শনিবার, মার্চ ২৩

এত হিংসা সহ্য করা যাচ্ছে না

সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়

আরো পাঁচজন সাধারণ মানুষের মত দিনের শেষে বাড়ি ফিরে আমিও টিভিতে খবর বা খবরের বিশ্লেষণী আলোচনা দেখতে ভালবাসি। বাড়ির সিরিয়াল-প্রেমী সম্প্রদায়ের সাথে এ নিয়ে সামান্য মনোমালিন্য হয়, কারণ টিভি একটাই। তবে ইদানীংকালে, মানে একদম হালে এসে বাড়ীর অন্য লোকেরা বেজায় খুশী কারণ আমি আর নিয়মিত খবর বা আলোচনা দেখছি না।

এখন এ রাজ্যে খবর একটাই, তা হল পঞ্চায়েত ভোট। রাশিয়া, চিন বা ভিয়েতনামের বিপ্লব আমি দেখিনি, আর সে সময় মিডিয়ার এই ভূমিকা ছিল না কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেদিন যদি আজকের মিডিয়া থাকতও তাহলে তারা সেসব ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা নিয়ে এত কভারেজ দেবার মত মেটিরিয়াল পেতেন না। যদিও অক্ষরিক অর্থে ঠিক নয়, তাও অনেকেই অক্টোবর বিপ্লবকে বলেন ‘ব্লাডলেস রেভলিউশন’। এ পঞ্চায়েত ভোটকে এ রাজ্যের একটি শিশুও বোধহয় ‘ব্লাডলেস’ বলতে পারবে না।

সারা দেশের ঘটনা নয়, বিশ্বের কিছু তো নয়ই, ছোট একটি রাজ্য সেখানে ভোট হচ্ছে। তাও বিধানসভা নয়, লোকসভার বাই ইলেকশন নয়, গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোট। সে ভোট কবে হবে আমরা জানি না কারণ নমিনেশন জমা দেয়া নিয়ে যা হয়েছে তা কল্পনাতীত। আর আলোচনার কথা যা বললাম তাতে কিন্তু কোন পঞ্চায়েত গত পাঁচ বছরে কী করেছেন বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু কী করেন নি, সেসব কিছু নেই। পুরো আলোচনার বিষয় হল কোথায় মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে কার কী অবস্থা হয়েছে। কত মারামারি হয়েছে এইসব।

কত মানুষ জখম হয়েছেন বা প্রাণ হারিয়েছেন সে সঠিক হিসেব আমার কাছে নেই, হয়ত কারো কাছেই নেই। কিন্তু প্রতিদিন আমরা দেখছি রক্তাক্ত মানুষ, হয় রাস্তায় পড়ে নয়ত শুয়ে আছেন দীন দরিদ্র কোন হাসপাতাল বা হেলথ সেন্টারের স্ট্রেচারে। গায়ের ওপরে যে চাদরটা দিয়ে ঢাকা সেটা এখনও মাথার ওপর টেনে দেয়া হয়নি, কিন্তু হতে পারে যে কোন সময়ে।

সেটা কিন্তু আর টিভি ক্যামেরাতে ধরা পরবে না কারণ ক্যামেরা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অন্য কোন গ্রামে যেখানে পেছন থেকে গুলি খেয়ে চিরঘুমে লুটিয়ে পড়েছে কোন যুবক। না, দু’ফোঁটা চোখের জল তার জুটবে না, অন্তত এখন তো নয়ই, তাঁর শোকতপ্ত পিতাকে ধরে টানাটানি চলবে, তাঁকে ক্যামেরার সামনে কবুল করতে হবে তাঁর ছেলে কোন দলের কর্মী ছিল। এই এই চরম মর্বিডিটি আমরা ভাবলেশহীন মুখে দেখতে দেখতে চিপস চিবোতে চিবোতে চায়ে চুমুক দেব।

আমাদের ছোটবেলা এই ক্লাস নাইন টেন-এ ইতিহাসের সাথে ভারতের সংবিধান বলে একটা বিষয় পড়তে হত। ব্যাপারটা আমার বিশেষ প্রিয় ছিল কারণ ওই সংবিধান অংশের জোরে আমি ইতিহাসে পাশ করতাম। সেখানে পড়েছি যে শাসকের পাশাপাশি বিরোধী সদস্যের গুরুত্ব। পড়ে মনে হয়েছিল দুটি জিনিস গণতন্ত্রকে রাজতন্ত্রের অনেক ওপরে স্থান দিয়েছে। এক, সাধারণ মানুষের তাদের শাসক নির্বাচন করার ক্ষমতা আর দুই বিরোধীদের গুরুত্ব।

