বাসে আর ফেসবুকে কি দুটো আলাদা জগতের মানুষ

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

    এই দুদিন আগেও গুনগুন করছিলাম, ‘দেখাতে পারিনে কেন প্রাণ খুলে গো/ বোঝাতে পারিনে হৃদয়বেদনা’। ‘মায়ার খেলা’য় অশোকের কন্ঠে এই গান বহু বহুদিন ধরে আমার প্রিয়তম গানগুলোর একটা। কিন্তু এই দুনিয়াব্যপী মায়ার খেলায় এখন কি হৃদয়বেদনা বলে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই? ভরদুপুরে চলন্ত বাসের মধ্যে চূড়ান্ত অসভ্যতামি করতে থাকা লোকটার ভিডিও দেখতে গিয়ে গা গুলিয়ে ওঠে, চোখ সরিয়ে নিই মুহূর্তেই আর তখনই মনে হয়, এরা কেবল একটা মেয়েকে নির্যাতন করবে বলে এই কাজটা করছে না, এদের লক্ষ্য আরও ব্যাপক। এরা সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে চাইছে যে ‘হৃদয়বেদনা’ বলে আর কিছু হয় না, দুনিয়ার সমস্ত বেদনা দুই পায়ের ফাঁকে এসে জড়ো হয়েছে।

    ‘বেদনা’ শব্দটা ব্যবহার করা ভুলই হয়ে গেল। ‘বেদনা’র যে বিপুল বিস্তার, তার উচ্চারণেই যেভাবে জলে ভরে ওঠে চোখ, তাতে বেদনা আর যারই হোক, কোনও পিশাচের হতে পারে না কোনওদিন। কিন্তু প্যারাডক্স হল, বেদনা যে দিতে পারে না, সেও বেদনা দিতে পারে। আর ওই লোকটা, ওর কী নাম জানতে চাই না, এখনও একটা বিপুল অংশের মানুষকে বেদনা দিতে সক্ষম হয়েছে।

    বেদনার চেয়েও বেশি করে হয়তো আতংক ছড়িয়ে গেছে,  যেমন প্রাথমিকভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল অবিশ্বাস কিন্তু সেই টমাস মানের কথায় যেমন পৃথিবীর সব অনুভূতিই শেষ অবধি স্পর্শের অনুভূতি (খাবার জিভকে ছোঁয়,  গন্ধ নাককে, দৃশ্য চোখকে) তেমন সব আতংক বা অবিশ্বাসই দিনের শেষে কোথাও না কোথাও বেদনায় পর্যবসিত হয়, যাদের মস্তিষ্ক এখনও ক্রিয়াশীল কিংবা হৃদয় আজও লাবডুব করে তাদের কাছে।

    ওই লোকটা সেই হৃদয় আর মস্তিষ্কেই ধাক্কা দিয়েছে। আমাদের সমবেত হৃদয় আর মস্তিষ্কে। প্রকাশ্য দিবালোকে, ভরা বাসে এমন কিছু যে করা যায়, আমরা তো কল্পনাও করতে পারতাম না, আজকের  আগে অবধি। সেদিক থেকে বলতে গেলে লোকটি একটি মৈথুনাব্দ, না, মৈথুনাব্দ নয়, বীভৎসাব্দ চালু করল আজ থেকে, কলকাতায়।

    ওকে বিশ ঘা চাবুকের বাড়ি মারলে কিংবা দশবছর জেলে পচালেও, ওর এই অপকীর্তিকে অস্বীকার করা যাবে না আর। তা আরও আরও পিশাচকে অনুপ্রাণিত করবেই।

    শংখবাবুর একটা কবিতায় ছিল যে হঠাত কখনও যদি বোকা হয়ে যায় কেউ সে নিজে আর বুঝতেও পারে না সেটা কারণ বুঝতে পারলে তো আর বোকা বলা যেত না তাকে।

    তেমনি আমরাও কি হঠাৎ করে সবাই ভীষণ অসংবেদনশীল হয়ে গিয়েছি?

