রবিবার, এপ্রিল ২১

বুনোফুলের দেশ

অংশুমান কর

ভোট মানেই ছুটি। অন্তত আমার জীবনে। না, ভোট মানেই এই ক’দিন আগে পর্যন্তও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস চলে যাবে জেলা প্রশাসনের দখলে আর গরমের ছুটির সঙ্গে জুড়ে যাবে ভোটের একটা ‘দুষ্টুমিষ্টি’ ছুটি—সেজন্য নয়। সত্যি বলতে কি, এখন তো আমাদের গরমের ছুটি উঠেই গেছে আর ভোটের জন্যও আর সেভাবে আমাদের ক্যাম্পাস নেওয়া হয় না। ভোট মানেই আমার কাছে ছুটি সে আমার ছেলেবেলার কারণে। ছেলেবেলায়, আটের দশকের গোড়ার দিকে, ভোট ছিল যেন একটা উৎসব। মনে আছে, ভোটের দিন, জেঠুর নেতৃত্বে আমাদের বাড়ির বড়রা সব্বাই (মায় ঠাম্মা শুদ্ধু) ভোট দিতে যেত। তার মানে বাড়ি ফাঁকা, মানেই আমাদের ছুটি। তাও প্রায় একটা গোটা বেলা। পঞ্চায়েত ভোট হলে তো কথাই নেই, কখনও কখনও মা-বাবা-জেঠু-বড়মাদের ভোট দিয়ে ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে হয়ে যেত দুপুর। এখন ভাবি, কেন ভোট দিতে গেলে অতটা সময় লাগত তখন। মনে হয় যে, তখনও তো ইলেকট্রনিক ভোটের মেশিন আসেনি, ইভিএমের নয়, সে ছিল কাগজে ছাপ দেওয়া ভোটের যুগ, তাই মনে হয় অত সময় লাগত এক একটা ভোট শেষ হতে। আর পঞ্চায়েত ভোট মানে তো তিন-তিনটে ভোট! তাই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যেত বড়দের ফিরতে।  আর বড়দের দেরি মানেই আমরা দেখতাম সাপের পাঁচ পা। গার্জেন বলতে বড়দি, যে কিনা সাকুল্যে আমাদের চেয়ে বছর চার-পাঁচের বড়।  কে শোনে তার কথা! অবশ্য কথা শোনাতে তারও খুব আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না; কেননা, এ তো তার কাছেও পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার একটি ছুটি। সেও তাই হয়ে যেত আমাদের মতোই বাঁধনহারা। তখন ইলেকট্রিক পাখা, মানে যাকে বলে ফ্যান, ছিল না আমাদের বাড়িতে। এদিকে ভোট হত এখনকার মতো সেই গরমকালেই।  তাই ছুটি পেয়ে ঘরের গরম থেকে বাঁচতে আমরা প্রায়ই আশ্রয় নিতাম আমাদের পাড়ার বড় বড় আম গাছগুলোর তলায়। হ্যাঁ, আজ আর সবক’টি নেই, কিন্তু তখন আমাদের পাড়ায় বড়সড় আমের গাছ ছিল বটে কয়েকটা। ভোটের সময় আম ঠিক ধরত না। কোনও কোনও গাছে তখন সুবাস ছড়াত মুকুল আর কোনও কোনও গাছে সদ্য দেখা দিত ছোট্ট ছোট্ট আমের গুটি। আমরা সেই আমের গুটি কখনও গাছে উঠে পেড়ে নিতাম, আর কখনও বা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিতাম;  মাটিতে এমনিই ঝরে পড়ত তারা। তারপর সেই ছোট্ট গুটিগুলোকে আমাদের বাড়ির (মানে স্কুলের কোয়াটার্সের) হলুদ দেওয়ালে ঘষে ঘষে তার ছাল তুলে, নুন মাখিয়ে খেতাম। লিখতে লিখতেই জিভে জল চলে আসছে এমনই অপূর্ব ছিল তার স্বাদ। ভোট মানেই কেন জানি না এখনও আমার কাছে একবেলার একটা ছুটি, সঙ্গে আমের গুটি।

