যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

করোনার প্রত্যক্ষ শিকার যাঁরা, তাঁদের পাশাপাশি যাঁরা এর পরোক্ষ শিকার হচ্ছেন, তাঁদের কথা সরকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। আলো জ্বালানোর আবেদনের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এই অংশের মানুষের কথাও একটু বেশি করে বলতেন সেদিনের সংক্ষিপ্ত ভাষণে, কী কী ব্যবস্থা অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে নেওয়া হচ্ছে তার একটি ছোট্ট রূপরেখা দিতেন, তাহলে হয়তো কিছু মানুষের অসন্তোষ এতখানি বাড়ত না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    আজ একটু ছন্দপতন হোক। একটু তাল কাটুক। সোজা কথা সোজা করেই বলা যাক আজ।
    ৫ এপ্রিল রাত্রি ৯টায় ৯ মিনিটের জন্য দেশে এল অকাল দীপাবলি। ঘরে ঘরে যেমন নিভে গেল আলো, তেমনই জ্বলে উঠল মোমবাতি, প্রদীপ, এমনকি মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট। তেমনটাই অনুরোধ করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু পটকা ফাটাতে বলেননি। তুবড়ি জ্বালাতে বলেননি। ফানুস ওড়াতে বলেননি। এসব বলেননি। তাও হল। বলেছিলেন, যদি ঠিক শুনে থাকি তো, জমায়েত না করতে, কিন্তু মশাল নিয়ে মিছিলও হল। লকডাউন ভেঙে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন প্রচুর মানুষ। দেখে শুনে কেউ কেউ বললেন, জনগণের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল যে, অনেকে বুঝি ধরেই নিয়েছেন সামনের নভেম্বরে সত্যিকারের দীপাবলি উদ্‌যাপন করার জন্য আর থাকবেন না, তাই এই অকাল উৎসব। ঠাট্টা আর কী! মুহূর্তের মধ্যে মিমে-মিমে ছেয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়া।

    অবশ্য কেবল এক পক্ষই যে আক্রমণ করল, তা নয়। আক্রমণ করল অন্য পক্ষও। এবং এই আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী এই যুগপৎ আলো নেভানো ও আলো জ্বালানোর আহ্বান রাখার পর থেকেই। এই আহ্বানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার এই আহ্বানের পক্ষে গলা ফাটালেন। লক্ষ করলাম যে, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ঘোষণার সময় স্বেচ্ছায় ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী আর জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর সম্মান জানাতে হাততালি দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এইবার মোমবাতি জ্বালাতে অস্বীকার করলেন। কিন্তু কেন? যে মোমবাতি এই পোড়া দেশে বারবার জ্বলে উঠেছে ঐক্যের প্রতীক হয়ে, নির্যাতিত মানুষের সহমর্মী হয়ে, সেই মোমবাতির প্রতি হঠাৎ এই বীতরাগ এল কেন?

