মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

আর্টস পড়লে এত জবাবদিহি করতে হবে কেন?

অস্ত্যর্থা দাস

বছর চোদ্দ আগে যখন বাড়ির অবাধ বিচরণস্থল থেকে বেরিয়ে স্কুল তথা শিক্ষার প্রাথমিক প্রাঙ্গণে পদার্পণ করেছিলাম ,তখন অন্য সব সহপাঠীদের মতোই জানা ছিল না যে , কালক্রমে জটিল আবহে নিজেকে অবিচল রাখার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে আমাদের আশু ভবিষ্যত।

বিজ্ঞান নিয়ে ভারতীয় সমাজের ক্রমবর্ধমান ‘ব্যাধি ‘-টির উপশম পাওয়া দুরূহ। অভিভাবকরা সন্তানদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাতে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে দিনরাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। এই অগণিত সেন্টারগুলোর মধ্যে কারো আশ্বাস  ‘আকাশ ’চুম্বী স্বপ্নপুরণে লাগবে মাত্র বার্ষিক এক লক্ষ টাকা , কেউ খুঁজে দেয় সঠিক ‘পাথ ’ , কেউ আবার দাবী করে দেড় লক্ষের বিনিময়ে একবছরেই তৈরি হবে আইআইটির মজবুত ‘ফাউন্ডেশন ’! তাছাড়া পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর খবরের কাগজের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে সফল আকাশচুম্বীদের পাসপোর্ট ছবি দেখে স্বীকার করতেই হয় যে এদেশের কারিগরি কর্মশালাগুলো প্রতিবছর দক্ষভাবে কত লক্ষ লক্ষ ‘যন্ত্র ’ উত্পাদন  করে চলেছে ।

“ভালো স্টুডেন্ট হয়ে আর্টস পড়বি?!”, “বাড়িতে মা-বাবা বিজ্ঞান ছেড়ে কলাবিভাগে পড়তে দেবে?” এবং “আর্টস পড়ে জীবনে শেষে করবিটা কী!” – যেকোনো সামাজিক আবহে এহেন প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়ার অভ্যাসে বিগত দু’বছরে তটস্থ হয়ে গেছি। গড্ডলিকা স্রোতের প্রবল আকর্ষণ আমি প্রথম উপলব্ধি করি অষ্টম শ্রেণীতে। নবম শ্রেণীতে উঠে যখন সকলপ্রকার ‘মানসিক অবরোধ’ অতিক্রম করে কলাবিভাগে পড়ার সিদ্ধান্তটা নিই তখনও পদে পদে বুঝতে শিখেছি যে এই সামাজিক ব্যাধির মূল অনেক গভীরে নিহিত। দুশো বছরের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার বন্ধ্যত্বে আবদ্ধ মানুষ আপাত-নিরাপদ নিশ্চয়তার ছায়ার আশ্রয়ের খোঁজেই ইঁদুর দৌড়ে ঠেলে দেয় তাদের আত্মজকে। মেকলের যুগের সঙ্গে এযুগের আকাশপাতাল তফাত থাকলেও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো প্রচেষ্টা নেই রাষ্ট্রের। এজন্য বহুলাংশে দায়ী নাগরি অসচেতনতা।

ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের পরিমণ্ডলে বড়ো হয়ে সহিত্যের প্রতি এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ অনুভব করেছি। তবে বিজ্ঞান বা অঙ্কের প্রতি কোনদিনই বিতৃষ্ণা ছিল না। অষ্টম শ্রেণী থেকে অঙ্কে গৃহশিক্ষকের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় কিন্তু অন্য প্রতিটি বিষয় আমি নিজের মতো করে একা পড়ে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি। গল্পের বই কিংবা সিনেমায় মজে থাকা আমায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আমি হয়ত স্বভাবতই একটু কুঁড়ে ফলে এখানে সেখানে ছুটে ‘নোটস’ যোগাড় করার চেয়ে বিভিন্ন বই, অভিধান এবং অন্তর্জালের সাহায্যে নিজের পড়া তৈরি করায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে যে এত ছড়িয়ে থাকা সম্পদ আমায় যা দিতে পারে তার চেয়ে বেশি বোধহয় অন্য কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, তিনি যত বড়ো পসারওয়ালা টিউশন মাসটারই হোন না কেন। যখন প্রথম উপলব্ধি করি যে কলা বিভাগের প্রতিই আমার অন্তরতাড়না, তখনও সম্মুখীন হতে হয়েছে বহু ‘মানসিক অবরোধ’-এর । ভুল করছি না তো ? স্রোতের বিপরীতে চলতে কতটা মানসিক শ্রম প্রয়োজন তা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বুঝেছি।কিন্তু অনেক কম মানুষকেই বোঝাতে পেরেছি যে প্রকৃত মেধার উপাসনা করতেই আমি আর্টস পড়তে চাই , না পড়ে ‘উড়ে বেড়াবার জন্য নয়। আমি কলা বিভাগে পড়ব কারণ আমি ভবিষ্যতে ইংলিশ নিয়ে পড়তে চাই এবং এখন থেকেই বিশ্বসাহিত্যের অতল ভাণ্ডারে নিজেকে আত্মহারা করে ফেলতে চাই। আমি বিশ্বাস করি যে সমাজ যতই ক্লিন্ন হয়ে যাক, কারো যদি নিজের একশো শতাংশ দিয়ে যথার্থ জ্ঞানার্জন করার চেষ্টা থাকে তাহলে তার স্বপ্নসার্থক হবেই। নশ্বর জীবনে কি ‘টাকার যন্ত্র’ হওয়াটাই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত?! আমার পেশার মধ্যে যদি আমি আনন্দ না খুঁজে পাই তাহলে কোনদিনই আমি তার মধ্যে আমার সেরাটা দিতে পারব না। প্রতিটি মানুষের মধ্যে নিহিত থাকে কোন সুপ্ত প্রতিভা – সেই প্রতিভার স্বাধীন বিকাশ হতে না দিয়ে সকলকে এক ছাঁচে গড়ে তোলার ‘ট্রেন্ড’ কী আদৌ বৃহত্তর সমাজের পক্ষে মঙ্গলদায়ক? আজ রাজস্থানের ‘কোচিং শহর’ কোটা যখন দেশের মধ্যে আত্মহত্যার নিরিখে শীর্ষস্থান দখল করে তখনও কি আমরা বুঝব না যে ‘মাছকে গাছে ওঠার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা’ কতটা ক্ষতিকারক?! একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কেন আজও কোন একটি বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের গায়ে পূর্বনির্ধারিত ‘নিম্নমেধা’ তকমা এঁটে দেওয়া হবে?

