খেলা যখন ছিল…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অংশুমান কর

দুব্‌লা পাতলা ছিলাম বলে খেলাধুলোয় তেমন পটু ছিলাম না ছেলেবেলায়, কিন্তু খেলা নিয়ে আমার উৎসাহের অন্ত ছিল না। গ্রামে জন্মেছিলাম বলে বৈচিত্র্যের অভাব ছিল না আমাদের খেলাধুলোতে, ছিল না খেলার মাঠেরও অভাব। একটা সময়ে আমাদের গ্রামে ক্রিকেট খেলাই অফিসিয়াল স্পোর্টস হয়ে গিয়েছিল বটে (সে নেশায় ডুবে আমি তো এমনকি এক সময়ে প্রাণটাই বিসর্জন দিতে বসেছিলাম) কিন্তু একেবারে ছোটবেলায়, মানে যখন স্কুলে যাওয়াও শুরু হয়নি, বা সদ্য শুরু হয়েছে, তখন কিন্তু ক্রিকেট নয়, আমাকে মজিয়ে রেখেছিল অন্য নানা ধরনের খেলা।

মার্বেল বা গুলি খেলা ছিল তখন আমার প্রিয়তম খেলা। কী যে ভালো লাগত ওই নীল, সবুজ, কালো কাচের বর্ণময় ছোটো ছোটো গুলি গুলোকে! ওই গুলি গুলো এক অদ্ভুত মায়াঅঞ্জন এঁকে দিত চোখে। সে খেলায় জিতলে অন্যের গুলি চলে আসত আমার দখলে আর হারলে আমার প্রিয় গুলি চলে যেত অন্যের ছোটো কাপড়ের ঝোলায়। এই গুলি খেলারই দরিদ্র ছোটভাই ছিল কাঁইবিচি খেলা। কাঁই বিচি মানে তেঁতুলের বিচি। সেগুলো জমাতাম আমরা। চকচকে ঘন বাদামি বিচিগুলোই ছিল আমাদের কোহিনুর মণি। কী যে মায়া পড়ে যেত ওই তুচ্ছ বস্তুগুলোর ওপর! খেলায় হেরে একটা তেঁতুলের বিচি অন্যের দখলে চলে গেলে দুঃখে ঘুমোতে পারতাম না রাতের পর রাত।

তখন আমাদের গ্রামে গুলি খেলা আর কাঁই বিচি খেলায় ওস্তাদ ছিল হারাধন আর ওর ভাই বিশু। ওদের হারানো ছিল অসম্ভব। হেরে যাব জেনেও ওদের কিন্তু খেলায় ডাকতাম দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে জেতা গুলি বা কাঁই বিচি ওদের উপহার দেব বলে। হারাধন আমাদের প্রাইমারি স্কুলেই আমাদের চেয়ে এক ক্লাস ওপরে পড়ত। বিশু পড়ত এক ক্লাস নীচে। হারাধন স্কুলে যেত একটা কালো ছোট তোরঙ্গের মতো বাক্স নিয়ে। কেউ ওর ওই বাক্সে হাত দিতে সাহসই পেত না। কীভাবে যেন রটে গিয়েছিল যে, ওর ওই বাক্সে মাছি ভর্তি আছে। মাছিগুলো ওর পোষা। আমিও সত্যিই বিশ্বাস করতাম মার্বেল আর কাঁই বিচির মতো হারাধন মাছিরও মালিক! তবে কেন যে মাছিকে অত ভয় পেতাম তখন তা আজও জানি না!

প্রথম বিশ্বকাপ আর তারপর বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিরিজ ভারত জেতার পরে যখন ক্রিকেটময় হয়ে উঠল আমাদের গ্রাম, তখন আমিও জীবন সঁপে দিয়েছিলাম ক্রিকেট খেলায়। তবে সে সময়েই একটু অন্য রকমের দুটি খেলা আমরা  চুটিয়ে খেলেছিলাম আমাদের বাড়িতেই। টিভি দেখতে দেখতেই তখন ক্রিকেট ছাড়াও আরও দুটি খেলা মন কেড়ে নিয়েছিল আমাদের। টেনিস আর টেবিল টেনিস। কিন্তু পরিকাঠামো ছাড়া তো টেনিস বা টেবিল টেনিস খেলা অসম্ভব। আর গ্রামে কীভাবে মিলবে পরিকাঠামো? আমরা আমাদের মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছিলাম অবশ্য। আমাদের বাড়ির ছাদে  শক্তপোক্ত ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট আর খুব হাল্কা টেনিস বল নিয়ে আমি আর আমার পরের ভাই টিক্লা শুরু করে দিয়েছিলাম নেটবিহীন টেনিস খেলা। সে খেলার নিয়মকানুনও সব আমাদের নিজেদেরই বানানো। খেলতে খেলতে আমরা নিজেদের ভাবতাম ইভান লেন্ডল বা বরিস বেকার।