    আসলে এই সংকটের সময়ে মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটু বেশি কিছুই আশা করেছিল। প্রথম যেদিন উনি বলেন হাততালি আর থালা বাজানোর কথা, সেদিন যে পরিস্থিতি ছিল, তারপরে যেদিন দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করলেন, সেদিন দেশের যে পরিস্থিতি ছিল তার থেকে যেদিন উনি মোমবাতি জ্বালানোর কথা বললেন সেদিন যে পরিস্থিতি ছিল তা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এরই মধ্যে মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে অনেক ক্ষোভ। লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উচিত ছিল বিশেষ করে গরীব মানুষদের জন্য, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা-সুরাহার ব্যবস্থাপত্র ঘোষণা করা। কিন্তু সেই ঘোষণা এল দেরিতে। মনে হল যেন, এল অনেকটাই দেশজুড়ে নানা মানুষের সম্মিলিত আবেদন আর বিরোধী দলগুলির চাপে। তবু, কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হল যা অবশ্যই সদর্থক। কিন্তু তারপরেই দেখা গেল যে, পায়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন আতঙ্কিত শ্রমিকরা। হাঁটতে হাঁটতে মারাও গেলেন অনেকে। বার্তা গেল যে, যতই বলা হোক আমরা ঐক্যবদ্ধ, আসলে ঐক্য নেই, সাম্য নেই, এই কঠিন পরিস্থিতিতেও অসাম্যই রয়েছে দেশজুড়ে। রাগ বাড়ল কিছু কিছু মানুষের। এই শ্রমিকদের জন্যও অবশ্য সাহায্যের তহবিল খোলা হল। ভাল উদ্যোগ। কিন্তু, আবারও সেই একই কথা। দেখে মনে হচ্ছে যে, রাষ্ট্র যেন আগাম আন্দাজ করতে পারছে না কী হতে চলেছে। একটি করে ঘটনা ঘটছে আর তারপরে নেওয়া হচ্ছে কিছু ব্যবস্থা। হতে পারে। এক গভীর সংকটের সময়ে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু এইরকম হলে কিছু মানুষ, যাঁরা এখনও নিজেরা মধ্যবিত্ত হলেও, দেশের গরীব মানুষদের সঙ্গে এক অদ্ভুত সহমর্মিতার ডোরে বাঁধা পড়ে আছেন, তাঁরা তো ক্ষুব্ধ হবেনই। কিছু মানুষের ওপর এরই মধ্যে ব্লিচিং ছুড়ে দেওয়া হল জলবন্দুক (নাকি কামান?) ব্যবহার করে। দেখে মনে হল যে, ওই মানুষগুলো যেন মানুষ নয়। এঁরা দেশের মধ্যেই দেশের বাড়িতে ফিরছিলেন। যাতে গ্রামে গিয়ে ভাইরাস না ছড়াতে পারেন, তাই এই ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের এই অমানবিক ব্যবহার দেখে অনেকেই প্রশ্ন করলেন, আন্তর্জাতিক বিমান আরও আগে বন্ধ করা হল না কেন? বিদেশ-ফেরত বাবুদের সঙ্গে এই ব্যবহার করা যেত তো? গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো কমিয়ে দেওয়া হল সুদ। যে সমস্ত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেবলমাত্র এমআইএসের সুদের ওপর নির্ভর করে সংসার চালান, তাঁদের কপালের ভাঁজ চওড়া হল।
    এইসব ঘটনাগুলি যদি না ঘটত, তাহলে মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর মোমবাতি জ্বালানোর আবেদন নিয়ে এত জলঘোলা হত না। যাঁরা মোমবাতি জ্বালালেন না বা আলো নেভালেন না, তাঁরাও কিন্তু আসলে ঐক্যের পক্ষেই আছেন। সেই ঐক্যের শেকড় চেতনের অনেক গভীরে প্রোথিত। এই কথাটি এঁদের নিয়ে যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘খিল্লি’ করলেন, বা এঁদের যাঁরা তীব্র আক্রমণ করলেন, তাঁদের অধিকাংশই বোঝার চেষ্টাই করলেন না।

    তবে কি এটা বলতে হবে যে, কেন্দ্র সরকার কিছুই করছে না? না। তা নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের আমলারা প্রেস কনফারেন্স করে যে সমস্ত ঘোষণা করছেন প্রতিদিন, তার অনেকটাই সদর্থক। টেস্ট কিটের সংখ্যা বেড়েছে। বেসরকারি ল্যাব বা হাসপাতালেও নিখরচায় টেস্ট করার সুযোগ বেড়েছে। টেস্ট সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে। নিজামুদ্দিন-কাণ্ড পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপও মন্দ নয়। অতি দ্রুত চিহ্নিত করা হয়েছে কয়েকটি হটস্পট। এটিও অতীব প্রয়োজনীয় একটি কাজ। কিন্তু, এইসব ভাল কাজের পাশাপাশি এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেছে ইতিমধ্যেই যার ফলে করোনার প্রত্যক্ষ শিকার না হলেও এর পরোক্ষ শিকার হবে অনেকগুলি প্রাণ। যা বোঝা যাচ্ছে তাতে লকডাউনের মেয়াদ বাড়তে পারে। মাঝে কিছুদিনের বিরতি হলেও হতে পারে। তাই এখন করোনার প্রত্যক্ষ শিকার যাঁরা, তাঁদের পাশাপাশি যাঁরা এর পরোক্ষ শিকার হচ্ছেন, তাঁদের কথা সরকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। আলো জ্বালানোর আবেদনের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এই অংশের মানুষের কথাও একটু বেশি করে বলতেন সেদিনের সংক্ষিপ্ত ভাষণে, কী কী ব্যবস্থা অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে নেওয়া হচ্ছে তার একটি ছোট্ট রূপরেখা দিতেন, তাহলে হয়তো কিছু মানুষের অসন্তোষ এতখানি বাড়ত না। কাজের কথাগুলি বলবেন আমলা বা অন্য মন্ত্রীরা আর আমাদের নৈতিক শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বলবেন কেবলই ঐক্যের কথা— মনে হয় এটা দেশবাসীর একাংশ চাইছেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি ভেবে দেখবেন এই কথা?

