এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো শব্দহীন হও…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    সন্ধের মুখে কালবৈশাখী হলে, আমাদের মন ভেঙে যেত। সেই আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি। তখন রবীন্দ্রজয়ন্তী হত পাড়ার মাচায়। খুঁটি দিয়ে মাচা বাঁধার সময় থেকেই আমাদের উৎসুক প্রতীক্ষা শুরু হয়ে যেত, পঁচিশে বৈশাখের। দুগ্‌গা পুজোর অপেক্ষার চেয়ে কম উত্তেজনা ছিল না সেই প্রতীক্ষায়! সেইসব দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল কালবৈশাখী। গ্রামে তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামের বালাই ছিল না তখন, আজও বোধ হয় নেই। খোলা মাঠের অনুষ্ঠান ভেস্তে দিত কালবৈশাখী। দু’একবার তাই পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানটি আমাদের একদিন পিছিয়ে দিতে হয়েছিল, বেশ মনে আছে। পাড়ায় এই মাচা বেঁধে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনে একবার আমার টেনশন হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। সেবার বুড্‌ঢাদার নির্দেশোনায় আমরা মঞ্চস্থ করেছিলাম “খ্যাতির বিড়ম্বনা”। মহলা দেওয়ার জায়গার অভাবে আমরা মহলা দিতাম একটি শূন্য গোয়াল ঘরে, গাভীটি চরতে বেরিয়ে যাওয়ার পরে। আমাদের মহলার পুরো সময়টি জুড়েই  না থাকলেও ওই গাভীটির উপস্থিতির গন্ধ টের পেতাম। আজও সেই অদ্ভুত গন্ধ নাকে ভাসে। তো, সেবার বুড্‌ঢাদার বাবা রমেন জেঠু ঘোষণা করেছিলেন যে, যার অভিনয় নাটকে সবচেয়ে ভালো লাগবে ওঁর, তাকে একটি পুরস্কার দেবেন। আমি করেছিলেম দুকড়ি দত্ত। সারাক্ষণে মঞ্চে আমার উপস্থিতি আর সংলাপও অনেক। তাই বড়ো আশা করেছিলাম যে, পুরস্কারটি আমিই পাব। এদিকে পঁচিশে বৈশাখ বিকেল থেকেই গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া। ভয়ে বুক কাঁপতে লাগল আমার। তখন তো আর ওয়েদার রিপোর্ট চেক করার হাজার খানেক অ্যাপ ছিল না, আবহাওয়া দপ্তরের সরকারি রিপোর্টেও যা বলা হত, ঠিক তার উল্টোটাই হত। আকাশের দিকে তাকিয়েই আমাদের উৎকণ্ঠার প্রহরগুলি কাটত। ঠিক আলো কমে আসার মুখেই শুরু হল ঝড়। তারপর বৃষ্টি! কালবৈশাখী যেমন হয় আর কি! মনে আছে, ঝড় বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরে, বেশ রাত করেই শুরু হয়েছিল আমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তী। মঞ্চস্থ হয়েছিল “খ্যাতির বিড়ম্বনা”। পুরস্কারটিও পেয়েছিলুম বটে!

    #

    ডেকরেটরের বেঁধে দেওয়া মাচায় রবীন্দ্রজয়ন্তী শুরু হওয়ার আগেই অবশ্য আমার জেঠুর উদ্যোগে আমাদের পাড়ায় শুরু হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন। মঞ্চ বানানো হত বাড়ির তক্তপোশ গুলো জোড়া দিয়ে দিয়ে। সকাল থেকে বাড়ির তক্তপোশ বের করে নিয়ে মঞ্চ বানানোর সে কী তোড়জোড় চলত দিনভর! সে এক হইহই রইরই ব্যাপার! সেইসব অনুষ্ঠানে আমার অংশগ্রহণ করা হয়নি, তখন আমি খুবই ছোট। ভাসা ভাসা মনে পড়ে সেই সব অনুষ্ঠানের কথা। মনে পড়ে ধুতি দিয়ে বানানো হত পর্দা আর নাটক হলে গামের (আঠার) একটা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যেত ঘরময়, কেননা তখন কোনও মেক-আপ আর্টিস্ট ছিল না গ্রামে, কলা-কুশলীদের সাজিয়ে দিতেন আমার জেঠুই। মাচায় উঠে যখন আমাদের জেনারেশন অভিনয় করার সুযোগ পেল, তখন অবশ্য আমাদের মেক-আপ আর্টিস্ট ছিল ওই পরিচালক বুড্‌ঢাদাই। এখনও আমাদের পাড়ায় ছোটোদের নিয়ে নাটক করায় বুড্‌ঢাদা, তাদেরও মেক-আপ করে দেয়। ছোটবেলায় নাটক করতে গিয়ে, নকল দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে খুবই টেনশন হত আমার। গামের একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লেগে থাকত ঠিক, কিন্তু ওই আঠার টানে, স্বাভাবিকভাবে কথা বলা হয়ে যেত প্রায় অসম্ভব। বুড্‌ঢাদা এই আড়ষ্টতা কাটাতে দেখিয়ে দিতে ঠোঁটের নানা রকম ছোটোখাটো ব্যায়াম। তবে, ঠোঁট স্বাভাবিক হলেও, ভয় পিছু ছাড়ত না। খালি মনে হত, এই বুঝি খসে পড়ল দাড়ি-গোঁফ! না, খসে পড়েনি কোনওদিন, তবু এই ভয় যেত না। অকারণেই বুক ছ্যাঁত ছ্যাঁত করার অভ্যেস আমার সেই তখন থেকেই!

