বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

তুমি হও যে অদর্শন…

অংশুমান কর

বেশ কিছুদিন ধরেই ইংরেজি নববর্ষের চেয়ে আমার ভালো লাগে বাংলা নববর্ষের উদ্‌যাপন। না, সে কেবল আমি বাঙালি বলে নয়। এই পক্ষপাতের পেছনে আরও গূঢ় কিছু কারণ রয়েছে। আসলে বাংলা নববর্ষের দিনে আমার টেনশন একটু কম হয়। কেন? বলছি। খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের সকলের জন্মদিনই তো নানা ফর্মে, চাকুরির জায়গায়, কোর্ট-কাছারিতে লিখতে হয় ইংরেজি বছর মোতাবেক। লিখতে লিখতে আমরা প্রায়ই আমাদের বাংলা জন্মতারিখটি ভুলেই যাই।  কিন্তু দিব্যি মনে থাকে ইংরেজি তারিখটি। ফি বছর ইংরেজি নববর্ষ আসে আর আমাদের মনে করায় যে ভাই, আরও একটা বছর গেল, ‘নতুন’ ‘নতুন’ করে বেশি চেঁচামেচি করো না, সত্যটা হল এই যে, শরীরের বয়স আরও এক বছর বাড়ল। সকলে এই সংকট বুঝতে পারবেন না। কিন্তু, চল্লিশ পেরিয়ে গেছেন যাঁরা, তাঁরা অবশ্যই বুঝবেন। আরও একটা কারণে বাংলা নববর্ষের প্রতি আমার এই পক্ষপাত। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এঁদের সকলকেই নানা বিশেষ বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা জানাতে আমি ভুলে যাই। প্রাণপণ চেষ্টা করি মনের রাখার কাছের মানুষদের জন্মদিন, তাও ভুলে যাই। আসলে সকলে তো আর ফেসবুকে থাকেন না, যে ‘নোটি’ এসে জানান দেবে আজ এঁদের এঁদের জন্মদিন। জন্মদিন ভুললে পরে ম্যানেজ করার কোনও উপায়ই থাকে না। কিন্তু নববর্ষ সে উপায়টুকু বাঁচিয়ে রাখে। অন্যদিনের মতোই  নববর্ষের দিনেও আমি যথারীতি দু’পাঁচজনকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে যাই। ইংরেজি নববর্ষে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে যাওয়ার পরে সামনাসামনি দেখা হলে বা ফোনে কথা হলে তখন বাংলা নববর্ষই আমাকে বাঁচায়। অম্লানবদনে বলি যে, আসলে আমি তো ইংরেজি নববর্ষে শুভেচ্ছা জানাই না, আমি শুভেচ্ছা জানাই বাংলা নববর্ষে। আর বাংলা নববর্ষে ভুললে, কথাগুলোকে শুধু ঘুরিয়ে নিই।  এই যে চালাকিটুকু করে আমি অনেকের রোষের হাত থেকে এতদিন বেঁচেছি, সে তো আমাদের একটা বাংলা নববর্ষ আছে বলেই! পৃথিবীর কত কত দেশের লোকেদের তো একটাই নববর্ষ—তাদের এই জুড়ুয়া ভাইয়ের সুবিধেটুকু নেই।

