বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

ট্রোলতন্ত্র

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

সুষমা স্বরাজকে ট্রোল করছেন হিন্দুত্ববাদীদের ইন্টারনেট সেনা? সেকি! তবে কী ট্রোল ফ্যাঙ্কেনস্টাইন? নাকি এই ট্রোলতন্ত্রের শুরু অনেক আগে থেকেই। 

গ্রামের জমিদার কিম্বা বড়লোকের ল্যাজে পা পড়েছে। চণ্ডীমণ্ডপ থেকে বিধান ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দেবার। গ্রামের পুকুরের জলও ছুঁতে দেওয়া হবে না। সাতচল্লিশের আগের ভারতের এই ছবি এখনো সাহিত্যে-শিল্পে জ্বলজ্বল করে। দেখতে চাইলেই দেখা যায়। তারপর? এ সব উঠে গেছে? আজ্ঞে, ভাবতে যতই ইচ্ছে করুক ওঠেনি। গ্রাম-মফস্বল-নগরের রাজনীতি আরো বেশি বেশি করে চণ্ডীমণ্ডপের আওতায় চলে এসেছে। গোদা কথা হল যেখানেই আপনি থাকুন, আপনাকে করে খেতে হলে কারও না কারও হাত ধরতে হবেই। আচ্ছা, করে খাবার ক্ষমতা আপনার বিস্তর, তাই সে কারণে হাত ধরবেন না। অন্যান্য কারণে? ইস্কুলে কলেজে ভর্তি থেকে হাসপাতাল, সবেতেই উপযুক্ত রেফারেন্স না থাকলে সময় মতন পারবেন সব সামলাতে?

সরকারি ব্যবস্থায় শুধু রেফারেন্স? বেসরকারি স্কুলে কত ডোনেশনের গল্প? জানেন না ঠিকঠাক লোক চেনা না থাকলে শুধু ডোনেশনেও কাজ হবে না? বাদ দিন, কেওড়াতলা শ্মশানে একটা ভি আই পি চুল্লি আছে জানেন তো? তো ভি আই পি আপনি মরে গেলে হবেন কেমন করে যদি রেফারেন্স না থাকে? আমরা সবাই জানি এ সব কথা। মুখে যদি তর্জন-গর্জনও করি, মনে মনে জানি কোন দেবতা কোন নৈবেদ্যে সন্তুষ্ট! আরে আক্ষরিক অর্থেই নিতে পারেন। দেবতাকে সন্তুষ্ট করার লাইন ভাবুন। পুজো-টুজো করার লাইন যে তিরুপতিতে (শুনছি তারাপীঠেও) আলাদা তা নিশ্চই আপনাকে বলে দিতে হবে না। যে লাইনে অমিতাভ বচ্চন যাবেন, সে লাইনে আপনি-আমি? যদি বলেন মানছি না তাহলে বলতে হবে এঁড়ে তর্কে কাজ নেই। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, সেখানে যে দেখবে না সে অন্ধ, নয় স্বার্থান্ধ।

হ্যাঁ, এই স্বার্থান্ধ কথাটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখুন একবার। শব্দটা ভয়াবহ রকমের গুরুত্বপূর্ণ। আটষট্টিতে ফাটাকান্তর বাড়িতে ঝোলানো থাকতো ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়ার ছবি। কালে কালে সে ঘরের বাইরেও আরো ঘর হয়েছে। নিতান্ত অন্দরমহলের লোক না হলে ও ঘর অবধি ঢুকতেই পারবেন না। সে সব বাইরের ঘরে মার্ক্স ঝুলতে দেখলে চমকানোর কিচ্ছু নেই। ফাটাকান্ত তো আর শশীকান্ত না, যে ইমনের সঙ্গে কাহাড়বা বাজাবেন। তাঁর বাবার নামে স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্র-রজত নাকি টিনের পদক করিয়ে ছেড়েছিলেন এক কালে। কি বলছেন? বাবা তো রায়সাহেবের লেঠেল ছিল! স্বদেশীওলাদের মাথা ফাটিয়েছে! অ! তা দারোগা মেহের আলি, সার্কেল ইন্সপেক্টর জনার্দন সরকার সবাই কোন মন্ত্রে সাতচল্লিশের পনেরোই অগাস্ট মধ্যরাত যেতেই স্বদেশপ্রেমী স্বদেশী সরকারের নয়া কমরেড হলেন? ফাটার বাপ সাবঅল্টার্ন বলে অমনি না? সে সব প্রবন্ধ ছুঁড়ে মারলে বুঝবেন নিম্নবর্গের শক্তি।