    #

    মাচায় আমি সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠান করেছি অবশ্য বাঁকুড়া শহরে। তখন পড়ি ক্লাস ইলেভেনে। সিরিয়াসলি কবিতা লেখা সবে শুরু করেছি, তবে তখন বাঁকুড়া শহরে আমার মূল পরিচিতি ছিল একজন আবৃত্তিকার হিসেবে। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, বিজয়া সম্মিলনী থেকে সিটুর সম্মেলনের মাচায় বারবার আবৃত্তি করার ডাক আসত। নেচে উঠত হৃদয়ও। একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠানও থাকত কখনও কখনও। আমার হিরো সাইকেল তখন হয়ে উঠত পক্ষীরাজ। পক্ষীরাজ উড়িয়ে মুহূর্তে পেরিয়ে যেতাম মাইলের পর মাইল, পৌঁছে যেতাম এক মঞ্চ, থুড়ি এক মাচা থেকে আর এক মাচায়। সম্মান দক্ষিণাও পাওয়া যেত সামান্য। কখনও একশো, কখন দুশো, কখনও বা সাকুল্যে পঞ্চাশ টাকা। এইসব অনুষ্ঠান করতে করতে আমরা একটা ছোট্ট দলও বানিয়ে নিয়েছিলাম। জনা তিন-চার গায়ক—মান্না দের গান গাওয়া অতনু, যাকে আমরা আদর করে ডাকতাম অতু, শ্যামল মিত্রের গান গাওয়া বাপ্পাদা, লোকগান গাওয়া স্বরূপদা আর জনা দুই আবৃত্তিকার, আমি আর ডাকুদা, মানে অরিন্দম ঘোষ, একেবারে কমপ্লিট প্যাকেজ। একটি দলকে ভাড়া করলেই সব রকমের শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা পাকা। আসতও ভাড়া। মনে আছে, একবার পুজোর সময়ে দক্ষিণ বাঁকুড়ার কোনও একটি গ্রাম থেকে ভাড়া এল। অনুষ্ঠানের দিন সন্ধেবেলাতেই সেই গ্রামে পৌঁছে জানতে পেরেছিলাম যে, অনুষ্ঠান হবে মধ্যরাতে। ঠান্ডা তখন অল্প অল্প পড়ছে। বেশ মনে আছে প্রথমে আঁসকে পিঠে আর কিছু পরে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে একটি বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে আমরা মাঝরাতে শুরু করেছিলাম অনুষ্ঠান। মাচার সামনে তখন পিলপিল করছে লোক, কেউ বসে আছে খালি মাটিতে, কেউ বা ইটের ওপর। ভয় ছিল যেসব কবিতা আমি তখন বলতাম সেইসব কবিতা ওই ‘গেঁয়ো’ মানুষেরা শুনবেন তো? বলেছিলাম সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’। শুনেছিলেন কিন্তু ওই ‘গেঁয়ো’ মানুষেরা। আমি বুঝেছিলাম দর্শকের শিক্ষা তাঁর স্থানিক অবস্থান দিয়ে বিচার করতে যাওয়া মূর্খামো। শিল্পের যে কোনও শাখার ভোক্তাদের সম্পর্কেই এ কথা সত্য।

    #

    সত্যি বলতে কি, মাচার অনুষ্ঠান থেকে এভাবে আমি শিখেছি অনেক। সবচেয়ে বেশি শিখেছি কীভাবে মানিয়ে চলতে হয় সকলের সঙ্গে, প্রয়োজন মতো পাল্টে নিতে হয় স্ট্র্যাটেজি। বাঁকুড়া শহরে থাকার সময়েই আমি যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যার নাম ছিল ‘সংগ্রামী সাংস্কৃতিক পরিষদ’। বাপ্পাদার নেতৃত্বে বিশাল গানের দল গাইত নানা রকমের গান—‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘ও মোদের দেশবাসীরে’ থেকে ‘জন হেনরি’। নাচেরও দল ছিল আমাদের। বেশ কয়েকজন ছেলে আর মেয়ে। সারা গায়ে কালো ভুসো কালি আর তেল মেখে ‘জন হেনরি’ নাচত বুম্বাদা। তার গ্রন্থিল পেশি থেকে স্ফটিক ঠিকরোত। নাচ আর গানকে সংহত এক বাঁধনে বেঁধে স্ক্রিপ্ট লিখে দিত বাবলুদা, তিনি ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। আমার আর সোমাদির দায়িত্ব ছিল সেই স্ক্রিপ্ট পড়ার। তো, এই দল নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াতাম এখানে-ওখানে, শহরের ভেতরে, দূরের শহর-গঞ্জেও। অনেক সময়ই গিয়ে দেখা যেত মাচাটি খুবই ছোট, মোটে দশ ফুট বাই দশ ফুট। তার মধ্যেই কী করে কী জানি আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঠিক নেচে ফেলত। গানের দলও দাঁড়িয়ে যেত ঠিক। মঞ্চের পেছনে আলো-আঁধারি জায়গায় কভার দেওয়া ডুমের আলোয় আমরাও পড়ে ফেলতাম স্ক্রিপ্ট। শিখে যেতাম সংগ্রামের ঠিক উল্টো পিঠেই লেখা আছে সংহতি।

