বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

শিক্ষকদের সামনে প্যারা, সিভিক, ইন্টার্ন বসাবেন না, প্লিজ়

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে স্থায়ী শিক্ষকদের নিয়োগ জরুরি, জরুরি এবং ভীষণ জরুরি।
কুড়ি বছরের কিছু বেশি সময় আগে থেকে শুরু হওয়া স্কুল সার্ভিস কমিশন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের অনেক ছেলে-মেয়েকে বেঁচে থাকার রাস্তা দিয়েছে, পথ চলার আলো দিয়েছে বিভিন্ন চাকরি। আজ সেই সমস্ত স্থায়ী চাকরিগুলোকেই অস্থায়ী কিছু নিয়োগের মাধ্যমে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে ফেলে দেওয়া হলে, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বড় দুর্দিন নেমে আসবে, তা বলাই বাহুল্য।

গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছেলেমেয়েদের জন্য যে পারিশ্রমিকের কথা সরকার বাহাদুর ভাবছেন, সেই টাকায় বাড়িতে যিনি রান্না করেন বা যে মানুষটি মাটি কোপান, তাঁদেরও উপযুক্ত পারিশ্রমিক হয় না। এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর যে আরও বেশি পারিশ্রমিক প্রয়োজন, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজ, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায়, যার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই শিক্ষক শ্রেণি যদি আর না-ই থাকে, তা হলে বাঙালিকে মানুষ করে তুলবে কে?

আর একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, এখন প্রশিক্ষনহীন শিক্ষক বলতেও কেউ আর নেই। গোটা বাংলা জুড়েই রয়েছে অসংখ্য বিএড ও ডিএলএড কলেজ। সেখান থেকে পাশ করা কয়েক লক্ষ ছাত্রছাত্রী গলায় প্রাণ নিয়ে একটা চাকরির জন্য অপেক্ষা করছে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে।

গত পাঁচ-ছ’বছর ধরে স্কুলে নিয়োগ তলানিতে এসে ঠেকেছে। কেউ বলতে পারেন, অনেক সরকারি স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুব কম। মানুষের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন হয়েছে।

কিন্তু গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য তো আজও সরকারি স্কুলের কোনও বিকল্প নেই।

মানুষের পরিবর্তিত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, দরকার হলে কম ছাত্র থাকা স্কুলগুলোকে মার্জ করাতে হবে অন্য স্কুলের সঙ্গে। কিংবা যেখানে যেখানে দরকার, ইংরেজি মাধ্যম চালু করতে হবে।

কিন্তু তাই বলে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে নিয়মিত নিয়োগ হবে না, এই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবা একটা ভদ্রস্থ মাইনে পেয়ে ঠিকঠাক জীবন শুরু করার কোনও সুযোগ পাবে না, এটাও তো হতে পারে না!

সোমবারের সরকার এই ইন্টার্ন প্রথা চালু করার কথা ভাবছে, এটা জানা পরে এই রাজ্যের বিএ, বিএসসি, এমএ, এমএসসি পাশ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে এক বার কথা বলে দেখুন। অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট কিছু ছেলেমেয়ে ছাড়া, বাকি সকলের চোখেই হতাশার ঘন কুয়াশা নেমে এসেছে। যে কুয়াশার ও-পারে কিচ্ছু দেখা যায় না। জীবন যেন মৃত্যুর থেকেও বেশি অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পদক্ষেপ যদি নেওয়া হয়, তা হলে স্থায়ী শিক্ষকবিহীন হয়ে যাবে এই রাজ্যের বহু স্কুল। সামান্য দু’হাজার, আড়াই হাজার টাকায় পড়াতে আসা ইন্টার্নরা আদৌ পারবেন তো শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব সামলাতে? কোন বাবা-মা তাঁদের ওপর ভরসা করে ছেলে মেয়েকে পড়াতে পাঠাবেন?

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যেমন অনেক দিনই মানুষ কোথাও একটা ভরসা হারিয়ে ফেলছে সরকারি ব্যবস্থার উপর, সেই একই অবস্থা হবে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। শিক্ষাকে কেবল মুনাফার অস্ত্র ভাবা বেসরকারি স্কুলের দাপট শহর পেরিয়ে গ্রামে গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়বে।

এখানে আরও একটা কথা বলা দরকার। খুব মারাত্মক পরিস্থিতি না হলে, পশ্চিম বাংলায় গত কুড়ি বছরে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে চাকরি পাওয়া শিক্ষকেরা কাজে যোগ দিতে অস্বীকার করেননি। তা সে যত প্রত্যন্ত এলাকাতেই পোস্টিং হয়ে থাক না কেন।

যে জাতির শিক্ষক নেই, সে জাতিই থাকতে পারে না। হাতে খড়ির সময়ে একটা হাত যেমন ছোট আর একটা হাতকে ধরে, ধৈর্য্য ধরে ‘অ’ লেখা শেখায়, ঠিক তেমনই এই রাজ্যের গ্রামে, শহরতলিতে, শহরাঞ্চলেরও বহু জায়গায়, ক্লাস টেনে অ্যালজেব্রা বা প্রাথমিকের ‘অ আ ক খ’ শেখাতে বহু শিক্ষকের দরকার।

তাই পূর্ণ সময়ের শিক্ষক নিয়োগ করুন। শিক্ষিত সমাজের এই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খুলন। আমরা বড় বেশি ভার্চুয়াল, বড় বেশি নন-ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। পেটের খিদেটা কিন্তু খুব বাস্তব। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের দাগটা আরও বাস্তব। অত বড় ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা হয়ে যায় একটা চকের ছোঁয়াতেই। আমাদের জীবনের ব্ল্যাক বোর্ডটা সাদা করতেও আমাদের একটা চকের দরকার। সে জন্যই পার্মানেন্ট শিক্ষকের চাকরি দরকার।

শিক্ষকদের সামনে প্যারা, সিভিক, ইন্টার্ন বসাবেন না। আলোওয়ালাদের জীবনটাই অন্ধকার করে দেবেন না। প্লিজ়।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কবি, উপন্যাস ও গল্প লেখেন। নিজের কলামে সমাজ এবং জীবনের সেই সেই বিষয়গুলো ছুঁতে চান যা আমরা পড়তে চাইলেও লিখতে চাই না। লেখালেখির জন্য গিয়েছিলেন আইওয়া লেখক শিবিরে গিয়েছিলেন বাংলাসাহিত্যের প্রতিনিধি হয়ে। পেয়েছেন কৃত্তিবাস, বাংলা আকাদেমি ও ভাষানগর পুরস্কার।   

Comments are closed.