আর হ্যাঁ, ভুলে গেছেন নিতাই, নিমাই আর জগন্নাথের কথা? এক ভাই কংগ্রেস, এক ভাই সিপিআই, এক ভাই সিপিএম? সে পরিবারের আজকের খবর রাখেন তো নিশ্চই! এক ভাই কং, এক ভাই সিপিএম, সিপিআই-এর ধ্বজাধারী মারা গেছেন। কং-এর বড় ছেলে শুরুতে একটু নকু মাইন্ডেড ছিল, এখন তৃণমূল। ছোটটা রাজনীতি করে না বলে। ইস্কুলের চাকরীটা হয়ে গেছে। দেশের জমিজমা সেই দেখে। সিপিএম-এর একমাত্র মেয়ে। না, ভুল করবেন না। ইনি আছেন লড়াই-এ। এবারেই বিজেপি-র হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন প্রায়। নেহাত ছোনে মিত্তির কাটি করেছে। আরে বাবা এই পরিবারে এনসিপি-র হয়ে দাঁড়িয়ে ভোটে হেরেও কামিয়েছে এমন জেঠিও তো ছিল নাকি। শাসক এবং বিরোধী সব দিকেই জ্যাক থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। সবই পরিবারের মধ্যেই রইল। তবে না শান্তিতে পাশের বাড়ির জমির খানিক নিয়ে পাঁচিল, পুকুরে অন্যের ভাগ বেমালুম ভুলে যাওয়া এ সব করা সম্ভব।

এই যে সমাজ এবং সামাজিকেরা, এঁদের তো মহীরাবণের চাইতেও কঠিন ব্যাপার-স্যাপার। কার্তবীর্জার্জুন লাগে কোথায়? এক হাজার মাথা, দশ লক্ষ হাত। চায়ের দোকানে আমি-আপনি কখন হেঁচেছিলাম সে খবর তো লোকাল-জোনাল সব কমিটিতেই এঁরা নিয়ে গেছেন। কেন, আপনাকে সেদিন ওই রাজনীতি না করা অমূল্য বলেনি, ‘পঞ্চাদা, ছিলেন তো মাল। এখন রায় হয়ে যে রায় সাহেব হয়ে গেলেন।’ আপনি খ্যা খ্যা করে হেসে ভেবেছেন খুব ইয়ার্কি ওড়ালেন। কই, ক্লাবের ছেলেরা যে রাত্রে আপনার নতুন পাঁচিল ভেঙে দিল, কিস্যু পেরেছেন করতে? এখন চায়ের দোকানে গোবিন্দকে নিয়ে আর বলতে সাহস করেন ‘কবে মন্ত্রী হবি’?

আপনি তো আপনি, মাঝপেলিয়ার নিমু সাঁতরা, গম্ভীর ভাবে টিচার্স রুমে একবারই বলে ফেলেছিল, জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়াটা সত্যিই ঐতিহাসিক ভুল। ওই যে অতগুলো মিটিং-মিছিলে – ক্লাস সামলে, ধুতি সামলে – চব্বিশটা বছর গেছিলেন – ফুঁয়ে উড়ে যায়নি? পেনশন নিজের চোখে দেখে যেতে পেরেছে লোকটা? আরে বাদ দিন, নেতাজীর ছবির উপর মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। অম্লানদা, অত রোয়াবে চলা ব্যবসায়ী, একবারই শুধু তপনদাকে বলেছিল তো, ‘তপন, নেতাজীকে ছোট করিস না’। কত ডোনেশন দিয়েছে তারপর কে মনে রেখেছে? প্রোমোটিং করে আর খেতে পাবে জীবনে?