    #

    মাচার অনুষ্ঠান থেকে সবচেয়ে বড়ো শিক্ষাটি আমি অবশ্য পেয়েছিলাম জীবনে প্রথম বার মাচায় উঠেই। সেই অনুষ্ঠানটির কথা গত বছর এই সময়ে একবার বিশদে লিখেছিলেন অর্ধাঙ্গিনী, আমারও উল্লেখ ছিল তাতে। কিন্তু, বিস্তার ছিল না। আজ একটু বিস্তার করতে ইচ্ছে করছে। জীবনে প্রথমবার মাচায় উঠেছিলাম “পূজারিনি” কবিতাটির নাট্যরূপের অংশ হিসেবে। আমাদের গ্রামের বাড়ির উল্টোদিকের ইলেকট্রিক অফিসে হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান। এক কাকিমার নির্দেশনায়। পাড়ার দিদি আর বোনেরাই অভিনয় করেছিল তাতে। বাঁকুড়া শহর থেকে ‘ফিমেল’ (তখন ইলেকট্রিক অফিসে যাত্রা হত বিশ্বকর্মা পুজোয়, আর সেই যাত্রায় অভিনয় করার জন্য বাঁকুড়া থেকে মাত্র ক’দিনই রিহার্সাল দিতে মহিলা শিল্পীর আসতেন, তাদেরই বলা হত ‘ফিমেল’, অপভ্রংশে তাঁরা কখনও কখনও ‘ফ্যামিলিও’ হয়ে যেতেন!) আসেনি কোনও। পুরুষদেরও নেওয়া হয়নি অভিনয়ে। দিদি-বোনেরাই করেছিল পুরুষ চরিত্রগুলি। সম্পূর্ণ মহিলা অভিনীত সেই নাটকে আমিই ছিলাম একমাত্র (শিশু) পুরুষ অভিনেতা। সাজতে হয়েছিল নির্বাক বুদ্ধ। কোনও সংলাপ ছিল না আমার। শুধু শ্রীমতী আমাকে পুজো করবে বলে, ধুতি পাঞ্জাবি (অঙ্গবস্ত্রহীন অবস্থায় মাচায় উঠতে আমার ছিল তীব্র আপত্তি) পরে চুপচাপ বসে থাকতে হয়েছিল অনেকক্ষণ। বসে বসে দেখেছিলাম একের পর এক বিপর্যয়। সংলাপ ভোলা, শ্রীমতীকে তরবারির কোপ দিতে ভুল হওয়া—মাচায় ঘটে যাওয়া এই রকম একের পর এক বড়ো বড়ো দুর্ঘটনা। গোটা কবিতাটিই ছিল আমার মুখস্থ। তাই সংলাপে ভুল হলে আমার ইচ্ছে করছিল  ধরিয়ে দিই সংলাপ। কিন্তু আমি তো জ্যান্ত বুদ্ধ নই, পাথরের মূর্তি মাত্র, কথা বলা মানা। তাই চুপটি করে বসে ছিলাম ওই বিপর্যয়ের সময়েও।

    #

    আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় যে, সেদিন, জীবনে প্রথম মাচায় উঠেই জীবনের এক বড়ো শিক্ষা পেয়েছিলাম আমি। শিখেছিলাম মৌন থাকতে। মনে পড়ে শঙ্খ ঘোষের পঙ্‌তিগুলি, “এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো/ শব্দহীন হও…লেখো আয়ু লেখো আয়ু” আর মনে হয় এই কবিতার ভেতরে শুধুই কি মৌনের সাধনার কথা বলেছেন শঙ্খ ঘোষ? কোথাও কি একটু বিদ্রুপের ছোঁয়া নেই? আয়ু বৃদ্ধির বিশল্যকরণী যে বিপর্যয়ের সময়ে মৌনে স্থিতু হওয়া—সেই ইঙ্গিত কি নেই একেবারেই? এই রকম মনে হয় আর বুঝি যে, পাথরের বুদ্ধ সেজে, জীবনে প্রথমবার মাচায় উঠেই আমি শিখে নিয়েছিলাম বিপর্যয়ের সময়ে মৌন থাকার পদ্ধতি, রপ্ত করেছিলাম আয়ু বৃদ্ধির কৌশল। হা রে মাচা! হা রে আমি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More