শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে, তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে

অংশুমান কর

লোকটা যে ঠিক কে, লোকটা যে ঠিক কী, তা আজও আমার জানা হল না। একেক সময়ে ওঁকে এক এক রকম লাগে। এক এক সময়ে মনে হয় উনি একজন বৈদ্য। না, ডাক্তার নন, বৈদ্যই। শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুসজ্জিত সেই কোন প্রাচীনকালের সর্বরোগহরা বদ্যিবুড়ো। যিনি একাধারে মেডিসিনের ডাক্তার, অন্যধারে পটু সার্জারিতে। কখনও কখনও তিনি আবার মনস্তত্ত্ববিদও।  ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য রোগে তাঁর ওষুধ রুগিকে দেয় ক্ষণেক আরাম। তাই-ই বা কম কী? এক কথায় অব্যর্থ তাঁর বিশল্যকরণী!

কখনও কখনও মনে হয়, না, বৈদ্য তিনি নন। তিনি একজন ম্যাজিশিয়ান। রূপকথার এক জাদু-দুনিয়া থেকে আমাদের এই মাটির পৃথিবীতে নেমে আসা এক জাদুকর। যিনি এই পৃথিবীতে একবারই নেমে আসতে পারেন, মাত্র একবার। অসীম তাঁর জাদুদণ্ডের ক্ষমতা। যা আমরা নিজেদের খালি চোখে দেখতে পেতাম না কোনওদিন, তা তিনি আমাদের দেখিয়ে দেন। লাল ফুলকে করে দেন নীল, রজনীগন্ধাকে জুঁই। প্রবল শীতের রাতেও তিনি চাইলেই নামিয়ে আনতে পারেন বর্ষণ। অতিবৃদ্ধের প্রাণেও তিনি পুরে দেন শিশুর চাপল্য। এমনই তাঁর ম্যাজিক!

কখনও কখনও মনে হয়, না, ম্যাজিশিয়ানও তিনি নন, তিনি আমার মাস্টারমশাই। কত কিছু পড়ান আমাকে। কখনও বা পড়ান পরমাণুর গঠন, কখনও বা ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস। বুঝিয়ে দেন গ্রাম বলতে তিনি কী বোঝেন, কোথায় কোথায় ত্রুটি নগরসভ্যতার। পরাধীনতার উত্তরাধিকার বহন করে যখন ক্রুদ্ধ লাল চোখে তাকাই ইওরোপের দিকে, তখন তিনি আমাকে নির্মোহ এক দৃষ্টি নিয়ে ইওরোপকে দেখতে শেখান। এতটুকু উত্তেজিত না হয়ে তিনি আমাকে চেনান জাতীয়তাবাদের স্বরূপ।

কখনও কখনও মনে হয়, না, ঠিক মাস্টারমশাই নন, তিনি যেন তার অতিরিক্ত কিছু, আমার অভিভাবক। চলতে চলতে ভুল হলে মৃদু ধমক দেন আমাকে। কখনও কখনও কোন পথে হাঁটা উচিত সে বিষয়ে দেন নির্দেশ। পা টলমল হলে, তাঁর হাত ধরেই আমি আবার শক্ত হয়ে মাটিতে দাঁড়াই। প্রলোভনের সঙ্গে লড়াই করি তাঁর আশীষেই। তিনিই আমাকে পিতার মতো ভরসা দেন একলা চলার।

কখনও কখনও মনে হয়, তিনি ঠিক অভিভাবক নন আমার, বরং বন্ধু। দূরে থাকেন না আমার থেকে। সর্বদা থাকেন কাছে কাছে। থাকেন রাজদ্বারে, থাকেন শ্মশানে। আনন্দে যেমন এসে তিনি দেন তাঁর প্রবল সমর্থন, তেমনই আমার বিষাদের কালে তিনি এসে বসেন আমার পাশে। বেশি কথা বলেন না। শুধু আমার পিঠে রাখেন তাঁর শোকোত্তীর্ণ, স্নেহময় হাত।

কখনও কখনও মনে হয়ে তিনি আমার কমরেড, আমার সহযোদ্ধা। মনে হয়, ওই তো তিনি হাঁটছেন আমার সঙ্গে মিছিলে। দৃপ্ত তাঁর পদচারণা, কিন্তু অহং নেই তাতে, আছে গভীর প্রত্যয়। আমার জন্যই তিনি নেমে এসেছেন পথের ধুলায়। তিনিই আমার লংমার্চ।

কখনও বা  মনে হয়, তিনি ঠিক কমরেড নন আমার। তিনি আমার সেই বস, যিনি সহকর্মীদের সঙ্গে মেশেন সমুদ্রের সাবলীলতায় আবার প্রয়োজনে আছড়ে পড়েন ঝঞ্ঝার ক্রোধ নিয়ে। তিনিই ভারতবর্ষের প্রথম কর্পোরেট যিনি কাচের কিউবিকল ভেঙে এগারতলার ফ্লোরে এনে দেন ঘাসের ওপর চিকচিক করতে থাকা শিশির।

কখনও আবার মনে হয়, নন, নন, নন—তিনি এসব কিছুই নন, তিনি আমার প্রেমের সহায়। তিনি আমার কিশোরী পিয়াদি যার হাতে ধরে আমি লিখতে শিখেছি জীবনের প্রথম প্রেমপত্র। আমার প্রেমে আজও তিনিই দৃষ্টির আড়াল, ক্ষণকালের কয়েকটি শব্দ আর চিরকালের নিঃসীম নীরবতা।

রবীন্দ্রনাথ, আপনি যে ঠিক কে, আপনি যে ঠিক কী—তা আজও জানা হল না আমার। শুধু জানি, আমার ঠিকানা আছে আপনার বাড়িতে, আপনার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে। আপনাকে প্রণাম।

Comments are closed.