ট্রোল! নতুন নতুন আপনাদের কাঁঠালের আঁঠা মাইরি। ফেসবুক দেখেছেন, গুগল, টুইটার এ সব খানিক শুনেছেন কী শোনেননি ট্রোল নিয়ে অত্ত কথা বলছেন। বলি ট্রোল কি বেদে ছিল না? সামবেদের লোকদের ঋক্‌বেদের লোকেরা দলবদ্ধ ভাবে নেচেগেয়ে কুকুর-টুকুর বলেনি? না দাদা, না দিদি, আমিও আজকাল সময় বুঝে নিচ্ছি। বেদ-টেদ পড়ছি। দু-চারটে গীতার বাণীও বাঙালির সংস্কৃতে ঝেড়ে দিচ্ছি। আরে ইস্কুলে সেই কাগজ দেখে মহাপুরুষদের বাণী পড়তাম না, সকাল বেলা – সেই অভ্যাস ঝালিয়ে নিচ্ছি। সুষমা স্বরাজ, একটা এত্তবড় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে বুঝতে পারলেন না, কখন চুপ থাকতে হয়? ট্রোল করছে বলে সকলে চ্যাঁচাচ্ছে, নেহাত আমার ইংরেজীটা কাঁচা, নইলে আমিও তো করতাম। আরে যদি লক্ষ্যই হয় কামাই, তাহলে কেন তেল পাবে জগাই-মাধাই? সোজা আসল জায়গায় তেল দেব। আহা, আমি দোতলাটা এবারে করেই ফেলব, ম্মা কালীর দিব্যি।

এঁরা না থাকলে? ধ্যার মশাই। ট্রোলতন্ত্রের কিস্যু বোঝেননি দেখছি। কুকুর পছন্দ করা দেখেছেন? যে মালিক কুকুর পছন্দ করে সে তো দাঁত, নখ, লোম, লেজ, পিটিপিটে চোখ এই সব দেখেই বাছে। যেমন মালিক পাব আমি তেমন কুকুর হব। যাকে যা দেখালে পছন্দ তাকে তাই দেখাব। ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি হুক না লাগাতে পারলে আপনি নেড়ি, আমিও নেড়ি। রাইটিস্ট এই ট্রোল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, বিজেপি-র কন্ট্রোলে নেই, একদিন প্রধানমন্ত্রীকেও মানবে না – এই সব তত্ত্বে বাজার গরম করছেন করুন। ট্রোলতন্ত্রের গূহ্যমন্ত্রই জানেন না। কত হিঁদু দু-পয়সা করবে বলে মোছলমানের পা চেটেছিল ভুলে গেছেন? তারপরে ইংরেজ পা কত হিঁদুতে মোছলমানে? সেই ট্র্যাডিশন বজায় রাখাই কাজ। কস্তব কান্তা কস্তে পূত্রা! ক্ষমতাই একমাত্র ঈশ্বর। লেফট-রাইট, হিঁদু-কেরেস্তান-মোছলমান যে রূপেই আসুক, ট্রোলের কাজ তাঁর এবং তাঁর ভজনা। অবশ্যই যদ্দিন ক্ষমতায়। এবং প্রধান, মুখ্য এই সব মন্ত্রী বলেই না, যিনি যেখানে ক্ষমতায় তিনিই পূজ্য। সে পাড়ার নেতাই হোক, কী ফেসবুক কমিউনিটির অ্যাডমিন।

‘স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্যান সর্ব্বত্র পূজ্যতে’ শুনে আলুথালু চোখ করে ভেবেছেন বিদ্যানের কী গরিমা, অহো! মশাই, তাই যদি হত তাহলে স্বদেশেই বা রাজা কেন, বিদ্যানই তো পুজো পেতেন। রাজাকে তো সব সময় সুশাসনের জন্যই পুজো করে লোক এমন না। ভয়েও করে বেশীরভাগ। বিদ্যান তো পিটিয়ে পুজো নিতে পারবে না। কই একবারের জন্যও ভাবলেন এই দুই তুলনাই অমূলক। অথবা প্রথমেই আসল কথা আছে, দেশে রাজা বাপু, তুমি বাইরে পুজো পাবে ভেবেই থাক। স্বান্তনা পুরস্কার আর কী! হাতে আসবে না। ট্রোলেরা এ সব জেনেই ট্রোল হয়। শিখুন, নইলে পিছিয়ে পড়ুন।

(লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং নাট্যকর্মী)

Shares

Leave A Reply