সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

দরজা খোলো, কিন্তু দেখে-শুনে

রন্তিদেব সেনগুপ্ত

সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই রাজ্যে ১৮টি আসনে জয়লাভের পর রাজনৈতিক চিত্রটি অনেকাংশেই বদলে গিয়েছে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস যেমন খুব দ্রুত তার জমি হারিয়ে ফেলছে, ওই দলের নেতা-কর্মীদের মনেও সৃষ্টি হচ্ছে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা। পাশাপাশি বিজেপি তার প্রভাব এবং প্রসার যেমন দ্রুত বাড়াচ্ছে, তেমনই বিজেপি নেতা-কর্মীরাও ক্রমশ তেমন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টি আসনে জয়লাভের পর, এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে এখন অনেকেই মনে করছেন, ২০২১ বা তারও আগে যদি অকস্মাৎ বিধানসভা নির্বাচন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে সেই নির্বাচনেই রাজ্যে প্রথম আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে গেরুয়া সরকার।

এরকম সম্ভাবনা যে একদম নেই, তা বলাও যাবে না। বরং এই সম্ভাবনাই প্রবল। আর এই সম্ভাবনা যতই প্রবলতর হয়ে উঠছে, ততই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘর ভেঙে বিজেপিতে প্রবেশের একটি জোয়ার এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বললাম বটে, মূল ভাঙনটা ধরেছে তৃণমূল কংগ্রেসে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে বিজেপির এই বৃদ্ধিতে বিজেপির প্রসার ঘটছে বটে, কিন্তু বিজেপির অন্দরেও প্রশ্ন উঠেছে-তৃণমূল ভেঙে আসা এই জোয়ারে বিজেপি তার পবিত্রতা হারাবে না তো? বিজেপিতে বেনোজলের অনুপ্রবেশ ঘটবে না তো?

এইরকম একটি আশঙ্কা ওঠাকে একেবারে অযৌক্তিক বলে উড়িয়েও দেওয়া যাবে না। দলের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিতে সবসময়ই একটি আশঙ্কা লুকিয়ে থাকে। নব্বইয়ের দশকে দলের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিতে সিপিএম-এর ভিতরেও এমনই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন অনেকে। এই আশঙ্কা থেকেই বিজেপির অন্দরমহলে কেউ কেউ তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙিয়ে বিজেপি বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন।

বিতর্কটা এখানেই। তাহলে বিজেপি কী করবে? সে কি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখে দেবে? নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের ঘরটি তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টাটাই চালিয়ে যাবে। প্রথমত, যাঁরা তৃণমূল-প্রবেশের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা বাস্তবের উপর ভর করে যতটা না করছেন, তার চেয়ে বেশি করছেন আবেগনির্ভর হয়ে। রাজনীতি বস্তুটিই এমন- তা আবেগে বেশিক্ষণ চলে না। এ বারের লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশের মতো এ রাজ্যেও একটি প্রবল মোদী ঝড় বয়ে গিয়েছিল, তা বিজেপিকে ১৮টি আসন পেতে সাহায্য করে। এ বারের লোকসভা নির্বাচনে যতটা না বিজেপি সাংগঠনিক শক্তিতে জিতেছে, তার চেয়ে বেশি জিতেছে মোদী হাওয়ায়- এ কথাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেই হবে।

আগামী বিধানসভা নির্বাচনে এই মোদী হাওয়া যে থাকবে না, তা দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব, এমনকী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সর্বাধিকারীরা বোঝেন। সে ক্ষেত্রে বিজেপিকে লড়তে হবে তার সাংগঠনিক শক্তিতে। এবং এ কথাও মানতে হবে, এখনও পর্যন্ত সাংগঠনিক শক্তিতে এই রাজ্যে বিজেপির থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে। হঠাৎই যদি এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়, তাহলে সাংগঠনিক শক্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে টক্কর দেওয়ার জায়গায় বিজেপি এখনও পৌঁছয়নি, অপ্রিয় হলেও এটি সত্য।