#

ঠাট্টার বাইরে গিয়ে একটি প্রকৃত বেদনার কথা জানানো যাক। এই শুভেচ্ছা জানানোর প্রসঙ্গটি এলেই নববর্ষের সকালে আমার মৃদু মনখারাপ করে এখন। সেই কত-কতদিন আগে, ছেলেবেলা থেকে প্রথম যৌবন পর্যন্ত হলুদ পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতাম দাদু, সোনা দিদান সহ আরও নানান গুরুজনদের। গোটা গোটা অক্ষরে লিখতাম ‘তোমরা আমার নববর্ষের প্রণাম নিও’। তারপরে এল ফোন। বেড়ে গেল জগতও।  নববর্ষের সকালে ফোনে প্রণাম জানাতাম সুনীলদা, দিব্যেন্দুদাকে। হলুদ পোস্টকার্ড ডোডো পাখির মতো অদৃশ্য হয়ে গেছে।  নেই এই মানুষগুলিও। এখনও বেঁচে আছেন আমার চুরানব্বই বছরের দিদা। কানে কম শোনেন। তাঁকে চিৎকার করে বলি, “শুনতে পাচ্ছ? আমার নববর্ষের প্রণাম নিও”। দিদা বলে, “আমার আশীর্বাদ নিও, সুস্থ থাকো”। দিদাকে ফোন করার পরে ফোন করি অন্য গুরুজনদের, পরিবার আর লেখার জগতের। আশীর্বাদ দেন সকলে। মনে হয়, ওইসব আশীর্বাদই আমার কবচকুণ্ডল।  ঘৃণা আর ঈর্ষার তিরের সম্মুখে যা আমাকে রক্ষা দেয়, অবধ্য করে রাখে। ভালো লাগে। কিন্তু, একই সঙ্গে ভয়ও করে এই ভেবে যে, আরও অনেক-অনেকদিন ধরে ওই কবচকুণ্ডল ধারণ করতে পারব তো? পাব তো ওইসব আশীর্বাণী?

#

ওই ভয়টুকু, শঙ্কাটুকু বাদ দিলে আজও কিন্তু বছরের প্রথম দিনটিতে আমার মন নেচে ওঠে। আমার মনে হয়, নববর্ষের উৎসবই বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। কেন? কারণ, আর বাকি সব উৎসবের গায়ে হামেশাই লেগে থাকে কোনও না কোনও ধর্মের রঙ। কিন্তু নববর্ষ উৎসব হল এক্কেবারে অসাম্প্রদায়িক একটি উৎসব। যে বাঙালিরা মনে করেন (এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, সংখ্যায় তাঁরা নেহাত কম নন) মুসলমানরা ‘বাঙালি’ নন, ‘বাঙালি’ মাত্রেই হিন্দু আর তাই অনায়সেই বাঙালি মুসলিমদের সম্পর্কে বলে ফেলতে পারেন, “আমাদের বাঙালিদের মধ্যে এতসব বিধিনিষেধ নেই বাপু, কিন্তু ওদের (মুসলিমদের) মধ্যে আছে”, তারা তো এই রকম একটি দিনে আমাদের দেশের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের নববর্ষ উদ্‌যাপন দেখতে দেখতে একটিবার হলেও থমকান। চেতনে না হলেও অবচেতনে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্বটুকুকে মেনে নেন, যে অস্তিত্বটুকু মুছে দিতে চারিদিকে আজ কতই না আয়োজন!