#

তবে ছেলেবেলার ভোট আর বড়বেলার ভোট তো এক রকম হয় না। বড়বেলায় ভোট নিতে যেতে হয় আমাদের, মানে সরকারি, আধা-সরকারি কর্মচারীদের। এবং ভোট নিতে গিয়ে ভোটকর্মীদের মাঝেসাজে  যে হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা হয়—তা তো আমরা জানি। আমারই এক ঘনিষ্ট বন্ধুর চোখের সামনে একবার মেরে ফেলা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের দুই কর্মীকে। সেটি দেখে, কী ভয়ংকর ট্রমার মধ্যে পড়েছিলেন সেই বন্ধুটি, কীভাবে ধীরে ধীরে চিকিৎসায় সুস্থ হন তিনি—সে কথা লিখতে গেলে তো আর এক পর্ব লাগবে। মাঝে মাঝে প্রিসাইডিং অফিসারেরা তো মারাও যান। এ বাংলায়, হায়, ভোটের সময়, সবই সম্ভব! এ জন্যই ভোটের ডিউটি এলে সকলেই পথ খুঁজতে থাকেন, কীভাবে ভোটের ডিউটি কাটানো যায়। এ বিষয়ে মোক্ষম এক পদ্ধতির আবিষ্কর্তা আমার এক দাদা। নিরাপত্তার কারণেই তার নাম নেওয়া যাবে না। জানানো যাবে না এমনকি তিনি কোন জেলার।  সারা বছর অজীর্ন রোগে ভুগতে থাকা তাঁর শরীরটিই ভোটের ডিউটি কাটানোর ক্ষেত্রে তাঁর ইউএসপি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি দেখেছেন যে, ঘন্টা চারেক যদি গ্রীষ্মের টা-টা পোড়া রোদে থাকা যায় তাহলে জ্বর অনিবার্য। সঙ্গে যদি একটি দিন জল না-খেয়ে থাকা যায় তাহলে ডিহাইড্রেশন হবেই হবে সঙ্গী। ভোটের ডিউটি কাটাতে তাই তিনি এই দোরে ওই দোরে ঘুরে বেড়ান না। রোদে ঘোরেন। তারপর একটি পুরো দিন জল না খেয়ে যান ভোটের জিনিসপত্র বুঝে নিতে। তারপর অবধারিত ভাবে মাথা ঘুরে পড়ে যান আর তাঁর জায়গা নেন রিজার্ভে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার। তিনি হাসপাতালে ড্রিপ ও পথ্যি সেবন করে বাড়ি ফেরেন এক বা দু’ দিন পরে। এখনও পর্যন্ত একবারও ব্যর্থ হয়নি তাঁর এই অস্ত্র।  অস্ত্রটি মোক্ষম কিন্তু পাছে নির্বাচন কমিশনের রোষে পড়তে হয় তাই বলতেও পারছি না যে, আগ্রহীরা চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

#

এ লেখায় ইতি টানি আমার নিজের ভোট নিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটুকু ভাগ করে নিয়ে। জীবনে মাত্র একবারই ভোট নিতে যেতে হয়েছে আমায়।  তখন পড়াই বরাবাজার হাইস্কুলে। ভোটের ডিউটি এল এমনই এক সময়ে যখন বাড়িতে এক নতুন অতিথির প্রতীক্ষায় দিন গুনছি আমরা। সেবার ভোট হয়েছিল ১৩ মে। আর আমাদের কন্যা তিন্নি আমাদের ঘর আলো করে এসেছিল ১৯মে। সন্তানের জন্মের জন্য টেনশনের কারণেই কি না জানি না, আমার খালি মনে হত, ভোট নিতে গেলে আমি বোধহয় আর ফিরব না, বাবাকে আমার সন্তান দেখতেই পাবে না। হয়তো তার কিছুদিন আগেই আমার বাবা মারা গেছিলেন বলে এত বেশি মৃত্যু চিন্তা আসত। হতে পারে যে, তখন মাওবাদী কার্যক্রম জোরতার শুরু হয়ে গেছে পুরুলিয়ায়, তাই লাগত অত ভয়। আমার ডিউটি পড়েছিল ঝালদা কন্সটিটুয়েন্সিতে। পুরুলিয়ার বাকি সব জায়গা চষা হলেও ঝালদা তখনও অব্দি আমি একবারও যাইনি, হয়তো ভয় ছিল তা নিয়েও। মনে আছে, যখন আমাদের জানানো হল যে, আমরা ন’টি দল একটি বাসে যাব আর দেখতে থাকলাম ওই ন’টি দলের আটটির সঙ্গেই যাচ্ছে এ কে ৪৭ ঝোলানো মিলিটারি, বুক দুরুদুরু করছিল। আমার ভাগ্যে কিন্তু পড়ল হাতে লাঠিওলা হোমগার্ড, বন্দুক-টন্দুকের বালাই নেই। বন্ধু-বান্ধবরা সবাই বলল, আমি নাকি ভাগ্যবান, ‘সেফ’ বুথে যাচ্ছি, তাই পুলিশ-মিলিটারি নেই, বন্দুক নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম না, সত্যিই আমি ভাগ্যবান নাকি হাতে এ কে ৪৭ ওলা মিলিটারি সঙ্গে থাকলে ভালো হত—‘সেফ’ বুথ ‘আনসেফ’ হতে কতক্ষণ!