আরও পড়ুন : বিজ্ঞান/ কলা দ্বন্দ্ব সমাস

এদেশের আপাত ‘বিজ্ঞান ম্যানিয়ার’ পরিপ্রেক্ষীতে আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য – ভারতে যথার্থ বিজ্ঞানচর্চা হয় কী? বিশ্ব যখন প্রতিদিন নতুন নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে চলেছে, এ পোড়া দেশে বিজ্ঞানচর্চার জন্য বরাদ্দ মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদনের ০.৮% ! এদেশেই স্বাধীনতার সত্তর বছর পর বাজেটের প্রায় ২০% ব্যয় হয় প্রতিরক্ষায়, যেখানে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ মোটে ৩%! বিজ্ঞানচর্চার জন্য বরাদ্দ এই ০.৮%-এ মৌলিক গবেষণার সুযোগ ও পরিকাঠামোর অভাবে ভারত প্রযুক্তির দিক থেকে অন্য প্রথমবিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর থেকে অনেক পিছিয়ে। এমন দুর্বোধ্য সমাজকাঠামোয় যে ডাক্তাররা লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছয় তাদের থেকে ‘হাটেবাজারে’-এর ডাক্তার অনাদি মুখোপাধ্যায়, ‘আনন্দ আশ্রম’-এর ডাক্তার দীপক কিংবা ‘অগ্নীশ্বর’-এর ডাক্তার অগ্নীশ্বর চ্যাটার্জির মতো সর্বস্বসমর্পিত নিষ্ঠা আশা করাটাই ধৃষ্টতা। তথাকথিত বিশ্বসেরা লিওনেল মেসির মতোই এরা ‘দেশের’ রত্ন নয়, পুঁজিপতিদের দ্বারা চালিত ইউরোপীয় অর্থনীতির প্রতিনিধি কোন বিশেষ ‘ক্লাব’-এর অলঙ্কার!

ভালোবেসে সুস্থ মনোভাব বজায় রেখে পড়াশোনা করলে কোন বিভাগের মেধাবী ছাত্র অন্য বিভাগের সমকক্ষ ছাত্রটির তুলনায় কম মেধাবী নয়। বিজ্ঞান ও আর্টস এর কোন দ্বন্দ্ব নেই , মানবমনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ (holistic development )-এর জন্য এরা একে অপরের পরিপূরক। তাই আর্টস ভালোবেসে পড়ে ভবিষ্যতে কোন দৃঢ় লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্ত-কে আন্তরিকভাবে সমর্থন করা সমাজের দায়িত্ব। মা বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন কে সন্তানের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্য না দিয়ে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার নিজস্ব মতামত খর্ব করা কতটা ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ?

সমাজের বিজ্ঞান পড়ার হ্যাংওভার এখনও কাটেনি – বিগত তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে উচ্চ মেধা কে ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ার নামান্তর হিসেবে ধরা হয়। আমরা যারা বিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক সহপাঠীদের সাথে সমানতালে পায়ে পা দিয়ে মাধ্যমিকে নিজেদের মেধার প্রকৃত পরিচয় দিয়েই আর্টস পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের প্রতিনিয়ত এই ‘চোখ কোঁচকানো’ ব্যাধির বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের মাধ্যমিকের বছরেই রাজ্যে উচ্চমাধ্যমিকে কলাবিভাগ থেকে শীর্ষস্থান দখল করা গ্রন্থন সেনগুপ্ত-র কথায়ও আমাদের আর্টস পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের এই একই আত্মবেদনা প্রকাশ পায় যখন সে সাক্ষাত্কারে সাংবাদিকের “আর্টস নিয়ে পড়তে বাধা পেতে হয়নি ?” প্রশ্নের উত্তরে বলে, “একদমই নয়। আমাকে বলা হয়েছিল, আমি যেটা নিয়ে পড়তে চাই, সেটা নিয়েই যেন পড়ি। অনেকে আবার মুখ ভেটকেছিল। বলেছিল ‘আর্টস!’ খারাপ লেগেছিল রিআকশনে। কিন্তু কী করতে পারি আর ? মারপিট করতে তো পারি না এজন্য।”

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

(অস্ত্যর্থা দাস সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুলে কলাবিভাগে একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। তিনি এইবছরের সিবিএসই দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় ৯৭.৮ শতাংশ নম্বর পেয়েছেন। ভবিষ্যতে পড়তে চান ইংরাজি সাহিত্য।  প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে পছন্দের বিষয় গল্পের বই ও ধ্রুপদি ভারতীয় ও বিদেশি চলচ্চিত্র ।  অধ্যাপক হওয়ার পাশপাশি লেখক হতে চান।)

Leave A Reply