#

লিখলাম বটে, আজও নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে হৃদয় আমার নেচে ওঠে, অনেকেই কিন্তু নতুন বছরকে  নিয়ে এই আদিখ্যেতা পছন্দ করেন না। ঠিক বলতে পারব না কে লিখেছেন এই কথা, শিবরাম নাকি তারাপদ, কিন্তু নতুন বছরকে নিয়ে চমৎকার একটি ঠাট্টা মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে। কথাটা অনেকটা এই রকম যে, নতুন বছরকে নিয়ে এত হইচই করার কিছু নেই বাপু, কেননা যখনই জিনিসটা এসেছে, এক বছরের বেশি টেঁকেনি! কথাটা তো মিথ্যে নয়। নতুনের পুরনো হতে আর কতদিন লাগে! বছর থেকে সম্পর্ক— সকলের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। কেউ কেউ তো এমনটাও বলেন যে, একই দিনে একটা বছর সকলের জন্য নতুন হতে পারে না। ঠিকই বলেন।  ভোর রাতের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর পাশের বাড়ির কিশোরীটিকে হঠাৎ যেদিন সকালবেলা অন্যরকম লাগে, মনে হয় জলের অধিকারে সে স্পর্শ করতেই পারে তার অঙ্গুলি, সেইদিনই তো যুবাটির জন্যে বছর ‘নতুন’ হয়ে ওঠে।  বা অর্থকষ্ট, প্রতিবেশীদের অপমান, আর সহ-লেখকদের ঈর্ষায় যে তরুণ কবির মনে হয় সে বেঁচে রয়েছে ট্রেঞ্চের মধ্যে,  যেদিন প্রথম তার এক ফর্মার চটি বইটি নিজেকে খুলে ধরে বলে, আকাশ আমার ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে, সেইদিনটিতেই তো কবির নতুন বছরের সূচনা। ঠিক। কিন্তু তাও কেন বাংলা নববর্ষের দিনে রোদ্দুরে মনে হয় কেউ যেন মিশিয়ে দিয়েছে একটু বেশিই কাঁচা হলুদ? কেন মনে হয়, বাতাসে আজ রয়েছে সেই ছেলেবেলার গ্রীষ্ম-দুপুরের শীতলপাটির পরশ? কেন মনে হয়, ওই যে পাখিটি হঠাৎ ডেকে উঠল, আগে তার ডাক কোনওদিন তৈরি করেনি এমন মায়াবী কুহক? এইসবই কি ভুল ভাবি আমরা?

#

এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথা। শুনি কণিকা গাইছেন, ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে, হারাই ক্ষণে-ক্ষণ/ ও মোর ভালোবাসার ধন’।  মনে হয়, কেন যে নববর্ষের প্রভাতে আমাদের হৃদয় দুলে ওঠে, তার উত্তর বোধহয় লুকিয়ে আছে এই গানটির মধ্যে। কাকে নতুন করে পাবেন বলে হারাবার কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ? গানটি সংকলিত ‘গীতবিতানে’র পূজা পর্যায়ে। তবে কি এই ভালোবাসার ধন ঈশ্বর? পূজা পর্যায় আর প্রেম পর্যায়ের অনেক গানই তো আবার পর্যায়ের পরিখা অতিক্রম করে পূজা থেকে প্রেম আর প্রেম থেকে পূজায় মিশে যায়। তবে কি মানসীকে ক্ষণে-ক্ষণ হারাবার কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ? হয়তো তাই। দু’টোই ঠিক। কিন্তু আমার তো আজ মনে হচ্ছে যে, আসলে নিজেকেই ক্ষণে ক্ষণে হারাবার কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ। পুরনো আমিকে হারিয়ে নতুন হতে চাইছেন। চাইছেন তার ভালোবাসার ধন ‘অন্তঃপ্রকৃতি’কে নতুন করে পেতে।  এ যাত্রা অন্দরের দিকে যাত্রা, গুপ্ত এক সুড়ঙ্গের ভেতরে দিয়ে, তাই ‘ভয়ে কাঁপে মন’। নিজেকে নতুন করে পেতে আমরাও কি চাই না? চাই না সমস্ত মালিন্য মুছে শুভ্র মরাল-মরালী হয়ে উঠতে? চাইলেও হয়তো পারি না। কিন্তু জীর্ণ, মলিন পুরনোকে হারিয়ে ফেলার ইচ্ছে, নিজেকে নতুন করে পাওয়ার ইচ্ছে— সে তো মরে না। সে ইচ্ছে রয়েই যায় ভেতরে, আর বছরের প্রথম দিনটিতে, উদ্‌যাপনের আবহে, সংহত হয়ে প্রকাশ পায় বাহিরে। তাই ভিতরে নতুন না হতে পারলেও, আমরা নতুন হয়ে উঠতে চাই বাহিরে। পরি একটি নতুন জামা,  যেটি  আর কিছুই নয়, আমাদের সেই নতুনের খোঁজ যা আসলে ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে।

Comments are closed.