এখন দেখতে পাচ্ছি এক ভয়াবহ উচ্চারণ, ‘বিরোধী শূন্য’ – অর্থাৎ গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের একটি কারণ চলে গেল। আর মানুষের শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা তো তখনই চলে গিয়েছে যখন এক বা অনেক পক্ষ নমিনেশন ফাইল করতেই পারেন নি। সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে আসল ক্ষমতার লড়াই যখন নমিনেশন ফাইল করার মধ্যেই হয়ে গিয়েছে তখন এত সরকারী টাকা খরচ করে ভোট করার দরকার কি? যে যেখানে যেমন নমিনেশন ফাইল করতে পেরেছে তাকে সে অনুপাতে আসন দিয়ে দিলেই তো হয়। শুধু খাতায় কলমে কিছু নিয়ম রাখতে গিয়ে কোটি কোটি সরকারি টাকা, যা দিয়ে রাস্তাঘাট সাঁকো স্কুল হাসপাতাল হতে পারত, তা খরচ করার দরকার আছে কি?

এই পঞ্চায়েত ভোটের আঁচ যে শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের গায়ে লেগেছে তা নয়। আমারা যারা এইসব ভোট এলাকার বাইরে থাকি তারা ঠিক বুঝব না যে আজ এই ভোট অধীনস্থ পুরো অঞ্চলের চেহারাটা কি। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস সন্দেহ এমন কি পরিষ্কার ঘৃণার প্রকাশ ঘটছে যেখানে সেখানে। চায়ের দোকানের আড্ডা হয়ে উঠছে বিস্ফোরক। স্কুল কলেজ হাসপাতাল যেখানে এমনিতেই খুব ঠিকঠাক কাজ হয় না, সেখানকার অবস্থা আরো শোচনীয়। বোমা পড়ছে যেখানে সেখানে কোন ভরসায় বাবা মা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন?

ভোট নিয়ে অশান্তি বা সন্ত্রাস এ রাজ্যে নতুন বা এ শাসকের আমদানি এ কথা বলা যাবে না। সত্যি বলতে কি কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে লিখতেও বসিনি। কী করে তা করব? রাজনীতির খপ্পরের বাইরে আমরা কেউই নই কিন্তু সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে থাকিনি কখনো। চিরকালই তো দেখে আসছি “Cruel leaders are replaced only to have new leaders turn cruel”। চে-র এই উক্তি তো ভোলবার নয়। কিন্তু এ সন্ত্রাস এ শাসকের আমদানি যদি নাও হয়ে থাকে এ শাসকের সময়ে এই সন্ত্রাস শেষ হবে না কেন তার কোন যুক্তি আছে কি?

তা যদি না হয় তাহলে তো কোন খারাপ ঘটনাই কোনদিন শেষ হবে না।  বাম আমলে বন্‌ধের যে সংস্কৃতি এ রাজ্যের মানুষের বলতে গেলে মজ্জায় ঢুকে গিয়েছিল তা আজ নেই। এবং এ ব্যাপারে কৃতিত্ব অবশ্যই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর প্রাপ্য। কিন্তু ভোটের সন্ত্রাস তো অন্য কথা বলছে। আর সরকারী কিছু সংস্থা যেমন নির্বাচন আয়োগ তার দশা দেখে তো কান্না পায়। শুনেছি সব থেকে ভাল ছাত্ররাই নাকি এসব পদে বসে। এই যদি ভাল ছাত্রের কাজের নমুনা হয় তাহলে তো মাঝারি হয়ে থাকাই ভাল।

আসলে মুশকিল হয়েছে এ রাজ্যে বিপুল সংখ্যক যুবকের কাছে রাজনীতি একটি জীবিকা। আর এটা বুঝেই  সামান্য অর্থের বিনিময়ে এক বাহিনী তৈরি করে ফেলছে শাসক ও বিরোধীরা।

স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও আমরা সবাইকে পরিষ্কার জল, পরিষ্কার বাতাস দিতে পারিনি, শিক্ষার কথা না বলাই ভাল, আর যা দিতে পেরেছি তা হল এমন এক পরিবেশ যেখানে দুটো রুটির জন্য হাতে লাঠি তুলে নিতে হয় জীবন বিপন্ন করে।

মারা যাবার পর সব দল থেকে একখানা করে মালা আসে বটে তার সাথে মার্কার পেনে লেখা একখানা কাগজ ‘অমর রহে’ গোছের ফালতু কথা লেখা। সেটাই বা কম কি!

(লেখক পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি লেখেন  নাটক, গল্প, চিত্রনাট্য, প্রবন্ধ। তাঁর  লেখা বেশ কয়েকটি নাটক কলকাতার নামী কিছু দল দ্বারা অভিনীত হয়।  তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্র ও স্বল্প দৈর্ঘের কাহিনীচিত্র বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও সম্মানিত হয়েছে।)

 

 

Shares

Leave A Reply