টেবিল টেনিস খেলা অবশ্য এত সহজ ছিল না। খেলার মতো টেবিল পাব কোথায়? সমস্যা মিটিয়েছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির এক রহস্যময় মানসিকতা। বড় হয়ে ওঠার মুখে হঠাৎ করে আমাদের বাড়িতে বানানো হয়েছিল ঢাউস একখানা ডাইনিং টেবিল। কিন্তু মাস কয়েক যেতে না যেতেই সেই টেবিলে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গিয়েছিল। সাহেবি চাল ছেড়ে আমরা ফিরে গিয়েছিলাম সেই চিরদিনের মাটিতে থেবড়ে বসে ভাত খাওয়ার অভ্যেসে। ডাইনিং টেবিলের ওপরে জমা হয়ে পড়ে থাকত বইপত্র,  নানা আবর্জনা। সেই ডাইনিং টেবিলটাই হয়ে গেল আমাদের টেবিল টেনিস খেলার টেবিল। টেবিল তো জুটল, কিন্তু নেট পাব কীভাবে? কুছ পরোয়া নেহি! একই সাইজের বইকে খাড়া করে দিয়ে পরপর সাজিয়ে রেখে বানিয়ে নিতাম নেট। তারপর শহরের খেলার দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসতাম টেবিল টেনিসের ব্যাট আর পিংপং বল। জমে যেত আমাদের দুই ভাইয়ের খেলা। শুধু দুপুর বেলা টেবিল টেনিস খেলতে পারতাম না। খটাস খটাস শব্দে জেঠুর ঘুম ভেঙে যেত বলে। বেশি শব্দ করতাম বলে বকুনিও খেতাম খুব। কিন্তু সেসব অগ্রাহ্য করেই আমি, আমার ভাই, আর কলকাতা থেকে আমাদের গ্রামে থাকতে আসা আমাদের এক বন্ধু সোনা— এই তিনজন মিলে নিজেদের মধ্যেই আয়োজন করে নিয়েছিলাম টেবিল টেনিসের এক টুর্নামেন্টের। তিনজনের মধ্যে লিগ সিস্টেমে খেলার শেষে দুজনের মধ্যে হয়েছিল ফাইনাল। ফাইনালের জন্য তিরিশ বা চল্লিশ টাকা দিয়ে কেনাও হয়েছিল একটা সোনালি কাপ।

তবে এইসব খেলার বাইরে কিছু অন্য রকমের খেলাও ছিল  আমার প্রিয়। তখন আমাদের পাড়ায় একের পর এক নতুন বাড়ি হচ্ছে। তাই এখানে ওখানে পড়ে থাকত ইটের পাঁজা। এক একদিন  বিকেলে আমার দৌড় ঝাঁপ করতে ভালো লাগত না। মন বসত না কোনও খেলাতেই। দেখতাম দিদিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠে। আর আমি ওই ইটের পাঁজার ওপর বসে দোকানি সাজার খেলা খেলতাম। খুব ইচ্ছে করত চপ ভেজে বিক্রি করতে। কাদার তাল দিয়ে বানিয়েও নিতাম চপ। বাঁ হাতের ওপর সেই কাদার তালকে রেখে বাখারির ছুরি দিয়ে কেটে কেটে ইটের ওপর পর পর সাজিয়ে রাখতাম। তবে সেই কাদার চপ আমার দোকানে তেলের বদলে ব্যবহার করা জলে ভাজা যেত না। তাই ওই কাঁচা চপই বিক্রি করতাম পাড়ার দিদিদের। পয়সাও নিতাম। পাতার পয়সা। জবা গাছের ছেঁড়া পাতাই হয়ে উঠত সে খেলায় আমাদের পয়সা। এইসব খেলা যখন খেলেছি তখনও অবশ্য প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি ডিঙোইনি। ওই বয়সে, সত্যি বলতে কী, আমার খেলার সাথী ছিল মূলত আমার দিদিরাই। খেলার

