দিল্লির দাঙ্গা: কেজরিওয়ালও কিন্তু কম যান না

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়া কী করছিলেন? হ্যাঁ, তথাকথিত সেই ‘জননায়ক’ কেজরিওয়াল কী করছিলেন?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

    গত রবিবার রাত থেকে তিন ধরে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলেছে তাকে ভয়াবহ বললেও কম বলা হয়। শুধু ধর্মের কারণে মানুষের প্রতি মানুষের এত ঘৃণা জন্মাতে পারে! যে ঘৃণা কিনা চল্লিশেরও বেশি নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল! এ ঘটনা শুধু মর্মান্তিক নয়, গোটা দেশের জন্য লজ্জার এবং ভয়েরও। জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে এর পর নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

    এর নেপথ্যে কী ঘটনা ছিল, তাতে গেরুয়া বাহিনীর ভূমিকাই বা কী ছিল, ইতিমধ্যে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কোনও বিশেষণ, কোনও ব্যাখ্যাই কেউ বাদ রাখেননি। সুতরাং সে ব্যাপারে নতুন সংযোজনের অবকাশ নেই। তা ছাড়া বাবরি মসজিদ ধ্বংস কিংবা গুজরাত, মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা যাদের বায়োডেটায় রয়েছে, তাদের সম্পর্কে নতুন করে হয়তো বলারও নেই কিছু।

    কিন্তু আমার মৌলিক প্রশ্ন, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল কী করছিলেন? হ্যাঁ, তথাকথিত সেই ‘জননায়ক’ কেজরিওয়াল কী করছিলেন?

    আগুন যখন পুরোমাত্রায় লেগে গিয়েছে, বাড়ির ছাদের উপর পর্যন্ত যখন চলে গিয়েছে তার লেলিহান শিখা, তখন উনি গোবেচারা মুখ করে এসে বললেন, ম্যায় দুখি হুঁ! দিল্লি পুলিশ তো আমার অধীনে নয় জি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। তার পর যখন একের পর এক লাশ বেরোচ্ছে, দাঙ্গায় পুড়ে যাওয়া মৃত্যপুরী ফুটে উঠছে টিভির পর্দায়, উনি কিনা সপার্ষদ ক্ষতিপূরণ ঘোষণায় নামলেন।

    ব্যস এতেই হয়ে গেল? এতেই দায়িত্ব শেষ?

    প্রথম কথা হল, দিল্লি পুলিশ কস্মিনকালেও রাজ্যের অধীনে ছিল না। তা ছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনেই। অতীতে বাজপেয়ী জমানায় দিল্লিতে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে যেমন পুলিশ ছিল না, তেমনই ছিল না মনমোহন জমানায় কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে। ভুলে গেলে চলবে নির্ভয়া কাণ্ডের পর দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতের উদ্দেশে কী লেকচার দিয়েছিলেন কেজরিওয়াল?

    মেনে নিচ্ছি, হিংসা রুখতে দিল্লি পুলিশের ভূমিকাও সদর্থক ছিল না। কিন্তু এ ধরনের গোষ্ঠী সংঘর্ষ কি শুধু পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করবে? রাজনৈতিক দলের কোনও ভূমিকা থাকবে না?

    মাত্র ক’দিন আগেই দিল্লিতে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে আম আদমি পার্টি। ৭০ টি আসনের মধ্যে ৬২ টি আসনই জিতে নিয়েছে তারা। ভোটের ফলাফল ও ভোট শতাংশ যদি বিচার করি, তা হলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে দিল্লির ষোল আনা সংখ্যালঘু মানুষের ভোট পেয়েছেন কেজরিওয়াল।

    কিন্তু সেই সংখ্যালঘুরা যখন বিপন্ন, তখন কেজরিওয়াল কি শুধু ঘরে বসে পুলিশ পুলিশ বলে অসহায় চিৎকার করে যাবেন? তাঁর উচিত ছিল অশান্তির আঁচ পাওয়া মাত্র সেখানে চলে যাওয়া। তাঁর দলের বিধায়ক, নেতা, কর্মীদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া। এলাকায় ঘুরে ঘুরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে শান্তি মিছিল বের করা, পিস কমিটি তৈরি করা। কারণ, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে তো দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই ভোট পেয়েছেন তিনি।

