শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

কুকুর মরলে মোদীর কী, গৌরী খুন নিয়ে মুতালিকের রাজনীতি

শমীক ঘোষ: ‘কর্নাটকে কোনও কুকুর মারা গেলেও প্রধানমন্ত্রীকে কথা বলতে হবে নাকি?’ গৌরী লঙ্কেশ হত্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নীরবতাকে সমর্থন করে এইভাবেই সরব হয়ে উঠলেন, প্রমোদ মুতালিক।  ম্যাঙ্গালোরের পাবে যাওয়ার জন্য মেয়েদের পিটিয়ে বিখ্যাত হওয়া শ্রীরাম সেনের মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় হিন্দু সেনার নেতা।

অর্থাৎ তিনি স্পষ্ট করে দিলেন কট্টর হিন্দুত্ববাদ বিরোধী সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে কুকুর বলেই মনে করেন তিনি। আর কুকুর মরলে কেনই বা প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন?

গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুর রাজারাজেশ্বরী নগরে নিজের বাড়ির সামনে খুন হয়েছেন গৌরী লঙ্কেশ। রাত আটটা নাগাদ বাড়িতে ঢোকার সময় তাঁকে খুন করে আততায়ীরা।

হিন্দু-মৌলবাদীদের তীব্র সমালোচক গৌরীর এই খুনের পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে দেশ জুড়ে। কিন্তু যোগ ব্যায়ামের উপকারিতা থেকে বডি ফিটনেসের প্রয়োজনীয়তার মতো বহু বিষয় নিয়ে ‘মন কি বাত’ প্রকাশ করা নরেন্দ্র মোদী গৌরীর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আশ্চর্য নীরব। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, তবে কি ধরে নিতে হবে নীরবতা সম্মতির লক্ষণ?

আর এই বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর নীরবতাকে হঠাৎ সমর্থন করে বসলেন প্রমোদ মুতালিক।

গৌরী হত্যাকাণ্ডে অবশ্য ইতিমধ্যেই ছয় জনকে গ্রেফতার করেছে কর্নাটক পুলিশ। এর মধ্যে সবার শেষে ধৃত পরশুরাম ওয়াঘমারের সঙ্গে প্রমোদের মুতালিকের ছবি ভাইরালও হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

প্রমোদ অবশ্য বলে দিয়েছেন, পরশুরামের সঙ্গে তাঁর বা শ্রী রাম সেন’এর কোনও সম্পর্কই নেই।

তবে ভারতীয় রাজনীতিতে নিহত বা নীপিড়িতদের সঙ্গে কুকুরের তুলনা টানা অবশ্য এই প্রথম নয়।

লোকসভা নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে এমন কথা বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদীই। ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গায় আক্রান্তদের প্রতি সমব্যথী কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি পালটা বলে বসেছিলেন, সে তো গাড়ির পেছনে সিটে বসে যাওয়ার সময় যদি গাড়ির চাকার নিচে কোনও কুকুরছানা চাপা পরে তাহলে কি আপনি দুঃখিত হবেন না?

রাজনীতিবিদের কথার মারপ্যাঁচে বলে দেওয়া হয়েছিল অনেক কথা। পেছনের সিটে বসে থাকলে আপনি কিছুতেই কাউকে চাপা দেওয়ার জন্য দায়ী হতে পারেন না। আবার একই সঙ্গে একথাও স্পষ্ট করা হয় না যে গাড়িরচালকের এই বেপরোয়া ড্রাইভিং-এ আপনার মত ছিল কিনা। আর দাঙ্গা-পীড়িত অর্থাৎ মুসলমানদের ‘কুকুরের বাচ্চা’র সঙ্গে তুলনা করলে, একই সঙ্গে খুশি রাখা যায় দেশের উগ্র হিন্দু অংশকে। কিন্তু কথাটা যেভাবে বলা হল তাতে সমব্যথী হওয়ার একটা স্পষ্ট ভানও রইল।

মুতালিকের কথায় অবশ্য কোনও মারপ্যাঁচ নেই। গৌরীকে কুকুর বললে কার কী এসে গেল, সে নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তিনি জানেন এই কথা বলায় দেশের সংবেদনশীল অংশ যতই রাগ করুক, তাঁর পকেট-সমর্থক উগ্র হিন্দুত্বের সমর্থকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে বই কমবে না।