    কিন্তু মোমবাতি যাঁরা জ্বালালেন, তাঁরা কি অন্যায় করলেন? যাঁরা মিছিল করলেন মশাল হাতে, যাঁরা পটকা ফাটালেন, লকডাউন অমান্য করলেন, প্রধানমন্ত্রীর জমায়তে না করার নির্দেশকে অমান্য করলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই অন্যায় করেছেন। এঁদের কেউ কেউ আমাদের রাজ্যে গ্রেফতারও হয়েছেন। সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য সরকার। কিন্তু সব রাজ্যে এই চিত্র দেখা গেছে কি? অকাল দীপাবলি যাঁরা উদ্‌যাপন করলেন, তাঁদের দেখে অনেকেরই সেদিন হয়তো মনে পড়ছিল রণজিৎ দাশের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটিঃ ‘ফুর্তির চেয়ে অশ্লীল এবং বেদনার চেয়ে পবিত্র এই জগতে আর কিছু নেই’। আইন ভাঙার জন্য এইসব মানুষদের অন্য রাজ্যে কি করা হয়েছে গ্রেফতার?
    কিন্তু ফুর্তির এই অশ্লীল উৎসবে যোগ না দিয়ে যাঁরা শুধুই আলো জ্বালালেন, তাঁদের সকলকেই দ্রুত বিজেপি বা গরীব মানুষের শত্রু ভাবার কারণ নেই। যে অবস্থার মধ্যে আমাদের দেশ রয়েছে তাতে এই দাগিয়ে দেওয়ার খেলা আমাদের বন্ধ করতে হবে। মানছি যে, এঁদের মধ্যে একটা অংশ ধূর্ত। কিন্তু সকলে নন। অনেকেই সত্যিই এই কঠিন সময়ে ‘আমরা সকলে এক আছি’ এই বার্তাটিকেই হয়তো অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। মোমবাতি জ্বালিয়ে এঁরা দোষ করেননি। কিন্তু এঁরা যদি মনে করেন যে, কেবল মোমবাতি জ্বালিয়েই এই সংকটের সময়ে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে, তাহলে ভুল ভাবছেন। দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য সরকারকে আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল মোমবাতির প্রতীকে ঐক্য এই সংকটে যথেষ্ট নয়।

    এতদূর অবধি এই লেখা পড়ে অনেকেরই হয়তো মনে এই প্রশ্ন জাগছে যে, আমি কী করেছি? নিভিয়েছি কি ঘরের আলো? জ্বালিয়েছি মোমবাতি? না, নেভাইনি আলো। জ্বালাইনি মোমবাতি। আসলে পারিনি। সত্যিই পারিনি। বাইরের প্রদীপকে জ্বালাতে হলে অন্তরের ইচ্ছেপ্রদীপটিকে তো আগে জ্বালাতে হয়। যতবার সেই আলো জ্বালাতে গিয়েছি, সত্যি বলছি, তা ‘নিবে’ গেছে ‘বারে বারে’।

    আরও দিন অন্তরিন…

    দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

    একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

    খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

    আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

    খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More