    তা নাহলে গোটা বাসের মধ্যে থেকে একটা লোক উঠে এসে ঠাটিয়ে চড় মারল না কেন ওই বিকৃতমস্তিষ্কের গালে? অন্তত বাস থামিয়ে ঘাড়ে ধরে লোকটাকে নামিয়ে দিল না কেন?

    মেয়েটা যখন চেঁচাচ্ছে, ভিডিও করছে মোবাইলে তখনও কারো মনে হল না, উঠে এসে একটা কিছু করি?

    কিন্তু সেই ভিডিওই ফেসবুকে শেয়ার হতে না হতে বিশহাজারের উপরে শেয়ার, পনেরো-ষোলো হাজার কমেন্ট। রাগেফেটে পড়ছে সব। ঝড় তো নয়, সাইক্লোন শুরু হয়েছে  প্রতিবাদের। তাহলে কি ফেসবুকে যারা প্রতিবাদ করে আর বাসে যারা বসে থাকে তারা সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জগতের মানুষ?

    কিন্তু আমরা থাকি তো একই জগতে।

    তাড়াতাড়িই তর্ক শুরু হবে, এতদিনে হয়েও গিয়েছে নিশ্চয়ই, মেয়েটা ফেসবুকে ভিডিওটা আপলোড করে ঠিক করল কি? ওই অশ্লীলতার খতিয়ান কেবলমাত্র পুলিশের কাছে জমা দিয়েই চুপ করে যেতে পারত না কি?কিন্তু আমরা থাকি তো একই জগতে।
    তাড়াতাড়িই তর্ক শুরু হবে, এতদিনে হয়েও গিয়েছে নিশ্চয়ই, মেয়েটা ফেসবুকে ভিডিওটা আপলোড করে ঠিক করল কি? ওই অশ্লীলতার খতিয়ান কেবলমাত্র পুলিশের কাছে জমা দিয়েই চুপ করে যেতে পারত না কি?উত্তরটা যারা খুঁজছেন বা খুঁজবেন তাদের একটাই কথা বলার,যে সমাজ ওই অবস্থায় মেয়েটার ডাকে উঠে এসে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, তার এই প্রশ্নটা করার এক্তিয়ারই নেই।

    কিন্তু যে কথাটা হাজার অন্য কথার ভিড়েও ঘুরেফিরে আসে, তা হল, বাসের ওই চুপ করে বসে থাকা লোকগুলো কারা?
    আমরাই তো!

    তবে কি সোশ্যাল মিডিয়া এসে আমাদের প্রত্যেককে ডাক্তার জেকিল আর মিস্টার হাইড বানিয়ে দিয়েছে? ভবিষ্যতে কি এমন অসংখ্য মানুষ জন্মাবে যারা কেবল আঙুল দিয়েই প্রতিবাদ করবে, গলা দিয়ে নয়?

    সমরেশ বসুর ‘শান্তিপ্রিয়’ গল্পটা মনে পড়ছে। প্রায় পঞ্চাশবছর আগেকার সেই গল্পে বাসের ভিতরে একজন শান্তিপ্রিয় লোক অনেকক্ষণ অবধি লুম্পেনের বাড়াবাড়ি দেখতে দেখতে অবশেষে রুখে দাঁড়ায়, নিজেকে বিপন্ন করে প্রতিবাদ করে। ভার্চুয়াল নয়, রিয়াল প্রতিবাদ।

    আমাদের এই মোবাইলের ঘেরাটোপে বন্দি জনজীবনে আজ ওরকম কিছু ‘শান্তিপ্রিয়’ লোকের ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

    টেকনিকাল ত্রুটির জন্য এই লেখাটির কিছুটা অংশ বাদ পড়ে গিয়েছিল। আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত

    মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

    (বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, এই সময়ের একজন কবি ও গদ্যকার)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More