মুকুল রায়ের মতো দক্ষ ভোট কৌশলী লোক, ১৮ আসন জয়ের পিছনে যাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, এ সবই তিনি এবং তাঁর মতো বিজেপি নেতারা বোঝেন। তাঁরা বোঝেন, এই পরিস্থিতিতে বিধানসভা নির্বাচনের আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের ঘরটি ভেঙে তাকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনুধাবন করছেন যে, ২০২১ সালের তৃণমূল কংগ্রেস দলটিকে ভেঙে তার অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলে দেওয়াটা জরুরি। এই কারণেই জরুরি যে, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে বিজেপির মোকাবিলা করা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে যেমন কষ্টকর হবে, তেমনই রোজই দলটি যদি ভেঙে যেতে থাকে, দলের নেতা কর্মীরা যদি রোজই দলটি ছাড়তে থাকেন, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই একটি অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। যেসব নেতা-কর্মীরা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসে আছেন, তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে। তাঁরা হতোদ্যম হবেন। তাই রণকৌশল হিসেবেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূল ভেঙে দেওয়ার এই কাজটি শুরু করেছেন।

এই রণকৌশলটি আরএসএস-ও বুঝতে পারছে। এবং তা বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুকুল রায়কে। যা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে তিনি করতে পেরেছেন। কেননা, ইতিমধ্যেই এই রকম একটি রব উঠেছে যে, ২০২১ সালের আগেই তৃণমূল কংগ্রেস দলটির অস্তিত্ব বিলোপ হবে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বলেছেন, ৪০ জন তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।

তাহলে কি সত্যিই বিজেপির খোলা দরজা দিয়ে বেনোজল হু হু করে ঢুকে পড়বে? অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির শিকার হয়ে পড়বে বিজেপিও? যাঁরা দল ভাঙিয়ে আনার বিরোধিতা করছেন, তাঁদের আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হবে? বলতেই হচ্ছে, যাঁরা বিরোধিতা করছেন, সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের রণকৌশলটি তাঁরা বুঝছেন না। তবে তাঁদের আশঙ্কাও একেবারে হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, এই রাজনৈতিক রণকৌশলের ভিতরেও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির আশঙ্কাটা লুকিয়ে আছে। রণকৌশল রচনার পাশাপাশি বিজেপিকে সেই আশঙ্কার কথাও মাথায় রাখতেই হবে। আর সেই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই বিজেপি কতগুলি পদক্ষেপ এখন থেকেই গ্রহণ করতে পারে। যেমন-

ক ) তৃণমূল কংগ্রেস বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দল থেকে যখনই কোনও নেতা বা কর্মীকে দলে যোগদান করানো হবে, তার আগে এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, ইত্যাদি বিচার করে নিতে হবে। গ্রহণযোগ্য নয় বা খারাপ ভাবমূর্তির নেতাকে দলে প্রবেশাধিকার না দিলেই ভালো।

খ )  যাঁদের অন্য দল থেকে বিজেপিতে নেওয়া হচ্ছে, প্রথমেই তাঁদের বিজেপির কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ঠিক হবে না।

গ )  যাঁদের দলে নেওয়া হচ্ছে, কর্মশিবির করে বিজেপি এবং সংঘের ভাবাদর্শ সম্বন্ধে তাঁদের অবহিত করতে হবে।

ঘ )  সর্বোপরি, নতুন যাঁরা দলে আসছেন, তাঁদের উপর দলীয় নিয়ন্ত্রণের রাশ রাখতে হবে।

যে কোনও সুস্থ গণতান্ত্রিক দলেই বিতর্ক থাকে। বিজেপি একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক দল। বিতর্ক থাকবেই সেখানে। সেখানে রণকৌশল থাকবে, আদর্শও থাকবে। খোলা দরজা থাকবে, দরজায় প্রহরীও থাকবে। দরজাটা বন্ধ করে রাখলেও চলবে না।

Comments are closed.