আর হিন্দুত্ববাদের প্রসঙ্গে তিনি তো চিরকাল নিজেকে বিজেপির থেকে বেশি কট্টর বলেই প্রমাণ করতে চেয়েছেন। বজরং দলের মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন থেকে বিতাড়িত হয়ে মুতালিক গিয়েছিলেন শিবসেনায়। তারপর বেলগমে মহারাষ্ট্র-কর্নাটক সীমান্ত নিয়ে শিবসেনার সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি নিজেই বানিয়ে বসেন শ্রী রাম সেনে। জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের কাছে তিনি নিজেকে চিনিয়েছিলেন ম্যাঙ্গালোরের পাবে মহিলা পিটিয়ে। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিলেন বিজেপিতে। তবে বিজেপির মধ্যেই তাঁকে নিয়ে তীব্র অসন্তোষ হওয়ায় কয়েক ঘন্টার মধ্যে ত্যাগ করেন সেই দল। ২০১৪ সালে, তিনি বিজেপিকে আক্রমণ করে ভারতীয় জেসাস পার্টিও বলে বসেছিলেন।

নরেন্দ্র মোদীকে সমর্থন এবং গৌরী লঙ্কেশকে কুকুর বলায় আপাতত ভাবে প্রমোদ মুতালিককে যতই যা মুখে আসে তাই বলে দেওয়া কট্টর মৌলবাদী বলে মনে হোক না কেন, আসলে কিন্তু এই ম্যাডনেসেরও একটা মেথড আছে।

কর্নাটকে এখন কংগ্রেস এবং জনতা দল (সেকুলার)-এর জোট সরকার। লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে গৌরী লঙ্কেশের খুনিদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের যোগ পরিষ্কার প্রমাণিত হলে লাভ বিরোধীদেরই।

নোটবন্দী-জিএসটির পর মোদী ঝড় অস্তমিত। উত্তর ভারতে বিরোধীদের ঐক্যের মুখে নড়বড় করছে মোদী-অমিত শাহের রথের চাকা। কর্নাটকে সরকার গড়তে না পারলেও এককভাবে সব থেকে বেশি আসন পেয়েছে বিজেপিই। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও কর্নাটকে ভালো ফল করতে চাইবে বিজেপি। আর ভোটের অঙ্কে যাই হোক না কেন, দেশ জুড়ে কট্টর হিন্দুত্ববাদী কার্যকলাপে কোনও ভাটা নেই। কোথাও হিন্দু বান্ধবীর সঙ্গে বসা জন্য মুসলমান তরুণকে গণপ্রহার তো কোথাও গোরক্ষার জন্য মুসলমানদের গণপ্রহার চলছেই।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই আশঙ্কা, লোকসভা নির্বাচন যত এগোবে দেশের উগ্র হিন্দু অংশকে আরো বেশি করে কাছে পেতে চাইবেন মোদী-অমিত শাহ। হয়ত পকেট থেকে হিন্দু-তাসের টেক্কাও বার করতে হতে পারে তাঁদের।

আর এই বাজারে প্রমোদ মুতালিক তাই চাইলেন কর্নাটকের কট্টর হিন্দুত্ববাদের মুখ হয়ে উঠে বিজেপিকে একটু চাপে রাখতে। হয়ত, মোদীর সমর্থন করে বার্তাও দিতে চাইলেন তাঁদের।

কে না জানে, দেশের মূলধারার রাজনীতিতে অতিবামের গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও অতিদক্ষিণপন্থীদের চিরকালই আছে। কোনও রাজনৈতিক দলের কাছেই তাঁরা সম্পূর্ণভাবে অচ্ছুত নন। আর জনমানসে কটূকথার রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতার উদাহরণ – সেও তো ভুরিভুরি।

প্রমোদ মুতালিক নিজেই চান, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সংবেদনশীল অংশ তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করুক। এই প্রতিবাদ আসলে আরও বেশি করে প্রচার দেবে তাঁকে, দেশের সাম্প্রদায়িক উগ্র অংশের কাছে নিজেকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে প্রচার করতেও সুবিধাই হবে ।

প্রমোদ মুতালিকদের মতো কটূত্বের কারবারিদের রাজনৈতিক কৌশলকেই ভোঁতা করা সব থেকে ভালো অস্ত্র, তাঁদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা।

Leave A Reply