    টিভিতেই দেখা গিয়েছে, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে হিংসা ছড়িয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম চরিত্র ছিলেন আম আদমি পার্টির কাউন্সিলর তাহির হুসেন। তর্কের খাতিরে নয় ধরেই নিলাম যে তাহির আত্মরক্ষায় দলবল নিয়ে ছাদ থেকে সোডার বোতল, ইট পাটকেল ছুড়ছিলেন। তার মানে তাহির বিপন্ন ছিলেন। সেই খবর কেন পৌঁছয়নি কেজরিওয়াল বা মণীশ শিশোদিয়ার কাছে? কেন বিপন্ন সেই সংখ্যালঘু নেতাকে বাঁচাতে কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের কেউ মাঠে নামেননি।

    মনে পড়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাতেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন বামেরা বাংলায় তা নিয়ে দাঙ্গা হতে দেননি। এলাকায় এলাকায় সংখ্যালঘুদের নিয়ে মিছিল করে উত্তেজনা প্রশমিত করেছিলেন। মেরুকরণের রাজনীতির জন্য ইদানীং বাংলায় কোথাও যখন টেনশন তৈরি হয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চেষ্টা করেন দলের নেতা কর্মীদের দিয়ে এলাকায় উত্তেজনা প্রশমনের। কারণ, পুলিশি অ্যাকশন দিয়ে সবসময় যেমন হিংসা থামানো যায় না, তেমনই সবাইকে সাহস যোগানোও যায় না। মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তার কাঁধে হাত রেখেই তা আরও সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব।

    দিল্লি ভোটের ফল প্রকাশের পর দেখা গিয়েছিল, কেজরিওয়ালের মিডিয়া ম্যানেজাররা অনিল কাপুরের ‘নায়ক’ সিনেমার পোস্টারের সঙ্গে অরবিন্দের ছবি লাগিয়ে প্রচার করছেন। নায়কে অনিল কাপুর ছিলেন সত্যিই জননায়ক। একদিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি প্রশাসনিক বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। ওই ছবি দেখে একজন আদর্শ রাজনীতিক সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে রোমান্টিসিজমে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল জনতা।

    তবে সিনেমা সিনেমাই। তাতে বর্তমান সমাজ জীবনের প্রতিফলন দেখা গেলেও বাস্তবের সঙ্গে বিস্তর ফারাক। এবং আমি মনে করি, কেজরিওয়াল মোটেই নায়ক নন। তাঁরও উদ্দেশ্য স্রেফ গদিতে টিকে থাকা। প্রকৃত জননায়ক কখনওই নৈরাজ্যবাদী হতে পারেন না। তাঁর চরিত্রে তা থাকার কথাও নয়। অথচ তাঁকে দেখেছি প্রথমবার ক্ষমতায় এসে স্রেফ ধর্না দিয়ে আর লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করে তিন বছর কাটিয়ে দিতে। তার পর ভোটের মুখে দু’শ ইউনিট বিদ্যুৎ, সিসিটিভি ক্যামেরা, বাসে মেয়েদের টিকিট ফ্রি দেওয়ার মতো খয়রাতির রাজনীতি করে মানুষের মন ভোলাতে। এও প্রশ্ন জাগে, তিনি যদি এতই জনপ্রিয় হন তা হলে কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে ভোটের আগে স্ট্র্যাটেজিস্ট ভাড়া করার প্রয়োজনই বা পড়ল কেন? কেনই বা ভোটের সময় হাতে হনুমান চালিশা নিয়ে ঘুরতে হল?

    কারণ, কেজরিওয়ালও টিকে থাকার রাজনীতিতে ঢুকে গিয়েছেন। তিনি জানতেন, দিল্লির সংখ্যালঘুদের আর যাওয়ার জায়গা নেই। ওরা আপকেই ভোট দেবে। সুতরাং শাহিনবাগে গিয়ে সংখ্যাগুরুদের চটাব কেন। বরং হাতে একটা হনুমান চালিশা নিয়ে ঘুরি। হালকা করে একটু হিন্দুত্ব করি।

    উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে হিংসার আগুন ছড়ানোর পরেও হয়তো সেই রাজনীতিই কাজ করেছে ওর। ওসবের মাঝে ঢুকে কেন সংখ্যাগুরুদের চটাব। আর সংখ্যালঘুরা তো থাকছেই আপের সঙ্গে। বরং আমি পুলিশ পুলিশ বলে চিৎকার করি, সেনা নামানোর দাবি জানাই, ওটাই সেফ লাইন।

    কিন্তু মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আপনি ধরা পড়ে গিয়েছেন। তা সে যতই গলা ফাটিয়ে পুলিশ পুলিশ করুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More