যে আবার ছেলেদের খেলা, মেয়েদের খেলা ভাগ হতে পারে সেটা তখন আমি বুঝতামই না। তাই যেসব খেলা দিদিরা খেলত সেইসব খেলা খেলতাম আমিও। চুটিয়ে খেলতাম কিতকিত। মন্দ খেলতাম না। খোলামকুচি ছিল সেই খেলায় আমাদের গুটি। কী ভালোই না লাগত কুমীরডাঙা খেলতে! এইসব খেলায় মেয়েদের সঙ্গে শুধু যে আমিই অংশ নিতাম তা নয়। পাড়ার অন্য ছেলেরাও কিন্তু তাল মিলিয়ে খেলত মেয়েদের সঙ্গেই। ক্রিকেট এসে ক্রমশ আমাদের ছেলেদের আর মেয়েদের খেলার ভাগ করে দেয়। রীতিমতো নেট খাটিয়ে আমাদের পাড়াতে শক্ত কর্কেট বলে তখন ক্রিকেট খেলা হত। প্যাড আর গ্লাভস ছিল বটে আমাদের। তবে কেউ কেউ সেসবও পরত না। আর হেলমেট তো পরার প্রশ্নই ছিল না, কেননা আমাদের কোনও হেলমেট ছিলই না! নিরাপত্তার কথা না ভেবেই মূলত কর্কেট আর কোনও কোনও দিন সত্যিকারের ডিউস বলে হত আমাদের প্র্যাকটিস। আহতও হতাম হামেশাই। গৌতমদা বলে আমাদের এক দাদার নাকে বেশ বড়ো চোট লেগেছিল একবার। আশীষদার এক বাউন্সারে উড়ে গিয়েছিল আমার চশমা। নাকের ওপর হয়েছিল গভীর ক্ষত। এইসব দৃশ্য মাঠের পাশে বসে দেখত পাড়ার মেয়েরা। তাদের আর আমাদের খেলার জগত তখন আলাদা।

তবে ছোটোবেলার একটি খেলার কথা মনে পড়লে আজও শিহরণ লাগে। কী যে রোমান্টিক ছিল সেই খেলাটা! খেলাটার নাম ডাংগুলি। নিশ্চয়ই ছোটবেলায় খেলেছেন অনেকেই। পেয়ারা গাছের ডাল কেটে আমরা বানাতাম গুলি। সেও ছিল এক শিল্প। আর ডাংটিও হত মূলত পেয়ারা গাছেরই। এই ডাংগুলি খেলাতেও প্রায় অপরাজেয় ছিল হারাধান আর বিশু। কিছুতেই ওদের হারানো যেত না।  মারতে মারতে ওরা কোথায় নিয়ে চলে যেত গুলি। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে যেসব জায়গায় আগে কোনওদিন যাইনি, সেইসব জায়গায় নিয়ে চলে যেত ওরা। খেলায় এভাবে হারতে হারতে আমরা চলে যেতাম একেবারে দিগন্তের কাছাকাছি। পরাজয়েও মিশে থাকত এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। মন নিজের অজান্তেই ওই দিগন্তের স্বাদ পেয়ে কখন যেন বড় হয়ে যেত, জুড়ে যেত বিশ্বনিখিলের সঙ্গে।

খেলার মাঠ এখন তো আর দিগন্ত দেখায় না। বড্ড ছোট হয়ে গেছে খেলার মাঠ। আর যেসব খেলা দায়ে পড়েই খেলতে হয় এখন, তাতে ক্ষণে ক্ষণেই মনও বড় ছোট হয়ে আসে।। এ বয়সে বারবার তাই ওই ডাংগুলি খেলার কথা মনে পড়ে। ইচ্ছে হয় মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে আরেকবার দিগন্তের মুখোমুখি দণ্ড দুয়েক দাঁড়াতে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More