#

ডিউটি পড়েছিল বানসায়। একটা ছোট্ট পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটা প্রাইমারি স্কুল, সেটাই বুথ। আমরা পৌঁছতেই সাদরে অভ্যর্থনা করল গ্রামের অনেকে। আলাপ হল সাইকেল মেসেঞ্জারের সঙ্গে। সেই ভদ্রলোক আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন যে, “এখানে কোনও গোলমাল হবে না, চিন্তা করবেন না স্যার, এখানে সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি—সব ভাই ভাই”। সাধারণ মানুষজনদের, বাচ্চাদের বেশ কৌতূহলও রয়েছে দেখলাম ভোটবাবুদের নিয়ে। একজন বয়স্ক মানুষ শুধু আমাদের দলের মধ্যে কনিষ্ঠতম আমিই যে প্রিসাডিং অফিসার এটা জেনে বড়ই আশাহত হলেন মনে হল। তিনি বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন যে, এত বাচ্চা প্রিসাইডিং অফিসার ভোটের এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে পারবে কিনা তা নিয়ে। সাইকেল মেসেঞ্জার বন্ধুটির কল্যাণে রাতের খাওয়া-দাওয়া ভালোই হল।  শুধু বাজারের তুলনায় তার খাবারের রেট ছিল তিনগুণ—একথা বেশ মনে আছে। খেয়েদেয়ে শুয়েও পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি। বাড়িতে খবর দেওয়ার কোনও উপায়ই ছিল না। কেননা, সে মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না। আমাদের বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ছিল ঠিক, কিন্তু বানসা গ্রামে কোথাও ছিল না টেলিফোন বুথ।  মনে আছে যে, প্রাইমারি স্কুলে পাথর বের-হওয়া মেঝেতে চাদর বিছিয়ে মাথার তলায় ব্যাগ রেখে শুয়ে পড়েছিলাম আমরা। জানলা দিয়ে একফালি চাঁদ দেখতে দেখতে সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা বুঝতেও পারিনি। গ্রাম তো, তাই ভেবেছিলাম ঘুম ভাঙবে বোধহয়  আগমনীর সুরে; কিন্ত ঘুম ভেঙেছিল ওই মেসেঞ্জার বন্ধুটির কর্কশ ডাকেই। ধড়মড় করে উঠেই স্কুলের টিওকলে স্নান করে ভোট নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। সত্যি বলতে কি, এক আজব ভোট দেখেছিলাম সেবার। তিনটি দলের এজেন্টদের মধ্যে কী সদ্ভাব! হাসি-ঠাট্টা-গল্প করতে করতেই তারা ভোটের হিসেব রাখছিলেন। বড় কেন, ছোট কোনও ঝামেলা ছাড়াই নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হয়েছিল আমাদের ভোটগ্রহণ।

#

ভোটের কাজ সাঙ্গ করে, মাঝরাত্তিরে পুরুলিয়ায় ফিরে,  বিশাল ম্যারাপ-বাঁধা কন্ট্রোলিং সেন্টারে কাগজপত্র জমা করে দিয়ে প্রথম আমার মনে হয়েছিল যাক, হবু সন্তানের মুখটি তাহলে দেখতে পাব। ওই মাঝরাত্তিরেই বাড়ি ফিরে মা-বউ-ভাইদের কাছে পেয়েছিলাম রাজকীয় সংবর্ধনা, মনে হচ্ছিল যেন রাজ্যজয় করে ঘরে ফিরেছি। সেদিন এও বুঝেছিলাম যে, যতই তাত্ত্বিকেরা পরিবারকে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করুন না কেন, আদপে তা নয়। হতে পারে না। রাষ্ট্রের লোহার খাঁচা পরিবারের বুক ধুকপুক করতে থাকা পাখিটিকে আশ্রয় দিতে অপারগ। মনে হয়েছিল আরও একটা কথা। বানসা গ্রামের ওই ভোটগ্রহণের গল্প যখন করছিলাম বাড়িতে, অবাক হয়ে শুনছিল মা-ভাই-বউ। যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না ওদের। মনে করছিল বুঝি রূপকথার কোনও গল্প বলছি বানিয়ে বানিয়ে। কিন্তু আমি তো জানি বানিয়ে কোনও গল্পই বলিনি ওদের সেদিন। মিথ্যে বলিনি এক কণাও।  আমার তো চোখের সামনে ছবির মতো ভাসছিল সিপিএমের এজেন্টের কাছ থেকে বিড়ি খাবে বলে দেশলাই চেয়ে নিচ্ছে বিজেপির এজেন্ট আর তারপর সেটা নিয়ে খুনসুটি করছে কংগ্রেসের এজেন্টটি। চোখের সামনে ভাসতে থাকা ওইসব দৃশ্য দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিল যে,  বিদ্বেষ বানাতে নেতা লাগে, ইন্ধন লাগে, কিন্তু ভালোবাসা আর সহমর্মিতা হল সেইসব বুনোফুল যারা নিজেরাই ফুটে ওঠে।

#

জানি না, বানসায় এখন কীভাবে ভোট হয়। তবে মাঝে মাঝে আজও আমি স্বপ্নে ওই ছোট্ট স্কুলবাড়িটাকে দেখি।  আমার খুব ওই বুনোফুলের দেশটিতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু, আজকের পশ্চিমবঙ্গে সে কি আর সম্ভব?

আরও পড়ুন

নাড়ুগোপাল, নাড়ুগোপাল

Shares

Comments are closed.