠতে থাকে, দেখে আমি মজা পাই, স্বস্তি পাই। যে পাতায় রুল টানা নেই, সেই পাতায় খালি আমার মনে হয় অক্ষরগুলি ঠিক সমান সমান হচ্ছে না, একটি আরেকটির চেয়ে বড়ো বা ছোটো হয়ে পড়ছে, সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি হতেই থাকে। কবিতার লাইনগুলি অসম হলেও অক্ষরগুলির ভেতরে যেন এক সাম্য থাকে—এই রকমের একটি ভাবনা কাজ করতেই থাকে আমার ভেতরে, কেন কে জানে! কবিতা লেখার কাগজ নির্বাচনের ব্যাপারেও আমি তাই বেশ খুঁতখুঁতে। কিন্তু আশ্চর্যের হল এই যে, কবিতা লেখার খাতায় আমি সাধারণত খুব একটা কাটাকুটি করি না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে যেন শব্দগুলি আসতে থাকে একের পর এক। কাটাকুটি যা-কিছু  তা হতে থাকে মাথার ভিতরেই। তবে সেসব কাটাকুটিরও কোনও চিহ্ন থাকে না। সব কাটাকুটি কী আর দেখা যায় জীবনে? কে যে কাকে কখন কোথায় জীবন থেকে বাদ দিয়ে দেয়—তা কি বুঝে ওঠা সম্ভব সবসময়?

    মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে, এতখানি খুঁতখুঁতে না হলেও তো চলত আমার।  তাহলে হয়তো গৃহে থাকত শান্তি; জীবনে পারিজাত। তারপরই মনে হয় যে, সৃজনশীল মানুষ মাত্রই সম্ভবত এতখানি খুঁতখুঁতে হয়। সৃজনশীলতার জন্য এই খুঁতখুঁতানিটুকু অনিবার্য। তবে, খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্যই অন্যদের চেয়ে, এমনকি, কখনও কখনও নিজের পরিবার-পরিজনদের থেকেও কোথাও একটা আলাদাও হয়ে যান খুঁতখুঁতে মানুষ। সকল লোকের মাঝে বসে, আমাদের নিজেদের মুদ্রাদোষে, আমরা একাই  শুধু আলাদা হতে থাকি। তবে এই বিয়োগ নিয়ে আক্ষেপ করে সত্যিই লাভ নেই। এইটুকু বিয়োগ হয় বলেই অনেক যোগের অঙ্ক মিলে যায়। এ যেন এক মধুর অভিশাপ!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More